২৩ জুলাই ২০১৯  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

উন্নয়নমুখী ও জনবান্ধব বাজেট

  • বাজেট ২০১৯-২০২০

জলি রহমান ॥ ‘সমৃদ্ধ আগামীর পথযাত্রায় বাংলাদেশ সময় এখন আমাদের, সময় এখন বাংলাদেশের’ শিরোনামে প্রস্তাবিত বাজেটের আকার ধরা হয়েছে ৫ লাখ ২৩ হাজার ১৯০ কোটি টাকা। এটি দেশের ৪৮তম এবং বর্তমান সরকারের তৃতীয় মেয়াদের প্রথম বাজেট। মাননীয় অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামালের প্রথম বাজেট যার আকার বাংলাদেশের এ যাবত কালের সর্ববৃহৎ। ২০১৯-২০ অর্থবছরে প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রা ৮ দশমিক ২ শতাংশ ধরে বাজেট উপস্থাপন করা হয়েছে। ২০১৮-১৯ অর্থবছরে প্রবৃদ্ধির লক্ষ্য ছিল ৭ দশমিক ৮ শতাংশ। নতুন অর্থবছরের বাজেটে জিডিপি ধরা হয়েছে ২৮ লাখ ৮৫ হাজার ৮৭২ কোটি টাকা। গত অর্থবছরে ছিল ২৫ লাখ ৩৭ হাজার ৮৪৯ কোটি টাকা। রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ৩ লাখ ৭৭ হাজার ৮১০ কোটি টাকা। আর ২০১৮-১৯ অর্থবছরে রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা ৩ লাখ ৩৯ হাজার ২৮০ কোটি টাকা। সেই হিসেবে রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা বেড়েছে ৩৮ হাজার ৫৩০ কোটি টাকা। বাজেটে রয়েছে বেশকিছু ভাল দিকনির্দেশনা। বাজেটের মূল আকর্ষণ ৩ কোটি নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি। ফলে কমবে বেকারতœ। এছাড়াও ১ কোটি লোককে করের আওতায় আনার ঘোষণা দেয়া হয়েছে। যা রাজস্ব খাতকে সমৃদ্ধ করবে নিঃসন্দেহে। তবে আমাদের সামনে অনেক চ্যালেঞ্জও রয়েছে যেমন- ব্যাংকিং খাতের সমস্যা, বিনিয়োগের স্থবিরতা, স্বল্পোন্নত দেশ হতে উন্নয়নশীল দেশে উত্তরণের প্রস্তুতি, বাজেট ঘাটতি। আশার কথা হলো এসব বড় চ্যালেঞ্জের জন্য সুনির্দিষ্ট সংস্কার কর্মসূচী ইতোমধ্যে নেয়া হয়েছে।

বাজেটে পুঁজিবাজারে বিনিয়োগকারীদের প্রত্যাশা ও প্রাপ্তির সমন্বয় হয়েছে বলে মনে করছে ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ (ডিএসই)। বাজেটে দেশী-বিদেশী বিনিয়োগকারীদের বিনিয়োগে আরও বেশি আকৃষ্ট করবে বলে মনে করছে ডিএসই। ডিএসই বলছে, বিনিয়োগকারীদের প্রত্যাশা অনুযায়ী নতুন অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটে পুঁজিবাজারের সংস্কারমূলক দিকনির্দেশনা ও একগুচ্ছ প্রণোদনা প্রদান করে বিনিয়োগকারীদের প্রত্যাশার সঙ্গে প্রাপ্তির সমন্বয় ঘটানো হয়েছে। পুঁজিবাজারকে সম্প্রসারণ ও গতিশীল করার জন্য সরকার বিশেষ গুরুত্বারোপ করায় ডিএসই নতুন অর্থমন্ত্রীকে আন্তরিক ধন্যবাদ জানিয়েছে।

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, বাজেট হবে জনবান্ধব, সুষম ও উন্নয়নমুখী। ২০৩০ সালের মধ্যে এসডিজি অর্জন, ২০৪১ সালের মধ্যে উন্নত দেশ গড়া আর আওয়ামী লীগের নির্বাচনী ইশতেহারের অঙ্গীকার পূরণের কার্যকর মাধ্যম এই বাজেট। পুঁজিবাজারের ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারীদের আমরা কোম্পানিগুলোকে ক্যাশ ডিভিডেন্ডে উৎসাহিত করার জন্য স্টক ডিভিডেন্ডের ওপর ১৫ শতাংশ হারে কর আরোপের প্রস্তাব করেছিলাম। এ বিষয়ে ব্যবসায়ী সমাজের কেউ কেউ আপত্তি জানিয়েছে। ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানসমূহের পক্ষ থেকে জানানো হয় যে, বাংলাদেশ ব্যাংকের চাহিদা অনুযায়ী পরিশোধিত মূলধন বাড়ানোর জন্য ব্যাংকগুলো নগদ লভ্যাংশ দিতে পারে না। ব্যবসায়ী ও উদ্যোক্তাদের এমন মন্তব্যের পাশাপাশি পুঁজিবাজারে ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারীদের স্বার্থ আমাদের ভাবতে হবে। কোম্পানির শেয়ারে বিনিয়োগ করে বিনিয়োগকারীও নগদ লভ্যাংশ প্রত্যাশা করে। প্রধানমন্ত্রী আরও বলেছেন, এসব বিষয় বিবেচনায় নিয়ে আমি প্রস্তাব করছি যে, পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত কোন কোম্পানি যে পরিমাণ স্টক লভ্যাংশ ঘোষণা করবে, কমপক্ষে তার সমপরিমাণ নগদ লভ্যাংশ প্রদান করতে হবে। যদি কোম্পানির ঘোষিত স্টক লভ্যাংশের পরিমাণ নগদ লভ্যাংশের চেয়ে বেশি হয়, তাহলে স্টক লভ্যাংশের ওপর ১০ শতাংশ হারে কর প্রস্তাব করতে হবে। প্রধানমন্ত্রী আরও বলেছেন, দেশীয় শিল্পের প্রতিরক্ষণ, প্রণোদনা প্রদানে প্রস্তাবিত বাজেটে বেশ কয়েকটি ক্ষেত্রে শুল্কহার হ্রাস-বৃদ্ধি করা হয়েছে। তবে সে ক্ষেত্রে লক্ষ্য রাখতে হবে যাতে এর ফলে দেশীয় কাগজ ও গ্যাস উৎপাদনকারী শিল্পসহ অন্যান্য শিল্প ক্ষতিগ্রস্ত না হয়। দেশীয় মুদ্রণ শিল্পে প্রণোদনা প্রদান ও বন্ড ব্যবস্থার অপব্যবহার রোধ কল্পে দেশে উৎপন্ন হয় না, এমন পেপারগুলোর শুল্কহার যৌক্তিক করা হবে। প্রস্তাবিত বাজেটে আমদানি পর্যায়ে কতিপয় শুল্কহার পুনর্নির্ধারণ করা হবে।

দরিদ্র প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর কথা বিবেচনা করে তাঁতশিল্পে ব্যবহৃত সুতাশিল্পের ওপর ৫ শতাংশ মূসকের পরিবর্তে প্রতিকেজি সুতায় ৪ টাকা হারে সুনির্দিষ্ট করের প্রস্তাবও করেছেন সংসদ নেতা। আর্থিক খাতে সার্বিক শৃঙ্খলা আনতে বাজেটে বেশকিছু সুনির্দিষ্ট কার্যক্রমের কথাও বলেছেন। খেলাপি ঋণ কমাতে অর্থমন্ত্রী যে উদ্যোগী ঘোষণা দিয়েছেন, তা অত্যন্ত সময়োপযোগী। এর পাশাপাশি প্রধানমন্ত্রী সুপারিশ করেছেন, যেন ব্যাংক ঋণের ওপর সুদের হার এক অঙ্কে রাখতে যথার্থ পদক্ষেপ নেয়া হয়। এটি করা হলে দেশের শিল্প ও ব্যবসা খাতকে সক্ষম করে গড়ে তোলা সম্ভব হবে। উচ্চ হারে সুদ থাকলে শিল্প বিকশিত হবে না। এ জন্য এই ব্যবস্থা নিতে হবে। এছাড়াও যুবকদের কর্মসংস্থানের জন্য ১০০ কোটি টাকা বরাদ্দ অত্যন্ত সময়োপযোগী। প্রবাসী বাংলাদেশীদের অর্থ প্রেরণে দুই শতাংশ প্রণোদনার প্রস্তাবে রেমিটেন্স পাঠানোর বর্ধিত ব্যয় লাঘব হবে। প্রবাসী কর্মীরা বৈধ পথে টাকা পাঠাতে উৎসাহিত হবেন। প্রবাসী বাংলাদেশীদের বীমা সুবিধার আওতায় আনার পরিকল্পনাও সরকারের আছে।

তৈরি পোশাক দ্রুত বিকাশমান ও সবচেয়ে সম্ভাবনাময় খাত। তৈরি পোশাক রফতানির ক্ষেত্রে অর্থবছরে এক শতাংশ প্রণোদনার প্রস্তাব করা হয়েছে যা যুগান্তকারী পদক্ষেপ। এতে তৈরি পোশাক খাত আরও বিকশিত হবে বলে আশা করা যায়। যা কর্মসংস্থানে ইতিবাচক ভূমিকা রাখবে। বর্তমান সরকার ১০ বছরে যে অভূতপূর্ব উন্নতি করছে তা দেশে বিদেশে প্রশংসিত হচ্ছে। মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের পাশাপাশি অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখা সরকারের একটি বড় সাফল্য। দেশের সার্বিক অর্থনৈতিক উন্নয়ন হয়েছে বলেই বাজেটে বৈদেশিক অনুদান মাত্র দশমিক ৮ শতাংশ। আগামী ২০২৩-২০২৪ সালে প্রবৃদ্ধি ১০ শতাংশে উন্নীত করা, মাথা পিছু আয় ২ হাজার ৭৫০ ডলার, রফতানি ৭২ বিলিয়ন ডলার, বিদ্যুৎ সরবরাহ ২৮ হাজার মেগাওয়াট ও অতি দারিদ্র্যের হার ৪ দশমিক ৫ শতাংশে নামিয়ে আনার লক্ষ্য স্থির করা হয়েছে। এবারের বাজেট এসব লক্ষ্য অর্জনে গুরত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে বলে আশা করা যায়। অর্থনৈতিক সব ক্ষেত্রে দূরদর্শী সময়োপযোগী পদক্ষেপের কারণে সামষ্টিক অর্থনীতি স্থিতিশীল। বাজেটে যে ঘাটতি তা সহনশীল। বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ পর্যাপ্ত, মুদ্রা বিনিময় হার বাণিজ্য সহায়ক। বাজেট ঘাতটি সব সময় ৫ শতাংশ ধরে রাখা হয়েছে, কখনও কখনও এর চেয়ে কমও হয়। বাজেট নিয়ে আলোচনা-সমালোচনা থাকবেই। তবে পরিবর্তিত বাংলাদেশে উন্নয়নের মাইলফলকে এবারের বাজেট হবে ফলপ্রসূ এটাই সকলের প্রত্যাশা। এজন্য প্রয়োজন বাস্তবসম্মত গণমুখী কর্মসূচী।

নির্বাচিত সংবাদ