২৩ জুলাই ২০১৯  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

মার্কিন রিটেইল ব্যাংকিংয়ে রাঘব বোয়ালরা আসছে

  • এনামুল হক

আমেরিকার সবচেয়ে বড় ব্যাংকগুলো যে কোন মানদন্ড এক একটা জলহস্তির মতো। জেপিমরগ্যানে চেজের ব্যালেন্স শীটের দিকে তাকালে দেখা যাবে সেটা ২ দশমিক ৭ ট্রিলিয়ন ডলার। ব্যাংক অব আমেরিকার (বিও এফএ) ২ দশমিক ৪ ট্রিলিয়ন ডলার, সিটি গ্রুপের প্রায় ২ ট্রিলিয়ন ডলার এবং ওয়েলস ফার্গোর ১০৯ ট্রিলিয়ন ডলার। এদের সমষ্টিগত বাজারমূল্য প্রায় ১ ট্রিলিয়ন ডলার। গত বছর এরা কর পরিশোধের পর ১০ হাজার কোটি ডলারেরও বেশি মুনাফা তুলে নিয়েছে।

তবে একটি মানদন্ড এই টাইটান বা বৃহৎ ব্যাংকগুলো বিস্ময়কর রকমের ক্ষুদ্র। একত্রে এই ব্যাংক চতুষ্টয় আমেরিকানদের আমানতের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ ধারণ করে থাকে। কানাডা থেকে সুইডেন পর্যন্ত অন্যান্য ধনী দেশগুলোয় সবচেয়ে বড় ব্যাংকগুলোতে এই আমানতের ভাগ অনেক বেশি। সম্ভবত একমাত্র জার্মানিতে শত শত পৌর ও সমবায় ব্যাংকসহ ব্যাকিং বাজার আমেরিকার মতো খন্ডিত।

২০০৮-০৯ সালের অর্থনৈতিক সঙ্কটসহ বেশ কিছু ব্যাংকের একত্রী করণের ঘটনা সত্ত্বেও আমেরিকায় এখনও ৫ হাজার ৩০০শ’রও বেশি ব্যাংক রয়েছে। এসব ব্যাংকের প্রায় ৫ হাজারটি হলো কমিউনিটি ব্যাংক যেগুলোর অধিকাংশেরই পরিসম্পতের পরিমাণ ১শ’ কোটি ডলারের কম। এই ব্যাংকগুলো একত্রে ১৫ শতাংশ আমানত ধারণ করে। বাকি আমানত রয়েছে অবশিষ্ট তিন শতাধিক বাণিজ্যিক ব্যাংকে। এমনকি বৃহৎ ব্যাংকগুলোও আমানতের ক্ষেত্রে এখনও এই শূন্যতা পূরণ করে চলেছে। তাদের রিটেইল নেটওয়ার্কের মধ্যেই পরিচয় পাওয়া যায় অতীতে কেন তারা একীভূত হয়েছিল। বোফা এই তো মাত্র গত বছরই পিটসবার্গে এবং এ বছরের জানুয়ারিতে সল্ট লেক সিটিতে শাখা খুলছে। জেপি মরগ্যান চেজের বোস্টন ও ওয়াশিংটনে প্রথম শাখা খোলা হয় ২০১৮ সালের শেষদিকে।

ডিজিটাল প্রযুক্তি আমেরিকার ব্যাংকিংয়ের দৃশ্যপট ইতোমধ্যে বদলে দিয়েছে। ১৪৭ বছর ধরে রিটেইল ব্যাংকিংয়ের প্রতি অবজ্ঞা ভাব দেখিয়ে আসার পর ২০১৬ সালে গোলম্যান শ্যাকস ‘মারকাস নামে একটি কনজিউমার ব্যাংক চালু করে। এটি ৩ হাজার ৫শ’ কোটি ডলারের আমানত বাগিয়ে নিয়েছে। নিজের অভিজাত ব্র্যান্ড এবং সুদের উচ্চ হার এই আমানত টেনে আনতে সহায়ক হয়েছে। অনেকে মনে করেন যে একদিকে পুরনো আইটি এবং অন্যদিকে শাখাগুলোর আমানত ক্রমাগত হ্রাস পাওয়ার কারণে ভারাক্রান্ত ব্যাংকগুলোকে রিটেইলার ও ট্যাক্সি ড্রাইভারদের পরিণতি ভোগ করতে হবে। জেপি মরগ্যানের মোবাইল ব্র্যান্ড ফিন গত ৬ জুন বন্ধ হয়ে যাওয়া থেকে বাহ্যত আরও প্রমাণ মেলে যে ব্যাংকগুলো ডিজিটাল যুগের জন্য যথেষ্ট ক্ষিপ্র নয়।

কিন্তু এই বক্তব্যের সঙ্গে সবাই একমত নন। যারা ভিন্নমত পোষণ করেন তাদের বক্তব্য ডিজিটাল যুগে সবচেয়ে বড় ব্যাংকগুলোরও বিকশিত হওয়ার সুযোগ আছে। কারণ ডিজিটালাইজেশনই তাদের এ কাজে সাহায্যে করবে। তাদের সুবিধা হচ্ছে ডিজিটালাইজেশনের জন্য অর্থশক্তি তাদের আছে। জেপি মরগ্যান চেজ আইটির পেছনে বছরে ১১শ কোটি ডলার ব্যয় করে। তাদের রয়েছে লাখ লাখ গ্রাহক এবং সেই গ্রাহকদের আয়-ব্যয়ের বিপুল তথ্য। তাদের ব্র্যান্ডগুলো ঘরে ঘরে পরিচিত। তাদের অর্থায়নের খরচ কম। অন্যদিকে অর্থলগ্নি-প্রযুক্তি কোম্পানিগুলোর কোন ব্যাংকিং লাইসেন্স না থাকায় তাদের ফেডারেল সরকারের দিক থেকে সুরক্ষিত ও স্বল্প সুদের আমানত লাভের সুযোগ নেই। সবকিছু বিবেচনায় নিলে বলা যায় যে শেষ পর্যন্ত গোলিয়াথদেরই জয় হয় অর্থাৎ বড় ব্যাংকগুলোই সাফল্যের হাসি হাসে।

আরও বিস্ময়কর ব্যাপার হলো বেশিরভাগ বড় ব্যাংক এখনও তাদের শাখাগুলোকে এ্যাসেট হিসেবে গণ্য করে। এটা ঠিক যে বৃহৎ ব্যাংকগুলো তাদের অনেক শাখা বন্ধ করে দিচ্ছে। তবে প্রসার ঘটাতে হলে তাদের নিজেদের ছড়িয়েও দেয়া প্রয়োজন। সর্ববৃহৎ ব্যাংকগুলো ইচ্ছেমতে নতুন বাজারে পয়সা খরচ করে ঢুকতে পারে না সেক্ষেত্রে বিধিনিষেধ আছে। তাই গত কয়েক বছরে বোফা ডেনভার, ইন্ডিয়ানা পোলিস ও মিনিয়া পোলিসে শাখা খুলেছে। এরপর খুলবে ওহাইওর বড় বড় শহরে। জেপি মরগ্যান চেজ ২০১৮ সালে জানিয়েছে যে তারা ২০টি বাজারে ঢুকবে এবং ৪শ’ শাখা খুলবে। এই ব্যাংকটিও চলতি গ্রীষ্ণে মিনিয়া পোলিসে আসছে। জেপি মরগ্যান চেজ ও বোফা দুটোই বিশাল শক্তিধর প্রতিযোগী। যেখানেই তারা ঢুকবে সেখানকার শীর্ষ তিনের মধ্যে পৌঁছানোই তদের লক্ষ্য।

ডিজিটাল যুগে ব্যাংকে শুধু ডিজিটালাইজেশনে গেলেই হবে না, তার শাখাও থাকতে হবে। শাখা না থাকলে খুব বেশি দূর এগোনো যাবে না। ডিজিটাল প্রযুক্তির বদৌলতে সহজে ও সস্তায় গ্রাহকদের কাছে পৌঁছানো যায়। প্রচুর লোক র‌্যাপ ডাউনলোড করে। তবে আমেরিকায় কাছাকাছি কোথাও ব্যাংকের শাখা না থাকলে তারা ব্যাংক এ্যাকাউন্ট খোলে না বললেই চলে। পক্ষান্তরে সিটি ব্যাংকের কথাই ধরা যাক। এর শাখাগুলো অর্ধডজন শহরে কেন্দ্রীভূত। ব্যাংকটি আরও অনেক শাখা খোলার প্রয়োজন তেমন একটা দেখে না। এর রয়েছে ফীমুক্ত বিশাল এটিএম নেটওয়ার্ক এবং ক্রেডিট কার্ডের সুবিশাল ব্যবসা। তার মানে এর অতি শক্তিশালী ডিজিটাল উপস্থিতি ইতোমধ্যেই রয়েছে। সিটি আশা করে যে এ্যাকাউন্ট খুললে বাড়তি একটা কার্ড পুরস্কার হিসেবে মিলবে এটাকে টোপ হিসেবে ব্যবহার করে তারা ক্রেডিট কার্ড ধারকদের চলতি ও সঞ্চয়ী হিসাব খুলতে রাজি করাতে পারবে। এশিয়ায় তার অভিজ্ঞতার ওপর ভিত্তি করে এই ব্যাংকটি তার মোবাইল এ্যাপের মাধ্যমে ডিজিটাল লেন্ডিং প্রোডাক্ট অফার করছে। যারা ক্রেডিট কার্ড বিল পরিশোধ করছে তারা তৎক্ষণাৎ স্বল্প সুদে ঋণ নিতে পারবে।

বৃহৎ ব্যাংকগুলোর যখন প্রসার ঘটছে তখন লোকসান কাদের হচ্ছে? এক্ষেত্রে কমিউনিটি বাংকগুলোই সম্ভবত সর্বাধিক ঝুঁকির মুখে। ইতোমধ্যেই ক্ষুদ্রতম ব্যাংকগুলো মূলত বড়দের সঙ্গে একীভূত হওয়ার মধ্য দিয়ে উধাও বা বিলুপ্ত হয়ে যাচ্ছে। প্রতি সপ্তাহে ৫টি করে এমন ব্যাংক লুপ্ত হচ্ছে। অন্য অনেক ধনী দেশগুলোতে ব্যাংকিং যেমন কেন্দ্রীভূত আমেরিকার ব্যাংকিং তেমনভাবে কেন্দ্রীভূত আর না হওয়ারই সম্ভাবনা। তবে ডিজিটাল প্রযুক্তি সবচেয়ে বড় ব্যাংকগুলোকে আরও বড় আকার ধারণ করতে, শক্তিশালী হয়ে উঠতে সাহায্য করবে।

সূত্র: দি ইকোনমিস্ট

নির্বাচিত সংবাদ