১৬ জুলাই ২০১৯  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

৫ কোটি টাকার শর্তে জাপায় সংরক্ষিত মহিলা এমপি!

রাজন ভট্টাচার্য ॥ সংরক্ষিত নারী আসনে এমপি করার জন্য ‘পাঁচ কোটি টাকা দেয়ার অঙ্গীকার’ বাস্তবায়ন না করায় জাতীয় পার্টির প্রেসিডিয়াম সদস্য ও সংরক্ষিত আসনে এমপি অধ্যাপিকা মাসুদা এম রশীদ চৌধুরীকে শোকজ করার একমাস না পেরুতেই প্রেসিডিয়ামসহ সব পদ স্থগিত করেছেন দলের চেয়ারম্যান হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ।

জাপা সূত্র থেকে জানা গেছে, সংরক্ষিত আসনের এমপিদের প্রত্যেককের কাছ থেকে পার্টির ফান্ডের জন্য পাঁচ কোটি টাকা দেয়ার জন্য একটি লিখিত চুক্তি হয়। এ চুক্তিতে পার্টির সংরক্ষিত চারজনই এ স্বাক্ষর করেন। পরবর্তীতে এ টাকা দিতে অপারগতা প্রকাশ করেন পার্টির মহিলা এমপি মাসুদা এম রশিদ চৌধুরী। যার পরিপ্রেক্ষিতে গত ২০ মে পার্টির মহাসচিব মশিউর রহমান রাঙা শোকজ করেন মাসুদাকে। শোকজের পর মাসুদা এ বিষয়ে দলীয়ভাবে পদক্ষেপ নেয়ার কথা বলেন। এক পর্যায়ে মাসুদা তার ছেলে ব্যারিস্টার সানজিদকে বিষয়টি নিয়ে আইনী প্রক্রিয়ায় যাওয়ার কথা জানান।

বিষয়টি জানাজানির পর পার্টির মহাসচিবসহ সিনিয়র নেতারা ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেন। এরমধ্যে অনেকেই মাসুদার পক্ষে অবস্থান নেন। আবার কেন্দ্রীয় নেতাদের অপর একটি অংশ রাঙার পক্ষে অবস্থান নেন। তবে রাঙা মহাসচিব থাকায় এখন পার্টিতে তিনি অনেক প্রভাবশালী। এরশাদ নিজেও রাঙাকে সর্বাধিক গুরুত্ব দিয়ে দল পরিচালনা করাচ্ছেন।

২০ মে জাপা মহাসচিব স্বাক্ষরিত মাসুদা বরাবর চিঠিতে বলা হয়, ‘পার্টি চেয়ারম্যান হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ কর্তৃক নির্দেশিত হয়ে এই মর্মে আপনাকে জানাচ্ছি যে, ২০১৯ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনে জাতীয় পার্টির সংরক্ষিত মহিলা আসনে আপনাকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত করা হয়। একাদশ জাতীয় সংসদে সংরক্ষিত মহিলা আসন নির্বাচনে জাতীয় পার্টির শীর্ষস্থানীয় নেতৃবৃন্দের ফোরামে কিছু শর্ত সাপেক্ষে আপনাকে মনোনয়ন দেয়া হয়। ...আপনার স্বাক্ষরিত পার্টি সংক্রান্ত অঙ্গীকারপত্রও আছে। কিন্তু অতীব দুঃখের বিষয়-আপনার দেয়া অঙ্গীকারগুলো যথাযথভাবে পালন করেননি। অন্যদিকে প্রেসিডিয়াম সদস্য হিসেবে আপনার মাসিক চাঁদা দুই বছর ধরে বকেয়া। এমতাবস্থায় পার্টির গঠনতন্ত্রের ২০/১/ক ধারায় জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান...আপনাকে পার্টির প্রাথমিক সদস্যপদসহ সব পদ পদবি থেকে কেন অব্যাহতি দেবেন না তা আগামী ১০ দিনের মধ্যে লিখিতভাবে জানাতে অনুরোধ করা হলো।

চিঠির আনুষ্ঠানিক কোন জবাব না পেয়ে ১৫ জুন এরশাদ স্বাক্ষরিত মাসুদা বরাবর দেয়া অপর চিঠিতে বলা হয়, ‘২৬ মে মহাসচিব কর্তৃক একটি কারণ দর্শানোর নোটিস আপনাকে পাঠানো হয়েছিল। অদ্যাবধি আপনি এর জবাব দেননি। যা জাপার সাংবিধানিক অবজ্ঞার শামিল ও সংগঠনবিরোধী কার্যকলাপ হিসেবে পরিগণিত হয়। সংগঠনবিরোধী কার্যকলাপের অভিযোগে পার্টির গঠনতন্ত্রের ২০/১/ক ধারার ক্ষমতাবলে প্রেসিডিয়াম সদস্যসহ প্রাথমিক পদ ও পদবি থেকে অস্থায়ী ভিত্তিতে আপনার সব পদ স্থগিত করা হলো...।’

এদিকে পার্টির সিনিয়র নেতৃবৃন্দ বলছেন, এই ধরনের ঘটনা নজিরবিহীন। মনোনয়ন বাণিজ্য কম-বেশি অনেক রাজনৈতিক দলেই হয়ে থাকে, কিন্তু এভাবে লিখিত দলিল করে শর্ত সাপেক্ষে মনোনয়ন দেয়ার ঘটনা রাজনৈতিক দল ও রাজনীতিবিদদের জন্য লজ্জার। এর প্রেক্ষিতে অর্থ আদায়ে প্রকাশ্যে যা হচ্ছে তা একটি রাজনৈতিক দলের অবস্থানকে আরও নিচে নামিয়ে দেয়ার শামিল।

এ বিষয়ে জাপার ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান জিএম কাদেরের কাছে জানতে চাইলে এ বিষয়ে তিনি কিছু জানেন না বলে জানান। তিনি বলেন, এ নিয়ে নানা আলোচনা শুনছি। কিন্তু আনুষ্ঠানিকভাবে আমি কিছু জানি না। যদিও তিনি দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান।

এদিকে জাপা চেয়ারম্যান বার্ধক্যজনিত কারণে কিছুদিন ধরেই খুব অসুস্থ। তার পক্ষে দল পরিচালনা করেন ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান জি এম কাদের। কিন্তু অস্থায়ীভাবে মাসুদার দলীয় পদ পদবি স্থগিত হওয়া চিঠিতে এরশাদের স্বাক্ষর রয়েছে। গত ১৫ জুন এই চিঠি দেয়া হয়। চিঠিতে এরশাদের স্বাক্ষর নিয়ে বিস্ময় প্রকাশ করেছেন পার্টির অনেকেই।

জাপার প্রেসিডিয়াম সদস্য সৈয়দ আবু হোসেন বাবলা বলেন, ফান্ডে অর্থ না দেয়ার অভিযোগে এমপির দলীয় পদ স্থগিত হওয়া দুঃখজনক। আর বিষয়টি গণমাধ্যমে প্রকাশ হওয়া আরও বেশি দুঃখজনক। আমরা মনে করি দলের সর্বোচ্চ পর্যায়ের নেতাদের দ্রুত হস্তক্ষেপে বিষয়টির শান্তিপূর্ণ সুরাহা হবে।

আরেক প্রেসিডিয়াম সদস্য মেজর (অব) খালেদ আখতার বলেন, পার্টির মাসিক চাঁদা পরিশোধ না করায় তাকে প্রথমে শোকজ, পরবর্তীতে উত্তর না দেয়ায় তার সব পদ স্থগিত করা হয়েছে। দলের ফান্ডে পাঁচ কোটি টাকা দেয়ার কথা ছিল কিনা জানতে চাইলে তিনি এ বিষয়ে কোন মন্তব্য করতে রাজি হননি। দলের মহাসচিব এমন চিঠি দিয়ে থাকলে এটি তার ব্যক্তিগত বিষয়।

এ প্রসঙ্গে দলের মহাসচিব মসিউর রহমান রাঙা বলেন, দলে চালাতে অনেক খরচ। দলের দুটি কার্যালয়ে স্টাফ আছেন ৫২ জনের মতো, তাদের বেতন-বোনাস মিলিয়ে প্রায় ১৬ লাখ টাকা লাগে। এ রকম নানা খরচ রয়েছে। মনোনয়ন দেয়ার সময় মাসুদা এম রশীদ চৌধুরী অঙ্গীকার করেছিলেন যে তিনি চট্টগ্রামে দলকে সুসংগঠিত করতে ভূমিকা রাখবেন, সেখানে অফিস নেবেন, দল চালাবেন। কিন্তু তিনি তা করেননি। এ ছাড়া দুই বছর ধরে মাসিক চাঁদা পরিশোধ করেননি। এখানে আর গোপন কোন অঙ্গীকার ছিল না। উনি (মাসুদা এম রশীদ চৌধুরী) লিখিত সন্তোষজনক কোন জবাব দেননি।

এদিকে মাসুদা এম রশীদ চৌধুরীর পক্ষে তার ছেলে সানজিদ রশীদ চৌধুরী বলেন, মার দলীয় পদ স্থগিতের বিষয়ে হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ, রওশন এরশাদ ও জিএম কাদের কিছুই জানেন না। আমার মা নিয়মিত পার্টির চাঁদা পরিশোধ করেন না বলে রাঙা সাহেব মিথ্যাচার করছেন। রাঙাকে ইতোমধ্যে ৩ কোটি দশ লাখ টাকা দেয়া হয়েছে। তিনি সে টাকা পার্টির ফান্ডে না রেখে নিজের কাছে রেখেছেন। তিনি যা কিছু করছেন তার ব্যক্তি স্বার্থে করছেন বলেও অভিযোগ করেন মাসুদা রশীদের ছেলে ব্যারিস্টার সানজিদ। এদিকে জাপার একটি অসমর্থিত সূত্রে জানা গেছে, দলের মহাসচিবসহ শীর্ষ স্থানীয় কয়েকজন নেতা মাসুদা এম রশীদ চৌধুরীকে নানা অভিযোগ দিয়ে পার্টি থেকে বহিষ্কারের চিন্তা করছেন। চলতি মাসের মধ্যে এ বিষয়ে আনুষ্ঠানিক সিদ্ধান্ত আসতে পারে। এক্ষেত্রে সংরক্ষিত নারী আসন হারাবেন মাসুদা রশীদ। আলোচনা আছে জাপার সাবেক এক মন্ত্রী ও বর্তমান সাংসদের মেয়েকে এই পদে মনোনয়ন দিতেই এত কিছু।