২৪ সেপ্টেম্বর ২০১৯  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

ক্রিকেট এলো কেমন করে

  • খালেদ সাইফুল্লাহ

এশিয়ায় ক্রিকেট জনপ্রিয় খেলা। ফুটবল হটিয়ে বাংলাদেশেও ক্রিকেট এখন জনপ্রিয়। ক্রিকেটের সৌজন্যে বিশ্বে বাংলাদেশের পরিচিতি বেড়েছে। ইংল্যান্ডে বসেছে ক্রিকেটের সবচেয়ে বড় আসর- বিশ্বকাপ। ব্যাটসম্যান মাঠে চার-ছক্কার ঝড় তুলছেন, বোলাররা শাসন করছেন ছন্দময় গতি আর ঘূর্ণিজাদুতে। মাঠে দর্শকের জয়োল্লাসের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে চলছে টেলিভিশনের পর্দায় হার-জিতের চুলচেরা বিশ্লেষণ। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমগুলোও সরব। ক্রিকেট নিয়ে ঘরে-বাইরে, অফিসে, আড্ডায় চায়ের কাপে এই যে আলোচনার ঝড়, সেই ক্রিকেটের উৎপত্তি কোথায়, কখন, কীভাবে হলো সে সম্পর্কে জানে ক’জন!

আজকের ক্রিকেট একদিনে এই জায়গায় আসেনি। ক্রিকেটের আধুনিকায়নের আগে খেলাটির উৎপত্তি, নামকরণ, বিবর্তন নিয়ে রয়েছে নানা কাহিনী, রয়েছে মতভেদ। একটি মত অনুসারে ক্রিকেট খেলা প্রথম শুরু হয়েছিল স্যাক্সন এবং নরম্যানদের সময় উইল্ডে বসবাসকারী শিশুদের দ্বারা। এই জায়গাটি দক্ষিণ-পূর্ব ইংল্যান্ডের কান্ট এবং সাসেক্সের মধ্যবর্তী একটি ঘন অরণ্যের মধ্যবর্তী ফাঁকা জায়গা। ১০৬৬ খ্রিস্টাব্দে ইংল্যান্ডে বসবাসকারী নরম্যানরা বিনোদনের জন্য ব্যাট-বলের খেলা শুরু করে। কিন্তু তখনকার খেলা ছিল আজকের ক্রিকেটের বহু পুরনো এবং সরল রূপ। সেখানে শুধু একজন ব্যক্তি বল কিংবা বলসদৃশ কোন বস্তু ছুড়ে মারত এবং বিপরীতে থাকা অন্য একজন কাঠের ডা-া দিয়ে বলটিকে আঘাত করত। বল হিসেবে মূলত ছোট কাঠের টুকরো বেছে নেয়া হতো। খেলাটি সপ্তাহে একদিন রবিবারে হতো। এই খেলাতে ক্রিজের শেষ প্রান্তে কোন স্ট্যাম্প থাকত কিনা তা জানা যায় না। বল ছোড়া এবং ডান্ডা দিয়ে আঘাত করার পর্যায় ছাড়া এই খেলার উন্নতির পর্যায়ে কখন রান নেয়ার পদ্ধতি যোগ হলো? কখন সীমানা নির্ধারণ করা হলো কিংবা কখন বোলারের সঙ্গে মাঠে অন্যরাও সাহায্যকারী হিসেবে ফিল্ডিং করতে শুরু করল তার কোন নির্দিষ্ট প্রমাণ পাওয়া যায় না। তবে তারা খেলাটির নাম ক্রিঘ এবং ক্রিকে (creagh & cricke) দিয়েছিল বলে জানা যায়।

অন্য একটি বর্ণনা মতে ক্রিকেট খেলার সূচনা হয়েছিল ভারতবর্ষে। ৭ম শতাব্দীতে পাঞ্জাবের দোহার অঞ্চলে ব্যাট এবং বল দিয়ে এই খেলার প্রচলন। অষ্টম এবং নবম শতকে খেলাটি ‘নরম্যাডিক জিপসি’দের দ্বারা পারস্য থেকে তুরস্কে যায়। এদের মাধ্যমেই মূলত ইউরোপে এই খেলাটির সূচনা হয়। ক্রিকেটের উৎস সম্বন্ধে আরও যেসব অনুমান করা হয়, এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো, জুলিয়ান ক্যালেন্ডার অনুযায়ী ১৩০০ খ্রিস্টীয় সনে এই খেলা ফ্রান্স অথবা ফ্লেন্ডার্সে শুরু হয়েছিল।

তবে এটি ভাবা হয়ে থাকে যে, ক্রিকেট খেলার উৎপত্তি হয়েছিল বোলস খেলা থেকে। এই খেলাটিতে ব্যাটসম্যান তার বিপরীত দিক থেকে ছোড়া বল ব্যাট দিয়ে আঘাত করে দূরে পাঠিয়ে দেয়। খেলাটিতে ভেড়ার পশমের তৈরি বল মাটির উপর দিয়ে গড়িয়ে ছুড়ে দেয়া হতো এবং এগিয়ে আসা বলটি ব্যাটসম্যান প্রতিহত করত।

প্রথম দিকে ইংল্যান্ডে গ্রামীণ ক্রিকেট

সমাজতাত্ত্বিক, ঐতিহাসিকগণ ক্রিকেটের মধ্যযুগীয় উন্নতিতে উচ্চমার্গীয় জমিদার বা ভূস্বামী শ্রেণী, প্রবাসী ফ্লেমিশ গার্মেন্টস শ্রমিক, দক্ষিণ-পূর্ব ইংল্যান্ডের নিম্নাঞ্চলীয় মেষপালক কিংবা কেন্টের অরণ্যময় অঞ্চলের লোহা ও গ্লাস শ্রমিকদের অবদান ছিল বলে ভিন্নমত পোষণ করেছেন। কিন্তু এগুলোর একাডেমিক ভিত্তি থাকলেও এর কোনটিকে প্রতিষ্ঠিত করার মতো যথেষ্ট প্রমাণ উপস্থাপন করা সম্ভব হয়নি। তবে এ ব্যাপারে বিশেষজ্ঞরা সকলে একমত যে, ১৭ শতাব্দীতে ক্রিকেট খেলা প্রাপ্ত বয়স্কদের খেলায় রূপ নেয়ার পূর্ব পর্যন্ত খেলাটি শিশুদের খেলা ছিল। ক্রিকেট খেলার ঐতিহাসিক উল্লেখ পাওয়া যায় ১৫৯৭ সালের একটি আইনী নথিতে। সেখানে জমিজমা সংক্রান্ত একটি মামলার নথিতে ‘ক্রেকেট’ শব্দটির উল্লেখ পাওয়া যায়। এই মামলার সঙ্গে জড়িত জন ডেরিক নামের এক ব্যক্তি সাক্ষ্য দেয়, স্কুলে পড়াকালীন তারা ওই জমিতে ‘ক্রেকেট’ খেলত। ধারণা করা হয় সেটি ওই ব্যক্তির সাক্ষ্য দেয়ার সময়কাল থেকে প্রায় ৫০ বছর পূর্বে। ক্রিকেট সম্বন্ধে এই বর্ণনাটি সার্বজনীনভাবে গৃহীত। ইংল্যান্ডে টিউডর রাজবংশের শাসনামলে ক্রিকেট খেলা শুধু ব্যাট-বলের খেলা থেকে আজকের আধুনিক ক্রিকেটের দিকে অনেকখানি বিবর্তন লাভ করে। এই সময় খেলাটি কেন্ট, সাসেক্স এবং সারেতে বেশ জনপ্রিয়তা পায়। খেলাটি অবসর সময় কাটানোর মাধ্যমে পরিণত হয়।

আনুমানিক ১৫৫০ সালের দিকে যুক্তরাজ্যের গিল্ডফোর্ডে ক্রিকেট খেলার প্রমাণ পাওয়া যায়। এরপর ১৫৯৮ খ্রিস্টাব্দে ফ্লোরিওর ইতালিয়ান ইংরেজী ডিকশনারিতে ‘ক্রিকেট’ শব্দটি উল্লেখ করা হয়। ১৬১০ সালে কেন্ট এ উইল্ড এবং আপল্যান্ডের মধ্যকার ক্রিকেট খেলার প্রমাণ মেলে। রবিবার গির্জায় না গিয়ে ক্রিকেট খেলার জন্য ১৬১১ সালে সাসেক্সে দুই যুবককে জরিমানা করা হয়। প্রাপ্তবয়স্কদের মধ্যে ক্রিকেট খেলার এটিই প্রথম প্রমাণ। এই সময় থেকে বড়দের মধ্যেও ক্রিকেট খেলাটি জনপ্রিয়তা পেতে শুরু করে। তখনকার দিনে ক্রিকেট গ্রামীণ আঞ্চলিকতার মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল। কাউন্টি বা ঘরোয়া ক্রিকেট শুরু হয়েছে ১৭ শতকের শেষের দিকে। এ সময় গ্রামীণ দক্ষ খেলোয়াড়দের নিয়ে কাউন্টি পেশাদার দল গঠন করা হয়। ১৭ শতকের মাঝের দিকে ধনীরা ক্রিকেট খেলায় অর্থ বিনিয়োগ করা শুরু করে এবং জুয়ার প্রতি আসক্তি বাড়ে। তখন ক্রিকেট খেলা জনপ্রিয়তা পাওয়ার পেছনে অন্যতম কারণ ছিল জুয়া। ১৬২৪ খ্রিস্টাব্দে সাসেক্সের হর্সটেড গ্রিনে ক্রিকেট খেলতে গিয়ে বল ধরার সময় ব্যাটের আঘাতে মৃত্যু হয় জাসপার ভিনালের। তিনিই ক্রিকেট খেলতে গিয়ে নিহত হওয়া প্রথম ব্যক্তি বলে জানা যায়।

১৬৭৬ সালে ইংল্যান্ডের বাইরে সিরিয়ার আলেপ্পোতে ক্রিকেট খেলে কতিপয় ব্রিটিশ নাগরিক। এটিই বিদেশের মাটিতে প্রথম ক্রিকেট ম্যাচ। ১৬৯৭ সালে সাসেক্সে প্রথম দুই দলে ১১ জন খেলোয়াড় নিয়ে একটি বৃহৎ ক্রিকেট ম্যাচ অনুষ্ঠিত হয়। ১৭০৯ সালে কাউন্টি ক্রিকেট দলগুলোর নাম দেয়া হয়। ওই বছরই কেন্ট বনাম সারের মধ্যে একটি ইন্টার কাউন্টি ক্রিকেট ম্যাচ অনুষ্ঠিত হয়। ১৭১০ সালে ক্যামব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রথম ক্রিকেট খেলা অনুষ্ঠিত হওয়ার প্রমাণ মেলে। ১৭১৯ সালে ইংল্যান্ড জাতীয় দল ও বর্তমান কাউন্টি দল কেন্টের মধ্যকার ম্যাচটির মাধ্যমে ক্রিকেট খেলা আরও জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। পুরনো দিনের ক্রিকেটের অবসান ঘটিয়ে এটিকে আধুনিক রূপ দান করে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি। ১৭২১ সালে কোম্পানির মাধ্যমে আধুনিক ক্রিকেটের প্রচলন শুরু হয়। ১৭২৭ সালে সারেতে রিচমন্ডের ডিউক এবং পিপারহ্যারোর মি. ব্রডরিকের টিমের মধ্যে ম্যাচগুলো পরিচালনা করার জন্য কিছু চুক্তি সই করা হয়। ১৭২৯ সালের একটি ব্যাট ওভালের প্যাভিলিয়নে রাখা আছে, যেটি ছিল জন শিট্টির। ১৭৩০ সালে সেন্ট্রাল লন্ডনের আর্টিলারি গ্রাউন্ডে প্রথম ক্রিকেট খেলা হয়, আর্টিলারি কোম্পানির ক্রিকেট মাঠ হিসেবে যেখানে এখনও ক্রিকেট খেলা হয়ে থাকে। ১৭৪৫ সালে সারেতে প্রথম নারীদের ক্রিকেট ম্যাচ অনুষ্ঠিত হয়।

১৭৪৪ সালে লন্ডন ক্লাব কর্তৃক প্রথম ক্রিকেটের আইন-কানুন প্রণয়ন করা হয়। এতে ক্রিকেটের পিচ ২২ গজ হবে বলে উল্লেখ করা হয়। একই বছর আর্টিলারি গ্রাউন্ডে অনুষ্ঠিত ম্যাচে কেন্ট দল ইংল্যান্ড জাতীয় দলকে এক উইকেটে পরাজিত করে। ১৭৬৭ সালে হ্যাম্পশায়ারে হ্যাম্বেলডন ক্লাব স্থাপিত হয়, যারা পরবর্তী সময়ে ৩০ বছর ইংল্যান্ডের ক্রিকেটে নেতৃত্ব দিয়েছে। ১৭৬৯ সালে ক্রিকেটের প্রথম সেঞ্চুরি করেন জন মিনশাল। ১৭৭১ সালে ক্রিকেট ব্যাটের পরিমাপ নির্ধারণ করা হয়। এটির আকার ৪১/৪ ইঞ্চি হবে বলে নিয়ম করা হয়। ১৭৭৪ সালে ক্রিকেটের আইনকানুন সংশোধন করা হয় এবং এই সময়েই এলবিডব্লিউ, থার্ড স্ট্যাম্প এবং মিডল স্ট্যাম্পের ধারণাগুলো অন্তর্ভুক্ত করা হয়। ১৭৮৭ সালে লর্ডসে ম্যারিলিবোন ক্রিকেট ক্লাব (এমসিসি) গঠিত হয়। এই ক্লাব গঠিত হওয়ার আগ পর্যন্ত ক্রিকেটের মূল কেন্দ্রবিন্দুতে ছিল হ্যাম্বেলডন ক্লাব। কিন্তু এরপর থেকে এমসিসি মূলত ক্রিকেটের নিয়ম-কানুনগুলো দেখভাল করতে থাকে। ১৭৮৮ সালে এমসিসি ক্রিকেটের নিয়ম সংশোধন করে। আজকে শুনলে হয়ত হাসি পাবে, ১৭৬০ সাল পর্যন্ত ক্রিকেটে বল করা হতো মাটিতে গড়িয়ে। এই সময় পর্যন্ত ব্যাটও ছিল হকি স্টিকের মতো। কিন্তু এই সময়ের পর বল শূন্যে ছোড়ার নিয়ম শুরু হয় এবং তার পরিপ্রেক্ষিতে ব্যাটের আকারও পরিবর্তিত হয়। উত্তর আমেরিকায় ক্রিকেট খেলা পরিচিতি পায় ১৭ শতকের গোড়ার দিকে ঔপনিবেশিক ব্রিটিশদের দ্বারা। এই সময়ে উত্তর আমেরিকাসহ পৃথিবীর একটি বৃহৎ অংশ ব্রিটিশদের উপনিবেশ ছিল। এ কারণে ১৮ শতকের মধ্যেই এই খেলাটি পৃথিবীর অন্যান্য অংশে পৌঁছে যায়। ওয়েস্ট ইন্ডিজে পৌঁছে ঔপনিবেশিকদের দ্বারা এবং ভারতীয় উপমহাদেশে এটি প্রবেশ করে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির নাবিকদের মাধ্যমে। ১৭৭৮ সালের দিকে এটি অস্ট্রেলিয়াতে প্রবেশ করে এবং নিউজিল্যান্ড ও দক্ষিণ আফ্রিকাতে প্রবেশ করে উনিশ শতকের শুরুর দিকে। উপনিবেশিকরণের একটি প্রক্রিয়া হিসেবে ব্রিটিশরা ক্রিকেট খেলা বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে দেয় বলে অনেকে মনে করেন।

বিভিন্ন সময়ে ব্যাটের আকৃতি

১৭৯৪ সালে চার্টারহাউস বনাম ওয়েস্টমিনিস্টারের মধ্যে প্রথম আন্তঃস্কুল ক্রিকেট খেলা অনুষ্ঠিত হয়। ১৭৯৫ সালে প্রথম এলবিডব্লিউ-এর ঘটনা ঘটে। ১৮০৯ সালে নর্থ ব্যাংক-এর সেন্ট জনস জঙ্গলে লর্ডস-এর দ্বিতীয় ক্রিকেট মাঠ চালু করা হয়। ১৮১১ সালে সারে বনাম হ্যাম্পশায়ার-এর নারী দলের মধ্যে প্রথম কাউন্টি ম্যাচ অনুষ্ঠিত হয় লন্ডনে। নারীদের ক্রিকেটে পদার্পণ এই খেলাটির দ্রুত উন্নতিতে তাৎপর্যপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। ১৮২৭ সালে প্রথম অক্সফোর্ড বনাম ক্যামব্রিজ ক্রিকেট ম্যাচ অনুষ্ঠিত হয়। ১৮২৮ সালে বলারদের কনুই ঘুরিয়ে উপরে উঠানোর বৈধতা দেয় এমসিসি। পৃথিবীর প্রথম অফিসিয়াল আন্তর্জাতিক ক্রিকেট ম্যাচ অনুষ্ঠিত হয় কানাডা বনাম যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে ১৮৪৪ সালে নিউইয়র্কের সেন্ট জর্জেস ক্রিকেট ক্লাব মাঠে। ১৮৩৯ সালে প্রথম ইংলিশ কাউন্টি ক্লাব সাসেক্স প্রতিষ্ঠিত হয়। ১৮৪৬ সালে ‘অল ইংল্যান্ড একাদশ গঠিত’ হয়। তাদের দেশব্যাপী ভ্রমণের উদ্যোগ এই খেলাটিকে বিভিন্ন অঞ্চলে ব্যপক পরিচিতি দেয়। ট্রেন যোগাযোগের উন্নতির ফলে ক্রিকেটের বিস্তৃতি আরো দ্রুত হয়। কারণ খেলোয়াড়দের জন্য তখন অল্প সময়ে দূরপাল্লার ভ্রমণে যাওয়া সহজ হয়ে ওঠে। ক্রিকেটের বিস্তৃৃতিতে ব্রিটিশ সেনাবাহিনীর ভূমিকাও চোখে পড়ার মতো। তারা বিভিন্ন অঞ্চলের লোকদের ক্রিকেট খেলার প্রতি উৎসাহিত করত, যা প্রাচীন ব্রিটিশ সা¤্রাজ্যজুড়ে ক্রিকেট দলের সংখ্যা বৃদ্ধিতে সহায়তা করে।

১৮৫০ সালে প্রথম উইকেট রক্ষকদের গ্লাভস ব্যবহৃত হয়। ১৮৫৮ সালে পরপর তিন বলে তিনটি উইকেট নেয়ায় এক বোলারকে পুরস্কারস্বরূপ টুপি প্রদান করা হয়। ১৮৫৯ সালে ইংল্যান্ডের পেশাদার ক্রিকেটারদের একটি দল আমেরিকা ভ্রমণ করে এবং এটিই তাদের প্রথম বিদেশ যাত্রা। এ যাত্রায় দলের ক্যাপ্টেন ছিলেন জর্জ পার। ১৮৬২ সালে ইংলিশ ক্রিকেট দল প্রথমবারের মতো অস্ট্রেলিয়া গমন করে। এর ৬ বছর পর অস্ট্রেলিয়ান আদিবাসীদের একটি ক্রিকেট দল ইংল্যান্ড ভ্রমণ করে। এটিই প্রথম অস্ট্রেলিয়ান ক্রিকেট দল, যারা বিদেশ ভ্রমণ করে। ১৮৭৭ সালে ইংল্যান্ড বনাম অস্ট্রেলিয়ার মাঝে একটি ক্রিকেট ম্যাচ অনুষ্ঠিত হয় মেলবোর্নে। এটিকেই ক্রিকেট ইতিহাসের প্রথম টেস্ট ম্যাচ হিসেবে অভিহিত করা হয়। এই ম্যাচে ক্রিকেটের দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞ ইংল্যান্ড স্বাগতিক অস্ট্রেলিয়ার কাছে পরাজয় বরণ করে। ১৮৮০ সালে পুনরায় অজিদের মুখোমুখি হয়ে প্রথম জয় পায় ইংলিশরা। ১৮৮২ সালে আবার ইংল্যান্ড বনাম অস্ট্রেলিয়া টেস্ট ম্যাচ অনুষ্ঠিত হয় ওভালে। সে বছর স্বাগতিক ছিল ইংলিশরা। কিন্তু এ বছর অজিরা জয় তুলে নেয় নিজেদের ঝুলিতে। ১৮৮৯ সালে দক্ষিণ আফ্রিকা তৃতীয় টেস্ট খেলোয়াড় দেশ হিসেবে বিশ্ব ক্রিকেট মঞ্চে প্রবেশ করে। কিন্তু তাদের শুধু ৩ দিন কিংবা ১ দিনের ম্যাচ খেলার অনুমতি দেয়া হয়। এই সময়ের ক্রিকেট ম্যাচগুলোতে সাধারণত দিনের হিসাব করা হতো না। ক্রিকেট ম্যাচগুলো অনির্দিষ্ট কিছুদিন যাবত চলত। এ কারণে ১৮৯৯ সালে ক্লিফটন কলেজে অনুষ্ঠিত একটি জুনিয়র ম্যাচে এ ই জে কলিন্স ৬২৮ রান করেও অপরাজিত ছিলেন।

১৮৯০ সাল থেকে ১ম বিশ্বযুদ্ধের পূর্ববর্তী সময়কালকে ক্রিকেটের ‘স্বর্ণযুগ’ বলা হয়। ১৯০৯ সালে ‘ইম্পেরিয়াল ক্রিকেট কনফারেন্স-আইসিসি’ গঠিত হয়। এটি বর্তমানের ইন্টারন্যাশনাল ক্রিকেট কাউন্সিলের প্রাচীন রূপ। ১৯৬৫ সালে এটির নাম পরিবর্তন করে ‘ইন্টারন্যাশনাল ক্রিকেট কনফারেন্স’ রাখা হয়। তখনকার সময়ে ক্রিকেটের সর্বোচ্চ নিয়ন্ত্রক সংস্থাটি গঠিত হয়েছিল ইংল্যান্ড, অস্ট্রেলিয়া এবং দক্ষিণ আফ্রিকার সমন্বয়ে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের প্রাক্কালেই ওয়েস্ট ইন্ডিজ (১৯২৮), নিউজিল্যান্ড (১৯৩০) এবং ভারত (১৯৩২) টেস্ট খেলার মর্যাদা লাভ করে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরপরই ১৯৫২ সালে পাকিস্তানও টেস্ট খেলুড়ে দেশ হিসেবে স্বীকৃতি পায়। এরপরই এসব দেশে ক্রিকেট জনপ্রিয় হতে শুরু করে। ওয়েস্ট ইন্ডিজ দ্বীপ ভিত্তিক একটি প্রথম শ্রেণীর টুর্নামেন্ট আয়োজন করে, ভারত ১৯৩৪ সালে রনজি ট্রফি আয়োজন করে এবং পাকিস্তান কায়েদে আজম ট্রফি চালু করে ১৯৫৩ সাল থেকে। ১৯০০ সাল পর্যন্ত ক্রিকেটের ওভার গণনা করা হতো ৫ বলে। কিন্তু ১৯০০ সালে ৬ বলে ওভার-এর নিয়ম চালু করা হয়। এর পূর্বে ১৮৮৯ সাল পর্যন্ত ওভার গণনা করা হতো ৪ বলে। ১৯২২-২৩ সালে অস্ট্রেলিয়া ৮ বলে ওভার গণনা শুরু করে এবং তাদের পদাঙ্ক অনুসরণে নিউজিল্যান্ডও ৮ বলে ওভার গণনা করতে থাকে। ১৯৩৯ সালে ইংল্যান্ড পরীক্ষামূলকভাবে ৮ বলে ওভার গণনার পদ্ধতি চালু করে, কিন্তু তা এক বছর স্থায়ী ছিল। ১ম বিশ্বযুদ্ধের পর ইংল্যান্ড আবার ৬ বলে ওভার গণনা শুরু করে। দ. আফ্রিকা ১৯৩৮-৩৯ সাল থেকে ১৯৫৭-৫৮ সাল পর্যন্ত ৮ বলে ওভার গণনা করে। কিন্তু ১৯৭৮-৭৯ সালে আইসিসি সার্বজনীনভাবে ৬ বলে ওভার গণনার পদ্ধতি চালু করে।

১৯৩৪ সালে ইংল্যান্ড বনাম আফ্রিকার মধ্যে প্রথম নারীদের আন্তর্জাতিক ক্রিকেট ম্যাচ অনুষ্ঠিত হয়। ১৯৫৮ সালে নারীদের ক্রিকেটের আন্তর্জাতিক সংগঠন ইন্টারন্যাশনাল উইমেন্স ক্রিকেট কাউন্সিল গঠিত হয়, এটি পরবর্তী সময়ে ২০০৫ সালে আইসিসির সঙ্গে একত্রিত হয়ে যায়। বিশ্বকাপ ক্রিকেট প্রচলনের ক্ষেত্রে নারীরাই এগিয়ে ছিল। কারণ সর্বপ্রথম বিশ্বকাপ ক্রিকেট অনুষ্ঠিত হয় ১৯৭৩ সালে ইংল্যান্ডে এবং সেটি ছিল নারী ক্রিকেট বিশ্বকাপ। ক্রিকেট ম্যাচের দীর্ঘসূত্রতার ফলে ২০ শতকের মাঝামাঝি সময়ে মানুষ এই খেলাটি থেকে মুখ ফিরিয়ে নিতে শুরু করে। কারণ একটি খেলা শুরু হয়ে কখন শেষ হবে তার কোন নির্দিষ্ট সময় জানা ছিল না। ফলে দর্শকদের প্রচুর সময় নষ্ট করতে হতো এবং খেলার মাঝে ঝড়-বৃষ্টিসহ নানা প্রাকৃতিক দুর্যোগের কবলে পড়তে হতো। ১৯৫০ এর দশকে ক্রিকেট খেলার সময় কমিয়ে আনার চেষ্টা করা হয়। ১৯৬৩ সালে ইংলিশ কাউন্টি দলগুলো এক ইনিংস এবং নির্দিষ্টসংখ্যক ওভারের মধ্যে খেলা শেষ করার পদ্ধতি প্রবর্তন করে। ক্রিকেট মাঠে দর্শক ফিরিয়ে আনা ও আর্থিকভাবে লাভবান হওয়ার উদ্দেশ্যে রাগনেল হার্ভের উদ্যোগে রথম্যানস কো. ৪০ ওভারের একটি টুর্নামেন্ট আয়োজন করে। খেলা হতো রবিবার। খেলতেন কাউন্টি দলগুলোর বিপক্ষে চলতি ও প্রাক্তন তারকা খেলোয়াড়দের সমন্বয়ে গড়া ইন্টারন্যাশনাল কার্ভেলিয়ার্স। এই ধরনের খেলা জনপ্রিয়তা পেতে শুরু করে।

ইংল্যান্ড বনাম অস্ট্রেলিয়া ১৮৯৯

যদিও একদিনের ক্রিকেটের যাত্রা কিছুটা দুর্ঘটনাবশত। মেলবোর্নের একটি আন্তর্জাতিক টেস্ট ম্যাচ বৃষ্টির কারণে প্রায় পুরোটা সময় নষ্ট হয়ে যায়। ম্যাচটি পরিত্যক্ত না করে দ্রুত খেলা শেষ করার জন্য তাই একদিনের ক্রিকেট ম্যাচ খেলা হয়। প্রথম একদিনের ম্যাচ খেলেছিল অস্ট্রেলিয়া বনাম ইংল্যান্ড। ৪০ ওভারের খেলায় জয় তুলে নিয়েছিল অস্ট্রেলিয়া।

১৯৭৫ সালে আন্তর্জাতিক ক্রিকেট কাউন্সিল বিশ্বব্যাপী একদিনের ক্রিকেট খেলা ছড়িয়ে দেয়ার জন্য বিশ্বকাপ ক্রিকেট আয়োজনের সিদ্ধান্ত নেয়। যেখানে টেস্ট খেলুড়ে দেশগুলো অংশ নেয়। এই বিশ্বকাপে ওয়েস্ট ইন্ডিজ তাদের থেকে অপেক্ষাকৃত অভিজ্ঞতাসম্পন্ন অস্ট্রেলিয়াকে পরাজিত করে নিজেদের ঘরে ট্রফি তুলে নেয়। এরপর থেকে ক্রিকেট খেলাটি অন্য যে কোন সময়ের থেকে অপেক্ষাকৃত দ্রুত উন্নতির দিকে ধাবিত হয় এবং খুব দ্রুত বিশ্বব্যাপী এর জনপ্রিয়তা বাড়তে থাকে। তারপর থেকে আজ অবধি ক্রিকেটের নানা পরিবর্তন হয়েছে এবং এতে বিভিন্ন দেশ যুক্ত হয়েছে, আবার অনেক দেশ আন্তর্জাতিকভাবে ক্রিকেট খেলা ছেড়ে দিয়েছে। কিন্তু ২০ শতকের শেষ থেকে আজ পর্যন্ত ক্রিকেট ক্রমাগত নিজেকেই ছাড়িয়ে চলেছে।

তথ্যসূত্র : আইসিসি ক্রিকেট ডটকম, ইসপিএন ক্রিকইনফো ডটকম, ঢাকা ইউনিভার্সিটি রিডিং ক্লাব ট্রাস্টের ১১৫তম পাবলিক লেকচার, উইকিপিডিয়া