১৭ জুলাই ২০১৯  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

কালো টাকা আলোয় ফেরানোর কাজ শুরু হোক

  • বাজেট ২০১৯-২০

ড. মিহির কুমার বায় ॥ সম্প্রতি বাংলাদেশের প্রথম শ্রেণীর একটি দৈনিক পত্রিকায় কালো টাকার ওপর প্রবন্ধ প্রকাশিত হয়েছে যা খুবই তাৎপর্যপূর্ণ ও সময় উপযোগী। কারণ, বিগত ১৩ জুন তারিখে বাংলাদেশ জাতীয় সংসদে অর্থমন্ত্রী যে বাজেট প্রস্তাব পেশ করেছিলেন তাতে ব্যবসা, শিল্প ও আবাসন খাতে বিনিয়োগের মাধ্যমে কালো টাকা সাদা করা অথবা অপ্রদর্শিত আয় প্রদর্শন করার যে সুযোগের কথা বলা হয়েছে তা বিগত সময়ের বাজেট ঘোষণাগুলোতে এমনভাবে আসেনি। আরও উল্লেখ্য, পূর্বে ফ্ল্যাট কিনে কালো টাকা সাদা করার যে রেওয়াজ ছিল তার সঙ্গে আবার যোগ হয়েছে জমি ও শতকরা দশ ভাগ হারে কর দিয়ে আগামী পাঁচ বছরের জন্য নির্মীয়মাণ বিভিন্ন অর্থনৈতিক অঞ্চল ও হাইটেক পার্কে বিনিয়োগ করলে তা সহজে গ্রহণ করার আইনের সুযোগ দেয়ার কথা বলা হয়েছে প্রস্তাবিত বাজেটে। সম্ভবত সরকার মনে করছে এই সুযোগের ফলে অর্থ পাচার রোধ হবে। অর্থনীতির মূলধারায় বিনিয়োগ হলে প্রবৃদ্ধিকে (জিডিপি) ত্বরান্বিত করবে যা কর্মসংস্থান তথা মাথাপিছু আয় বাড়ানোরও একটি মাধ্যম। কিন্তু এ ব্যাপারে ভিন্নমত রয়েছে অনেকের। যেমন, এই প্রক্রিয়া অবৈধভাবে আয় উপার্জন ও আয়কর ফাঁকিকে যেমন উৎসাহিত করবে অন্যদিকে বৈধপথে উপার্জনকারী নিয়মিত ও সৎ করদাতাকে নিরুৎসাহিত করবে, দুই দলের মধ্যে বৈষম্য বাড়াবে এবং অনৈতিক চর্চা প্রসারিত হবে। কিন্তু তাত্ত্বিকভাবে এই বিষয়টিকে অর্থনীতির চর্চায় তেমনভাবে গুরুত্ব দেয়া হয় না বিশেষত শিক্ষা কিংবা গবেষণা কার্যক্রমে বিধায় এই বিষয়টিতে তেমন কোন গুরুত্বপূর্ণ লেখা অনেকক্ষেত্রে চোখে পড়ে না। তাই প্রশ্ন স্বভাবতই আসে বিষয়টি কি? কালো টাকার একটা নিজস্ব ধারণা রয়েছে- যেমন দেশের কর আইনে কালো টাকার সংজ্ঞা না থাকলেও অপ্রদর্শিত আয় কথাটি উল্লেখ আছে বিধায় যে ব্যক্তি তার আয়কর রিটার্নে তার আহরিত আয় প্রদর্শন করতে ব্যর্থ হয় সেই টাকাকেই কালো বলে ধরা হয়- যদিও এই আয় অবৈধ পথে নাও হতে পারে।

এখন অনেকে বলছে অপ্রদর্শিত আয় দুই রকমের যথা: ১. বৈধ অর্জন কিন্তু আয় রিটার্নে প্রদর্শিত হয়নি; ২. অবৈধ উপায়ে অর্জন যার ওপর আয়কর দেয়া হয়নি। এখন নির্দিষ্ট পরিমাণ কর জরিমানাসহ প্রদান সাপেক্ষে অর্থনীতির মূলধারায় কালো টাকাকে সম্পৃক্ত করার প্রচেষ্টাকে কালো টাকা সাদা করা বলা হয়। অর্থনীতিক দর্শনে কালো টাকাকে বিভিন্ন রূপে দেখানো হয়েছে যেমন: ধূসর, নিমজ্জিত, অনানুষ্ঠানিক, সুপ্ত, সমান্তরাল; যার মূল উৎস অনৈতিকতার ছাপে আবদ্ধ বিভিন্ন রূপে যেমন ঘুষ, মানুষ পাচার, স্বর্ণ পাচার, চাঁদাবাজি, জমি কেনা-বেচার দালালি ইত্যাদি যার গতিময়তা অর্থনৈতিক কর্মকান্ডে বেশি যা কোন নিয়মের ছকে আবদ্ধ করা যায় না। উর্চ্চমান আয়কর আইনের ১৯ই ধারায় ৩ (ঘ) উপধারা অনুযায়ী বেআইনী ও সন্ত্রাসী কার্যক্রমের মাধ্যমে অর্জিত আয় যথাযথ আয়কর এবং ১০ শতাংশ হারে জরিমানা দিয়ে টাকা সাদা করা যাবে না যা নৈতিকতা ও সংবিধানের পরিপন্থী যা সংবিধানের ২০ (২) অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে। বিগত ৭ জুন ২০১৪ একটি জাতীয় দৈনিকের একটি প্রবন্ধে বলা হয়েছে- কালো টাকা, সাদা টাকা উভয়ই মানি সার্কুলেশনের অন্তর্ভুক্তি হলেও অর্থনীতিতে প্রথমটির প্রভাব নেতিবাচক যা সরকারের হিসাবের মধ্যে থাকে না, বিশৃঙ্খল গতিতে চলতে থাকে, আর্থ-সামাজিক পথে ক্ষত সৃষ্টি করে যা প্রকারান্তরে ব্যাষ্টিক, সামষ্টিক অর্থনীতিতে অবক্ষয়ের রাস্তাকে প্রশস্ত করে। আবার এই কালো টাকা প্রচলিত আইনকে ফাঁকি দিয়ে জনপদে বিচরণ করে এবং ন্যায়সঙ্গত শ্রমের চেয়ে প্রাপ্তি বেশি থাকায় এই টাকা ব্যয়ের সময় অর্থনীতির নিয়ম-কানুন মেনে চলা হয় না। নোবেল বিজয়ী বাঙালী অর্থনীতিবিদ ড. অমর্ত্য সেন বলেছিলেন, সভ্যতার গোড়া থেকে সাদা ও কালো পরস্পর হাত ধরাধরি করে আসছে যা পৃথিবীর সব দেশেই কম-বেশি রয়েছে একটি নির্দিষ্ট সীমারেখার মধ্যে। যেমন পশ্চিমা বিশ্ব, মধ্যম আয়ের দেশ লাতিন আমেরিকা ও এশিয়ার কিছু দেশে যেখানে অফশোর হিসাব বলে একটি কার্যক্রম প্রচলিত আছে যেখানে বিশেষায়িত অঞ্চলে কালো টাকা বিনিয়োগ করলে কোন প্রশ্নের মোকাবেলা করতে হয় না- যা অর্থনীতিতে বিনিয়োগের একটি বৃহৎ অংশ দখল করে রয়েছে। এখন নিম্নমধ্যবিত্ত আয়ের দেশ হিসেবে বাংলাদেশের অবস্থানটা কি তা নিয়ে বিশ্লেষণ করা প্রয়োজন। কারণ, বাজেট এলেই এই বিষয়টি নিয়ে নানা ধরনের উক্তি করতে দেখা যায় বিশেষত বিশ্লেষকদের কাছে যা ছদ্মবেশে বিষয়টি রয়েই যায় যা কর্তৃপক্ষ সরাসরি বলতে বা ঘোষণায় কিছুটা রক্ষণশীল দৃষ্টিভঙ্গির আশ্রয় নেয়। কারণ, বিষয়টি অনেকটা অনৈতিক দার্শনিক শাস্ত্রের মানদন্ডে। স্বাধীন বাংলাদেশে বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে পরিচালিত রাষ্ট্র কাঠামোতে কালো টাকা, সাদা টাকা বিতর্কটি ছিল না। কিন্তু পঁচাত্তর পরবর্তী সামরিক সরকারগুলো এই বিষয়টিকে নিয়ে আসে বিভিন্ন আইনী প্রক্রিয়ার মাধ্যমে এবং বাজেটের আগে-পরে এই বিষয়টি হালে পানি পায় এই যুক্তিতে যা জিডিপির একটি বড় অংশ যা অর্থনীতির মূলধারায় নিয়ে আসতে না পারলে উন্নয়ন অনেকাংশে ব্যাহত হবে। বাস্তবে দেখা গেল এই প্রক্রিয়ায় সাড়া খুব একটা পাওয়া যায় না তিনটি কারণে। যথাক্রমে এক. জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) হয়ত নির্ধারিত ২০% (১০% কর ও ১০% জরিমানা) নিয়ে আয়কর রিটার্নের অন্তর্ভুক্তির মাধ্যমে কালো টাকা সাদা করার ব্যবস্থা করল। কিন্তু ভয়টা হলো ভবিষ্যতে এই রেকর্ড ধরে কালো টাকার মালিক কোন হয়রানির শিকার না হয়?

বর্তমান সরকার ধারাবাহিকভাবে ১১ বছর যাবত ক্ষমতায় রয়েছে এবং গত দুটি নির্বাচনের আগে বলা হতো ১৯৯১ থেকে ১৯৯৬ পর্যন্ত এবং ২০০১ সাল থেকে ২০০৬ সাল পর্যন্ত কত কালো টাকা সাদা করেছে যা একটি রাজনৈতিক বিতর্ক; দুই. দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) এই বিষয়টি নিয়ে ভবিষ্যতে কোন প্রকারে ঝামেলা করবে কিনা এবং যদি করে তবে দেশের প্রচলিত আইনে তাকে শাস্তি পেতে হবে। কারণ, দেশের প্রচলিত আইনে এর কোন সুরক্ষার কথা বলা নেই;

তিন. সামাজিক মর্যাদার ভয় রয়েই গেছে। কারণ, বাংলাদেশের রক্ষণশীল সমাজে কালো টাকার মালিক যদি আয়কর রিটার্নের মাধ্যমে কোন মামলায় জড়ায় তবে তা যাতনা বইতে হবে যা মানসিক অশান্তির কারণ হতে পারে। এখন আসা যাক, অর্থনীতিতে কালো টাকার পরিমাণ কত এবং এখন পর্যন্ত কত টাকা সাদা করা হয়েছে এই হিসাবে। বাংলাদেশ সরকারের অর্থ মন্ত্রণালয়ের ২০১১ সালের গবেষণা প্রতিবেদন অনুযায়ী দেখা যায় যে, ২০০৯ সালে অর্থনীতিতে ৬২.২ শতাংশ কালো টাকা ছিল যার পরিমাণ ৫ লাখ ৬৫ হাজার কোটি টাকা যা সম্প্রতি ঘোষিত বাজেটের চেয়েও বেশি। বাংলাদেশে ১৯৭৫ পরবর্তী থেকে এখন পর্যন্ত মাত্র ১৩ হাজার ৮ শত ৮ কোটি টাকা সাদা করা হয়েছে এবং সরকারের রাজস্ব আদায় হয়েছে মাত্র ১ হাজার ৪ শ’ ৫৫ কোটি টাকা যার জন্য এই সুযোগটা রাখা হয়েছে ঘোষিত/অঘোষিতভাবে। এখন প্রশ্ন থাকে, এই আদায়কৃত টাকা শর্ত মতে উৎপাদন খাতে ব্যায়িত হয়েছে? বাংলাদেশ অর্থনীতি সমিতির সভাপতি তার গবেষণায় উল্লেখ করেছেন- দেশে অপ্রদর্শিত কালো টাকার পরিমাণ ৭ লাখ হাজার কোটি টাকার ওপরে যার কোন প্রভাব দৃশ্যত অর্থনীতিতে দেখা যাচ্ছে না। এই কালো টাকার উপস্থিতির কারণে অর্থনীতিতে যে সব সমস্যা দৃশ্যমান তা হলো ১. ধনী-গরিবের আয়ের বৈষম্য সৃষ্টি; ২. দ্বৈত অর্থনীতি (কালো বনাম সাদা); ৩. জাতীয় আয়ে তথ্য বিভ্রাট; ৪. সরকার কর্তৃক রাজস্ব হারানো; ৫. সামাজিক ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠায় ভাটা; ৬. বাহুল্য ব্যয় বৃদ্ধি; ৭. দুষ্প্রাপ্য সম্পদের ওপর বাড়তি চাপ মূল্য বাড়ায়; ৮. সমাজের নৈতিক মানদ- নষ্ট হয়; ৯. উৎপাদন ব্যবস্থায় প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করে।

এই সকল সমস্যার সমাধানকল্পে একটি স্বল্প-দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনা থাকা প্রয়োজন যা বাজেট বক্তৃতায় তেমন উল্লিখিত হয়নি। তবে দীর্র্ঘমেয়াদে কালো টাকার অনুশীলন কোনভাবেই যুক্তিযুক্ত নয় যা এখন থেকেই সরকারকে পদক্ষেপ নিতে হবে। যেমন প্রথমত, প্রখ্যাত জার্মান অর্থনীতিবিদ ডেভিড মোরিলের বক্তব্যের আলোকে কালো টাকার পরিমাণ নির্ধারণসহ বাহকদের চিহ্নিত করতে হবে যাতে অর্থনীতির অনুকূলে ইতিবাচক কার্যক্রম নেয়ার পথ সুগম হয়; দ্বিতীয়ত, প্রখ্যাত আরও একজন সমাজ বিশ্লেষক কার্ল মার্কসের উক্তি হলো-কালো টাকা ছাড়া কোন পুঁজি গঠিত হয় না এবং তা যদি সত্য হয় তা হলে দেশের ভেতরে যে কালো টাকা রয়েছে তা দিয়ে গঠিত পুঁজি দেশের বড় বড় খাতের বিনিয়োগের মাধ্যমে উন্নয়ন ঘটাতে হবে যার ফলে বিদেশী নির্ভরতা কমবে; তৃতীয়ত: দেশের ভিতে কালো টাকার উৎপাদনের ক্ষেত্রগুলো বন্ধ করতে হবে ক্রমান্বয়ে। কাজটি যেহেতু অপ্রদর্শিত অর্থনীতির অংশ তাই এর প্রশাসনিক কাঠামো এমন হওয়া উচিত যেখানে অবৈধভাবে যেন অর্থ উপার্জনের সুযোগ না থাকে। একজন দার্শনিক বলেছিলেন, কেউ যদি বিপুল সম্পদের মালিক হয় তা রক্ষার জন্য পাহারাদার রাখতে হবে, সে যদি জ্ঞানের মালিক হয় তবে এই জ্ঞানের আলোয় উদ্ভাসিত হয়েই তার জীবন রক্ষা হবে যার জন্য কোন বাড়তি অর্থের প্রয়োজন হবে না। সর্বশেষে বলা যায়, এই কালো টাকা নিয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষায় সময় ব্যয় না করে এর একটি স্থায়ী সমাধানের দিকে যাওয়া উচিত যার দিকে নীতি নির্ধারকদের মনোযোগ দিতে হবে।

লেখক : অর্থনীতিবিদ, গবেষক ও ডিন

সিটি ইউনিভার্সিটি