২২ জুলাই ২০১৯  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

প্রধানমন্ত্রীর কৌশলী রাজনীতির কাছে বিএনপি পরাজিত

  • সংসদে নাসিম

সংসদ রিপোর্টার ॥ ৩০ ডিসেম্বরের একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন, নির্বাচনী কৌশলসহ নির্বাচনী রাজনীতি নিয়ে সরকারী দল ও বিএনপির মধ্যে জাতীয় সংসদে মঙ্গলবার প্রাণবন্ত বিতর্ক হয়েছে। বিএনপিকে ‘খুনীদের দল’ অ্যাখায়িত করে আওয়ামী লীগের সভাপতিম-লীর সদস্য ও সাবেক মন্ত্রী মোহাম্মদ নাসিম বলেন, বিএনপি এখন তাদের অতীত পাপের ফল ভোগ করছে। বিএনপির প্রতি পাতায় পাতায় শুধু ভুলের রাজনীতি। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার কৌশলী রাজনীতির কাছে তারা বারবার পরাজিত হয়েছে। পরিত্যক্ত একজন নেতাকে (ড. কামাল হোসেন) ভাড়া করে নির্বাচনের মাঝ পথ থেকে বিএনপির পালিয়ে যাওয়ার কারণেই আমাদের ফাঁকা মাঠে গোল দিতে হয়েছে। তিনি আমলাতন্ত্র ও সুবিধাবাদী ব্যবসায়ীদের রাজনীতিতে প্রবেশের কঠোর সমালোচনা করেন।

অন্যদিকে বিএনপি সংসদ সদস্য হারুনুর রশীদ দাবি করেছেন, নির্বাচনে তারা কৌশলের রাজনীতির কাছে পরাজিত হননি। নির্বাচনে তাদের মাঠে কাজ করতে দেয়া হয়নি। নির্বাচনের সময় বিএনপির ২২ প্রার্থীকে গ্রেফতার করা হয়েছিল, কোন প্রার্থীকে নির্বাচনের মাঠে নামতে দেয়া হয়নি। তবে সংসদের চিফ হুইপ নূর-ই-আলম চৌধুরী লিটন বিএনপি নেতার এমন বক্তব্যেকে মিথ্যা উল্লেখ করে তা একপাঞ্জের দাবি জানালে স্পীকার ড. শিরীন শারমিন চৌধুরী সকল অসংসদীয় বক্তব্যে এক্সপাঞ্জ করা হবে বলে জানান।

প্রথমে স্পীকার ড. শিরীন শারমিন চৌধুরী এবং পরে ডেপুটি স্পীকার এ্যাডভোকেট ফজলে রাব্বি মিয়ার সভাপতিত্বে মঙ্গলবার জাতীয় সংসদ অধিবেশনে প্রস্তাবিত ২০১৯-২০ অর্থবছরের বাজেটের ওপর সাধারণ আলোচনায় অংশ নেন সাবেক স্বাস্থ্যমন্ত্রী মোহাম্মদ নাসিম, সাবেক গণপূর্তমন্ত্রী ইঞ্জিনিয়ার মোশাররফ হোসেন, বাণিজ্যমন্ত্রী টিপু মুনশী, সমাজকল্যাণ মন্ত্রী নুরুজ্জামান আহমেদ, শিল্প প্রতিমন্ত্রী কামাল আহমেদ মজুমদার, পরিবেশ ও জলবায়ু পরিবর্তন বিষয়ক প্রতিমন্ত্রী মোঃ শাহাব উদ্দিন, প্রাথমিক ও গণশিক্ষা প্রতিমন্ত্রী জাকির হোসেন, সাবেক মন্ত্রী মোস্তাফিজুর রহমান ফিজার, সাবেক চিফ হুইপ আ স ম ফিরোজ, সাবেক ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রী ড. বীরেন শিকদার, সরকারী দলের এইচ এন আশিকুর রহমান, শেখ ফজলে নূর তাপস, বেগম ফজিলাতুন নেসা ইন্দিরা, সাগুফতা ইয়াসমীন এমিলি, ইসরাফিল আলম, আবু জাহির, তানভীর ইমাম, মোহাম্মদ শাজাহান মিয়া, ছোট মনির, বেগম খাদিজাতুল আনোয়ার, আবদুল মজিদ খান, মনিরা সুলতানা, তাহজীব আলম সিদ্দিকী, মুহাম্মদ শফিকুর রহমান, বাংলাদেশ জাসদের মইন উদ্দীন খান বাদল, তরিকত ফেডারেশনের নজিবুল বশর মাইজভান্ডারী, জাতীয় পার্টির নাসরিন জাহান রতœা, পীর হাবিবুর রহমান ও বিএনপির হারুনুর রশীদ।

আলোচনায় অংশ নিয়ে আওয়ামী লীগের সভাপতিম-লীর সদস্য ও সাবেক স্বাস্থ্যমন্ত্রী মোহাম্মদ নাসিম বলেন, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা মৃত্যুঞ্জয়ী নেতা। যে কোন পরিস্থিতি মোকাবেলা করে দূরদর্শী নেতৃত্ব দিয়ে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে দেশকে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছেন। রাজনৈতিক, নির্বাচনসহ সব কিছুতেই কৌশলে বিরোধী দলকে মোকাবেলা করে বিজয়ী হয়েছেন। তিনি বলেন, দীর্ঘদিন এমপিওভুক্তের বিষয়টি পড়ে আছে। জনপ্রতিনিধিদের এলাকায় জবাবদিহি করতে হয়, সে কারণে এ ব্যাপারে এমপিদের অন্তর্ভুক্ত করতে হবে। মোবাইল ফোনে কেন কর ধার্য করছি? সঞ্চয়পত্র ক্ষুদ্র ও গরিব পরিবারের কাছে একটি সোনার বাটি। তাই সঞ্চয়পত্রের ওপর থেকে অতিরিক্ত কর প্রত্যাহার করতে হবে।

আমলাতন্ত্রের সমালোচনা করে তিনি বলেন, যে যত বেশি ফাইল আটকে রাখতে হবে, সে তত বড় আমলা। সরকারকে ব্যর্থ করতে অনেকেই চক্রান্ত করে যাচ্ছে। সর্বত্র জামায়াত-শিবির-বিএনপির চক্রান্তকারীরা বসে আছে। তাই আমলাতন্ত্রের জটিলতা থেকে বের হতে হবে। তিনি বলেন, সরকারের এত বড় সফলতার পরও দুঃখ লাগে ব্যাংকিং খাতে ঋণখেলাপীরা হাজার হাজার কোটি টাকা লুটে নিয়ে গেছে। এদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নিতে হবে, ঋণখেলাপীদের সকল সম্পদ বিক্রি করে উদ্ধারকৃত টাকা গরিব-মেহনতি মানুষের মধ্যে প্রয়োজনে ভর্তুকি দিন। এদের কোন ছাড় নেই, জিরো টলারেন্স দেখাতে হবে।

কিছু সুবিদাবাদী ব্যবসায়ী নেতাদের রাজনীতিতে প্রবেশের সমালোচনা করে মোহাম্মদ নাসিম বলেন, কিছু ব্যবসায়ী আছেন তারা ব্যাংক, গার্মেন্টস, ওষুধ কোম্পানি ও গণমাধ্যমের মালিক। তারা সব ব্যাপারে অভিজ্ঞ। তারা আজকে সরকারী দলে এমনকি সংসদে পর্যন্ত ঢুকে গেছে। এ সমস্ত সুবিধাবাদী ব্যবসায়ীরা আমাদের বন্ধু হতে পারে না। এই সংসদ হবে রাজনৈতিক নেতাদের সংসদ। যারা রক্ত দিয়ে ঘাম দিয়ে বাংলাদেশকে প্রতিষ্ঠা করেছেন। ওই সকল ব্যবসায়ী যারা কোনদিন আওয়ামী লীগের রাজনীতি কিংবা রাজপথে লড়াই করেনি। এরা কারা, এদের সবাইকে চিনি। এরা হচ্ছে সুখের পায়রা। বিপদের সময় এদের খুঁজে পাওয়া যাবে না। এক এগারোর সময়ও এরা ভোল পাল্টিয়েছিল। এরা দুই দিকেই সুবিধা নেয়।

বিএনপির উদ্দেশে করে মোহাম্মদ নাসিম বলেন, বগুড়ায় ইভিএমের মাধ্যমে নির্বাচনে বিএনপি ৬০ হাজার ভোটের ব্যবধানে জিতেছেন। এখন কী বলবেন? বিএনপির প্রতি পাতায় পাতায় ভুল। গত নির্বাচনে আওয়ামী লীগের পরিত্যক্ত (ড. কামাল হোসেন) নেতাকে ভাড়া করে বিএনপি সামনে দাঁড় করালো। সেই ড. কামাল হোসেন কী করলেন, বিএনপিকে দিয়ে নির্বাচনের মাঝ পথে মাঠ ফাঁকা করে দিলেন। আমরা ফাঁকা মাঠে গোল দিয়ে দিলাম। বিএনপির ভাড়া করা লোক কাজ করল আমাদের পক্ষে! এই ভুলের রাজনীতি থেকে বিএনপিকে কবে বের হবে? আসলে বিএনপি হচ্ছে খুনীর দল, খুনীদের লালন-পালনকারীদের দল। বিএনপি এখন পাপের ফল ভোগ করছে। বিএনপি আমাদের কাছে বারবার হেরে গেছেন, নির্বাচনে মাঠ ছেড়ে পালিয়ে গেছেন। আন্দোলন করারও ক্ষমতা আপনাদের নেই। একমাত্র আওয়ামী লীগই জানে কীভাবে আন্দোলন করতে হয়।

আরেক আওয়ামী লীগের সভাপতিম-লীর সদস্য ইঞ্জিনিয়ার মোশাররফ হোসেন বলেন, সুখী-সমৃদ্ধ ও উন্নত বাংলাদেশ গড়ার এই বাজেট দেশকে আরও এগিয়ে নিয়ে যাবে। গত ১০ বছরে সরকারের অভাবনীয় উন্নয়নের কারণেই গত নির্বাচনে দেশের জনগণ দু’হাত ভরে আবারও ভোট দিয়ে আওয়ামী লীগকে দেশ সেবার সুযোগ দিয়েছেন। ১৯৮১ সালে বঙ্গবন্ধুর কন্যা শেখ হাসিনা দেশে ফিরে না আসলে দেশের এই অগ্রগতি কোনদিনই সম্ভব হতো না।

বিএনপির হারুনুর রশীদ বলেন, কথায় আছে চোরের মায়ের বড় গলা। বলা হচ্ছে নির্বাচনে কৌশলে বিএনপি হেরে গেছে। একাদশ নির্বাচনের গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে দেশে-বিদেশে সর্বত্র সমালোচনা হয়েছে। নির্বাচনের আগের রাতে বাক্সে ব্যালট ভরে রাখায় এ সংসদকে মধ্যরাতের পার্লামেন্ট বলেন অনেকেই। নির্বাচন কমিশন ব্যর্থ ও অযোগ্যতার পরিচয় দিয়েছে। আজ নির্বিচারে গুম ও বিনা বিচারে ক্রসফায়ারের শিকার হচ্ছে। বিএনপির হাজার হাজার নেতাকর্মীদের নামে গায়েবি মামলা দিয়ে হয়রানি করা হচ্ছে। গত ১০ বছরে বিএনপি নেতাকর্মীদের নামে ৯০ হাজার মামলা হয়েছে, যার ৯০ ভাগই ভুয়া। বাজেটে ঋণখেলাপী, ব্যাংক থেকে লুণ্ঠনকারী, পুঁজিবাজার লুটপাটকারীদের সম্পর্কে কোন কথা নেই। এটি একটি অদ্ভুত সরকার। একসঙ্গে নির্বাচন করে জোটের শরিকদের বিরোধী দলের আসনে বসালেন।

বাণিজ্যমন্ত্রী টিপু মুনশী প্রস্তাবিত বাজেটকে সাহসী বাজেট হিসেবে উল্লেখ করে বলেন, আমরা এই সাহসী বাজেট নিয়েই এগিয়ে যেতে চাই। সবক্ষেত্রে বাংলাদেশের অগ্রগতি প্রমাণ করে গত ১০ বছরে বর্তমান সরকার কোন ভুল নয়, সঠিক পথেই এগুচ্ছে। অর্থনৈতিক উন্নয়নে সারাবিশ্বে বাংলাদেশ এখন বিস্ময়। জিনিসপত্রের দাম সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতার মধ্যে রাখতে সক্ষম হয়েছি। দেশের এই অগ্রযাত্রা অব্যাহত রাখতে তিনি কর্মসংস্থানের ওপর জোর দেন।

বাংলাদেশ জাসদের মইন উদ্দীন খান বাদল চট্টগ্রাম কালুরঘাট ব্রিজ নির্মাণ না হওয়ায় ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, আগামী ডিসেম্বরের মধ্যে এ বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত না হলে আমি সংসদ থেকে পদত্যাগ করে চলে যাব। গত ১০ বছর ধরে এ দাবি জানিয়েই যাচ্ছি। কিছু বড় বড় প্রকল্পের নামে তামাশা চলছে। আর আমরা পবিত্র সংবিধানকে অগ্রাহ্য করছি কি না, ভবিষ্যতে এ ব্যাপারে আমাদের সবাইকে সতর্ক থাকতে হবে।

সমাজকল্যাণমন্ত্রী নুরুজ্জামান আহমেদ বলেন, প্রস্তাবিত বাজেট বাস্তবায়ন হলে দেশ আরও সমৃদ্ধ হবে, জনগণের প্রত্যাশা পূরণ হবে। প্রধানমন্ত্রী একের পর এক অসম্ভবকে সম্ভব করে বাংলাদেশের মাথায় পড়িয়েছেন সাফল্যের মুকুট। তাঁর জনপ্রিয়তা এখন আকাশচুম্বী। শেখ হাসিনার বাংলাদেশে এখন আর সন্ত্রাসী-জঙ্গী-মাদক ব্যবসায়ীদের কোন স্থান নেই। তাই গত নির্বাচনে বঙ্গবন্ধুর কন্যাকে জনগণ মহাবিজয়ী করেছেন।

শিল্পমন্ত্রী প্রতিমন্ত্রী কামাল আহমেদ মজুমদার বলেন, বাংলাদেশ উন্নয়নের মহাসড়ক দিয়ে দ্রুত গতিতে এগিয়ে যাচ্ছে। প্রস্তাবিত বাজেট জনগণের ওপর কোন বাড়তি কর বা ভ্যাট আরোপ করা হয়নি। শিল্প মন্ত্রণালয়ের অধীনে থাকা শিল্প কলকারখানার উৎপাদিত পণ্যের ওপর ভ্যাট না বাড়ানোর আহ্বান জানান তিনি।

সাবেক মন্ত্রী মোস্তাফিজুর রহমান ফিজার বলেন, প্রতিষ্ঠার ৭০ বছর ধরেই আওয়ামী লীগকে শত ষড়যন্ত্র মোকাবেলা করে উজানে নৌকা বেয়েই এ পর্যায়ে আসতে হয়েছে। বিএনপি সংসদকে অবৈধ বলে, আবার শপথ নিয়ে সংসদে এসে সব সুযোগ-সুবিধা নিচ্ছেন। তাদের এই দ্বৈতনীতি ও মিথ্যাচারের রাজনীতি দেশবাসী ভাল করেই অবহিত।

জাতীয় পার্টির নাসরিন জাহান রতœা সঞ্চয়পত্রের ওপর করারোপের সমালোচনা করে বলেন, এই সঞ্চয়পত্রের সঙ্গে দেশের সাধারণ মানুষের লগ্নি রয়েছে। এর ওপর কর বৃদ্ধি কখনও গ্রহণযোগ্য হতে পারে না।

তরিকত ফেডারেশনের নজিবুল বশর মাইজভান্ডারী ঋণখেলাপীদের বিরুদ্ধে দ্রুত কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানিয়ে তিনি বলেন, চারদিকে শান্ত পরিবেশ দেখে নীরব থাকলে চলবে না। বিএনপি-জামায়াত-শিবির গোপনে নানা ষড়যন্ত্র-চক্রান্ত চালিয়ে যাচ্ছে। ওয়াজ মাহফিল এবং ইউটিউবের মাধ্যমে সরকারের বিরুদ্ধে নানা মিথ্যাচার চালাচ্ছে। রোহিঙ্গাদের দ্রুত ফেরত পাঠাতে হবে। অনেক মাদ্রাসায় জাতীয় সঙ্গীত গাওয়া হয় না, বঙ্গবন্ধুর ছবি টানানো হয় না। খুঁজে ব্যবস্থা নিতে হবে।

জাতীয় প্রেসক্লাবের সাবেক সভাপতি মুহাম্মদ শফিকুর রহমান বলেন, সমস্ত পৃথিবী আজ প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার দিকে তাকিয়ে রয়েছেন। তাঁর মতো এমন মানবিক মূল্যবোধ সম্পন্ন রাষ্ট্রনায়ক আর একজনও নেই। তিনি ডাকাতিয়া নদী ড্রেজিং করে প্রাণ ফেরানোর জন্য দাবি জানান।

সাগুফতা ইয়াসমীন এমিলি বলেন, এক সময় বাংলাদেশকে তলাবিহীন ঝুড়ি বলে অপমান করা হতো। সেই বাংলাদেশকে মাত্র ১০ বছরেই প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা উন্নয়নের চরম শিকড়ে পৌঁছে দিয়েছেন। পদ্মা সেতু প্রধানমন্ত্রী সততা, দক্ষতা ও সাহসিকতার বাস্তব প্রতিফলন।