২৩ জুলাই ২০১৯  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

দিন বদলের গান গাইছে যারা

ওরা কিছু দুঃসাহসী তরুণ, অদম্য প্রাণশক্তি নিয়ে বদলে দিতে চাইছে আমাদের পরিচিত পৃথিবী। সবারই বয়স তিরিশের নিচে, এ বয়সেই নিজ নিজ ক্ষেত্রে সাফল্য ছুঁয়ে তারা এখন প্রস্তুত আরও বড় লড়াইয়ের জন্য। তাদের এই লড়াই কতটা বদলে দেবে আমাদের জীবন সে উত্তর থাকুক সময়ের হাতে, আপাতত আমরা জেনে নেই এমন কিছু তরুণের গল্প। ধারাবাহিকের সপ্তম পর্ব, লিখেছেন- পপি দেবী থাপা

কোমল আহমাদ (২৮)

প্রতিষ্ঠাতা, কোপিয়া

প্রযুক্তি ব্যবহার করে কোমল আজ ব্যস্ত এমন এক পৃথিবী গড়তে, যেখানে ক্ষুধার যন্ত্রণা থাকবে না। না খেয়ে থাকবে না একটি মানুষও। আর এই ভাবনার শুরু গৃহহীন যুদ্ধ ফেরত এক সৈনিকের সঙ্গে দুপুরের খাবার খেতে গিয়ে। সেদিনের সেই দুপুরের অভিজ্ঞতা তাকে এক সাধারণ মিডটার্ম স্কুলের ছাত্র থেকে আজ পরিণত করেছে উদ্যোক্তায়। সৈনিকটি সদ্য ইরাক যুদ্ধে অংশগ্রহণ করে ফেরত এসেছেন, না খেয়ে ছিলেন ৩ দিন ধরে। বিষয়টি তাকে ব্যথিত করে। সে তার স্কুলের ডাইনিং হল থেকে উদ্বৃত্ত খাবার স্থানীয় গৃহহীনদের মাঝে বিতরণের প্রস্তাব করলে কর্তৃপক্ষ তার প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেন। এর পরেই তিনি প্রতিষ্ঠা করেন কোপিয়া। উদ্দেশ্য প্রযুক্তি ব্যবহার করে ক্ষুধা মুক্ত পৃথিবী গড়ে তোলা। এ প্লাটফর্ম ব্যবহার করে তিনি যে সব প্রতিষ্ঠানের উদ্বৃত্ত খাবার থেকে যায় তাদের সঙ্গে যাদের বা যে সংস্থার খাবার প্রয়োজন তাদের সমন্বয় সাধন করেন। আর এভাবেই অসংখ্য মানুষ বিনা খরচে পেয়ে যাচ্ছে তাদের প্রতিদিনের খাবার। ২০১৬তে কোপিয়া প্রতিষ্ঠার পর কোমাল যেমন গ্র্যাজুয়েশন করেছেন ওয়াই- কমবিনেটর থেকে ঠিক তেমনি তার উদ্যোগে নষ্ট হওয়ার হাত থেকে রক্ষা পেয়েছে এক মিলিয়ন পাউন্ডেরও বেশি খাদ্য।

আপনি যদি আজ কোন আয়োজনের শেষে আপনার পরিত্যক্ত খাদ্যসামগ্রী ক্ষুধার্থদের মধ্যে বন্টন করতে চান, তাহলে আপনি ধন্যবাদের সঙ্গে কোমলের শরণাপন্ন হতে পারেন। তার এই উদ্যোগ বিশ্বজুড়ে ক্ষুধার্ত মানুষের মুখে খাদ্য তুলে দিতে খুলে দিয়েছে এক নতুন সম্ভাবনার দ্বার। ২৮ বছর বয়সী কোমল কথা বার্তায় অকপট। তিনি খুব সহজ করেই বলেন, ‘আমি দক্ষিণ এশীয় অভিবাসী পিতামাতার কন্যা। আমার সামনে নিজের ক্যারিয়ার বেছে নিতে খুব বেশি বিকল্প ছিল না। বড়জোড় ডাক্তার, আইনজীবী অথবা প্রকৌশলী এই ছিল পরিবারের চাওয়া। আর আমি নিজে সব সময় চেয়েছি বলিউডে অভিনেত্রী হতে। কিন্তু আমি আনন্দিত এ জন্য যে, শেষ পর্যন্ত এমন কিছু করছি যা মানুষের কাজে লাগে। ইউনিভার্সিটি অব ক্যালিফোর্নিয়ার ছাত্রী, নৌবাহিনীর সাবেক মিডশিপ ম্যান আর এখন খাদ্য পুনর্বন্টন কোম্পানির সিইও। কোমাল এখনও বার্কলের সেই বিকেলের কথা স্মরণ করেন, যেদিন ইরাক যুদ্ধ ফেরত এক প্রাক্তন সৈনিক তাকে বলেছিল, আমার নাম জন, আমি দেশের হয়ে ইরাকে যুদ্ধ করেছি, অপেক্ষা করছি আমার ভাতা পাওয়ার, না খেয়ে আছি ৩ দিন ধরে। তার মনে হয়েছিল দেশের জন্য যুদ্ধে সব হারানোর ঝুঁকি নেয়া এক সৈনিক দেশে ফিরে নতুন এক যুদ্ধের মুখে পড়েছে, যে যুদ্ধের নাম ক্ষুধা। বিষয়টি অবাক করে তাকে। তিনি জানতেন, কেবল বার্কলের ডাইনিং হলগুলোতে হাজার পাউন্ড খাদ্য নষ্ট হয় প্রতিদিন। তার ভাষায়, এমন নয় যে খাদ্য সঙ্কটের কারণে মানুষ না খেয়ে থাকে, সমস্য মূলত বন্টন পদ্ধতিতে। বিশ্বজুড়ে প্রতিদিন যে পরিমাণ খাবার নষ্ট হয় তা সুষ্ঠু বন্টন করে আমরা এমন এক পৃথিবী গড়তে পারি, যেখানে কেউ না খেয়ে থাকবে না। বেঁচে যাওয়া খাবার ক্ষুধার্থদের মাঝে বন্টনের আন্দোলন শুরু করেন নিজের বিশ্ববিদ্যালয়ের ডাইনিং হল থেকে। শুরুতে তারা রাজি না হলেও কোমল যখন রীতিমতো আইনের বই ঘেঁটে উদ্বৃত্ত খাবার পুনর্বন্টনের বিষয়ে ১৯৯৬ সালে কংগ্রেসে পাস হওয়া এক আইন দেখিয়ে দেন, তখন বাধ্য হয়ে ডাইনিং কর্তৃপক্ষ মেনে নেন তার প্রস্তাব। সেই থেকে শুরু হওয়া আন্দোলন আজ কোপিয়ার মাধ্যমে ছড়িয়ে গেছে বিশ্বব্যাপী। জার্মান এবং অস্ট্রিয়ান সরকার তার কোম্পানির সঙ্গে যোগাযোগ করেছে তাদের দেশে পদ্ধতিটি চালু করতে। কোমল বিশ্বাস করেন, পৃথিবীর প্রতিটি মানুষের মুখে তুলে দেয়ার মতো খাবার আমাদের রয়েছে। এটি কোন কল্পনা নয় যে একটু চেষ্টা করলে ক্ষুধা নামক দানবের বিরুদ্ধে আমরা জয়ী হতে পারব।

নির্বাচিত সংবাদ