১৭ জুলাই ২০১৯  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

হ্যান্ডবল তারকা সুমির মালদ্বীপ জয়

  • রুমেল খান

যেখানে সাত ম্যাচে দলের মোট ১৫১ গোলের মধ্যে একজন খেলোয়াড় একাই করেন ৮২ গোল, সেক্ষেত্রে সেই দলটি কি চ্যাম্পিয়ন না হয়ে পারে? হ্যাঁ, নবাগত লাম্বাদা ক্লাব-ও চ্যাম্পিয়ন হয়েছে ‘হাভারু ওমেন্স হ্যান্ডবল টুর্নামেন্ট’-এ। এটি মালদ্বীপের থিনাদো দ্বীপের একটি মহিলা হ্যান্ডবল ক্লাব। গত বৃহস্পতিবার রাতে অনুষ্ঠিত তুমুল প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ ফাইনালে লাম্বাদা ২৭-২৬ গোলে প্রতিপক্ষ আকুয়া প্যারাডাইসকে হারিয়ে শিরোপা জেতে। আর শিরোপা জেতার পেছনে যার সবচেয়ে বেশি অবদান, তিনি বাংলাদেশের হ্যান্ডবলার সুমি বেগম। ফাইনালে তিনি একাই করেন ১৫ গোল, আর ব্যক্তিগত মোট গোলের কথা আগেই বলা হয়েছে।

বাংলাদেশ জাতীয় দল ও বিজেএমসির হ্যান্ডবলার সুমি মালদ্বীপে দেশ ছাড়ার আগে বলে গিয়েছিলেন আবারও বাংলাদেশের মুখ উজ্জ্বল করতে চান তিনি। রবিবার প্রায় পাঁচ ঘণ্টার বিমানযাত্রা শেষে ঢাকায় নেমেই জনকণ্ঠের এই প্রতিবেদককে ফোন দিলেন, জানালেন দীর্ঘ ভ্রমণের কারণে ভীষণ ক্লান্ত হলেও মনটা আনন্দে পরিপূর্ণ। কারণ দেশের মানসম্মান রাখতে পেরেছেন। আজই আবার নিজ জেলা পঞ্চগড়ের তেঁতুলিয়ায় চলে যাবেন।

যাওয়ার আগে জনকণ্ঠকে ২৬ বছর বয়সী সুমি জানান, ‘আমার এই সাফল্যের জন্য বাংলাদেশের তিন কোচ কোচ আমজাদ হোসেন, নাসিরউল্লাহ লাভলু এবং দিদার হোসেনের অবদান অনস্বীকার্য। তারা ঢাকা থেকেই আমাকে দারুণভাবে সাহায্য-পরামর্শ দিয়েছেন। বিশেষ করে নাসির স্যার ফাইনাল খেলাসহ আরও কয়েকটি খেলা চলাকালে বিরতির সময় আমাকে ভিডিও কলের মাধ্যমে বিভিন্ন দিক নির্দেশনা দিয়েছেন। এতে করে আমি আমার বিভিন্ন সমস্যা-দুর্বলতা কাটিয়ে ভাল খেলে গোল করে দলকে জেতাতে পেরেছি। দিদার স্যার প্রায়ই আমাকে কল দিয়ে অনুপ্রেরণা জুগিয়েছেন। আর আমজাদ স্যার তো প্রতিনিয়তই খোঁজ-খবর রাখতেন। তাঁর মাধ্যমেই তো মালদ্বীপে এ নিয়ে দ্বিতীয়বারের মতো খেলতে গেলাম।’

সুমি সর্বোচ্চ গোলদাতার পুরস্কার এবং টুর্নামেন্টের সেরা খেলোয়াড়ের পুরস্কারটিও পান। একই দলের ফাথিমাথ আরুশা ৫৫ গোল করে হন দ্বিতীয় সর্বোচ্চ গোলদাতা, তার গোল সুমির চেয়ে ২৭টি কম!

এর আগে সেমিফাইনালে সুমির দল ১৪-৯ গোলে হারায় সেনোরাসকে। ম্যাচে সুমি একাই করেন ১১ গোল। হন ম্যাচসেরাও। সুমির ক্লাব লীগ পর্যায়ের ম্যাচে আকুয়া প্যারাডাইস স্পোর্টসকে ১৯-১৮ গোলে, যুম্বা হ্যান্ডবল টিমকে ১৯-৪ গোলে এবং বিল্লাবং হাই এমএমকে ৩০-২ (এ ম্যাচেও সেরা খেলোয়াড় হন সুমি) গোলে হারায়। তবে চতুর্থ ম্যাচে সেনোরাস দলের বিপক্ষে ২৩-২৩ গোলে ড্র করে। পঞ্চম ম্যাচে হেরে যায় আকুয়া প্যারাডাইসের কাছে ১৯-২১ গোলে। তবে পয়েন্ট টেবিলের শীর্ষ তিনের মধ্যে থাকার সুবাদে (৫ দলের মধ্যে) লাম্বাদার সেমিতে উঠতে কোন সমস্যা হয়নি। ফাইনালে আকুয়াকে হারিয়ে কড়ায়-গ-ায় বদলা নেয় সুমির লাম্বাদা ক্লাব।

জনকণ্ঠকে সুমি জানান, ‘ফাইনালে জিততে আমাদের ভীষণ কষ্ট হয়েছে। একপর্যায়ে তো জেতার আশা ছেড়েই দিয়েছিলাম। আমার বা হাতে ইনজুরি ছিল। তারপরও পেইনকিলার ইনজেকশন নিয়ে খেলেছি। ফাইনাল খেলা উপভোগ করতে স্টেডিয়ামে ৫০০’র বেশি দর্শক এসেছিল।’

মালদ্বীপে যে কদিন ছিলেন, সেখানকার সতীর্থ ও টিম ম্যানেজমেন্ট খুবই আপন করে নিয়েছিল সুমিকে। সুমির যেন কোন সমস্যা না হয়, সেদিকে তাদের ছিল বাড়তি নজর। বিদায় নেয়ার সময় তাদের ছেড়ে আসতে খুব খারাপ লেগেছে সুমির। খুবই ‘মিস’ করছেন তাদের।

উল্লেখ্য, বাংলাদেশের প্রথম হ্যান্ডবলার হিসেবে বিদেশের লীগে খেলেন সুমি বেগম, ২০১৭ সালে। সিক্স মিটার পজিশনের খেলা সুমি সেবার খেলেছিলেন মালদ্বীপের ড. আবদুল সামাদ মেমোরিয়াল হসপিটাল হ্যান্ডবল দলের হয়ে, হাভারু উইমেন্স হ্যান্ডবল টুর্নামেন্টে। সেই আসরে ৫২টির মতো গোল করেছিলেন সুমি। হয়েছিলেন সর্বোচ্চ গোলদাতা এবং টুনামেন্টসেরা খেলোয়াড়। দলকে অপরাজিত চ্যাম্পিয়নও করেছিলেন, যেটা এবার পারেননি। ২০১৭ সালের লীগ চ্যাম্পিয়ন সুমির সেই ক্লাবটি এবার খেলেনি। আগের মতো ৮ দলের টুর্নামেন্টও হয়নি এবার। এবার আসর অনুষ্ঠিত হয় ৫ দল নিয়ে।

২০১৭ সালে খেলতে গিয়েই দলীয়ভাবে অপরাজিত শিরোপার স্বাদ পেয়েছিলেন সুমি। সেবার ৮টি দল খেলেছিল লীগ পদ্ধতিতে। চূড়ান্ত খেলায় সুমির দল এমআরডিসি ক্লাবকে হারিয়েছিল ২১-৮ গোলে। ওই আসরে প্রতিটি দলে দু’জন বিদেশী খেলানোর নিয়ম থাকলেও সুমিই ছিলেন তার দলের একমাত্র বিদেশী খেলোয়াড়। এবারও তাই। লাম্বাদা ক্লাবের একমাত্র বিদেশী খেলোয়াড় ছিলেন সুমিই।

ষষ্ঠ শ্রেণীতে পড়ার সময় হ্যান্ডবল খেলা শুরু করেন সুমি। অল্প বয়সে বিয়ে হয়ে যাওয়ায় (নবম শ্রেণীতে, ২০০৮ সালে) এবং সন্তান হওয়ায় (এক ছেলে : সামির আহমেদ স্বপ্নীল, বয়স ৬) কয়েক বছর পড়াশোনায় ছেদ পড়ায় এখন পড়ছেন উচ্চ মাধ্যমিকের শেষ বর্ষে। শুরুতে পরিবারের বাধা পেয়েছিলেন খেলতে। তবে রেস্টুরেন্ট ব্যবসায়ী সুমন আলীর ঠিকই উৎসাহ পেয়েছেন।

২০১২ সাল থেকে বিজেএমসির হয়ে খেলছেন সুমি (এখন কর্মরত চট্টগ্রাম জোনে)। তার আগে খেলেছেন আরামবাগ ক্রীড়া সংঘ, আরএম স্পোর্টিং এবং মোহামেডান স্পোর্টিং ক্লাবে। এছাড়া জাতীয় চ্যাম্পিয়নশিপে বিভিন্ন সময় খেলেছেন পঞ্চগড়, ফরিদপুর, নড়াইল ও ঢাকা জেলা দলের হয়ে। বছরখানেক ধরে ঢাকার সানিডেল স্কুলে ক্রীড়াশিক্ষক হিসেবে কাজ করছেন। মালদ্বীপ খেলতে যাওয়ার জন্য স্কুল থেকে ছুটি নিয়ে গিয়েছিলেন।

২০১১ সাল থেকে জাতীয় দলের হয়ে খেলার সুবাদে সুমি এ পর্যন্ত খেলতে গিয়েছেন পাকিস্তান, নেপাল, থাইল্যান্ড, সিঙ্গাপুর, ভিয়েতনাম ও ভারতে।

সুমির ভবিষ্যত লক্ষ্য হচ্ছে এসএ গেমসের হ্যান্ডবলে বাংলাদেশের হয়ে স্বর্ণপদক জেতা। ২০১২ সালে খেলতে গিয়ে এ্যাঙ্কেলের টিস্যু ছিঁড়ে যাওয়াটাকেই এখন পর্যন্ত ক্যারিয়ারের সবচেয়ে বড় ইনজুরি বলে মনে করেন। সুমির অন্য প্রিয় খেলা হচ্ছে দীর্ঘ লাফ। শুনে অবাক হবেন এ খেলায় তার পদকও আছে! ২০০৮ সালে গ্রীষ্মকালীন আন্তঃস্কুল ক্রীড়ায় রীতিমতো রেকর্ড গড়ে সোনা জেতেন। ২০০৯ সালে জাতীয় আন্তঃস্কুল ক্রীড়ায় বর্শা নিক্ষেপে জেতেন স্বর্ণপদক। বিজেএমসির হয়ে ২০১৪ সালে জাতীয় চ্যাম্পিয়নশিপে উশুতে জিতেছেন তা¤্রপদক।

এছাড়া পঞ্চগড়ের কাজী শাহাবুদ্দিন বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের হয়ে আন্তঃস্কুল ভলিবল প্রতিযোগিতায় চ্যাম্পিয়ন হয়েছেন ২০০৬ সালে। একই স্কুলের হয়ে আন্তঃস্কুল হ্যান্ডবলে হ্যাটট্রিকসহ টানা ৫ বার শিরোপা জেতেন (২০০৬-২০১০)। খেলেছেন বিচ রাগবি, বেসবলও। ২০১৩ সালে প্রিমিয়ার লীগ ফুটবলেও খেলেছেন ফরাশগঞ্জের হয়ে! পাঠক নিশ্চয়ই প্রশ্ন করতে পারেনÑ অলরাউন্ডার সুমির আর কোন্ খেলা খেলতে বাকি আছে?

আগামীতে সুমি বিদেশের লীগে খেলতে গিয়ে এভাবে আবারও স্বীয় নৈপুণ্যে প্রজ্বলিত হয়ে দেশের মুখ উজ্জ্বল থেকে উজ্জ্বলতর করুন, সেটাই ক্রীড়ামোদিদের নিগুঢ় প্রত্যাশা।