২৭ জুন ২০১৯

রণদা প্রসাদ হত্যা মামলায় মাহবুবুরকে মৃত্যুদন্ড ॥ মির্জাপুরবাসী আনন্দিত

  রণদা প্রসাদ হত্যা মামলায় মাহবুবুরকে মৃত্যুদন্ড ॥ মির্জাপুরবাসী আনন্দিত

নিজস্ব সংবাদদাতা, টাঙ্গাইল ॥ মুক্তিযদ্ধের সময় দানবীর রণদা প্রসাদ সাহা (আরপি সাহা) ও তার ছেলে ভবানী প্রসাদ সাহা হত্যাকান্ডসহ তিনটি গণহত্যার অভিযোগে টাঙ্গাইলের মির্জাপুর উপজেলার মানবতা বিরোধী অপরাধী মাহবুবুর রহমানকে মৃত্যুদন্ড দিয়েছেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল। বৃহস্পতিবার চেয়ারম্যান বিচারপতি মো. শাহিনুর ইসলামের নেতৃত্বে তিন সদস্যের আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল এ রায় দেন।

এদিকে এ রায় প্রদানের পরপরই টাঙ্গাইল ও মির্জাপুরে মুক্তিযোদ্ধারাসহ সাধারণ জনগন আনন্দ ও উল্লাস প্রকাশ করেছেন। তারা বলেন, দীর্ঘ ৪৮ বছর পর এ মামলার রায় দেয়া হয়েছে। আমরা এ রায়ে খুশী। সরকারের কাছে এখন আমাদের একটাই দাবি, রায় অনুযায়ি এখন কুখাত্য রাজাকার মাহবুবুবের ফাঁসি কার্যকর করা। মানবতা বিরোধী অপরাধীদের উপযুক্ত শাস্তিই দিচ্ছে বর্তমান সরকার। মির্জাপুর উপজেলা মুক্তিযোদ্ধা সংসদের সাবেক কমান্ডার অধ্যাপক দুর্লভ বিশ্বাস জানান, দানবীর রণদা প্রসাদ সাহা ও তার ছেলেসহ মির্জাপুরে গণহত্যায় অংশগ্রহণকারীদের সর্বোচ্চ শাস্তি হওয়ায় জেলার সকল মুক্তিযোদ্ধারা আনন্দিত। দানবীর রণদা প্রসাদ সাহার মতো মানব প্রেমিককে যারা হত্যা করেছে তাদের সর্ব্বোচ্চ সাজা দ্রুত কার্যকরের দাবি জানাচ্ছি।

জানা যায়, ৭০ বছর বয়সী মাহবুবুর রহমান একাত্তরে মির্জাপুর শান্তি কমিটির সভাপতি বাইমহাটী গ্রামের রাজাকার আব্দুল অদুদের ছেলে। আসামি মাহবুবুর ও তার ভাই আবদুল মান্নান বাবার সাথে রাজাকার বাহিনীতে ছিলেন। তাদের নেতৃত্ত্বেই পাকিস্তানিরা মির্জাপুর ও আন্ধরা গ্রামে গণহত্যা চালিয়ে ৩১ জন নিরীহ গ্রামবাসীকে হত্যা করে। কুমিল্লার বাংগরা উপজেলার খামার গ্রামের আব্দুল অদুদ ১৯৪৬ সালে মির্জাপুরের এক মসজিদে ইমামতির চাকুরি নেয়। ১৯৪৬ সালের ২৪ আগস্ট ওই মসজিদের পাকা ভবনের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করে। পরে মসজিদটি টিনশেডে সমাপ্ত করেন। এরমধ্যে তিনি বাইমহাটী গ্রামের ছোবহান মুন্সির ১৫ সন্তানের তৃতীয় কন্যা হাসনা ভানুকে বিয়ে করে স্থায়ীভাবে বসবাস শুরু করেন। তারা ৩ ছেলে ও ৫ কন্যা সন্তানের দম্পতি। জানা গেছে, ‘৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন সময় ৭ মে রাতে এশিয়াখ্যাত দানবীর রণদা প্রসাদ সাহা ও তার ছেলে ভবানী প্রসাদ সাহা রবিসহ সাতজনকে নারায়নগঞ্জের বাসা থেকে ধরে নিয়ে হত্যা করে। এর আগে ঘাতক দলটি ওই দিনই মির্জাপুর ও আন্ধরা গ্রামের ৫৫ জনকে ধরে নিয়ে গুলি করে হত্যা করে।

আসামি মাহবুব জামায়াত নেতা ছিলেন। কিন্তু নির্দলীয়ভাবে তিন তিনবার ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করলেও প্রতিবারই পরাজিত হয়েছেন। মুক্তিযুদ্ধের সময় আসামি টাঙ্গাইলের মির্জাপুরের ভারতেশ্বরী হোমসের আশপাশের এলাকা, নারায়ণগঞ্জের খানপুরের কুমুদিনী ওয়েলফেয়ার ট্রাস্ট ও তার আশপাশের এবং টাঙ্গাইল সার্কিট হাউজ এলাকায় অপরাধ সংঘটিত করে।

মানবহিতৈষী কাজে ওতপ্রোতভাবে সম্পৃক্ত থাকায় ব্রিটিশ সরকার রায় বাহাদুর খেতাব দিয়েছিল রণদা প্রসাদ সাহাকে। মানবসেবায় অসামান্য অবদানের স্বীকৃতিসরূপ স্বাধীনতার পর ১৯৭১ সালে সরকার তাকে মরণোত্তর স্বাধীনতা পদক দেয়। মানবসেবায় অসামান্য অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ স্বাধীনতার পর সরকার আরপি সাহাকে মরণোত্তর স্বাধীনতা পদক দেয়। মানবহিতৈষী কাজের জন্য ব্রিটিশ সরকার রায় বাহাদুর খেতাব দিয়েছিল রণদা প্রসাদ সাহাকে। রণদা প্রসাদ সাহার বাবার বাড়ি ছিল টাঙ্গাইলের মির্জাপুর উপজেলায়। সেখানে তিনি একাধিক শিক্ষা ও দাতব্য প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলেন। এক সময় নারায়ণগঞ্জে পাটের ব্যবসায় নামেন রণদা প্রসাদ সাহা। থাকতেন নারায়ণগঞ্জের খানপুরের সিরাজদিখানে। সে বাড়ি থেকেই তাকে ও তার ছেলে এবং অন্যান্যদের ধরে নিয়ে যায় আসামি রাজাকার মাহবুবুর রহমান ও তার সহযোগীরা।

রণদা প্রসাদ সাহার পৈতৃক নিবাস ছিল টাঙ্গাইলের মির্জাপুরে। সেখানে তিনি একাধিক শিক্ষা ও দাতব্য প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলেন। একসময় নারায়ণগঞ্জে পাটের ব্যবসায় নামেন রণদা প্রসাদ সাহা থাকতেন নারায়ণগঞ্জের খানপুরের সিরাজদিখানে। উল্লেখ্য, পাকিস্তানি সেনা ও তাদের এদেশীয় দোষর কুখ্যাত রাজাকার মাওলানা আব্দুল অদুদ ও তার দুই পুত্র শুধু রণদা প্রসাদ সাহা ও তার ছেলে ভবানী প্রসাদ সাহা রবিকেই হত্যা করেননি। হত্যা করেছেন মির্জাপুর সদরের পুষ্টকামুরী গ্রামের বাসিন্দা মির্জাপুর উপজেলা আওয়ামী লীগের প্রতিষ্ঠাতা সাধারন সম্পাদক আবুল হোসেনের বাবা জয়নাল সরকারকে। তার মদদে পাকিস্তানীরা ঘরের ভেতর আগুনে পুড়িয়ে হত্যা করে। নিজ বাসায় আওয়ামী লীগের অফিস থাকা এবং লুটতরাজে অংশ নেয়া এদেশীয় রাজাকারদের কাজে বাধা দেয়ায় ওই দিনই একই গ্রামের অকুতভয় সৈনিক মাজম আলী শিকদারকে পাকিস্থানী বাহিনীরা ধরে নিয়ে নির্যাতন করতে থাকে। তাকে যতবারই পাকিস্তান জিন্দাবাদ বলতে বলেছে সে ততবারই জয় বাংলা বলেছে। এভাবে তিনবার বলার পর মির্জাপুর বাসস্ট্যান্ড এলাকায় কুমুদিনী হাসপাতালের প্রাচীরের সাথে দাঁড় করিয়ে নির্মমভাবে গুলি করে হত্যা করে বলে মির্জাপুর উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান মীর এনায়েত হোসেন মন্টু জানান।