১৭ জুলাই ২০১৯  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

প্রসঙ্গ ইসলাম ॥ রমাদানউত্তর ভাবনা

  • অধ্যাপক হাসান আবদুল কাইয়ূম

(শেষাংশ)

প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহু ‘আলায়হি ওয়া সাল্লামের মাধ্যমে বিশ্ব মানবতা সত্যিকার শান্তির দিকনির্দেশনা এবং সত্য পথের দিশা লাভ করল। তিনি বিশ্ব মানবতার জন্য আল্লাহ্্র দেয়া পূর্ণাঙ্গ, প্রগতিশীল ও ডাইনামিক জীবন ব্যবস্থা কায়েম করলেন- যা বিশ্ব শান্তির কথা বলে, ভ্রাতৃত্বের কথা বলে।

এই জীবন ব্যবস্থা সর্বকালে আধুনিক ও প্রগতিশীল। এই জীবন ব্যবস্থাই ইসলাম।

ইসলামের শব্দমূল সলমের অর্থ শান্তি। শান্তির দুনিয়া প্রতিষ্ঠার জন্যই প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহু ‘আলায়হি ওয়া সাল্লাম নূরের অবয়ব নিয়ে মানব সুরতে পৃথিবীতে আবির্ভূত হন।

ইমান, সালাত, সওম, যাকাত, হজ- ইসলামের এই পাঁচ স্তম্ভের প্রতিটিরই বৈষয়িক ও রুহানী তাৎপর্য রয়েছে।

তওহীদ ইসলামের মূল ভিত্তি। আল্লাহ্্ ছাড়া কোন ইলাহ্্ নেই, মুহম্মদ (সা.) আল্লাহ্্র রসূল- এই ঘোষণার মধ্য দিয়ে মানুষ তার রবের নিকট আত্মার জগতে যে স্বীকারোক্তি করেছিল তার বাস্তবায়ন ঘটাতে পারে। পাঁচ ওয়াক্ত সালাত কায়েমের মধ্য দিয়ে আল্লাহ্্র প্রতি পূর্ণ আনুগত্য প্রদর্শন করা হয়। প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহু ‘আলায়হি ওয়া সাল্লাম বলেছেন : আস্্ সালাতু ‘ইমাদুদ্্দীন ফামান্্ আকামাহা ফাকাদ্্ আকামদ্্দীন ওয়া মান্্ তারাকাহা ফাকাদ কদামাহাদ্্দীন- সালাত হচ্ছে দীনের ভিত্তি। যে ব্যক্তি সালাত কায়েম করে সে দীনকে কায়েম করে, আর যে ব্যক্তি সালাত পরিত্যাগ করে সে দীন ছেড়ে দেয়।

কুরআন মজিদে ইরশাদ হয়েছে : নিশ্চয়ই সালাত মানুষকে অশ্লীলতা ও মন্দ কাজ থেকে বিরত রাখে। (সূরা আনকাবূত : আয়াত ৪৫)।

প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহু ‘আলায়হি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, সালাত হচ্ছে মুমিনের জন্য মিরাজ।

এই পাঁচ ওয়াক্ত সালাত কায়েমের মাধ্যমে আল্লাহর প্রতি পূর্ণ আনুগত্য প্রকাশ করা হয়।

রমাদানের সিয়াম পালনের মাধ্যমে তাকওয়া অর্জিত হয়। মূলত এই তাকওয়া মানুষকে খাঁটি মানবতার মসনদে অধিষ্ঠিত করে, তেমনি যাকাত মানুষের প্রতি মানুষের দায়িত্ব ও কর্তব্যরোধ জাগ্রত করে দেয়। বিত্তবানের ধন-সম্পদ যে প্রার্থী ও বঞ্চিতের ন্যায্য অধিকার রয়েছে তা নিশ্চিত করে দেয় এবং অর্থনৈতিক ভারসাম্য স্থাপন করে।

হজ হচ্ছে মানবতার আন্তর্জাতিক বার্ষিক মহা সম্মেলন। এর মাধ্যমে বিশ্ব মানবতার ঐক্য ও সংহতির বুনিয়াদ সুদৃঢ় হয়। রমাদান এসে যে পরিশুদ্ধ জীবন চৈতন্য জাগ্রত করে তা বাকি এগারো মাস ধারণ করে যদি জীবনযাপন করা যায়, পরিবার গড়ে তোলা যায়, সমাজ গড়া যায় তাহলে পৃথিবীতে শান্তি অতি সহজে প্রতিষ্ঠা লাভ করবে। রমাদান হিংসা-বিদ্বেষ পরিহার করার প্রশিক্ষণ দিয়ে যায়। প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহু ‘আলায়হি ওয়া সাল্লাম বলেছেন : কোন সায়িমের সঙ্গে যদি কেউ কলহ-বিবাদ করতে আসে তখন যেন সে বলে : আমি সায়িম, আমি সায়িম অর্থাৎ আমি রোজাদার। (বুখারী শরীফ)।

প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহু ‘আলায়হি ওয়া সাল্লাম হিংসা পরিত্যাগ করার তাকিদ দিয়ে ইরশাদ করেন : তোমরা হিংসা ত্যাগ কর, কেননা আগুন যেমন কাঠকে জ্বালিয়ে ছাই করে দেয়, তেমনি হিংসা সৎগুণাবলীকে ধ্বংস করে দেয়। (আবূ দাউদ শরীফ)।

রমাদান চলে যায় চান্দ্রসনের বর্ষ গণনার ৩৫৪ দিনের আবর্তে, কিন্তু রমাদানের সিয়াম পালনের মাধ্যমে সায়িম জীবন যে অভিজ্ঞতার আলো বিচ্ছুরিত হয় সেই আলোয় প্রকৃতপক্ষে যারা উদ্ভাসিত থাকতে পারে তাদেরই জীবন সফলতার মন্জিলে পৌঁছবার শক্তি লাভ করে।

আল্লাহ্্ জাল্লা শানুহু ইরশাদ করেন : হে মানুষ। আমি তোমাদের সৃষ্টি করেছি এক পুরুষ ও এক নারী হতে। পরে তোমাদের বিভক্ত করেছি বিভিন্ন জাতি ও গোত্রে যাতে তোমরা একে অপরের সঙ্গে পরিচিত হতে পার। তোমাদের মধ্যে সেই ব্যক্তিই আল্লাহ্্র নিকট অধিক মর্যাদাসম্পন্ন যে অধিক মুত্তাকী। আল্লাহ্্ সবকিছু জানেন, সমস্ত খবর রাখেন। (সূরা হুজুরাত : আয়াত ১৩)।

রমাদান সেই মুত্তাকী হওয়ার প্রশিক্ষণই দিয়ে যায়। রমাদানের সিয়ামের উদ্দেশ্যও তাই। আল্লাহ্ জাল্লা শানুহু ইরশাদ করেন : তোমাদের জন্য সিয়াম বিধান দেয়া হলো, যেমন বিধান দেয়া হয়েছিল তোমাদের পূর্ববর্তীদের প্রতি- যাতে তোমরা মুত্তাকী হতে পার। (সূরা বাকারা : আয়াত ১৮৩)।

রমাদানের শিক্ষা আমরা যেন ভুলে না যাই। ইলমে তাসাওউফ চর্চার মাধ্যমে আমরা রমাদানের সিয়ামসহ সালাম, হজ, যাকাত, কুরআন, সৃষ্টি জগত, ফেরেশতা জগত প্রভৃতি বিষয়ে সম্যক জ্ঞান অর্জন করতে পারি এবং আল্লাহ্্র রিযামন্দি (সন্তুষ্টি) ও কুরবত (নৈকত্য) হাসিল করার মাধ্যমে মারিফাত অর্জন করতে পারি। রমাদান মাসে সিয়াম পালনকারী তাবত কামাচার, পানাহার ও পাপাচার থেকে বিরত থেকে কারও মুখাপেক্ষী না হওয়ার এবং প্রবৃত্তিকে দমন করার যে সাক্ষাত প্রশিক্ষণ লাভ করে তা রমাদান উত্তরকালেও যেন বজায় থাকে এই ভাবনা নিয়ে গড়ে উঠুক আমাদের নিকটের বা দূরের পৃথিবীর সব মানুষ।

লেখক : পীর সাহেব, দ্বারিয়াপুর শরীফ