২৩ জুলাই ২০১৯  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

ভাল বক্তা হতে চাইলে

  • সৈয়দ আসাদুজ্জামান সুহান

আমরা প্রতিদিন বিভিন্নভাবে বিভিন্ন ধরনের বক্তৃতা শুনে থাকি। যেমন ধরুন, অফিসে, স্কুলে, মাঠে-ঘাটে-রাস্তায়, রেডিও-টেলিভিশনে, বিভিন্ন ধরনের সভা-সেমিনারে। আমাদের অনেকের ধারণা হচ্ছে, যিনি যত বেশি শিক্ষিত, তিনি তত ভাল বক্তা হবেন। এই ধারণাটি সম্পূর্ণরূপে ভুল, যার একটি উদাহরণ দিচ্ছি। আমরা দেখতে পাই, দেশের কিছু রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ, কবি, সাহিত্যিক হাজার হাজার শ্রোতাদের সামনে অকপটে দুর্দান্ত বক্তব্য রাখছেন। তাদের দেওয়া বক্তব্য শ্রোতারা মন্ত্রমুগ্ধ হয়ে শুনছেন এবং উজ্জীবিত হচ্ছেন। তাদের মধ্যে কারও কারও শিক্ষাগত যোগ্যতা অতি অল্প কিন্তু উনারা জনপ্রিয় বক্তা। পৃথিবীতে এমন অসংখ্য ব্যক্তির নাম বলা যাবে, প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা কম থাকা সত্ত্বেও উনারা অনেক জনপ্রিয় বক্তা ছিলেন। আবার এমনও অনেক ব্যক্তি ছিলেন, যারা অতি উচ্চশিক্ষিত কিন্তু ভাল বক্তৃতা দিতে না পারার কারণে অন্য কেউ উনাদের লিখিত প্রবন্ধ পাঠ করতেন। আমরা কিছু কিছু বক্তার খুব সাধারণ কথা শুনলেও মন্ত্রমুগ্ধ হয়ে দীর্ঘ সময় ধরে উনাদের বক্তব্য শুনে যাই। আবার কিছু কিছু বক্তা অতি জ্ঞানগর্ভ বক্তব্য প্রদান করলেও অল্প সময় পরেই আমরা বক্তৃতা শুনতে বিরক্ত বোধ করি। আমরা সহজেই বুঝতে পারি, কে ভাল বক্তা কিন্তু তিনি কেন ভাল বক্তা, সেটা অনেকেই জানি না।

কেউ কেউ আছেন, বক্তৃতা দিতে গেলে হার্টবিট বেড়ে যায়। কারও কারও আবার হাত পা কাঁপে, গলা শুকিয়ে যায়। কেউ কেউ আছেন, অতিরিক্ত নার্ভাস হয়ে যায়, যা বলতে এসেছিলেন, সেটাই ভুলে যান। এমনও কেউ আছেন, বেশি মানুষের সমাগম দেখলে কিংবা অতি গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের সামনে বক্তৃতা দেয়ার সময় অতিরিক্ত মানসিক চাপে ভুগেন। বক্তব্যটা তালগোল পাকিয়ে ফেলেন। আমাদের অনেকের মাঝে এই সমস্যাগুলো আছে, যে কারণে আমরা ভাল বক্তা হতে পারি না। ভাল বক্তা হওয়ার কিছু কলাকৌশল আছে। এই কলাকৌশলগুলো রপ্ত করতে পারলে একজন ভাল বক্তা হওয়া যায়।

মনের ভয়টাকে জয় করা

একজন বক্তা হওয়ার জন্য সবচেয়ে বেশি জরুরী হচ্ছে নিজের মনের ভয়টাকে জয় করা। মনের ভেতরে ভয় নিয়ে কখনও ভাল বক্তা হওয়া যাবে না। মনের ভয়টাকে জয় করার সবচেয়ে সহজ কৌশল হচ্ছে, মানুষের সঙ্গে চলাফেরা করা ও খোলা মনে কথা বলা। মনের ভেতরের জড়তা, সংকোচ পরিহার করে সবার সঙ্গে নিয়মিত কথাবার্তা বলা। অন্যের সঙ্গে কথা বলার সময় নিজের উপরে আত্মবিশ্বাস রাখতে হবে। সর্বোপরি, অন্য কারও সঙ্গে কথা বলার সময় ভাবতে হবে, তিনি আমার মতোই একজন মানুষ ভিন্ন অন্য কিছু নন। তবে হ্যাঁ, যিনি যতটুকু সম্মান পাওয়ার যোগ্য, উনাকে সেই সম্মান অবশ্যই প্রদর্শন করতে হবে।

অনুশীলন

একজন ভাল বক্তা হওয়ার জন্য আমাদের অবশ্যই সর্বপ্রথম অনুশীলন করতে হবে। সবচেয়ে ভাল অনুশীলন করার জায়গা হচ্ছে আয়না। আমরা যদি আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নিয়মিতভাবে বক্তৃতা প্রদান করি, তাহলে তা আমাদের জড়তা কাটিয়ে উঠতে সহায়তা হবে।

এছাড়া মুখের বাচনভঙ্গি ও শারীরিক অঙ্গভঙ্গিতে দৃষ্টিকটু কিছু মনে হলে, সেটা সংশোধন করে নেওয়া যাবে। তারপর সাহস বৃদ্ধির জন্য মাঝেমধ্যে কৌশলে কাছের কিছু বন্ধুদের সামনে বক্তৃতা দেওয়ার মতো করে কথা বলে যাওয়া। বিভিন্ন বক্তার বক্তৃতা মনোযোগ দিয়ে শোনা। কে কিভাবে বক্তব্য দিচ্ছেন, মনোযোগ দিয়ে খেয়াল করা। সেভাবে নিজেকে তৈরি করে নেওয়া। এভাবে অনুশীলন করে এক সময় সভা-সেমিনারের একজন বক্তা হওয়া যাবে কিন্তু ভাল বক্তৃতা হওয়ার জন্য আরও অনেক কৌশল অবলম্বন করতে হবে।

বক্তব্য প্রদানের প্রস্তুতি

বক্তব্য প্রদানের পূর্বে কিছু প্রস্তুতি নেওয়া যেতে পারে, যা বক্তব্য প্রদানের সময় খুব সহায়ক ভূমিকা পালন করে। বক্তব্য প্রদানের পূর্বে আলোচ্য বিষয়টি জেনে নিয়ে তার উপরে গুরুত্বপূর্ণ কিছু পয়েন্ট লিখে নিয়ে যাওয়া যেতে পাবে। বক্তৃতা প্রদানকালে দেখে বক্তব্য প্রদান করলে অনায়াসে নির্ভুল বক্তব্য প্রদান করা যায়। অনেকেই আছেন খুব সাধারণ কিছু বিষয়ে ভুল করেন। যেমন বক্তৃতা প্রদানকালে আলোচ্য বিষয়টি বলতে গিয়ে ভুল করেন। ব্যক্তির নাম, পদবী কিংবা প্রতিষ্ঠানের নাম বলতে গিয়ে ভুল করেন। এছাড়াও আরও অনেক অনেক ভুল তথ্য প্রদান করে বক্তব্য দিয়ে যান। বক্তৃতা প্রদানকালে ভুল তথ্য দিলে মানুষের কাছে হাসির খোরাকে পরিণত হতে হয়। তাই বক্তব্য প্রদানকালে কোনভাবে ভুল তথ্য প্রদান করা যাবে না। এই বিষয়টি খুব বেশি খেয়াল রাখতে হবে।

শ্রোতাদের ওপরে সমান দৃষ্টিপাত

অনেকেই আছেন, বক্তৃতা প্রদানকালে শ্রোতাদের দিকে দৃষ্টিপাত করেন না। কেউ কেউ উপরের দিকে, কেউ কেউ নিচের দিকে, আবার নির্দিষ্ট কিছু মানুষের দিকে তাকিয়ে বক্তব্য রাখেন। এতে করে শ্রোতাদের দৃষ্টি আকর্ষণ করা যায় না। বক্তৃতা প্রদান কালে শ্রোতাদের দিকে সমান দৃষ্টিপাত করতে হবে। নির্দিষ্ট কারও সঙ্গে নয়, উপস্থিত সবার উপরে দৃষ্টি ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে সমান দৃষ্টিপাত করতে হবে। এতে করে খুব সহজেই শ্রোতাদের দৃষ্টি আকর্ষণ করা যায়। তখন শ্রোতারা ভিন্ন দিকে মনোযোগী হওয়ার সুযোগ পায় না এবং মনোযোগ দিয়ে বক্তব্য শুনে।

বাচনভঙ্গি ও অঙ্গভঙ্গি

অনেকেই আছেন, যাদের বাচনভঙ্গি ও শারীরিক অঙ্গভঙ্গি সুন্দর না হওয়ায় শ্রোতাদের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে ব্যর্থ হোন। কেউ কেউ আবার বক্তৃতা বক্তৃতা প্রদানকালে বাচনভঙ্গি ও শারীরিক অঙ্গভঙ্গির কারণে শ্রোতাদের হাসির খোরাকে পরিণত হোন। বক্তৃতা প্রদানকালে বাচনভঙ্গি ও শারীরিক অঙ্গভঙ্গি খুব বেশি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। বক্তৃতা কখনও একই রকম স্বরে দেওয়া যাবে না। আবার খুব উচ্চস্বরেও বক্তৃতা দেওয়া যাবে না, তেমনি খুব নিচুস্বরেও বক্তৃতা দেওয়া যাবে না। বক্তৃতা দেওয়ার সময় বক্তব্যের ধরন অনুযায়ী স্বরের ওঠা-নামা করাতে হবে। বক্তৃতা প্রদানকালে হাসির কথায় স্বর কোমল ও মুখে হাসি ফোটাতে হবে। কষ্টের কথায় স্বরে ব্যথিত ও চেহারায় কষ্ট ফোটাতে হবে। খুব শক্ত ও কঠিন কথায় স্বর বলিষ্ঠ ও চেহারা রূঢ় করতে হবে। মোটকথা, বক্তৃতার মাঝে একটি স্বরে ও চেহারার ভঙ্গিতে রিদম থাকতে হবে, যা শ্রোতাদের মুগ্ধ করে রাখবে। পাশাপাশি শারীরিক অঙ্গভঙ্গি বক্তব্যের ধরন অনুযায়ী সুন্দরভাবে সক্রিয় রাখতে হবে। বাচনভঙ্গি ও শারীরিক অঙ্গভঙ্গি শ্রোতাদের সবচেয়ে বেশি দৃষ্টি আকর্ষণ করতে পারে। তাই বক্তৃতা প্রদানকালে এই বিষয়ে খুব বেশি গুরুত্বারোপ করতে হবে।

প্রাসঙ্গিক আলোচনা

অনেকেই আছেন, বক্তৃতা প্রদানকালে প্রাসঙ্গিক বিষয়ের বাইরে অপ্রাসঙ্গিক বিষয় নিয়ে বেশি কথা বলেন। এতেও শ্রোতাদের মনোযোগ নষ্ট হয়ে যায় এবং এটি শ্রোতাদের বিরক্তির অন্যতম কারণ। যে প্রসঙ্গে আলোচনা হবে, সেই প্রসঙ্গের বাইরে না যাওয়াই উত্তম। সব সময় চেষ্টা করতে হবে প্রাসঙ্গিক বিষয়ের উপরে বক্তব্য প্রদান করা। যদি প্রাসঙ্গিক বিষয়ে ভাল ধারণা না থাকলে, বক্তৃতা দীর্ঘ না করে সংক্ষিপ্ত করে নেওয়া বুদ্ধিমানের কাজ। সবচেয়ে বেশি ভাল হয়, অপ্রাসঙ্গিক বিষয়ে কথা না বলে, পূর্বের বক্তাদের বক্তব্য থেকে কিছু অংশ আলোচনা করা।

শ্রোতাদের ধরন ও মনোভাব বিবেচনা করা

বক্তৃতা প্রদানকালে সবার আগে খেয়াল রাখতে হবে, শ্রোতারা কোন ধরনের মানুষ। অনেক সময় দেখা যায়, শ্রোতাদের অধিকাংশ উচ্চশিক্ষিত আবার কখনও দেখা যায়, অধিকাংশ শ্রোতাই কম শিক্ষিত বা অশিক্ষিত। উচ্চশিক্ষিত শ্রোতাদের সামনে যেভাবে বক্তব্য প্রদান খুব বেশি মনোযোগ আকর্ষণ করা যায়। অনুরূপ বক্তব্য কম শিক্ষিত বা অশিক্ষিত মানুষের কাছে মনোযোগ আকর্ষণ করতে পুরোপুরি ভাবে ব্যর্থ হয়। শ্রোতাদের ধরন অনুযায়ী বক্তব্য প্রদান করলে, সেই বক্তৃতা শ্রোতাদের কাছে গ্রহণযোগ্যতা পায়। এছাড়াও শ্রোতাদের মনোভাব বুঝতে হবে এবং সেই মনোভাব অনুযায়ী বক্তব্য প্রদান করতে হবে। যেমন, অতি ধার্মিক মনোভাবের শ্রোতাদের কাছে যেমন প্রগতিশীল চেতনার বক্তব্য আবেদন রাখতে পারে না, তেমনি প্রগতিশীল মনোভাবের শ্রোতাদের কাছে ধার্মিক মনোভাব থেকে বক্তব্য প্রদান করলেও সেটা আবেদন রাখতে ব্যর্থ হয়। তেমনিভাবেই, ছাত্রদের কাছে যে বক্তব্য খুব আকর্ষণীয় কিন্তু একই বক্তৃতা বয়োজ্যেষ্ঠদের কাছে পুরোপুরি ভাবেই ব্যর্থ। এভাবেই, বিভিন্ন বয়স, শ্রেণী ও মতাদর্শের কারণে ভিন্ন ভিন্ন মনোভাবের শ্রোতা থাকে এবং তাদের মনোভাব বুঝে বক্তৃতা দিতে পারলেই খুব সহজেই দৃষ্টি আকর্ষণ করা যায়।

শ্রোতাদের মনের অব্যক্ত কথাগুলো বলা

অনেক বক্তব্য আছে, শ্রোতারা আসলে কি শুনতে চাচ্ছেন, সেটাই ধরতে পারেন না। তাই খুব সুন্দরভাবে বক্তব্য প্রদানের পরেও শ্রোতাদের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে ব্যর্থ হয়। শ্রোতাদের মনের অব্যক্ত কথাগুলা অনুধাবন করতে হবে এবং সেই কথাগুলো বলতে বলতে পারলেই খুব সহজেই শ্রোতাদের খুব সহজেই মনোযোগ আকর্ষণ করা যায়। শ্রোতাদের তখন মনে হয়, তার মনের অব্যক্ত কথাগুলো বক্তা তার বক্তৃতায় বলছেন। শ্রোতাদের সব সময় প্রত্যাশা করে, তাদের মনের অব্যক্ত কথাগুলা বক্তারা বলুক। তাই এই বিষয়ে খুব বেশি গুরুত্ব আরোপ করতে হবে। যিনি এই বিষয়ে খুব পারদর্শী, তিনি শ্রোতাদের কাছে প্রিয় ব্যক্তিত্ব হয়ে ওঠেন।

যারা আমাদের দৃষ্টিতে ভাল বক্তা, আমরা দেখতে পাব, তাদের বক্তব্যের মাঝে উপরের কলাকৌশলগুলো বিদ্যমান। তাই উপরের কলাকৌশলগুলো রপ্ত করতে পারলে, আমরা খুব সহজেই একজন ভাল বক্তা হতে পারব। তবে হ্যাঁ, পরিশেষে একটি কথা বলতে হবে, যিনি যত ভাল শ্রোতা হবেন, তিনি তত ভাল বক্তা হতে পারবেন।

নির্বাচিত সংবাদ