২৪ জুলাই ২০১৯  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

মানব ইতিহাসের মর্মান্তিক অধ্যায় ॥ ২০ জুন, ১৯৭১

  • শাহাব উদ্দিন মাহমুদ

১৯৭১ সালের ২০ জুন দিনটি ছিল রবিবার। এই দিন বিবিসির সংবাদে বলা হয়েছে, পাকিস্তান স্বেচ্ছায় পূর্ব পাকিস্তানে বিদেশী সংবাদদাতাদের ওপর থেকে নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করে নিয়েছে। নোয়াখালী জেলার ফেনী মহকুমার ফুলগাজী চানগাজীতে ১৭ জুন থেকে ২০ জুন পর্যন্ত চার দিনব্যাপী বাংলাদেশ বাহিনীর সঙ্গে সংঘর্ষে বহু পাকসৈন্য হতাহত হয়। সানডে টাইমস’ পত্রিকার এক সংবাদে বলা হয়, ‘পূর্ব পাকিস্তানে নতুন করে ত্রাসের ঝড় বয়ে চলেছে। স্থানীয় নাগরিকদের তিন শ্রেণীতে ভাগ করা হচ্ছে। কুমিল্লা, রংপুর, কুষ্টিয়া, নোয়াখালী, ফরিদপুর ও সিরাজগঞ্জে পৌঁছেই পাকিস্তানী সেনাবাহিনী সেখানকার জেলা ম্যাজিস্ট্রেট ও পুলিশ সুপারদের হত্যা করে। ভারতের প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী শ্রীনগরে এক জনসভায় বলেন, পূর্ববঙ্গ থেকে শরণার্থী আসার ফলে ভারত নতুন নতুন সমস্যার মুখোমুখি হচ্ছে। ঢাকায় সামরিক গবর্নর টিক্কা খান ঘোষণা করেন, বিদেশীদের কাছে ভারতীয় প্রচারণার মুখোশ তুলে ধরার জন্য পূর্ব পাকিস্তানের সমন্বয়ে একটি প্রতিনিধি দল বিদেশ সফর করবেন। সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী হামিদুল হক চৌধুরীর নেতৃত্বে এই প্রতিনিধি দলে থাকবেন পিডিপির মাহমুদ আলী, বিচারপতি নূরুল ইসলাম ও উপাচার্য ড. সৈয়দ সাজ্জাদ হোসাইন। পাকিস্তান পিপলস পার্টির চেয়ারম্যান জুলফিকার আলী ভুট্টো কোয়েটার সাংবাদিকদের বলেন, দেশের পূর্বাঞ্চলের সাম্প্রতিক দুর্ভাগ্যজনক ঘটনাবলীর জন্য তিনি গভীরভাবে উদ্বিগ্ন। জাতিসংঘের সেক্রেটারি জেনারেল উ থান্ট বললেন, বাংলাদেশে যা ঘটছে তা মানব ইতিহাসের এক মর্মান্তিক অধ্যায়, মানব ইতিহাসের এই কলঙ্ক মুছে দেয়া সম্ভব নয়। বাংলাদেশের ঘটনাবলী সম্পর্কে সেক্রেটারি জেনারেল উ থান্টের এই মন্তব্যের কয়েক দিন পরেই জাতিসংঘ ত্রাণ ও সাহায্য দফতরের হাইকমিশনার প্রিন্স সদরুদ্দীন আগা খাঁ ভারত সীমান্তে বাংলাদেশ থেকে বিতাড়িত লাখ লাখ শরণার্থীর শিবিরগুলো পরিদর্শন করতে গিয়েছিলেন। ভারত সীমান্তে শরণার্থী শিবির সফর করার পর সদরুদ্দীন আগা খাঁ নিজেই বললেন : বাংলাদেশ থেকে আগত শরণার্থীরা নিজেদের জীবন সম্পর্ক কোনরকম নিশ্চয়তা না পাওয়া পর্যন্ত স্বদেশে ফিরতে পারে না। বাংলাদেশের শরণার্থীরা তার কাছে একটি স্মারকলিপি দিয়েছেন। এই স্মারকলিপিটিতে বাংলাদেশের শরণার্থীরা বলেছেন যে, যতদিন পাক হানাদার বাহিনী বাংলাদেশের মাটিতে থাকবে ততদিন স্বদেশে ফেরা তাদের পক্ষে সম্ভব নয়। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাবশালী সিনেটর এ্যাডওয়ার্ড কেনেডি বলেন, পাকিস্তানী হানাদারদের আক্রমণে বাংলাদেশ থেকে লাখ লাখ মানুষ আজও সর্বস্ব হারিয়ে দেশ ছেড়ে চলে যাচ্ছে। পশ্চিম পাকিস্তানী হানাদার বাহিনী আজও সেখানে গণহত্যা চালাচ্ছে, আজও তারা সেখানকার সাধারণ মানুষের বাড়ি-ঘর সহায়-সম্পদ ধ্বংস করছে- নারীর ওপর পৈশাচিক নির্যাতন চালাচ্ছে। সারা বাংলাদেশে পাকিস্তানী হানাদারদের এই বর্বরতায় উদ্বেগ প্রকাশ করা ও এর অবসান ঘটানোর ব্যাপারে সচেষ্ট হবার জন্য সিনেটর এ্যাডওয়ার্ড কেনেডি মার্কিন প্রেসিডেন্ট মিঃ রিচার্ড নিক্সন ও মার্কিন পররাষ্ট্র সচিব মিঃ রজার্সের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন। সিনেটর কেনেডি বলেন, বাংলাদেশে পশ্চিম পাকিস্তানী হানাদারদের সৃষ্ট এই ভয়াবহ পরিস্থিতিতে মার্কিন সরকারের নীরবতা মানব ইতিহাসের এক করুন ট্র্যাজেডি ছাড়া আর কিছুই নয়। তিনি বলেন, আগে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র পাকিস্তানকে যেসব অস্ত্রশস্ত্র সরবরাহ করেছে ইয়াহিয়া সরকার তা সবই বাংলার নিরস্ত্র জনগণের বিরুদ্ধে ব্যবহার করেছে। সিনেটর কেনেডি বলেন, আর কালবিলম্ব না করে ইয়াহিয়া সরকারের ওপর চাপ সৃষ্টির ব্যাপারে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র সরকারকে সক্রিয় হতে হবে। বর্তমান জরুরী অবস্থাই ইয়াহিয়া সরকারের ওপর চাপ সৃষ্টির প্রকৃত সময় বলে তিনি উল্লেখ করেন। আনন্দবাজার পত্রিকা ’চট্টগ্রাম এলাকায় মুক্তিফৌজের তৎপরতা’ শিরোনামে প্রকাশিত সংবাদে জানা যায় যে, বাংলাদেশের মুক্তিফৌজের গেরিলা বাহিনী চট্টগ্রামের পশ্চিমাঞ্চলের বিভিন্ন স্থানে গেরিলা আক্রমণ চালিয়ে যাচ্ছে। নিউজিল্যান্ডের সানডে টাইমস বাংলায় আতঙ্কজনক পরিস্থিতি শিরোনামে সংবাদ প্রকাশ করে। দৈনিক হিন্দুস্তান স্ট্যান্ডার্ড ‘পাকিস্তানে মার্কিন অস্ত্র চালানের বিরুদ্ধে বিক্ষোভ’ শিরোনামে সংবাদ প্রকাশ করেন, বুধবার সন্ধ্যায় ‘ইয়োথ ফর বাংলাদেশ’ এর উদ্যোগে কলকাতা এক ব্যাপক বিক্ষোভ মিছিল অনুষ্ঠিত হয়। তারা স্লোগান দিতে থাকে যে, এ মুহূর্তে পাকিস্তানে মার্কিন অস্ত্রের চালান একটি গোপন কূটকৌশল। তা সত্ত্বেও মার্কিন সরকার ঘোষণা করেছেন যে, পাকিস্তানে প্রস্তাবিত অস্ত্র সরবরাহ করা হবে। ইয়োথ ফর বাংলাদেশের সভাপতি জনাব মিহির সেন এক বিবৃতিতে নিক্সন প্রশাসনের দু-মুখো কূটনীতি ও হৃদয়হীন পক্ষপাতদুষ্ট মতবাদের নিন্দা করেন।

লেখক : শিক্ষাবিদ ও গবেষক

sumahmud78@gmail.com

নির্বাচিত সংবাদ