২২ জুলাই ২০১৯  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

লড়াই করেই হারল বাংলাদেশ

 লড়াই করেই হারল বাংলাদেশ

জিএম মোস্তফা ॥ পারল না বাংলাদেশ। স্বপ্ন দেখিয়েও জিততে পারল না লাল সবুজের প্রতিনিধিরা। টুর্নামেন্টের বর্তমান চ্যাম্পিয়নদের বিপক্ষে দাপুটে লড়াই করেও শেষ পর্যন্ত হেরে গেল মাশরাফি মর্তুজার দল। নটিংহ্যামের ট্রেন্টব্রিজে বৃহস্পতিবার অসিদের ছুড়ে দেয়া ৩৮১ রানের পাহারসমান রানের টার্গেটে ব্যাট করতে নেমে নির্ধারিত ৫০ ওভারে ৮ উইকেটের বিনিময়ে ৩৩৩ রান করতে সক্ষম হয় বাংলাদেশ। এর ফলে ৪৮ রানের জয় নিয়েই মাঠ ছাড়ে স্মিথ-ওয়ার্নাররা।

তবে হারা ম্যাচেও অর্জন রয়েছে বাংলাদেশের। মুশফিকের দুর্দান্ত এক সেঞ্চুরি ছাড়াও এই অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষেই নিজেদের ওয়ানডে ক্রিকেটের ইতিহাসে সর্বোচ্চ রানের রেকর্ড গড়ল টাইগার ক্রিকেটাররা। বাংলাদেশের বিপক্ষে এই জয়ের ফলে পয়েন্ট টেবিলের শীর্ষে উঠে এসেছে অস্ট্রেলিয়া। ৬ ম্যাচ থেকে অসিদের সংগ্রহ এখন ১০ পয়েন্ট। ৫ ম্যাচ থেকে ৯ পয়েন্ট নিয়ে দুইয়ে নেমে গেছে নিউজিল্যান্ড। ৬ ম্যাচ থেকে ৫ পয়েন্ট নিয়ে পাঁচেই রয়ে গেল বাংলাদেশ।

অস্ট্রেলিয়ার ছুড়ে দেয়া ৩৮২ রানের জয়ের লক্ষ্যে ব্যাট করতে নেমে শুরুতেই ধাক্কা খায় বাংলাদেশ। দুটি চারের সাহায্যে ব্যক্তিগত ১০ রানের মাথায় রান আউটের শিকার হন সৌম্য সরকার। স্ট্রাইক প্রান্তে থাকা তামিমের আহ্বানে সাড়া দেন সৌম্য। কিন্তু মাঝপথে যেতেই সৌম্যকে মানা করেন তামিম। এই সুযোগ মিড অন থেকে দেখে-শুনে সরাসরি থ্রো করে ননস্ট্রাইক এন্ডের স্টাম্প উপড়ে দেন এ্যারন ফিঞ্চ। এরপর তামিমের সঙ্গী হয়ে দলকে টেনে তোলার দায়িত্ব নেন সাকিব আল হাসান। তামিম কিছুটা ধীর গতিতে এগুলেও সাকিব খেলেন তার স্বভাবসুলভ ভঙ্গিতে। দুই বন্ধু মিলেই তিন অঙ্কের কোটা অতিক্রম করে বাংলাদেশের। সেই সঙ্গে স্বপ্নটাও বড় হতে থাকে দেশের ক্রিকেটপ্রেমীদের। কিন্তু হায়! দলীয় ১০২ রানেই সাজঘরে ফিরে যান ইনফর্ম ব্যাটসম্যান সাকিব। দুই অভিজ্ঞের ব্যাট যখন ভাল কিছুর ইঙ্গিত দিচ্ছিল ঠিক তখনই মার্কাস স্টোইনিসের বলে ওয়ার্নারের হাতে ক্যাচ দিয়ে আউট হয়ে যান তিনি। টুর্নামেন্টের প্রথম চার ম্যাচে সমান দুটি করে অর্ধশতক আর সেঞ্চুরি পূর্ণ করা সাকিব এদিন থেমে যান ৪১ রানেই। ততক্ষণে ফিঞ্চকে ছাড়িয়ে এবারের আসরে সর্বোচ্চ রান সংগ্রাহকের তালিকার দুইয়ে পৌঁছে যান সাকিব।

তামিম তখনও একপাশ আগলে রাখেন। সাকিবের পর মুশফিকুর রহিমের সঙ্গে জুটি বেঁধে দলকে এগিয়ে নেবেন বলেই আশায় বুক বাধতে থাকেন টাইগারপ্রেমীরা। প্রতিপক্ষের বোলারদের দেখে-শুনে খেলে ওয়ানডে ক্যারিয়ারের ৪৭তম ফিফটিও তুলে নেন তামিম। ফিফটি তুলে নেয়ার পর মারমুখি ভঙিতে খেলতে যাওয়া এ ওপেনার মিচেল স্টার্কের বলে ভুল শটে আউট হন। তার আগে ৭৪ বলে ৬ চারের সাহায্যে ৬২ রান করেন তিনি। এরপর ১৭ বলে ৩ চারে ২০ রান করে এডাম জাম্পার এলবির শিকার হয়ে প্যাভিলিয়নের পথ ধরেন লিটন দাসও।

তারপরও বাংলাদেশকে এগিয়ে নিয়ে যেতে থাকেন মুশফিক-মাহমুদউল্লাহ। কামিন্স-নিলদের দেখে-শুনে খেলে রানের চাকা সচল রাখেন সম্পর্কে দুই ‘ভাইরা’ ভাই। ধীরে ধীরে আক্রমণাত্মকও হতে থাকেন মুশফিক-মাহমুদউল্লাহ। নান্দনিক ব্যাট করে বাংলাদেশের তিন শ’র কোটাও পার করেন তারা। কিন্তু দলীয় স্কোরকার্ড যখন ৩০২ তখন নাথান কোল্টার নিলের বলে প্যাট কামিন্সের হাতে ক্যাচ তুলে দেন মাহমুদউল্লাহ রিয়াদ। তার আগে ৫টি চার ও ৩টি ছক্কায় ৬৯ রানের এক ইনিংস খেলে যান তিনি। সেই সঙ্গে মুশফিকের সঙ্গে পঞ্চম উইকেটে গড়ে যান ১২৭ রানের মূল্যাবন এক জুটি। মাহমুদউল্লাহর পর ক্রিজে আসতে না আসতেই কোল্টার নিলের বলে বোল্ডআউট হয়ে প্যাভিলিয়নের পথ ধরেন মোসাদ্দেক সৈকতের বদলি হিসেবে মাঠে নামা সাব্বির রহমান (০)। ৬ রান করে আউট হয়ে যান মেহেদী মিরাজও। স্টার্কের বলে ওয়ার্নারের হাতে ক্যাচ তুলে দেন এই অলরাউন্ডার। স্টোইনিসের বলে ম্যাক্সওয়েলের হাতে ক্যাচ দিয়ে সাজঘরে ফিরে যান টাইগার অধিনায়ক মাশরাফি বিন মর্তুজাও (৬)।

তবে অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষেই ক্যারিয়ারের সপ্তম ওয়ানডে সেঞ্চুরি তুলে নেন মুশফিকুর রহিম। ১০২ রানে অপরাজিত থাকেন তিনি। তার অনবদ্য শতরানের সৌজন্যেই এদিন ৫০ ওভারে ৩৩৩ রান সংগ্রহ করতে সক্ষম হয় বাংলাদেশ। অসিদের বিপক্ষে ৯৭ বলে ৯টি চার ও ১টি ছক্কার সৌজন্যে এবারের আসরে নিজের প্রথম সেঞ্চুরির ইনিংসটি সাজান মুশফিক। এর ফলে এবারের বিশ্বকাপে সর্বোচ্চ রান সংগ্রাহকের তালিকায় সপ্তম স্থানে উঠে এসেছেন তিনি। ৫ ম্যাচ থেকে তার সংগ্রহ মোট ২৪৪ রান। অস্ট্রেলিয়ার সফল বোলার নাথান কোল্টার নিল, মিচেল স্টার্ক এবং মার্কাস স্টোইনিস। প্রত্যেকেই দুটি করে উইকেট লাভ করেন এদিন। এছাড়া এডাম জাম্পা ১টি উইকেট দখল করেন।

বিশ্বকাপের বর্তমান চ্যাম্পিয়ন অস্ট্রেলিয়া। শিরোপা ধরে রাখার মিশনে এবারও দুর্দান্ত স্মিথ-ওয়ার্নাররা। নিজেদের দাপট অব্যাহত রাখতে নটিংহ্যামের ট্রেন্টব্রিজে টস জিতে এদিন প্রথমেই ব্যাটিংয়ের সিদ্ধান্ত নেয় অস্ট্রেলিয়া। ব্যাটিংয়ে নেমে শুরু থেকেই দুর্দান্ত খেলে দুই উদ্বোধনী ব্যাটসম্যান। দলীয় ১২১ রানে প্রথম সাফল্যের দেখা পায় বাংলাদেশ। রুবেল হোসেনের হাতে ক্যাচ বানিয়ে অস্ট্রেলিয়ার অধিনায়ক এ্যারন ফিঞ্চকে সাজঘরে ফেরত পাঠান সৌম্য সরকার। আউট হওয়ার আগেই ক্যারিয়ারের ২৪তম অর্ধশতক তুলে নেন ফিঞ্চ। ৫১ বলে ৫ চার আর দুই ছক্কায় ৫৩ রান করেন অসি অধিনায়ক।

ফিঞ্চ আউট হয়ে গেলেও বাংলাদেশের বোলারদের দাপটের সঙ্গে খেলে যান অস্ট্রেলিয়ার আরেক উদ্বোধনী ব্যাটসম্যান ডেভিড ওয়ার্নার। মাশরাফি-সাকিব-মুস্তাফিজদের দেখে-শুনে খেলে তুলে নেন ক্যারিয়ারের ১৬তম ওয়ানডে সেঞ্চুরি। ২০১৯ বিশ্বকাপে ব্যক্তিগত দ্বিতীয় শতক। শুধু শতরান করেই কিন্তু থেমে যাননি ওয়ার্নার। সৌম্য সরকারের বলে রুবেলের হাতে ক্যাচআউট হওয়ার আগে খেলে যান ১৬৬ রানের অসাধারণ এক ইনিংস। ১৪৭ বলে ওয়ার্নারের ইনিংসটি সাজানো ছিল ১৪টি চার ও ৫টি ছক্কার সৌজন্যে। ১১২.৯৩ গড়ে। অথচ, ইনিংসের পঞ্চম ওভারেই ওয়ার্নারকে ফিরতে হতো। মাশরাফির বলে ব্যাকওয়ার্ড পয়েন্টে সহজ ক্যাচ ফেলে দেন সাব্বির। ওয়ার্নারের রান ছিল তখন মাত্র ১০। জীবন পাওয়ার সুযোগ কাজে লাগিয়েই এবারের বিশ্বকাপের সর্বোচ্চ ইনিংস খেলেন ম্যান অব দ্য ম্যাচ নির্বাচিত হওয়া ওয়ার্নার। তার আগে জেসন রয় এবং এ্যারন ফিঞ্চের ১৫৩ রানই ছিল ব্যক্তিগত সর্বোচ্চ। রয়ের সেঞ্চুরিটিও ছিল বাংলাদেশের বিপক্ষে। আর লঙ্কানদের বিপক্ষে সেঞ্চুরি করেছিলেন ফিঞ্চ।

এদিন আরও একটি রেকর্ড গড়েন ওয়ার্নার। ওয়ানডে ক্রিকেটের ইতিহাসে প্রথম ব্যাটসম্যান হিসেবে ভিন্ন ভিন্ন ছয় প্রতিপক্ষের বিপক্ষে ১৫০ কিংবা তারও বেশি রানের ইনিংস খেলার রেকর্ড গড়েন এই ওপেনার। বাংলাদেশের বিপক্ষে দুর্দান্ত এই ইনিংস খেলে এবারের আসরে সর্বোচ্চ রানসংগ্রাহকও বনে যান ওয়ার্নার। টুর্নামেন্টের প্রথম ৬ ম্যাচ থেকে তার সংগ্রহ ৪৪৭ রান। এর পরেই রয়েছেন সাকিব আল হাসান (৪২৫)। ওয়ার্নারকে এদিন দারুণভাবে সঙ্গ দেন উসমান খাজাও। আউট হওয়ার আগে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ ৮৯ রানের ঝলমলে এক ইনিংস উপহার দেন তিনি। সেই সঙ্গে ওয়ার্নারের সঙ্গে দ্বিতীয় উইকেটে গড়েন ১৯২ রানের জুটি। এবারের বিশ্বকাপে যা যে কোন দলের সেরা জুটি। খাজার উইকেটও নিজের করে নেন সৌম্য সরকার। তবে এবার তালুবন্দী করেন মুশফিকুর রহিম। ওয়ার্নার-ফিঞ্চ-খাজারা দেখে-শুনে খেললেও ক্রিজে নেমেই ঝড় তোলেন গ্লেন ম্যাক্সওয়েল। মাত্র ১০ বলেই ৩২ রানের ঝড়ো ইনিংস উপহার দেন তিনি। তবে ম্যাক্সওয়েলকে খুব বেশিদূর এগুতে দেয়নি বাংলাদেশ। দলীয় স্কোর যখন ৩৫২ ঠিক তখনই রানআউটে কাটা পড়েন হার্ডহিটার এই তারকা ব্যাটসম্যান। এখানেও ঘুরে-ফিরে আসছে সৌম্য সরকার আর রুবেল হুসেনের নাম। এবারও যে বোলার ছিলেন সৌম্য। তার ওভারেই রানআউট করেন রুবেল। যিনি সৌম্যের নেয়া প্রথম দুই উইকেটে ক্যাচ ধরেছিলেন। সাইফ উদ্দিনের বদলি হিসেবে এদিন মাঠে নামানো হয় রুবেল হোসেনকে। বল হাতে এদিন রুবেল কিছু করতে না পারলেও ফিল্ডিংয়ে দুর্দান্ত দুটি ক্যাচ ধরেন। পাশাপাশি একটি রানআউটও করেন এই পেসার।

অস্ট্রেলিয়ার ইনিংসের ৪৯তম ওভারেই হানা দেয় বৃষ্টি। তবে খুব বেশিক্ষণ স্থায়ী হয়নি তা। ২৫ মিনিট পর আবারও মাঠে নামে দুই দল। শেষ পর্যন্ত নির্ধারিত ৫০ ওভারে ৫ উইকেটের বিনিময়ে ৩৮১ রানে গিয়ে থামে অস্ট্রেলিয়ার ইনিংস। মার্কাস স্টোইনিস ১৭ আর ১১ রানে অপরাজিত ছিলেন এ্যালেক্স ক্যারি। অস্ট্রেলিয়ার ব্যাটসম্যানদের মধ্যে এদিন নিষ্প্রভ ছিলেন শুধুই স্টিভেন স্মিথ। মাত্র ১ রান করেই এদিন মুস্তাফিজুর রহমানের এলবিডব্লিউর শিকার হন তিনি।

বিশ্বকাপের প্রথম পাঁচ ম্যাচ থেকে ২ জয় তুলে নেয় বাংলাদেশ। ২টি ম্যাচে হেরেছে টাইগাররা। এছাড়া শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে ম্যাচটি বৃষ্টির কারণে পরিত্যক্ত হওয়ায় পয়েন্ট ভাগাভাগি করতে হয়। মোট ৫ পয়েন্ট নিয়ে টেবিলের পাঁচে রয়েছে মাশরাফি বিন মর্তুজার দল। সেমিফাইনালে ওঠার আশা জিইয়ে রাখতে অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে ম্যাচ জেতাটা বেশ গুরুত্বপূর্ণ বাংলাদেশের জন্য। ‘পার্ট টাইম’ বোলার হয়েও অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে বাংলাদেশের সফল সৌম্য সরকার। ৮ ওভার বল করে ৫৮ রানের বিনিময়ে অস্ট্রেলিয়ার মূল্যবান ৩ উইকেট দখল করেন তিনি। ৯ ওভারে ৬৯ রান খরচায় ১ উইকেট লাভ করেন মুস্তাফিজুর রহমান। সাকিব, মাশরাফি, মিরাজ, রুবেলরা এদিন কোন উইকেটের দেখা পাননি।