২৪ জুলাই ২০১৯  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

সনু রানী দলিত গোষ্ঠীর গৌরব

সভ্য সমাজের আবর্জনা পরিষ্কার করে যাদের প্রতিদিনের জীবন এগিয়ে যায় তারা যে কখন সেই পরিবেশের অংশ হতে পারে তা কল্পনায় আসতেও বেশ সময় লাগে। এসব দলিত, অবহেলিত মানুষ কখনও মানবিক মর্যাদায় নিজের আসনটি গড়ে কত যে হিমশিম খায় সেও এক অজানা ইতিহাস। শুধুমাত্র অক্ষর জ্ঞান যাদের স্বপ্ন বিলাস তারা কিভাবে শিক্ষাঙ্গনের মতো এমন মহৎ ও বৃহৎ আলয়ে প্রবেশ করতে পারে তাও যেন এক বিস্ময়কর গতিপ্রবাহ। নারায়ণগঞ্জের টানবাজার সুইপার কলোনির দলিত সম্প্রদায়ের মেয়ে সনু রানী। হিন্দী ভাষী সনু বাংলা ভাষায় লেখাপড়া করতে গিয়ে কত যে বিপত্তির আবর্তে পড়েছে ধারণাই করা যায় না। এমনিতে এমন নিগৃহীত গোষ্ঠীর ছেলেমেয়েরা লেখাপড়ার ধারে কাছেই ঘেঁষে না তার ওপর কোন বালিকার বিদ্যালয় আঙিনায় প্রবেশাধিকার অনেকটা আকাশ-কুসুম স্বপ্ন। তেমন দুঃসময় অতীতে সারা বাংলাকে ভাবিয়ে তুললেও আজ-কালের যৌক্তিক আহ্বানে তারা ঘর থেকে বাইরে পা শুধু রাখেনি উন্নয়নের সর্বসূচকে তাদের অংশীদারিত্বও প্রমাণ করে যাচ্ছে। অগ্রগতির সমৃদ্ধ অভিগামিতায় বাংলাদেশ আজ আন্তর্জাতিক সীমানায় ও তার বিচরণ নিশ্চিত এবং নির্বিঘ্ন করতে সময় নেয়নি। বুঝতে হবে দেশটা যখন এগিয়ে যাচ্ছে সম্মিলিতভাবেই তা সম্ভব হয়েছে ধর্ম, বর্ণই শুধু নয় নারী-পরুষ নির্বিশেষে সকলের স্বতঃস্ফূর্ত এগিয়ে যাওয়ায় উন্নয়নের সফলতা আজ দেশ-বিদেশে স্বীকৃত এবং প্রশংসিত। অর্থাৎ সমতাভিত্তিক সমাজ বিনির্মাণে বাংলাদেশের অবস্থান আজ বিশ্বসভায়। তেমন সম্ভ্রসারিত অভিগমনে বাংলাদেশের নিম্ন শ্রেণীর হরিজন সম্প্রদায়ও সেই উদাত্ত আহ্বানকে সাসমনে রেখে দু’একজন হলেও নিজেদের তৈরি করতে এগিয়ে আসছে। শিক্ষাই হলো প্রথম সূচক যার মাধ্যমে ঘর থেকে বাইরে পা রাখাই নয় একেবারে অগ্রগতির অনন্য উচ্চতায় নিজেকে প্রমাণ করাও।

সনু রানী তেমনই একজন নারী ব্যক্তিত্ব। যিনি কিনা বিদ্যালয়, মহাবিদ্যালয়ের পর্ব শেষ করে স্নাতক ডিগ্রী অর্জনেও সফলতা দেখিয়েছেন। কেবলমাত্র নারী হিসেবে নয় একজন উচ্চমানসম্পন্ন মানুষের যোগ্যতাও। পুরো দলিত সম্প্রদায়ের প্রতিনিধি হিসেবে সুন এবং তার দুই সহপাঠী মিনা ও পূজা প্রথম এসএসসি পাস করে সবাইকে তাক লাগিয়ে দেয়। কারণ এদের শিক্ষা অর্জনের পেছনে পরিবার কিংবা সমাজ কেউই সহায়ক শক্তি হয়ে পাশে দাঁড়ায়িনি। বরং বিভিন্ন ভাবে বাধা প্রতিবন্ধকতাকে সামলাতে হয়েছে। যেখানে পুরুষ সমাজই যে শিক্ষা থেকে অনেকটা পিছিয়ে সেখানে দুর্বল এবং অবহেলিত তিন মেয়ে কিভাবে মাধ্যমিকের গ-ি পার হলো তা কি শুধু বিস্ময়? নাকি গৌরব আর অহঙ্কারও। তার চেয়ে বেশি নারীর অদম্য পথচলায় স্বাতন্ত্র্য আর আপন বৈশিষ্ট্যের অবিচলিত বোধ।

সেই উদ্যোম ও উদ্দীপনায় সনু ও মিনা এসএসসির পর এইচএসসিও পাস করেন নারায়ণগঞ্জ কলেজ থেকে। কি দুঃসাহসিক অভিযাত্রায় দুই বলষ্ঠ নারী শক্তির অপরাজেয় এগিয়ে চলা। এরপর আর পেছনে তাকানো নয়। একেবারে বীরদর্পে আত্মশক্তি আর সম্মানকে সম্বল করে সরকারি তুলারাম কলেজ থেকে স্নাতক ডিগ্রী আয়ত্তে আনা। নিজেরা শিক্ষিত হয়েও তাদের হৃদয়মন অপূর্ণই থেকে গেছে। কারণ পূর্ণতায় ভরিয়ে তুলতে গেলে আরও অনেককে শিক্ষার আলোয় আলোকিত করা সবচেয়ে জরুরী। সঙ্গত কারণে শিক্ষক হওয়ার বাসনা ও কর্মযোগের সুনির্দিষ্ট লক্ষ্য। প্রাথমিক শিক্ষক নিয়োগের জন্য আবেদন করে তারা অপেক্ষা করছে পরীক্ষার মুখোমুখি হতে।

১৫০টি পরিবার বেশিষ্টত এই সুইপার কলোনিতে একটি প্রাথমিক স্কুল থাকলেও হিন্দী ভাষী শিশু-কিশোররা স্কুলের গ-িতে পা রাখতে অস্বস্তি বোধ করে। কারণ বিদালয়ের শিক্ষার মাধ্যমে বাংলা ভাষা। যে ভাষাকে আয়ত্তে এনে প্রাইমারি শিক্ষা গ্রহণ এক অনধিগম্য পর্যায়। ফলে শিক্ষক হয়ে সনু ও মিনা কলোনির বাচ্চাদের বাংলা ভাষায় পাঠদান করতে উদ্যোগী হবে। এতে কলোনির শিশু-কিশোরদের শিক্ষার প্রতি আগ্রহ জন্মাবে ও জ্ঞানের সযত্ন স্পর্শে অন্ধকার জগত দ্যুতিময় হবে। অনেক অভিনন্দন, সাধুবাদ এবং শুভেচ্ছা এই আবর্জনা সাফকারী দলিত সম্প্রদায়ের দুই নারী শক্তিকে। যারা সমাজ-সভ্যতার নজির হয়ে আরও অনেককে উদ্দীপ্ত প্রেরণায় এগিয়ে নেবে।

অপরাজিতা প্রতিবেদক

নির্বাচিত সংবাদ