১১ জুলাই ২০১৯

বিড়াল ছানার প্রতি নিষ্ঠুরতা

পশুপালন অর্থনীতি যাযাবর বন্য গুহাবাসী মানুষের জীবনে স্থিতি এনেছিল প্রাগৈতিহাসিক যুগে। ভয়ঙ্কর জন্তুর সঙ্গে লড়াই করে বেঁচে থাকা আদিম মানুষ কোন এক সময় তাদের সঙ্গে সখ্য স্থাপন করে বশীভূত করতে বিস্ময়কর ভূমিকা রাখে। সেই প্রাচীন সমাজের বন্য পশুর সঙ্গে বিচরণকারী অসভ্য মানুষ তাদের সাহচর্যে প্রতিদিনের জীবনকে অনেকটা সহনীয়ও করে তোলে। প্রকৃতির সঙ্গে সংগ্রামী মানুষ পারিপার্শ্বিক প্রতিবেশকে জয় করে বিজ্ঞানের নিরবচ্ছিন্ন অগ্রযাত্রায়। ফলে পশুদের পোষ মানানোর দীর্ঘ প্রক্রিয়ায় আদিম সমাজের অর্থনৈতিক অবয়বেও তার ছায়া পড়তে থাকে। ফলে গড়ে ওঠে পশুপালন অর্থনীতির এক নতুন অধ্যায়। যা বর্বর যুগের যাযাবর মানুষের এক স্থান থেকে অন্য জায়গা ঘুরে বেড়ানোকেও স্থিতি অবস্থায় এনে দাঁড় করায়। ঐতিহাসিক ক্রমবিবর্তনের ধারায় পশুপালন প্রক্রিয়াটি আজ অবধি সভ্য মানুষ তাদের প্রতিদিনের জীবন প্রবাহের অনুষঙ্গ করে রেখেছে। আশ্চর্যজনকভাবে লালন-পালন করা প্রাণীরা গৃহকর্তার বশীভূত হয়ে হিংস্রতার পরিবর্তে সহমর্মিতা দেখাতে থাকে। গরু, ছাগল, কুকুর, বিড়াল এসব গৃহপালিত প্রাণী কেমন প্রভুভক্ত হয় এবং তার নির্দিষ্ট আলয়কে কিভাবে সুরক্ষা দেয়, সেটাও এক বিস্ময়কর ব্যাপার। সুতরাং এসব প্রাণীর প্রতিদিনের সামাজিক সুরক্ষাও আমলে নেয়া বাঞ্ছনীয়। সঙ্গত কারণেই ঔপনিবেশিক অবিভক্ত ভারতে ১৯২০ সালে ‘প্রাণীর প্রতি নিষ্ঠুরতা নিরোধ আইন’ আইনী ভিত্তি পায় বর্তমান সরকারের আমলে।

ঢাকার মুগদায় এক সদ্যজাত যার বয়স মাত্র ৩ দিন তেমন একটি বিড়াল ছানাকে জবাই করে একাদশ শ্রেণীর ছাত্রী ইশরাত জাহান মেহজাবিন। এই কিশোরী ছোট্ট বিড়াল ছানাটিকে হত্যা করে পলিথিনের মধ্যে পেঁচিয়ে রেলগেটে ফেলে আসে। হত্যা করার সময় মেহজাবিন পুরো দৃশ্যটি ভিডিও ধারণ করে। পরবর্তীতে তা ফেসবুকে দিলে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে সাড়া পড়ে যায়। এমন নিষ্ঠুরতায় অনেকে হতবাকও হয়। বিড়াল নিরীহ ছোট্ট একটি প্রাণী। যাকে প্রায়ই অনেক ঘরে লালন পালন করতে দেখা যায়। তার জন্য খাবারের ব্যবস্থা থেকে শুরু করে ঘুমানোর স্থানও নির্ধারিত করা থাকে। আধুনিক বিলাসবহুল ভবনে তাদের জন্য বাথরুমও করে দেয়া হয়। সেক্ষেত্রে এমন নৃশংসতা সচরাচর দেখা যায় না, যা এই কিশোরী সবার সামনে হাজির করল।

১৯ মার্চ ফেসবুকে এই নিষ্ঠুরতা দেখে জাহিদ হোসেন নামে এক সহৃদয় ব্যক্তি সংশ্লিষ্ট থানায় এমন নির্মমতার বিরুদ্ধে মামলা করেন। তিনি কেয়ার ফর পস নামের একটি প্রাণীকল্যাণ সংস্থার মহাসচিব। মামলার প্রেক্ষিতে তাৎক্ষণিকভাবে মেহজাবিনকে পুলিশ আটক করলেও আদালতের মাধ্যমে সে জামিন পেয়ে যায়। এই ছাত্রী হত্যার দায় স্বীকার করে বিজ্ঞানের বিষয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষার কথাই জোর দিয়ে বলেছে। তবে কেয়ার ফর পসের পক্ষ থেকে উক্ত কিশোরীর শাস্তি দাবি করা হয়। ১৯২০ সালের আইনে এমন অপরাধের দন্ড হিসেবে ৬ মাসের কারাবাস এবং ২০০ টাকা জরিমানা নির্দেশ থাকলেও প্রাণীদের ব্যাপারে জাতীয় সংসদে নতুন আইন ২০১৯ গত সোমবার পাস হয়েছে। নতুন আইনে কারাভোগের সময় ৬ মাস থাকলেও অর্থদন্ড বেড়ে হয় ১০ হাজার টাকা। অপ্রাপ্তবয়স্ক এই তরুণীর মামলাটি মূলত নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনের আওতায় আনা হয়। কিশোরী নিজেকে নির্দোষ প্রমাণ করতে চাইলেও কেয়ার ফর পসের পক্ষ থেকে আইন অনুযায়ী তার শাস্তি দাবি করা হয়। নতুন আইনে উল্লেখ আছে মালিকানাহীন কোন কুকুর বিড়ালকে নির্যাতন করলে তা শাস্তিযোগ্য অপরাধ হিসেবে গণ্য হবে। অবশ্যই তাকে আইনের আওতায় এনে কৃতকর্মের জন্য শাস্তিও বিধি অনুযায়ী দেয়া হবে। নিরীহ কিছু প্রাণীর সঙ্গে সভ্য মানুষের বন্ধুত্ব, সান্নিধ্য এবং নিকটতম হওয়ার নজির সমাজের চার পাশে ছড়িয়ে আছে। এসব প্রাণী কোন প্রভু ছাড়াও একা একা রাস্তা ঘাটে, বাড়ির আশপাশের আঙিনায় সব সময়ই ঘোরাফেরা করে। পশু-পাখির প্রতি নির্দয় কিংবা নিষ্ঠুরতাকে মানবিক মূল্যবোধ আর বিবেকের তাড়নায় নস্যাৎ করে দিতে হবে, এমন দাবি সচেতন মানুষের পক্ষ থেকে।