১৭ জুলাই ২০১৯  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

পোড়ামাটির নির্মাণশৈলী তিন গম্বুজ, খাঁজকাটা নক্সার দেয়াল

পোড়ামাটির নির্মাণশৈলী তিন গম্বুজ, খাঁজকাটা নক্সার দেয়াল
  • সুলতানী আমলের মসজিদ

খোকন আহম্মেদ হীরা ॥ সুলতানী আমলে পোড়ামাটি দিয়ে তৈরি ঐতিহাসিক কমলাপুর জামে মসজিদ। বরিশাল জেলার গৌরনদী উপজেলার খাঞ্জাপুর ইউনিয়নের কমলাপুর গ্রামে অবস্থিত প্রত্নতত্ত্ব অধিদফতরের নিয়ন্ত্রণাধীন তিন গম্বুজ বিশিষ্ট আয়তাকার এ মসজিদটি সতেরো শতকের শেষের দিকে নির্মাণ করা হয়েছে বলে ধারণা করা হয়। ১.৮৩ মিটার বা ছয় ফুট পুরু দেয়ালবিশিষ্ট মসজিদটি উত্তর-দক্ষিণ দিকে ১৭.২২ মিটার বা ৫৬ ফুট দৈর্ঘ্য এবং পূর্ব-পশ্চিম দিকে ৮.০৮ মিটার বা ২৬ ফুট দৈর্ঘ্য।

দেয়ালগুলোতে বহুখাঁজ বিশিষ্ট খিলানযুক্ত প্রবেশপথ রয়েছে। পূর্ব দিকে তিনটি এবং উত্তর ও দক্ষিণ দেয়ালে একটি করে মোট দুইটিসহ সর্বমোট পাঁচটি প্রবেশপথ রয়েছে। পূর্ব পাশে মসজিদের মধ্যভাগের প্রবেশ পথটি বাকিগুলোর থেকে বড় হওয়ায় এটিকে প্রধান ফটক হিসেবেই ব্যবহার করা হয়। মসজিদের কিবলার (সামনে) দিকে তিনটি অর্ধ অষ্টভুজ মিহরাব রয়েছে। এরমধ্যে মাঝখানের মিহরাবটি বাইরের দিকে অভিক্ষিপ্ত এবং দু’প্রান্তে দুটি ছোট অষ্টভুজ বুরুজ রয়েছে। পাশাপাশি ইটের তৈরি এই মসজিদকে খিলানের সাহায্যে তিন ভাগে ভাগ করা হয়েছে। যার প্রত্যেকটি ভাগে একটি করে সামান্য কন্দাকৃতির গম্বুজ রয়েছে। মসজিদের মধ্যখানের কেন্দ্রীয় গম্বুজটি অপর দুটি অপেক্ষা বড়। গম্বুজগুলোর শীর্ষে রয়েছে পদ্ম ও কলসের নক্সা।

মসজিদের অলঙ্করণের মধ্যে রয়েছে সুলতানী বৈশিষ্ট্যের পোড়ামাটির কাজ। প্রবেশপথের আয়তাকার অংশে প্যাঁচানো ফুলের নক্সা, গোলাপ নক্সা, জালি নক্সা প্রভৃতি মোটিফ সম্বলিত পোড়ামাটির ফলক দিয়ে সাজানো হয়েছে। এছাড়াও মিহরাবের বহুখাঁজ নক্সাগুলো আজও দেখতে অসাধারণ। এছাড়া মসজিদের তিনপাশ দিয়ে রয়েছে হাঁটার রাস্তা এবং মসজিদের সামনের অংশে রয়েছে সু-বিশাল বসার স্থান। যার পূর্বদিকে (সামনের অংশে) ছোট ছোট চারটি স্তম্ভ রয়েছে।

মসজিদের দেখভালের দায়িত্বে থাকা সৈয়দ সুমন আহম্মেদ জনকণ্ঠকে জানান, প্রধান প্রবেশপথে যে শিলালিপিটি ছিল তা হারিয়ে যাওয়ার কারণে মসজিদের নির্মাণসময় সঠিকভাবে জানা যায়নি। তবে প্রত্নতত্ত্ব বিভাগের হিসেবে সতেরো শতকের শেষভাগে এটি নির্মাণ হয়েছিল।

স্থানীয় বাসিন্দা খাঞ্জাপুর ইউনিয়ন যুবলীগের সভাপতি মোঃ এমদাদ হোসেন হাওলাদার জনকণ্ঠকে বলেন, ১৯৭৫ সালে বাংলাদেশ সরকারের প্রত্নতত্ত্ব অধিদফতর ঐতিহ্যবাহী এ মসজিদটি তাদের নিয়ন্ত্রণে নিয়ে যায়। পরবর্তীতে মসজিদটিতে অসংখ্যবার সংস্কার কাজও হয়েছে। তবে ১৯৮৭ ও ২০১২ সালের সংস্কার কাজ তিনি নিজেই দেখেছেন দাবি করে আরও বলেন, ঝড়ের কারণে মসজিদের গম্বুজগুলোর ওপর থাকা কলসের নক্সা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। তাছাড়া আরও কিছু সমস্যা রয়েছে, যেজন্য এখন আবার জরুরী ভিত্তিতে মসজিদের সংস্কার করা প্রয়োজন। প্রত্নতত্ত্ব বিভাগের পক্ষ থেকে মসজিদটি দেখভালের জন্য আগে নিয়মিত একজন লোক থাকলেও এখন তিনি নিয়মিত নন।

স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, প্রায় ২৬ শতক জায়গার ওপর মসজিদ কমপ্লেক্সের পাশেই এখন একটি মাদ্রাসা রয়েছে। সেখানকার শিক্ষক ও শিক্ষর্থীরাই এখন মসজিদের দেখভাল করছেন। মসজিদ ভবনের উত্তরপূর্ব কোণে একটি বিদেশী সংস্থা ওজুখানা নির্মাণ করে দিয়েছেন। এছাড়াও ওজুর জন্য মসজিদের পূর্বদিকে পুকুর রয়েছে। মসজিদের নিয়মিত মুসল্লিরা জনকণ্ঠকে জানান, বহু বছর ধরে এ মসজিদে স্থানীয়দের সহায়তায় পবিত্র রমজান মাসে ইফতারের আয়োজন করা হয়ে থাকে। এছাড়াও পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ আদায়ের পাশাপাশি রমজান মাসে তারাবির নামাজসহ সকল ধর্মীয় রীতিনীতি পালন করা হয়। মসজিদের ভেতরের অংশে তিনটি কাতারে ৮০ থেকে ৯০ জন একসঙ্গে নামাজ আদায় করতে পারেন। এছাড়া বাইরের খোলা অংশ নিয়ে দুই থেকে তিনশ’ মুসল্লি একত্রে নামাজ আদায় করেন। ঐতিহ্যবাহী এ মসজিদে বর্তমানে স্থানীয়দের উদ্যোগে প্রতিদিন ইফতারে দুইশ’ লোকের আয়োজন করা হচ্ছে। তারাবির নামাজেও বহু লোকের সমাগম ঘটে। তবে বিশেষ করে প্রতি শুক্রবার দূর-দূরান্ত থেকে জুমার নামাজ আদায় ও মসজিদ দেখতে অসংখ্য মানুষ এখানে আসেন।

স্থানীয়রা আরও জানান, কমলাপুর বাজারের কার্পেটিং সড়ক থেকে ঐতিহ্যবাহী মসজিদ কমপ্লেক্সে আসার একমাত্র ইটের সোলিংয়ের রাস্তাটি দীর্ঘদিন থেকে করুণ অবস্থায় রয়েছে। তাছাড়া বাঘমারা গ্রামের কার্পেটিং সড়ক থেকে এ মসজিদে আসার রাস্তাটি দীর্ঘদিন থেকে ভাঙ্গাচোরা ও কাঁচা সড়ক হওয়ায় প্রতিনিয়ত দর্শনার্থীদের ঐতিহ্যবাহী এ মসজিদে আসতে চরম ভোগান্তি পোহাতে হচ্ছে। তাই জরুরী ভিত্তিতে এ জনগুরুত্বপূর্ণ রাস্তা দুটি কার্পেটিং করে দেয়ার জন্য গ্রামবাসী স্থানীয় সংসদ সদস্য ও সংশ্লিষ্ট উর্ধতন কর্মকর্তাদের আশু হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন।