১৭ জুলাই ২০১৯  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

রেল ও সড়কের সেতু কালভার্ট জরিপের নির্দেশ প্রধানমন্ত্রীর

রেল ও সড়কের সেতু কালভার্ট জরিপের নির্দেশ প্রধানমন্ত্রীর
  • খেলোয়াড়দের জন্য হবে বিশেষ তহবিল ॥ একনেকে ১০ প্রকল্প অনুমোদন

স্টাফ রিপোর্টার ॥ রেলের গতি ও যাত্রী সেবার মান বাড়াতে বাংলাদেশ রেলওয়ের ২১টি মিটারগেজ ডিজেল ইলেক্ট্রিক লোকোমোটিভ নবরূপায়ণসহ ১০ প্রকল্পের চূড়ান্ত অনুমোদন দিয়েছে জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটি (একনেক)। এসব প্রকল্প বাস্তবায়নে মোট ব্যয় ধরা হয়েছে ৬ হাজার ৯৬৭ কোটি ২৩ লাখ টাকা। এসময় রেল ও সড়কপথের সমস্ত সেতু-কালভার্ট জরিপ করার নির্দেশ দেন প্রধানমন্ত্রী। জরিপ করে নড়বড়ে সেতু চিহ্নিত করে বর্ষার আগেই মেরামত করার নির্দেশনা দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী। মঙ্গলবার রাজধানীর শেরেবাংলা নগর এনইসি সম্মেলন কক্ষে একনেক চেয়ারপার্সন ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত একনেক সভায় এসব প্রকল্প অনুমোদন ও নির্দেশনা দেয়া হয়। সভাশেষে পরিকল্পনামন্ত্রী এম এ মান্নান প্রকল্প সম্পর্কে সাংবাদিকদের ব্রিফ করেন। প্রেস ব্রিফিংয়ে উপস্থিত ছিলেন পরিকল্পনা সচিব নুরুল আমিন, সাধারণ অর্থনীতি বিভাগের সদস্য (সিনিয়র সচিব) ড. শামসুল আলম এবং পরিসংখ্যান ও তথ্য ব্যবস্থাপনা বিভাগের সচিব সৌরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী।

একনেকের বৈঠকে প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনা তুলে ধরে পরিকল্পনামন্ত্রী এম এ মান্নান বলেন, মৌলভীবাজারের কুলাউড়ায় উপবন এক্সপ্রেসের দুর্ঘটনার প্রসঙ্গ টেনে রেল ও সড়কের সমস্ত সেতু ও কালভার্ট সার্ভে করার কথা বলেছেন প্রধানমন্ত্রী। বর্ষার আগেই নড়বড়ে সেতু-কালভার্ট চিহ্নিত করে সংস্কার করতে বলেছেন। কারণ বর্ষা আরম্ভ হলে বৃষ্টিতে ভেঙ্গে পড়ার প্রবণতা বাড়বে।

মন্ত্রী জানান, রবিবার রাতে রেলের বগি পড়ে হতাহতের ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে প্রধানমন্ত্রী দেশের সবগুলো রেলসেতু জরিপ করার দায়িত্ব দিয়েছেন রেলপথ এবং সড়ক ও জনপথ অধিদফতরকে। জরিপের মাধ্যমে যেসব সেতু ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে উঠে আসবে, সেগুলো দ্রুত মেরামতের উদ্যোগ নিতে হবে। এছাড়া দেশের কোন কোন সড়ক অধিদফতর দেখাশোনা করবে, আর কোন কোন সড়ক এলজিইডি দেখাশোনা করবেন তা জরিপের পর ভাগ করে নিতেও বলেছেন প্রধানমন্ত্রী।

এদিকে, সোমবার বিশ্বকাপ ক্রিকেটে আফগানিস্তানকে হারিয়ে বাংলাদেশ ক্রিকেট দল জয়লাভ করায় ক্যাপ্টেন মাশরাফি ও বিশ্বসেরা অলরাউন্ডার সাকিবসহ দলের সব খেলোয়াড়কে অভিনন্দন জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী। পাশাপাশি খেলোয়াড়দের জন্য বিশেষ তহবিল গঠনের তাগাদা দিয়েছেন তিনি। এ প্রসঙ্গে প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, খেলোয়াড়রা তরুণ বয়সে ভাল অবস্থায় থাকলেও বয়স হয়ে গেলে তাদের অর্থকষ্টে পড়তে হয়। এমন খেলোয়াড়দের জন্য বিশেষ তহবিল গঠন করতে হবে। পরিকল্পনামন্ত্রী বলেন, ‘খেলা নিয়ে সবার প্রশংসা করেছেন প্রধানমন্ত্রী। তাদের তিনি সন্তানের মতো মনে করেন। সাকিব, মুশফিক এদের সম্পর্কে খুব ভাল মন্তব্য করেছেন। এদের নিয়ে আরও কিছু করতে চান। এদের আরও সুযোগ-সুবিধা দেয়া প্রয়োজন বলে মনে করে তিনি।’ কলসিন্দুরের ফুটবল খেলা মেয়েদেরও সুবিধা দেয়া হবে বলে জানান শেখ হাসিনা। প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনা তুলে ধরে এম এ মান্নান বলেন, ‘উনার নির্দেশনাটা হলো খেলোয়াড়দের শুধু খেলাকালীন সময়ে নয়, তারা যখন পরবর্তী পর্যায়ে আমাদের মতো বার্ধক্যে যাবে, তখন খুব কষ্ট হয়। তিনি এ সম্পর্কে অবহিত। কম বয়সে খরচ করে ফেলে, টাকা জমায় না। ঠকা খায়। নানা ধরনের সমস্যায় পড়ে। প্রধানমন্ত্রী বলছেন, আমরা এটা হতে দেব না।’ এখন যেমন তাদের সাহায্য দেব, তাদের মাথায় হাত রাখব, পরবর্তী পর্যায়েও তারা যেন নিচে না পড়ে যায়, এজন্য ক্রিয়া মন্ত্রণালয়কে সুনির্দিষ্ট অর্ডার দিয়েছেন। তাদের বলেছেন প্রকল্প নিয়ে আসতে।

এছাড়াও সারাবছর চর্চা করার জন্য তহবিলের ব্যবস্থা করা হবে উল্লেখ করে পরিকল্পনামন্ত্রী বলেন, আরেকটা প্রধানমন্ত্রীর গুরুত্বপূর্ণ মন্তব্য- খেলা আসলেই প্র্যাকটিস শুরু হয়। তারপর আর খবর নেই। তার কথা হলো যে খেলোয়াড় পেশাজীবী, সে সারাবছরই প্র্যাকটিস করবে। খেলোয়াড় তো নিজের পয়সায় করবে না, কেন করবে? তিনি চান, একটা ভাল তহবিল থাকবে। যেন এই তহবিলের আওতায় তারা সারাবছর প্র্যাকটিস করতে পারে। মন্ত্রী বলেন, ‘তাদের (খেলোয়াড়) কর্তৃপক্ষ আছে, তারাই এটা করবে। সরকার শুধু টাকা দেবে। প্রধানমন্ত্রী সরাসরি অর্থ মন্ত্রণালয়কে নির্দেশনা দিয়েছেন এর জন্য একটি বিশেষ তহবিল গঠন করতে হবে।

খেলা বলতে শুধু ক্রিকেট নয়, ফুটবল, হকি, ভলিবল, বাস্কেট বল, সব ধরনের খেলাকেই সহযোগিতা করার আশ্বাস দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্য তুলে ধরে পরিকল্পনামন্ত্রী বলেন, শুটিং ও আর্চারিতেও আমাদের সম্ভাবনা আছে। সেখানে ইনটেনসিভ ট্রেনিংয়ের ব্যবস্থা করতে বলেছেন তিনি। এম এ মান্নান বলেন, আর্চারির কথা বলতে গিয়ে তিনি (শেখ হাসিনা) এটাও বলেছেন, শুধু পশ্চিমা আর্চারি নয়। আমাদের এখানে তির, ধনুক, বল্লম রয়েছে। আমাদের সাঁওতালরা ব্রিটিশদেরকে তির, ধনুক দিয়ে তাড়াতে চেয়েছিল। সেই তির, ধুনকও যাতে মরে না যায় এবং বিকশিত হয়, সেজন্য তহবিল, প্রশিক্ষণের আশ্বাস দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী।

এছাড়াও সভায় সারাদেশে সমন্বিতভাবে সরকারী অফিস স্থাপনের নির্দেশ দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। বড়, ছোট ও মাঝারি এই তিন ভাগে ভাগ করে জেলা সদরের সরকারী অফিসগুলো যেন একই ডিজাইনের হয় সেজন্যও নির্দেশনা দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী।

একনেকে অনুমোদিত প্রকল্প নিয়ে পরিকল্পনামন্ত্রী জানান, একনেকে অনুমোদিত ১০ প্রকল্পে মোট ব্যয় হবে ৬ হাজার ৯৬৭ কোটি ২৩ লাখ টাকা। এর মধ্যে সরকারী তহবিল থেকে খরচ করা হবে ৬ হাজার ৬৮৬ কোটি ১৩ লাখ টাকা, বাস্তবায়নকারী সংস্থার নিজস্ব তহবিল থেকে ব্যয় হবে ২৪১ কোটি ৫২ লাখ এবং প্রকল্প সাহায্য হিসেবে বৈদেশিক সহায়তা পাওয়া যাবে ৩৯ কোটি ৫৮ লাখ টাকা।

সভার সিদ্ধান্ত অনুযায়ী ২৪২ কোটি টাকা ব্যয়ে ২১ রেল ইঞ্জিনের সক্ষমতা বাড়ানোর উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। ফলে পুরাতন রেল ইঞ্জিনগুলো আরও ২০ বছর রেলপথে পরিচালনা করা যাবে। বর্তমানে বাংলাদেশ রেলওয়েতে ২৭২ ডিজেল ইঞ্জিন ইলেক্ট্রিক লোকোমোটিভ রয়েছে। এর মধ্যে ১৯৬টির অর্থনৈতিক আয়ুষ্কাল পেরিয়ে গেছে। এ অবস্থায় রেলের গতি বাড়াতে নতুন ইঞ্জিন কেনার পাশাপশি এগুলোকে মেরামতের উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। এতে এই ইঞ্জিনগুলো আরও ২০ বছর সেবা দিতে পারবে। ‘বাংলাদেশ রেলওয়ের ২১টি মিটারগেজ ডিজেল ইলেক্ট্রিক লোকোমোটিভ নবরূপায়ণ’ প্রকল্পটির অনুমোদন দেয়া হয়েছে। অনুমোদন পেলে চলতি বছর থেকে ২০২২ সাল নাগাদ এটি বাস্তবায়ন করবে বাংলাদেশ রেলওয়ে। পরিকল্পনামন্ত্রী বলেন, রেলের ২১ ইঞ্চিন আধুনিকরণ প্রকল্পের আওতায় রেলের ২১টি এমজি লোকোমোটিভ পুনর্বাসনের মাধ্যমে নবরূপায়ণ করা হবে। এতে লোকোমোটিভগুলোর কর্মক্ষমতা যেমন বৃদ্ধি পাবে তেমনি চলাচলে গতিশীলতা বৃদ্ধি পাবে। এর মাধ্যমে যাত্রী সেবা নিশ্চিত হবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।

বাংলাদেশ রেলওয়ের ২১টি মিটারগেজ ডিজেল ইলেক্ট্রিক লোকোমোটিভ নবরূপায়ণ প্রকল্পের ব্যয় ধরা হয়েছে ২৪২ কোটি ১৪ লাখ টাকা। জানুয়ারি ২০১৯ হতে জুন ২০২২ মেয়াদে প্রকল্পটি বাস্তবায়ন হবে। পরিকল্পনামন্ত্রী জানান, প্রধানমন্ত্রী সারাদেশে সমন্বিতভাবে সরকারী অফিস স্থাপনের নির্দেশ দিয়েছেন। এছাড়া ছোট, মাঝারি ও বড় এই তিন ভাবে ভাগ করে জেলা সদরের সরকারী অফিসগুলো যেন একই ডিজাইনের হয় সেই নির্দেশনাও প্রদান করেছেন তিনি।

একনেকে অনুমোদিত প্রকল্পসমূহ হলো- বামনডাংগা (গাইবান্ধা)-শঠিবাড়ী-আফতাবগঞ্জ জেলা মহাসড়ক প্রশস্তকরণ প্রকল্প, যার মোট ব্যয় ধরা হয়েছে ৪২৫ কোটি ৮১ লাখ টাকা। গাজীপুর সিটি কর্পোরেশনের বিভিন্ন জোনের প্রধান সংযোগ রাস্তাগুলো প্রশস্তকরণসহ নর্দমা ও ফুটপাথ নির্মাণ প্রকল্পের খরচ ধরা হয়েছে ৩ হাজার ৮২৮ কোটি টাকা। অফিসার্স ক্লাব, ঢাকার ক্যাম্পাসে বহুতল ভবন নির্মাণ প্রকল্পের ব্যয় হবে ২২৮ কোটি টাকা। মানিকগঞ্জ বহুতল বিশিষ্ট সমন্বিত সরকারী অফিস ভবন নির্মাণ প্রকল্পের খরচ ধরা হয়েছে ৯৫ কোটি টাকা।

ঢাকা বঙ্গবন্ধু জাতীয় স্টেডিয়ামের অধিকতর উন্নয়ন প্রকল্পের খরচ ধরা হয়েছে ৯৮ কোটি টাকা। দুস্থ শিশু প্রশিক্ষণ ও পুনর্বাসন কেন্দ্র পুনঃনির্মাণ, কোনাবাড়ি, গাজীপুর প্রকল্পের মোট ব্যয় ধরা হয়েছে ৮১ কোটি টাকা। সন্ত্রাসবাদ মোকাবেলা ও জননিরাপত্তা নিশ্চিতকল্পে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের সক্ষমতা বৃদ্ধি প্রকল্পের খরচ ধরা হয়েছে ৭৯ কোটি টাকা। বৃহত্তর ফরিদপুর সেচ এলাকা উন্নয়ন প্রকল্পে ব্যয় হবে ২০০ কোটি টাকা। ওয়েস্ট জোন এলাকায় বিদ্যুত বিতরণ ব্যবস্থার সম্প্রসারণ ও আপগ্রেডেশন প্রকল্পের খরচ ধরা হয়েছে ১ হাজার ৬৮৭ কোটি টাকা।

সভায় সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের, কৃষিমন্ত্রী মোঃ আব্দুর রাজ্জাক, তথ্যমন্ত্রী ড. হাছান মাহমুদ, স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রী মোঃ তাজুল ইসলাম, শিক্ষামন্ত্রী ডাঃ দীপু মনি; শিল্পমন্ত্রী নূরুল মজিদ মাহমুদ হুমায়ূন; স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণমন্ত্রী জাহিদ মালেক; বাণিজ্যমন্ত্রী টিপু মুনশি; গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রী শ ম রেজাউল করিম; পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন বিষয়ক মন্ত্রী মোঃ শাহাব উদ্দিন; ভূমিমন্ত্রী সাইফুজ্জামান চৌধুরী ও সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী ও প্রতিমন্ত্রীরা সভার কার্যক্রমে অংশ নেন। সভায় মন্ত্রিপরিষদ সচিব, প্রধানমন্ত্রীর মুখ্য সচিব, এসডিজির মুখ্য সমন্বয়ক, পরিকল্পনা কমিশনের সদস্য, সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়গুলোর সচিব এবং উর্ধতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।