২২ জুলাই ২০১৯  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

চিকিৎসা ব্যবস্থায় আস্থা

দেশের চিকিৎসা ব্যবস্থা নিয়ে বিদেশী বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকরা ইতিবাচক মন্তব্য করে থাকেন। আন্তর্জাতিক স্বাস্থ্য সমীক্ষা বিষয়ক প্রকাশনায়ও এর স্বীকৃতি মেলে। তবু বহু নাগরিক নিজের দেশের চাইতে বিদেশে চিকিৎসা করাতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেন। এ থেকে দেশীয় চিকিৎসা ব্যবস্থার ওপর তাদের অনাস্থাই প্রকাশ পায়। চিকিৎসার জন্য বিদেশ যাওয়া রোগীর সংখ্যা দিন দিন বেড়েই চলেছে। সাধ্য থাকলে ব্যাঙ্কক, সিঙ্গাপুরের উন্নত হাসপাতালগুলোতে চিকিৎসা নিলে সেটি নিশ্চয়ই ব্যক্তির নিজস্ব দৃষ্টিভঙ্গি। এটি তার ব্যক্তিস্বাধীনতাও। কিন্তু মধ্যবিত্ত শ্রেণীর বিপুল সংখ্যক রোগী যখন পার্শ্ববর্তী দেশে চিকিৎসার জন্য যান তখন সহজেই অনুমান করা যায় কোথাও একটা গলদ আছে। দেশে চিকিৎসাসেবার ওপর আস্থাহীনতা, ব্যবস্থাপনায় সমন্বয়হীনতা, প্রযুক্তিগত দুর্বলতা এবং চিকিৎসাসেবার অপ্রতুলতাই কি এজন্য দায়ী? বৃহস্পতিবারের জনকণ্ঠে এ সংক্রান্ত প্রতিবেদনে বিশদভাবে উঠে এসেছে দেশে চিকিৎসা ব্যবস্থার চালচিত্র।

বিদেশে চিকিৎসা নিতে গেলে দেশের টাকা বিদেশে চলে যায়- এটি বাস্তবতা। বিদেশে শিক্ষা গ্রহণ করতে বা ভিন্ন প্রয়োজনে গেলেও সেটি ঘটে। এদিকটি প্রধান বিবেচ্য নয়। মূল চিন্তার বিষয় হলো দেশে কি ডাক্তার নেই, চিকিৎসাসেবার মান উন্নত নয়? নাকি সার্বিক মেডিক্যাল ব্যবস্থাপনায় গলদ বা ঘাটতি রয়েছে? স্বাধীনতার অর্ধশতক পরেও যদি নিজ দেশ থেকে কষ্ট করে ভিন দেশে গিয়ে চিকিৎসাসেবা নিতে হয় সেক্ষেত্রে জাতিগতভাবে সূক্ষ্ম বেদনাবোধ ও ব্যর্থতার বোধ কাজ করাই কি স্বাভাবিক নয়? অথচ অতিসম্প্রতি ভারতের খ্যাতনামা হৃদরোগ বিশেষজ্ঞ ডাঃ দেবী প্রসাদ শেঠী বলেছেন, ভারত ও বাংলাদেশের চিকিৎসাসেবার মান প্রায় একই। কোন পার্থক্য দেখি না।

বাংলাদেশের বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের এক রিপোর্টে বলা হয়, প্রতিবছর বাংলাদেশীরা বিদেশে চিকিৎসা করাতে গিয়ে প্রায় ২.০৪ বিলিয়ন টাকা খরচ করে থাকে। এ অর্থ বাংলাদেশের মোট আয়ের ১.৯৪ শতাংশ। একই চিকিৎসা বাংলাদেশে করাতে যে ব্যয় হয়ে থাকে তা করতে ভারতে খরচ হয় প্রায় দ্বিগুণ। থাইল্যান্ড ও সিঙ্গাপুরে ৩ থেকে ১০ গুণ। তবে বাংলাদেশের হাসপাতালের বিল, কেবিন খরচসহ অন্যান্য আনুষঙ্গিক খরচাপাতি হিসাব করলে তার পরিমান প্রায় কাছাকাছি হয়ে থাকে। যার কারণে রোগীদের দেশের হাসপাতালগুলোর প্রতি অনীহা বেড়েই চলেছে দিন দিন।

দেশের চিকিৎসা ব্যবস্থাপনায় সমন্বয়ের অভাব রয়েছে। চিকিৎসক ও নার্সদের আচরণ যথেষ্ট রোগীবান্ধব নয়। এদেশে এখনও ক্যান্সার, নিউরো, লিভারসহ কিছু জটিল অসংক্রামক রোগের পূর্ণাঙ্গ বা চূড়ান্ত পর্যায়ের নির্ভরযোগ্য চিকিৎসাসেবা নেই। বিশেষজ্ঞরা বলেন, রোগীর সর্বোত্তম সেবা ও নিরাপত্তা হাসপাতাল ব্যবস্থাপনার প্রধান কাজ। তবে বাংলাদেশের অনেক হাসপাতালে রোগীদের চিকিৎসার চেয়ে ভোগান্তিই পোহাতে হয় বেশি। প্রয়োজন না থাকলেও দীর্ঘ সময় রোগীকে আইসিইউতে রাখার উদাহরণ অনেক। এর ওপর লাইসেন্সবিহীন নামসর্বস্ব হাসপাতালে অপচিকিৎসা তো রয়েছেই। বিদেশে যাওয়ার পেছনে দেশীয় চিকিৎসা প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রযুক্তিগত দুর্বলতা রয়েছে- এটি অস্বীকার করা যাবে না। ক্লিনিক, হাসপাতালগুলো ব্যবসা করার জন্যই প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। নিশ্চয়ই তারা মুনাফা করবে। কিন্তু অনেক ক্ষেত্রে যেনেতেন উপায়ে মুনাফা করাই বড় হয়ে ওঠে। সার্ভিস দেয়ার বিষয়টি গৌণ হয়ে দাঁড়ায়। এটি রোগীর মনোজগতে নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। পরীক্ষা-নিরীক্ষার মধ্য দিয়ে রোগ নির্ণয় করাতে গিয়ে দুর্ভোগের শিকার হন রোগীরা, হন বিভ্রান্তও। এসব বিষয় যথাযথভাবে পর্যবেক্ষণ ও নিয়ন্ত্রণ করা হলে এবং চিকিৎসা ব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত সর্বস্তরের কর্মীর মানসিকতা ও সার্ভিসে ইতিবাচক পরিবর্তন আনা সম্ভব হলে ধীরে ধীরে চিকিৎসার জন্য বিদেশযাত্রার হার কমে আসবে বলে আমরা আশা করতে পারি। এ লক্ষ্যে সরকারের যেমন পদক্ষেপ নিতে হবে, তেমনি চিকিৎসক ও হাসপাতাল ব্যবস্থাপনা সম্পর্কিত সংগঠনের নেতৃবৃন্দকেও খোলা মনে সার্বিক বিষয় পর্যালোচনা করে ইতিবাচক পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে। তা না হলে পরিস্থিতির পরিবর্তন সম্ভব নয়।