২৪ জুলাই ২০১৯  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

প্রবাসী আয়ে প্রণোদনা

প্রবাসীরা এতদিন ছিলেন উপেক্ষিত। এমনকি শাহজালাল বিমানবন্দরেও তারা ছিলেন ব্রাত্য। পদে পদে লাঞ্ছনা-গঞ্জনা-প্রবঞ্চনা ও অবহেলার অসহায় শিকার। বিদেশ-বিভুঁইয়ে সড়ক দুর্ঘটনা অথবা অন্য কোন কারণে মৃত্যুমুখে পতিত হলে লাশ আনাসহ পেতেও নানা ভোগান্তি। ক্ষতিপূরণ পেতেও নানা বিড়ম্বনা, বীমা তো দূর অস্্ত। অথচ বাস্তবতা হলো বিশ্বের বিভিন্ন দেশে কর্মরত প্রায় এক কোটি প্রবাসী শ্রমিকের অর্থেই দিন দিন স্ফীত হয়েছে দেশের অর্থনৈতিক উন্নতি ও সমৃদ্ধি। বেড়েছে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ। বৈদেশিক মুদ্রা উপার্জনের ক্ষেত্রে পোশাক শিল্পের পরেই প্রবাসীদের আয়-উপার্জন তথা রেমিটেন্সের স্থান। অথচ সেই হতভাগাদের প্রতি বিগত সরকারগুলোর সুদৃষ্টি তো দূরের কথা, এমনকি আনুকূল্য ও অনুকম্পাও ছিল না। বিদেশে কায়িক শ্রমে উপার্জিত অর্থ ব্যাংকের মাধ্যমে দেশে পাঠাতেও তাদের নানাভাবে ও উপায়ে হয়রানি করা হতো। ফলে অনেকেই বাধ্য হয়ে দেশে আত্মীয়স্বজন, পরিবার-পরিজনের কাছে টাকা পাঠাতেন অবৈধ পথে, হুন্ডির মাধ্যমে। এবারই প্রথম প্রবাসীদের পাঠানো রেমিটেন্সের অর্থ উৎপাদনশীল খাতে বিনিয়োগের জন্য একটি মাস্টার প্ল্যান হাতে নিয়েছে সরকার। বৈধ পথে প্রবাসী আয়-উপার্জন বাড়াতে প্রস্তাবিত ২০১৯-২০ বাজেটে ২ শতাংশ হারে প্রণোদনা দেয়ারও ঘোষণা দিয়েছে সরকার। এতে স্বভাবতই প্রবাসীরা দেশে অর্থ প্রেরণে উৎসাহ-উদ্দীপনা বোধ করবেন। উল্লেখ্য, এবারে ঈদ-উল-ফিতরে প্রবাসীরা রেকর্ড পরিমাণ অর্থ প্রেরণ করেছেন। এর বাইরেও প্রবাসীদের অর্থে সুরক্ষা নিশ্চিত করতে সভরেন বন্ড ইস্যু, ওয়ানস্টপ সার্ভিস, অর্থনৈতিক অঞ্চল স্থাপনসহ যথাযথ বিনিয়োগের ব্যবস্থা করা হবে। এতে নতুন নতুন শিল্প-কারখানা স্থাপনসহ কর্মসংস্থান হবে সুনিশ্চিত।

বিশ্বব্যাপী রেমিটেন্স প্রবাহ বৃদ্ধির সুসংবাদ দিয়েছে বিশ্বব্যাংক। সংস্থাটির মতে, ২০১৭ সাল ছিল প্রবাসী আয় বৃদ্ধির এক উজ্জ্বল বছর, যা অব্যাহত ছিল ২০১৮ সালেও। গত বছর সারা বিশ্বে প্রবাসী আয় বেড়েছে সাড়ে ৮ শতাংশ, যার পরিমাণ ৪৬৬ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। চলতি বছর এর পরিমাণ আরও চার শতাংশ বাড়তে পারে। এর ফলে দরিদ্র ও অনুন্নত দেশগুলো উপকৃত এবং উন্নত হচ্ছে। রেমিটেন্স প্রবাহের তালিকায় শীর্ষে আছে ভারত, দ্বিতীয় চীন, তৃতীয় ফিলিপিন্স ও চতুর্থ মেক্সিকো। এই তালিকায় বাংলাদেশের অবস্থান নবম, তবে দক্ষিণ এশিয়ায় তৃতীয়। এও সত্য যে, এই অবস্থা আর বেশিদিন থাকবে না। কেননা উন্নত বিশ্বে দক্ষ ও প্রযুক্তিভিত্তিক জনশক্তির চাহিদা বাড়ছে। অনেক ক্ষেত্রে উন্নত শিল্প-কারখানাগুলোতে শ্রমিকের স্থান দখল করে নিচ্ছে রোবট ও কম্পিউটার। সেই পরিস্থিতি মোকাবেলায় বাংলাদেশকে যথাযথ প্রস্তুতি নিতে হবে এখনই। দেশেই তৈরি করতে হবে দক্ষ মানবসম্পদ।

বর্তমানে বিশ্বের প্রায় কোন দেশেরই অর্থনৈতিক অবস্থা ভাল নয়। চীন-মার্কিন বাণিজ্যযুদ্ধের প্রেক্ষাপটে অনেক দেশেরই জাতীয় প্রবৃদ্ধিতে লক্ষ্য করা যায় নেতিবাচক প্রবণতা। মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধাবস্থা বিরাজমান। তদুপরি আমেরিকা, ইউরোপ, কানাডা, অস্ট্রেলিয়াসহ আফ্রিকা ও লাতিন আমেরিকার রাজনৈতিক, অভিবাসন পরিস্থিতিসহ আইনশৃঙ্খলার অবস্থা খুবই নাজুক। সার্বিক পরিবেশ-পরিস্থিতি বিবেচনায় বলতে হয়, বর্তমান বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশই বিনিয়োগের জন্য সর্বাধিক উত্তম ও উপযোগী। দেশে বর্তমানে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ পরিস্থিতি বেশ ভাল, প্রায় ৩৩ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। সরকারী-বেসরকারী ব্যাংকগুলোতে প্রচুর অলস অর্থ পড়ে আছে। সরকার নমনীয় সুদহার নির্ধারণ করে দেশী-বিদেশী বিনিয়োগ আকৃষ্ট করতে চাচ্ছে। বিদ্যুতের সমস্যা অনেকটাই মিটেছে। পদ্মা সেতুর অগ্রগতিও আশাব্যঞ্জক। অতঃপর চাই অবকাঠামো উন্নয়ন। সেটি করা সম্ভব হলে এবং বিদেশী বিনিয়োগ আকৃষ্ট করা গেলে বাংলাদেশী দক্ষ ও আধাদক্ষ শ্রমজীবীদের জীবনের ঝুঁকি নিয়ে আর বিদেশে যাওয়ার প্রয়োজন পড়বে না। উৎপাদনশীল খাতে প্রবাসী আয়ের কার্যকর বিনিয়োগে এই সম্ভাবনা আরও সমুজ্জ্বল হবে বৈকি।

নির্বাচিত সংবাদ