১৭ জুলাই ২০১৯  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

বিশ্বকাপে প্রথম সুযোগেই বাজিমাত লিটনের

বিশ্বকাপে প্রথম সুযোগেই বাজিমাত লিটনের

ধমোঃ মামুন রশীদ ॥ টানা তিন ম্যাচ সাজঘরে বসে ছিলেন দর্শক হয়ে। মূলত ওপেনার হওয়ার কারণেই কম্বিনেশনে মিলছিল না বলে লিটন কুমার দাসের বিশ্বকাপ অভিষেক আটকে ছিল। এবারই প্রথম বিশ্বকাপ এ তরুণ ডানহাতি ওপেনারের। শেষ পর্যন্ত সুযোগটা মিলল, তবে ওপেনার হিসেবে নয়- মিডলঅর্ডার ব্যাটসম্যান হিসেবে। আর প্রথম সুযোগেই বাজিমাত করলেন অফফর্মে থাকা মোহাম্মদ মিঠুনের পরিবর্তে খেলতে নেমে। ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে সোমবার টন্টনে দলের ‘ডু-অর-ডাই’ ম্যাচে ৫ নম্বরে নেমে ৬৯ বলে ৯৪ রানের হার না মানা ইনিংসে দলকে রেকর্ডময় জয় উপহার দিয়েই ফিরেছেন। সুযোগের সদ্ব্যবহার এভাবে করে বিশ্বকাপে নিজের শুরুটাও অবিস্মরণীয় করে রাখলেন। ২৪ বছর বয়সী এ তারকা বিশ্বকাপের আগে আয়ারল্যান্ডে হওয়া ত্রিদেশীয় সিরিজেও একাদশে নিয়মিত হতে পারেননি দলগত সমন্বয়ের কারণে। সেই সিরিজেও আয়ারল্যান্ডের বিপক্ষে সুযোগ পেয়েই খেলেছিলেন ৬৭ বলে ৭৬ রানের ইনিংস। তারপর থেকেই একাদশের বাইরে থাকা লিটন আবারও নিজের সামর্থ্যরে প্রমাণ দিলেন।

ঠিক ৪ বছর আগে ভারতের বিপক্ষে ঢাকার মিরপুর শেরেবাংলা জাতীয় স্টেডিয়ামে ওয়ানডে অভিষেক হয়েছিল লিটনের। তখন সৌম্য সরকার ফর্মের তুঙ্গে থাকায় তামিম ইকবালের সঙ্গে ইনিংসের উদ্বোধন করেছেন তিনিই। আর ওয়ানডাউনে লিটন। তিন ম্যাচের সিরিজে ৮, ৩৬ ও ৩৪ রান করে এই পজিশনে বাংলাদেশ দলের দীর্ঘ সময়ের চিন্তামুক্তির নিদর্শন দেখিয়েছিলেন। তিন নম্বরে নির্ভরযোগ্য কাউকে পায়নি বাংলাদেশ, তাই বেশ কয়েকবার লিটনকে সুযোগ দিলেও তা কাজে লাগাতে পারেননি। সে জন্য দুই বছরের জন্য ছিটকে যান, ২০১৭ সালের শেষে ফিরে এসে আবার বাদ পড়েন এক বছরের জন্য। গত বছর এশিয়া কাপে লিটন ছাড়া ভাল কোন বিকল্প ছিল না বাংলাদেশ দলের জন্য। সৌম্য তখন ব্যাট হাতে ঘরোয়া এবং আন্তর্জাতিক সব পর্যায়ে করুণ দশার মধ্যে। আর এই এশিয়া কাপে ওপেনার হিসেবে পাওয়া সুযোগটাই কাজে লাগিয়েছেন লিটন। প্রথম তিন ম্যাচে ০, ৬, ৭ করলেও চতুর্থ ম্যাচে অবশেষে ক্যারিয়ারসেরা ৪১, পঞ্চম ম্যাচে ৬ রান করেন। ১৭ ওয়ানডে পার করে কোন অর্ধশতকেরও মুখ না দেখা লিটন এশিয়া কাপ ফাইনালে সবাইকে তাক লাগিয়ে দেন। ভারতের বিপক্ষে ১১৭ বলে ১২ চার ও ২ ছক্কায় ১২১ রান করে বুঝিয়ে দেন কেন নির্বাচকরা বারবার তার ওপর নির্ভর করছিলেন। এক ম্যাচ বাদেই জিম্বাবুইয়ের বিপক্ষে ৭৭ বলে ৮৩ রান করেছিলেন। তবে নিয়মিত হতে পারেননি। সৌম্য দুর্দান্তভাবে রানে ফিরে ফর্মের তুঙ্গে তখন। দলও দারুণ নৈপুণ্য দেখিয়ে যাওয়ার কারণে লিটন অনিয়মিত হয়ে পড়েন। চলমান বিশ্বকাপের প্রথম তিন ম্যাচেও সাইডবেঞ্চে বসে থাকেন লিটন। সৌম্য খুব বড় ইনিংস খেলতে না পারলেও ভালই খেলছিলেন। তবে চার নম্বরে মিঠুন ব্যর্থ হওয়ায় ক্যারিবীয়দের বিপক্ষে সোমবার নিজেদের পঞ্চম ম্যাচে বাংলাদেশ মিঠুনকে বাদ দিয়ে লিটনকে নিয়ে একাদশ সাজায়।

ত্রিদেশীয় সিরিজ থেকে শুরু করে সবমিলিয়ে ৫ ম্যাচ পরে পাওয়া সুযোগটা কাজে লাগিয়েছেন দারুণভাবে। ক্যারিয়ারের প্রথম বিশ্বকাপ। মর্যাদার এই মঞ্চে অভিষেক হয়েছে দলের গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচে, তাও আবার ৫ নম্বর ব্যাটসম্যান হিসেবে। এই পজিশনে টেস্ট খেললেও ওয়ানডেতে ৩ নম্বর পজিশনের নিচে নামতে হয়নি লিটনকে। কিন্তু দারুণ কিছু করার জন্য মুখিয়ে ছিলেন। সাকিব আল হাসান তখন দুর্দান্ত খেলছিলেন, ৪৪ রানে অপরাজিত। সাকিবকে সঙ্গ দিতে পারেননি তামিম কিংবা মুশফিক। তাই লিটনের ওপর সেই ভার ন্যস্ত করেছিল দল। স্বভাবগতভাবে আক্রমণাত্মক হলেও তাই শুরুটা করেছিলেন মন্থর বেগে। ৩২২ রানের লক্ষ্যে খেলতে নামা বাংলাদেশের রান তখন ৩ উইকেটে ১৩৩। প্রথম ২৮ বলে ২৩ রান করা লিটনের সঙ্গে সাকিবের জুটিটা ৮২ রানে পৌঁছেছে। অর্থাৎ সাকিব অন্যপ্রান্তে লিটনের দারুণ সঙ্গ পেয়ে ক্যারিবীয় বোলারদের ওপর চড়াও হয়ে খেলে যাচ্ছিলেন। এরপর থেকেই লিটন ঝলসে ওঠেন। ক্রিস গেইলের করা এক ওভারে দুটি চার হাঁকান। এ বিষয়ে লিটন নিজেই পরে বলেছেন, ‘আমি প্রথমে সবকিছুতে নার্ভাস ছিলাম। ৩০ রান করার পর আমার মনে হয়েছে এই উইকেটে আমি রান করতে পারব। এর আগে আমি ঠিক মতো ব্যাটিং করতে পারছিলাম না। ৩০ রান হওয়ার পর সাবলীল খেলতে পেরেছি।’

তারপর আর থামানো যায়নি লিটনকে, ৪৩ বলেই ফিফটি আদায় করে নেন। ক্যারিয়ারের তৃতীয় আর বিশ্বকাপ অভিষেকেই ফিফটি হাঁকিয়ে আরও বিস্ফোরক হয়ে ওঠেন লিটন। শ্যানন গ্যাব্রিয়েলের করা ৩৮তম ওভারের প্রথম তিন বলেই টানা ছক্কা হাঁকিয়ে নিজের আসল রূপ দেখান। ওই ওভারে ২৪ রান তুলে নেন তিনি। আর দলও সহজ জয়ের দ্বারপ্রান্তে পৌঁছে যায়। শেষ পর্যন্ত অবশ্য সেঞ্চুরিটা পাননি দল জিতে যাওয়াতে। ৬৯ বলে ৮ চার, ৪ ছক্কায় ৯৪ রানে। এটি বিশ্বকাপের প্রথম ম্যাচে কোন বাংলাদেশীর সর্বোচ্চ ব্যক্তিগত রান। লিটনের এমন মারদাঙ্গা ব্যাটিংয়ের কারণেই চতুর্থ উইকেটে সাকিবের সঙ্গে মাত্র ১৩৫ বলে ১৮৯ রানের জুটি গড়ে উঠেছে। এটি বিশ্বকাপে চতুর্থ উইকেটে দ্বিতীয় সেরা এবং বাংলাদেশের পক্ষে সেরা জুটির রেকর্ড। এর আগে হল্যান্ডের বিপক্ষে ২০০৭ বিশ্বকাপে অস্ট্রেলিয়ার মাইকেল ক্লার্ক ও ব্র্যাড হজের করা ২০৪ রানের জুটিই এখন পর্যন্ত সেরা। ৫ নম্বরে নেমে টপঅর্ডার লিটনের এমন অবিশ্বাস্য ব্যাটিং দেখে অধিনায়ক মাশরাফি বিন মর্তুজা বলেন, ‘খুবই মেধার সঙ্গে ব্যাটিং করেছে লিটন। সাধারণত সে টপঅর্ডার, তাই ৫ নম্বরে ব্যাট করা খুব কঠিন। কিন্তু সে ঠিকই মানিয়ে নিয়েছে এবং দারুণ কিছু করেছে।’ আর সে কারণেই লিটন কিছুটা নার্ভাস ছিলেন ব্যাটিংয়ে নামার পর। কারণ দলকেও তখন অনেক লম্বা পথ পেরোতে হবে। সে জন্য তিনি বললেন, ‘ব্যাটিংয়ে যাওয়ার সময় নার্ভাস ছিলাম। মিডলঅর্ডারে খেলার অভ্যাস খুব একটা নেই। সাকিব ভাই আমাকে সাহায্য করেছে। খেলার মাঝখানে অনেক কথা-বার্তা বলেছে, যেগুলো আমার চাপ কমাতে ভূমিকা রেখেছে।’ সাকিব যেমন লিটনকে পরামর্শ দিয়ে সহায়তা করেছেন, তেমনি লিটনও বিশ্বসেরা অলরাউন্ডারকে অনুপ্রাণিত করেছেন। লিটন বলেন, ‘আমি সাকিব ভাইকে বলেছিলাম, ‘এমন সুযোগ বারবার আসবে না। আপনি অপরাজিত থাকলে আপনার গড়টা বাড়বে। একটু চেষ্টা করেন।’ শেষ পর্যন্ত ৫১ বল বাকি থাকতেই জয় ছিনিয়ে নেয় দল। সে জন্য লিটনের ভক্ত-সমর্থকদের অনেকেই যারা তাকে এলকেডি বলে সম্বোধন করেন, তারা আফসোস করেছেন, ‘ইস! ওয়েস্ট ইন্ডিজের রান আরেকটু বেশি হলে সেঞ্চুরিটা পেতেন লিটন!’ সাকিব তার ব্যাটিংয়ে মুগ্ধ হয়ে পড়ে বলেছেন, ‘উইকেট খুব সহজ ছিল। আমি ওকে বলেছিলাম, যদি উইকেটে থাকতে পারিস তাহলে খেলাটা শেষ করা যাবে। প্রথম ১০, ১৫ বল পর যেভাবে সে (লিটন) ব্যাট করেছে তা ছিল চোখ ধাঁধানো। অপরপ্রান্ত থেকে আমি তার ব্যাটিং উপভোগ করেছি। এমন রান তাড়ায় সে (লিটন) কখনই আমাকে চাপে পড়তে দেয়নি। এটাই তার ইনিংসের সেরা দিক বলব।’