১৭ জুলাই ২০১৯  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

ম্যানচেস্টারে রোহিত-রূপকথা

  • মোঃ রাশেদুল হক

শুরুটা একটু ধীরেই হয়েছিল। সংস্কারের ওল্ড ট্র্যাফোর্ডের নতুনপিচে মোহাম্মদ আমির, হাসান আলিদের বুঝতে খানিকটা সময় লেগেছিল। একবার ধরে ফেলার পর, বাকিটা শিল্প বিপ্লবের শহরে রোহিত শর্মার নতুন শিল্প। এই পিচ কার? ওয়াংখেড়ে না ওল্ড ট্র্যাফোর্ডের? ঠিক সময়ে পিচকে পড়ে ফেলেন টিম ইন্ডিয়ার সহ-অধিনায়ক। তারপরই শুরু হয় তার সংহার। শচীন টেন্ডুলকর-রাহুল দ্রাবিড় পরবর্তী সময়ে ভারতীয় ক্রিকেটের ধ্রুপদী ক্রিকেটার অবশ্যই রোহিত। রবিবার ইতিহাসের ম্যানচেস্টারে তার ব্যাটেই হলো নতুন রূপকথা। চলতি বিশ্বকাপের দ্বিতীয় সেঞ্চুরি রোহিতের ব্যাটে। সেই সঙ্গে ক্যারিয়ারের ২৪তম। ১১৩ বলে ১৪০। তার ব্যাটে সেঞ্চুরি মানে তো আরও একটি ডাবলের স্বপ্ন। ৩৫ হাজারের ওল্ড ট্র্যাফোর্ডের চোখে সেই স্বপ্নই ছিল। কিন্তু হঠাৎই যেন তাল কেটে গেল। তাতে কি। ভারত-পাকিস্তান মহারণে বিশ্বক্রিকেট চেটেপুটে উপভোগ করল হিটম্যানের ট্রিপল ফিগার। যা সাজানো ১৪টি চার আর ৩টি বিশাল ছক্কা দিয়ে।

প্রথম ভারতীয় হিসেবে পাকিস্তানের বিপক্ষে টানা দুই ওয়ানডেতে সেঞ্চুরির রেকর্ড গড়লেন রোহিত। গত বছর সেপ্টেম্বরে দুবাইয়ে এশিয়া কাপে সুপার ফোরের ম্যাচে চিরশত্রুদের বিপক্ষে ১১১ রানে অপরাজিত ছিলেন ওয়ানডেতে রেকর্ড সর্বাধিক তিন-তিনটি ডাবল সেঞ্চুরির মালিক। ইংল্যান্ডে চলতি বিশ্বকাপে রোহিতের এটি দ্বিতীয় সেঞ্চুরি। দক্ষিণ আফ্রিকার বিপক্ষে খেলেছিলেন অপরাজিত ১১১ রানের ইনিংস, মাঝে অস্ট্রেলিয়া বিপক্ষে করেন ৫৭ রান। রোহিতের ইতিহাসগড়া সেঞ্চুরির সঙ্গে লোকেশ রাহুল (৫৭) ও অধিনায়ক বিরাট কোহলির (৭৭) হাফ সেঞ্চুরির ওপর ভর করে নির্ধারিত ৫০ ওভারে ৫ উইকেটে ৩৩৬ রানের চ্যালেঞ্জিং স্কোর গড়ে ভারত। ৪০ ওভারে ৬ উইকেটে ২১২ রান করা পাকিরা হারে ৮৯ রানে। ডাকওয়ার্থ-লুইস পদ্ধতিতে টার্গেট ছিল ৩০২। কোহলি ৬৫ বলে ৭৭ রান করে আউট হন। ২ চার ও ১ ছক্কায় ১৯ বলে ২৬ রান করে ফেরেন হারদিক পান্ডিয়া। পাকিস্তানের সফল বোলার মোহাম্মদ আমির ৪৭ রান দিয়ে নেন ৩ উইকেট। কোহলি, পান্ডিয়া ও অভিজ্ঞ মহেন্দ্র সি ধোনিকে শিকারে পরিণত করেন এই তারকা পেসার। উল্লেখ্য, বিশ্বকাপে এর আগে মোট ছয় দেখায় ভারতকে কখনোই হারাতে পারেনি পাকিস্তান।

পাকিস্তানী বোলাররা যেন রোহিতের কাছে খুবই প্রিয়। তাদের পেলে খুবই স্বাচ্ছন্দ্যে খেলতে থাকেন। এবারও তার ব্যত্যয় ঘটল না। বিশ্বকাপের মতো ‘হাইভোল্টেজ’ ম্যাচে সেঞ্চুরি করে বসলেন ভারতীয় ওপেনার। ম্যানচেস্টারের ওল্ড ট্র্যাফোর্ডে টস হেরে ব্যাট করতে নেমে লোকেশ রাহুলকে নিয়ে ১৩৬ রানের দুর্দান্ত এক জুটি গড়ে তোলেন রোহিত শর্মা। ৭৮ বলে ৫৭ রান করে লোকেশ রাহুল আউট হয়ে গেলেও ঠিকই ক্যারিয়ারের ২৪তম সেঞ্চুরিটি তুলে নেন ওয়ানডে ক্রিকেটের এক ইনিংসে রেকর্ড ব্যক্তিগত সর্বোচ্চ ২৬৪ রানের মালিক। এদিন সেঞ্চুরির মাইলফলকে পৌঁছাতে মাত্র ৮৫ বল খেলেন রোহিত শর্মা। ৯টি বাউন্ডারি এবং ৩টি ছক্কার মার মারেন তিনি। পাকিস্তানের কোন বোলারকেই তোয়াক্কা করলেন না। মোহাম্মদ আমির শুরুর দিকে কিছুটা সমীহ আদায় করলেও শেষ পর্যন্ত আর পারেননি। গত বছর এশিয়া কাপেও প্রথম ম্যাচে ৫১ রানের পর দ্বিতীয় ম্যাচে রোহিত অপরাজিত ছিলেন ১১১ রানে। এর আগে ২০১৭ সালে আইসিসি চ্যাম্পিয়ন্স ট্রফির গ্রুপ-পর্বের ম্যাচেও পাকিস্তানের বিপক্ষে খেলেছিলেন ৯১ রানের দুর্দান্ত এক ইনিংস।

পাকিস্তানের বিপক্ষে বিশ্বকাপে রোহিতের এটি সর্বোপরি কোনও ব্যাটসম্যানের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ ব্যক্তিগত রানের ইনিংস। মাত্র ৪ রানের জন্য এ্যান্ড্রু সাইমন্ডসকে টপকাতে পারেননি তিনি। ২০০৩ সালে দক্ষিণ আফ্রিকা বিশ্বকাপে ১৪৩ রানে অপরাজিত ছিলেন অস্ট্রেলিয়ান ব্যাটসম্যান। পাশাপাশি নিজেদের বিশ্বকাপ ইতিহাসে এদিন প্রথমবারের মতো পাকিস্তানের বিপক্ষে শতরানের উদ্বোধনী জুটি পায় ভারত। রোহিত শর্মা ও লোকেশ রাহুলের উদ্বোধনী জুটি শতরান স্পর্শ করেন ১০৫ বলে। ওয়াহাব রিয়াজের বলে রাহুলের বিদায়ে ভাঙে ২৩.৫ ওভার স্থায়ী ১৩৬ রানের জুটি। রোহিত-রাহুল ছাড়িয়ে গেছেন শচীন টেন্ডুলকর ও নভোজ্যোত সিং সিধু জুটিকে। ১৯৯৬ বিশ্বকাপে বেঙ্গালুরুতে টেন্ডুলকর-সিধুর ৯০ রানের উদ্বোধনী জুটি ছিল আগের রেকর্ড। শুধু তাই নয়, বিশ্বকাপে পাকিস্তানের বিপক্ষে যে কোন উইকেটেই এটি ভারতের মাত্র চতুর্থ শতরানের জুটি। অথচ জুটি ভাঙতে পারত ৪৭ রানেই। কিন্তু রোহিত শর্মাকে রান আউট করার সহজ সুযোগ নষ্ট করেন ফখরুজামান। ৩২ রানে বেঁচে গিয়ে রোহিত করেন ফিফটি, ৩৪ বলে। ফিফটির করেন রাহুলও, ৬৯ বলে। ফিফটির পর অবশ্য ইনিংস আর বড় করতে পারেননি রাহুল। ৭৮ বলে ৩ চার ও ২ ছক্কায় করেন ৫৭।

ম্যান অব দ্যা ম্যাচ পুরস্কার নিতে গিয়ে রোহিত শর্মা বলেন, ‘যেভাবে আমরা একটা দল হিসেবে খেলেছি, তাতে আমি খুশি। আগের ম্যাচ নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে ম্যাচ বৃষ্টিতে পরিত্যক্ত হওয়ার কারণে আমরা ভীষণই নিরাশ হয়েছিলাম, কিন্তু আজ আমরা চেয়েছিলাম যে পুরো ম্যাচ হোক আরও ভালভাবে খেলি। ডবল সেঞ্চুরি করতে না পারা নিয়ে রোহিত শর্মা আগে নিজের বয়ানে বলেন, ‘আমি দুঃখী ছিলাম, যখন আমি আউট হই, বিশেষ করে যেভাবে আমি ওই শটটা খেলেছি। ওরা মিড অনকে পেছিয়ে দিয়েছিল আর ফাইন লেগের খেলোয়াড়কে ভেতরে নিয়ে এসেছিল, কিন্তু আমি সামান্য ভুল বুঝেছিলাম আর আমি এটার ওপর বেশি ধ্যান দিইনি। যখন আপনি সেট হয়ে গেছেন, আপনি তখন যত বেশি সম্ভব রান করতে চান। কিন্তু সত্যি বলতে কি আমি আমার আরেকটা ডবল সেঞ্চুরির ব্যাপারে ভাবছিলাম না। আমার প্রচেষ্টা স্রেফ দলের হয়ে যত বেশি সম্ভব যোগদান দেওয়ার দিকে ছিল’। লোকেশ রাহুলের ব্যাপারে কথা বলতে গিয়ে রোহিত আগে নিজের বয়ানে আরও বলেন, ‘রাহুল ভীষণ ভাল খেলেছে, ও ক্রিজে কিছুটা সময় কাটিয়েছে, যা ভীষণই জরুরী ছিল। উইকেটে সোজা গিয়ে শট খেলা যায় না। কিছু সময় ক্রিকেট থেকে দেখতে হয় যে উইকেট কিভাবে খেলছে। ও আমাকে ভাল সঙ্গ দিয়েছে আর আমরা দু’জনকে দলকে একটা ভাল শুরু এনে দিতে সফল হয়েছি।’

ক্যারিয়ারজুড়ে রেকর্ড ভাঙা-গড়ার খেলায় আরেকটি অর্জন এসে ধরা দিয়েছে বিরাট কোহলির হাতেও। কিংবদন্তি ব্যাটসম্যান শচীন টেন্ডুলকরকে ছাড়িয়ে ওয়ানডেতে দ্রুততম ১১ হাজার রানের রেকর্ড গড়েছেন ভারত অধিনায়ক। ভারতের তৃতীয় ও বিশ্বের নবম ব্যাটসম্যান হিসেবে ১১ হাজার রানে যেতে ২২২ ইনিংস লেগেছে কোহলির। ২০০২ সালে প্রথম ব্যাটসম্যান হিসেবে ১১ হাজার রানে যেতে শচীনের লেগেছিল ২৭৬ ইনিংস। পরে এই ক্লাবের সদস্য বেড়েছে আরও সাতজন। কিন্তু শচীনের চেয়ে কম ইনিংস খেলে ছুঁতে পারেননি কেউ। এবার কোহলি পূর্বসূরিকে পেছনে ফেললেন ৫৪ ইনিংস কম খেলে। পরশু পাকিস্তান ম্যাচের আগে ওয়ানডেতে কোহলির রান ছিল ১০ হাজার ৯৪৩। ওল্ড ট্র্যাফোর্ডে এদিন ৬৫ বলে ৭ চারে ৭৭ রানের দাপুটে ইনিংস খেলার পথে রেকর্ডটি নিজের করে নেন তিনি। ১০ থেকে ১১ হাজারে তার লেগেছে ১৭ ইনিংস। সময়ের হিসেবেও রেকর্ড গড়েছেন কোহলি। ২০০৮ সালের আগস্টে ওয়ানডে অভিষেকের পর ১০ বছর ৩০২ দিনে ১১ হাজারে পৌঁছালেন কোহলি। ১২ বছর ৪১ দিনে রেকর্ডটি গড়েছিলেন শচীন। ওয়ানডেতে দ্রুততম আট হাজার, নয় হাজার ও ১০ হাজার রানে পৌঁছানোর রেকর্ডও কোহলির দখলে।