২৪ জুলাই ২০১৯  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

শান্তি আন্দোলন ও বাংলাদেশ শান্তি পরিষদ

  • ড. ইঞ্জিঃ এমএ কাশেম

জাপানের নাগাসাকি ও হিরোশিমায় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের আণবিক বোমার বিস্ফোরণের পর নিশ্চিহ্ন শহর দুটির মর্মান্তিক ধ্বংসাবশেষ এবং আণবিক যুদ্ধের ভয়াবহতা দেখে বিশ্বের আণবিক বিজ্ঞানী, কবি-সাহিত্যিক, শিল্পী এবং বুদ্ধিজীবীগণ ভবিষ্যতে যুদ্ধের বিরুদ্ধে এবং শান্তির পক্ষে ঐক্যবদ্ধভাবে সোচ্চার হওয়ার প্রয়োজনীয়তা উপলব্ধি করেন। তাদের উদ্যোগেই ১৯৪৮ সালের আগস্ট মাসে কমিউনিস্ট ইনফর্মেশন ব্যুরোর (Communist Information Bureau) উদ্যোগে পোল্যান্ডের রোকলো শহরে ‘শান্তির জন্য বুদ্ধিজীবীদের’ বিশ্ব কংগ্রেস অনুষ্ঠিত হয়। ওই কংগ্রেসে শান্তির পক্ষে বুদ্ধিজীবীদের আন্তর্জাতিক লিয়াজোঁ কমিটি গঠন করা হয়। এই কমিটি ‘মহিলাদের আন্তর্জাতিক গণতান্ত্রিক ফেডারেশন’ এর সঙ্গে যুক্ত হয়ে ১৯৪৯ সালের এপ্রিল মাসে প্যারিসে আন্তর্জাতিক বুদ্ধিজীবীদের রুদ্ধদ্বার সম্মেলন (Conclave) অনুষ্ঠিত হয়। পৃথিবীর ৭৫টি দেশ থেকে ২০০০ প্রতিনিধি এই সম্মেলনে উপস্থিত ছিলেন এবং এই সম্মেলন ‘ওয়ার্ল্ড কংগ্রেস অফ পার্টিজান ফর পিস’ (World Congress of Partisan For Peace) নামে সংগঠন তৈরি করেন। বিশ্বনন্দিত আণবিক বিজ্ঞানী জুলিও কুরি এই সংগঠনের সভাপতি নির্বাচিত হন।

পরে বছর (১৯৫০) পোল্যান্ডের ওয়ারশ শহরে অনুষ্ঠিত দ্বিতীয় সম্মেলনে ‘ওয়ার্ল্ড কংগ্রেস অফ পার্টিজান ফর পিস’ কে ‘বিশ্ব শান্তি পরিষদ’ (ডড়ৎষফ চবধপব ঈড়ঁহপরষ) নামে নামাঙ্কিত করা হয়। বিজ্ঞানী জুলিও কুরি পুনরায় বিশ্ব শান্তি পরিষদের সভাপতি নির্বাচিত হন এবং আমৃত্যু এই সম্মানিত পদে অধিষ্ঠিত ছিলেন। বিশ্ব শান্তি পরিষদে প্রদত্ত প্রথম ভাষণে তিনি বলেন, ‘শান্তি বিশ্বের সব মানুষের বিষয়। কোন মানুষ একা, কোন দেশ একা শান্তি প্রতিষ্ঠা এবং যুদ্ধ প্রতিরোধ করতে পারবে না। এই মহান কাজ সম্মিলিত প্রচেষ্টার মাধ্যমেই করতে হবে। সোভিয়েত ইউনিয়নসহ সমাজতান্ত্রিক সব দেশ প্রথম থেকেই বিশ্ব শান্তি পরিষদকে সাহায্য ও সমর্থন করে এসেছে। সাম্রাজ্যবাদী যুদ্ধের বিরুদ্ধে সামরিক ঘাঁটি প্রতিষ্ঠা, সমরাস্ত্র উৎপাদন ও বিস্তারের বিরুদ্ধে; এবং জাতীয় স্বাধীনতা, গণতন্ত্র ও সামাজিক ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা ও রক্ষার পক্ষে শান্তিকামী মানুষের দৃঢ় মনোবল ও তীব্র আকাক্সক্ষা বিশ্ব শান্তি আন্দোলনের শক্তির উৎস।

বিশ্ব শান্তি পরিষদের বর্তমান সভাপতি হচ্ছেন ব্রাজিলের জাতীয় সংসদের প্রাক্তন সদস্য ম্যাডাম সকরো গোমেজ, সাধারণ সম্পাদক ফ্রান্সের জাতীয় সংসদ সদস্য থানাসিস প্যাফিলিস এবং নির্বাহী সম্পাদক বিশ্ব যুব আন্দোলনের যশস্বী নেতা গ্রিসের টি. ইরাকলিস। বিশ্ব শান্তি পরিষদ সাম্রাজ্যবাদী যুদ্ধের বিরুদ্ধে এবং শান্তির পক্ষে সব দল ও মতের সমন্বয়ে একটি অরাজনৈতিক আন্তর্জাতিক সংগঠন। প্রতিষ্ঠালগ্ন থেকেই বিশ্ব শান্তি পরিষদ- এশিয়া, আফ্রিকা ও লাতিন আমেরিকার মুক্তিকামী মানুষের জাতীয় স্বাধীনতা সংগ্রাম এবং স্বাধীন জাতীয় বিকাশের পক্ষে বিভিন্ন দেশের সরকার এবং জনগণের সমর্থন আদায়ে সচেষ্ট থেকেছে। ১৯৭১ সালে হানাদার পাকিস্তানী বাহিনীর বিরুদ্ধে এবং আমাদের স্বাধীনতা সংগ্রামের পক্ষে, সর্বশক্তি দিয়ে বিশ্ব জনমত এবং সোভিয়েত ইউনিয়নসহ সব সমাজতান্ত্রিক দেশের সরকারকে সংগঠিত করেছিল। বর্তমান সময়েও বিশ্ব শান্তি পরিষদ ফিলিস্তিনী জনগণের মুক্তি সংগ্রামের সমর্থনে, সিরিয়া, ইরানসহ মধ্যপ্রাচ্যের তেলসমৃদ্ধ দেশসমূহের বিরুদ্ধে সাম্রাজ্যবাদী যুদ্ধের চক্রান্ত, প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে আমেরিকার আক্রমণাত্মক সামরিক ও অর্থনৈতিক চক্রান্ত, ভেনেজুয়েলায় নির্বাচিত প্রগতিশীল গণতান্ত্রিক সরকারকে উৎখাত করার চক্রান্ত, সমাজতান্ত্রিক কিউবার বিরুদ্ধে অর্থনৈতিক অবরোধসহ সব প্রকার আন্তর্জাতিক ষড়যন্ত্র ও অন্যায়ের বিরুদ্ধে বিশ্বব্যাপী প্রতিবাদ এবং জনমত সঙ্ঘবদ্ধ করার কাজ নিরলসভাবে করে যাচ্ছে। বর্তমান বিশ্বে শান্তি আন্দোলনকে ব্যাপকভাবে প্রসারিত করা এবং শক্তিশালী করা অপরিহার্য হয়ে পড়েছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং তার সহযোগীরা বিশ্বব্যাপী একাধিপত্য প্রতিষ্ঠার জন্য তথাকথিত গণতন্ত্র রক্ষা এবং ‘সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে যুদ্ধ’-এর নাম করে, বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে যেভাবে যুদ্ধের দামামা বাজাছে, আক্রমণাত্মক সামরিক শক্তির সমাবেশ ঘটাচ্ছে, বাণিজ্য যুদ্ধ শুরু করেছে- তারই প্রতিক্রিয়া হিসেবে দেশে দেশে জনগণ স্বতঃস্ফূর্তভাবে যুদ্ধের বিরুদ্ধে এবং শান্তির পক্ষে সংগঠিতভাবে সোচ্চার হচ্ছে। ১৯৪৯-৫০ সালে যখন বিশ্ব শান্তি পরিষদ গঠন করা হয় তখন বিশ্বে আর কোন শান্তি আন্দোলন বা শান্তির পক্ষে কোন সংগঠন ছিল না। বর্তমানে বিশ্বব্যাপী শান্তির পক্ষে এবং যুদ্ধের বিরুদ্ধে ১২০টিরও অধিক উদ্যোগ বা সংগঠন রয়েছে; এর মধ্যে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রেই আছে ৫৭টি, যুক্তরাজ্যের ১০টি, কানাডায় ৫টি, খ্রিস্টান ধর্মীয় ১৫টি, এমন কি বুদ্ধিস্টদেরও ১টি সংগঠন রয়েছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের শান্তি পরিষদ (US Peace Council) যুদ্ধবিরোধী এবং শান্তিবাদী বিভিন্ন সংগঠন ও উদ্যোগকে ঐক্যবদ্ধ করার জন্য প্রচেষ্টা চালাচ্ছে।

বাংলাদেশে (তৎকালীন পূর্ব-পাকিস্তানে) শান্তি পরিষদ গড়ে ওঠে ১৯৫০ দশকের প্রথমার্ধে-কমিউনিস্ট পার্টির উদ্যোগে। প্রথম থেকেই শান্তি পরিষদ সাম্রাজ্যবাদী যুদ্ধ এবং তৎকালীন পাকিস্তানে সামরিক ঘাঁটি প্রতিষ্ঠার বিরুদ্ধে সোচ্চার ছিল; এবং স্বায়ত্তশাসনের অধিকার ও গণতন্ত্রের জন্য আন্দোলনে সক্রিয় ছিল। উনিশ শত পঞ্চাশ এবং ষাটের দশকে বাগদাদ প্যাক্ট, সিয়াটো এবং সেনটো সামরিক চুক্তির বিরুদ্ধে সভা, সমাবেশ ও মিছিল করেছে। মুক্তিযুদ্ধের সময় বাংলাদেশ শান্তি পরিষদের গৌরবোজ্জ্বল ভূমিকা মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে চিরভাস্বর হয়ে থাকবে। স্বাধীনতার পর বাংলাদেশ শান্তি পরিষদের উদ্যোগে বিশ্ব শান্তি পরিষদ- শান্তি, জাতীয় স্বাধীনতা, গণতন্ত্র এবং জোট নিরপেক্ষ আন্দোলনে অসামান্য অবদানের জন্য জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে বিশ্ব শান্তি পরিষদের সর্বোচ্চ সম্মানসুচক ‘জুলিও কুরি শান্তি পদকে’ অলংকৃত করে।

বাংলাদেশ শান্তি পরিষদ ১৯৯৩ সালে ঢাকায় এশীয় শান্তি সম্মেলনের অনুষ্ঠান করে। বাংলাদেশ শান্তি পরিষদ গর্বের সঙ্গেই উল্লেখ করতে পারে যে, ওই সম্মেলনে বাংলাদেশের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী প্রধান অতিথি হিসেবে এবং বিরোধীদলীয় নেত্রী বিশেষ অতিথি হিসেবে উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে একই মঞ্চে আসন অলংকৃত করেন। প্রায় ২৬ বছর আগের এই ঘটনা অনেকেরই স্মরণ থাকার কথা নয়।

২০১১ সালে বাংলাদেশ শান্তি পরিষদ ঢাকায় এশিয়া শান্তি সম্মেলন অনুষ্ঠান করে। এই সম্মেলনের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির আসন অলঙ্কৃত করেন বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এবং সমাপনী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির আসন অলংকৃত করেন গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের মাননীয় রাষ্ট্রপতি। বাংলাদেশের ইতিহাসে এই ধরনের দৃষ্টান্ত বিরল- বলতে গেলে নেই। বিশ্ব শান্তি পরিষদের সভাপতি এবং নিবার্হী সম্পাদক ছাড়াও ফিলিস্তিন, ভিয়েতনাম, ভারত, নেপাল, চীনসহ বিশ্বের ১৩টি দেশ থেকে ৩৭ জন বিদেশী প্রতিনিধি এই সম্মেলনে অংশগ্রহণ করেন।

২০১৩ সালে বঙ্গবন্ধুকে বিশ্ব শান্তি পরিষদের সর্বোচ্চ সম্মান- জুলিও কুরি পদকে ভূষিত করার ৪০ বছর পূর্তি উদযাপন করা হয়। যেখানে প্রধান অতিথির আসন অলঙ্কৃত করেছিলেন বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। পরবর্তী সময়ে বাংলাদেশ শান্তি পরিষদ, ভারতীয় শান্তি পরিষদ এবং পাকিস্তানের শান্তি পরিষদের যৌথ উদ্যোগে লাহোর থেকে ঢাকা পর্যন্ত একটি শান্তি মিছিলের কর্মসূচী প্রণয়ন করা হয়েছিল। এই কর্মসূচী বাস্তবায়িত করা যায়নি।

বাংলাদেশ শান্তি পরিষদ জাতীয় এবং আন্তর্জাতিক দিবসের একটি বার্ষিক কার্যক্রম অনুসরণ করে- যেমন, জাতীয় শোক দিবস, বিজয় দিবস, হিরোশিমা-নাগাসাকি দিবস, ফিলিস্তিন দিবস, আন্তর্জাতিক শান্তি দিবস। এছাড়াও বিভিন্ন সময়ে উদ্ভূত গুরুত্বপূর্ণ জাতীয় এবং আন্তর্জাতিক বিষয় নিয়ে সেমিনার, মানববন্ধন এবং সমাবেশ ও করা হয়ে থাকে; যেমন- রোহিঙ্গা সমস্যা, বাংলাদেশে মার্কিন সামরিক প্রভাব, ফিলিস্তিনে ইসরাইলী আক্রমণ এবং ফিলিস্তিনিদের জন্য স্বাধীন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা, সিরিয়া ইয়েমেনসহ মধ্যপ্রাচ্য এবং আরব অঞ্চলে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ষড়যন্ত্র এবং গৃহযুদ্ধ, ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধের ষড়যন্ত্র ও অর্থনৈতিক অবরোধ, ক্রিমিয়ায় সাম্রাজ্যবাদী চক্রান্ত এবং যুদ্ধ, ভেনিজুয়েলায় নির্বাচিত জনপ্রিয় সরকারকে উৎখাতের চক্রান্ত, এশিয়া প্যাসিফিক অঞ্চলে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বৃদ্ধি।

তিনটি যুগান্তকারী ঘটনার মধ্য দিয়ে বাংলাদেশ শান্তি পরিষদ আমাদের দেশের আপামর জনসাধারণের মনে অনন্য স্থান করে নিয়েছে, সার্বজনীনতা অর্জন করেছে। প্রথমত. মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে সমাজতান্ত্রিক সোভিয়েত ইউনিয়নের ঐতিহাসিক ভূমিকা; দ্বিতীয়ত. মুক্তিযুদ্ধের সময় বিশ্ব শান্তি পরিষদ এবং বাংলাদেশ শান্তি পরিষদের গৌরবময় ভূমিকা; তৃতীয়ত. জাতির পিতা বঙ্গবন্ধুকে বিশ্ব শান্তি পরিষদের সর্বোচ্চ সম্মান ‘জুলিও কুরি শান্তি পদকে’ ভূষিত করা। পৃথিবীর অনেক দেশেই শান্তি পরিষদ সাধারণ জনগণের হৃদয়ে এভাবে স্থান করে নিতে পারেনি। শান্তি পরিষদের এই সার্বজনীন অবস্থানকে আরও দৃঢ় করতে হবে। এ জন্য সাম্রাজ্যবাদবিরোধী গণতান্ত্রিক, অসাম্প্রদায়িক এবং মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় উদ্বুদ্ধ সব দল ও মতের ‘ইনক্লুসিভ’ (inclusive) সংগঠন হিসেবে বাংলাদেশ শান্তি পরিষদকে আরও সংহত এবং ঐক্যবদ্ধ হতে হবে। কোন বিশেষ আদর্শ অনুসারী দল বা মত আধিপত্য বিস্তার বা নিয়ন্ত্রণ করতে চাইলে সেই লক্ষ্য ব্যাহত হবে। এই সত্যটি সবাইকে অনুধাবন করতে হবে। এসব সমস্যা মোকাবেলা করে বর্তমান প্রেসিডিয়ামের পরিচালনায় বাংলাদেশ শান্তি পরিষদ এগিয়ে চলেছে।

লেখক : সাধারণ সম্পাদক, বাংলাদেশ শান্তি পরিষদ

নির্বাচিত সংবাদ