১১ জুলাই ২০১৯

শেখ হাসিনার চীন সফর এবং সমসাময়িক প্রসঙ্গ

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার চীন সফর খুবই গুরুত্বপূর্ণ। কেননা মিয়ানমার যেভাবে রোহিঙ্গাদের নিজস্ব বাসভূমি থেকে বিতাড়িত করছে তা কেবল অমানবিকই নয়। কোন কোন ক্ষেত্রে গণহত্যার শামিল। জননেত্রী অত্যন্ত দূরদৃষ্টিসম্পন্ন এবং মানবিকতায় ভরপুর। আর তাই তো, প্রায় ১২/১৩ লাখ রোহিঙ্গাকে আশ্রয় দিয়েছেন। মিয়ানমার এই রোহিঙ্গাদের ফেরত না নেয়ায় স্থানীয় জনমানুষের আর্থিক সমস্যার উদ্রেক হয়েছে। পাশাপাশি বিস্তীর্ণ বন জঙ্গল নষ্ট হয়েছে। আবার মিয়ানমারের কিছু দুষ্কৃতিকারী কেবল নারী-বালিকা-কিশোরীর প্রতি অবমাননা করেনি বরং তাদের মাধ্যমে এইডস রোগ আর পুরুষ ও নারীদের মাধ্যমে ইয়াবা ট্যাবলেট এদেশে ছড়িয়ে দিচ্ছে বলে পত্রিকান্তরে প্রকাশিত বিভিন্ন রিপোর্টে দেখা গেছে। এই রোহিঙ্গাদের একটি অংশ মানব পাচারকারীদের কবলে পড়ে বিভিন্ন ধরনের হয়রানি বিশ্বের বিভিন্ন দেশে এমনকি মৃত্যুর শিকার হচ্ছে। আরেকটি গ্রুপ রোহিঙ্গাদের বিদেশে বাংলাদেশের পাসপোর্ট জাল করে নিয়ে বিভিন্ন ধরনের অপকর্মে লিপ্ত হয়ে এদেশের সাধারণ মানুষের জীবনে বিদেশে কাদা ছোড়াছুড়ি করে। রোহিঙ্গারা যাতে সুন্দরভাবে থাকতে পারে, সে জন্য সরকার ভাষাণ চরে ব্যবস্থা করেছেন। তবে একদল বিদেশ থেকে প্রাপ্ত অর্থ সাহায্য কিছু সুবিধাবাদী এনজিওর মাধ্যমে পেয়ে থাকে। আর এই বিদেশ থেকে প্রাপ্ত অর্থ-সাহায্যের বেশ কিছু অংশ মানি লন্ডারিং করার জন্য কিছু এনজিও রোহিঙ্গাদের ভাষাণ চরে যাওয়ার বিরোধিতা করছে বলে বিভিন্ন পত্রপত্রিকা থেকে প্রাপ্ত তথ্যে জানা যায়। এটি খুবই দুর্ভাগ্যজনক। আর চীন বর্তমানে মিয়ানমারের বন্ধুপ্রতিম দেশ। আশা করা যায়, আমাদের প্রধানমন্ত্রীর চীন সফরের পর মিয়ানমার তার নিজ দেশের অধিবাসীদের সে দেশে ফেরত নেবেন।

এমনিতেই বাংলাদেশ জনসংখ্যার আধিক্যে ভরপুর। চীন সফর শেষে সাংবাদিক সম্মেলনে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা যথার্থই বলেছেন যে, মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্য কখনও বাংলাদেশের মানচিত্রের সঙ্গে জুড়তে পারবে না। তিনি রাষ্ট্র নায়োকচিত কণ্ঠে বলেন যে, প্রত্যেক দেশ তার সার্বভৌমত্ব নিয়ে থাকবে। তবে মিয়ানমারের উচিত ধর্মের নামে অন্যায় করা থেকে বিরত থাকা। আর তার দেশের মানুষদের অন্য দেশে বিতাড়িত না করা। আশা করা যায়, চীন যথার্থ অর্থেই রোহিঙ্গাদের প্রতি অন্যায়-অবিচার থেকে বিরত রাখা এবং রোহিঙ্গাদের মিয়ানমারে ফেরত যাওয়ার পক্ষে দূতিয়ালী করে মানবতার পক্ষে কাজ করবে। একটি দেশ যখন বড় হয় তখন সে দেশকে মানবিক হতে হয়। আর এ মানবিকতার কোন বিকল্প থাকতে পারে না। প্রধানমন্ত্রী বলেছেন যে, চীন সফরে রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনের বিষয়টি জোরালোভাবে তুলে ধরা হয় এবং চীনের প্রেসিডেন্ট, প্রধানমন্ত্রীসহ চীনা কমিউনিস্ট নেতারা সমস্যা সমাধানে সহায়তার আশ্বাস দিয়েছেন।

দেশ এগিয়ে যাওয়ার পথে হঠাৎ করে শিশু ও নারী নির্যাতন একটি সামাজিক ব্যাধিতে পরিণ হয়েছে। শিশু ও নারী নির্যাতন বন্ধের লক্ষ্যে একদম শৈশব থেকে পারিবারিকভাবে শিক্ষা গ্রহণ করতে হবে। ছেলেমেয়ের মধ্যে প্রভেদ থাকা উচিত নয়। সমতাভিত্তিক উন্নয়নে, লিঙ্গভিত্তিক সমতা দরকার। পাশাপাশি কুরুচিপূর্ণ ঘটনা প্রবাহ, মানুষ হিসেবে মর্যাদা দেয়ার ব্যত্যয় ঘটায় যাতে দেশে কোন ধরনের বৈষম্য না থাকে সেদিকে খেয়াল রাখা দরকার।

আসলে অশুভের বিরুদ্ধে সামাজিক প্রতিরোধ গড়ে তুলতে হবে। স্কুল পর্যায় থেকে মেয়েদের সম্মান করতে শেখাতে হবে। যে সমস্ত ছেলে এ ধরনের অন্যায় করে তাদের আইনের আওতায় এনে বিচার করতে হবে। আবার যদি কোন মেয়ে সুইসাইডস করে কোন ছেলেকে অন্ধকারে ঠেলে দেয় তার বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নিতে হবে। যারা গডফাদার হিসেবে পরিচিত তাদের আইনের আওতায় আনতে হবে। সমাজ ব্যবস্থায় যেমন কোন বৈষম্য বিশেষত লিঙ্গভিত্তিক গ্রহণযোগ্য নয় তেমনি শিশু ও নারী নির্যাতন আইনে যথাযথ ব্যবস্থা এবং শাস্তিপ্রাপ্তদের সম্পর্কে তথ্য জনসম্মুখে প্রকাশ করে তাহলে অন্যায়কারীরা পার পাবে না। সম্প্রতি চট্টগ্রামে অধ্যাপক এবিএম মাসুদ মাহমুদের সঙ্গে যা হলো, তার জন্য অবশ্যই বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের ব্যবসায়িক দৃষ্টিভঙ্গিই দায়ী। মেয়েরা এখন অন্যায়ের প্রতিবাদ করতে শিখেছে এটা যেমন ভাল কথা তেমনি যারা এক শ্রেণীর নরপিশাচ কর্তৃক উত্ত্যক্ত হচ্ছেন এবং পৃথিবীর মায়া ত্যাগ করতে বাধ্য হচ্ছেন, তাদের বিরুদ্ধে অবশ্যই যথাযথ ব্যবস্থা দাবি করছি। মানুষ হিসেবে অমানুষের পরিচয় কোনমতেই গ্রহণযোগ্য নয়। অথচ অন্যায় করে যাতে কেউ পার না পায় সে জন্য খোদ প্রধানমন্ত্রী নির্দেশ দিয়েছেন। তার নির্দেশনায় জড়িতদের বিরুদ্ধে তাৎক্ষণিক কঠোর ব্যবস্থা আইনশৃঙ্খলা বাহিনী গ্রহণ করেছে। পুরুষ হিসেবে আজ লজ্জা হয়, ঘৃণা হয়- যারা অন্যায় করছেন তাদের হয়ত দু’কানই কাটা। বিভিন্ন অশ্লীলতা ও অপকর্ম করে কখনও সুস্থ জীবনবোধের পরিচয় পাওয়া যায় না। সমাজে আজ ধর্ষক পুরুষদের মনোবৃত্তির ওপর গবেষণা করার জন্য সমাজবিজ্ঞানী ও সাইকিয়াট্রিসদের যৌথ উদ্যোগে গবেষণা করে, শিকড় থেকে এ ধরনের অন্যায় কর্মকান্ড উপড়ে ফেলতে কাজ করতে হবে। সমাজকে এগিয়ে আসতে হবে। দেশের সমাজ বিজ্ঞানীদের অধিকাংশ বিশেষত যারা পুরুষ, তাদের অধিকাংশই চুপ করে আছে। যখন আগুন লাগে তখন কেবল পাশের বাড়ি পুড়ে যায় না- বরং নিজের ঘরেও লাগতে পারে? আবার কেউ যেন মিথ্যা নারী নির্যাতনের শিকার না হয় সেদিকেও খেয়াল রাখা দরকার। যেমন নিরীহ অনেককে ইয়াবা ট্যাবলেট দিয়ে ফাঁসিয়ে দেয়া হয় বলে পত্রিকায় রিপোর্টে বেরিয়েছে অথচ ইয়াবার মূল গডফাদাররা আপোসে বেঁচে যায়- এ ধরনের ঘটনা যাতে না ঘটে সে জন্য সবাইকে সজাগ থাকতে হবে।

গ্যাসের দাম বৃদ্ধি নিয়ে এক শ্রেণীর ব্যক্তি, যারা নিজেদের সুশীল সমাজের প্রতিনিধি হিসেবে দাবি করে থাকেন, তাদের সঙ্গে যুক্ত হয়েছেন কিছু সুবিধাবাদী রাজনীতিবিদ বেশ একটি মওকা খুঁজতে চেয়েছেন। আশার কথা, জনগণ তাদের কথায় সায় দিচ্ছে না। বরং ভর্তুকি দিয়ে এখনও গ্যাস সরবরাহ করা হচ্ছে। সরকার প্রতি কিউবিক মিটার এলএনজি গ্যাস ৬১.১২ টাকায় কিনে ৯.৮০ টাকায় বিক্রি করছে। সেপ্টেম্বর ২০১৮ থেকে ফেব্রুয়ারি ২০১৯ পর্যন্ত এলএনজি গ্যাস আমদানি করতে সরকারকে ৪ হাজার ৪০০ কোটি টাকা ব্যয় করতে হয়েছে। ২০১৮ সালের আগস্ট মাসে বাংলাদেশ এলএনজি গ্যাসের যুগে প্রবেশ করেছে। ৩০ জুন, ২০১৯ তারিখে গ্যাসের দাম গড়ে ৩২.৮% বৃদ্ধির সিদ্ধান্ত হয়েছে যা অত্যন্ত যৌক্তিক। উন্নত রাষ্ট্র ব্যবস্থায় গড়ে উঠতে গেলে গ্যাসের প্রয়োজন। স্থলজ গ্যাসের পরিমাণও ক্রমশ শেষ হয়ে আসছে। জলজ গ্যাস উৎপাদনের জন্য সঠিক পদক্ষেপ গ্রহণ করা বাঞ্ছনীয় হয়ে পড়েছে। এ ব্যাপারে পেট্রোবাংলা ও বাপেক্সকে আরও কার্যকর হতে হবে। তাদের উচ্চ সুযোগ-সুবিধা কিন্তু জনকল্যাণই আসতে হবে। দুঃখজনক হলেও সত্য, এ দেশে একশ্রেণীর মানুষ রয়েছে, যারা তাদের ওপর ন্যায্য কর দেয় না, সরকারের উন্নয়নের সুফল নিতে চায় কিন্তু তার জন্য প্রাপ্য অর্থ দিতে রাজি নয়। সরকারী ভতুর্কি দেয়ারও সীমা-পরিসীমা আছে। আর তাই প্রধানমন্ত্রী যখন সংবাদ সম্মেলনে মন্তব্য করেছেন যে, শিল্পায়ন করতে হলে, বিদ্যুত উৎপাদন বাড়াতে হলে, সার উৎপাদন করতে হলে অর্থনৈতিক উন্নয়ন করতে হলে, ঘরে ঘরে বিদ্যুত দিতে হলে এলএনজি গ্যাস আমদানির বিকল্প নেই। যখন একটি দেশ উন্নয়নের মধ্য দিয়ে যায়, তখন বিদ্যুত ও জ্বালানির বিশাল প্রয়োজন থাকে। এক্ষেত্রে গ্যাসের দাম বাড়ানোর পরও সরকারকে বিপুল ভতুর্কি দিতে হবে। আসলে আমরা যদি উন্নয়ন চাই- তবে বিত্তশালী থেকে শুরু করে নিম্ন-মধ্যবিত্ত পর্যন্ত সবাইকে সঠিকভাবে সঠিক সময়ে কর ও ন্যায় মূল্য দেয়ার অভ্যাস করতে হবে। নইলে আমরা গ্রীকদের মতো দেউলিয়া হয়ে যেতে পারি। বাংলাদেশে প্রতি ঘনমিটার গ্যাসের দাম গৃহস্থালিতে ১২.৬০ টাকা যেখানে ভারতে স্থান ভেদে ৩০ টাকা থেকে ৩৭ টাকা, আবার শিল্প ক্ষেত্রে ১০.৭০ টাকা অথচ ভারতে ৪০ থেকে ৪২ টাকা আর সিএনজি ক্ষেত্রে এদেশে ৪৩ টাকা ভারতে ৪৪ টাকা আর বাণিজ্যিক ক্ষেত্রে এদেশে ২৩ টাকা আর ভারতে হচ্ছে ৫৮ থেকে ৬৫ টাকা। এরপরও তথাকথিত কনসালটেন্সি ফার্মসহ সঙ্গে কিছু সুশীল নামধারী আর অতি বাম-ডান এক হয়ে গ্যাসের মূল্য বৃদ্ধির পেছনে লেগেছে। তবে গ্যাস ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানিগুলো যেন দুর্নীতির আখড়া না হয় সে জন্য এখন থেকেই কষে দুর্নীতি বিরোধী ব্যবস্থা ও শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নিতে হবে। নচেৎ দাম বাড়ার পরও প্রয়োজনীয় সাপোর্ট হয়ত গ্রাহকরা নাও পেতে পারেন।

বাজেট ঘোষণার পর থেকেই অদ্ভুত একটি বাংলা শব্দ ঘুরেফিরে আসছে। যদিও শব্দটি প্রথম চয়ন করেছিল বিএনপির জনৈক রাজনীতিবিদ আর তা হচ্ছে বাজেট হচ্ছে ব্যবসায়ীবান্ধব কিন্তু ব্যবসাবান্ধব নয়। পরবর্তী সময়ে টকশোতে গিয়ে দেখলাম বর্তমান সরকারের অনুগ্রহভাজন এক কনসালটেন্ট কাম অর্থনীতিবিদ একই শব্দ ব্যবহার করছেন। তার ভাষ্যে ব্যবসায়ীবান্ধব বলতে বোঝায় গুটিকয়েক ব্যবসায়ীর স্বার্থ রক্ষা করা। যদি আমরা ন্যূনতম মাতৃভাষা ঠিক না জানি, তবে এ ধরনের পন্ডিতমন্য বক্তব্যই আসবে। অথচ যিনি ব্যবসা করেন, তার জন্য ব্যবসা করলে ব্যবসায়ীবান্ধব বলে। আবার যিনি কারবার করেন তার জন্য ব্যবস্থা করলে কারবারীবান্ধব বলে থাকে। আসলে টু ইচ ডুয়িং বিজনেসের সূচকে বাংলাদেশের অবস্থান উন্নত করতে হবে। দেশে ব্যবসায়ীরা যদি ন্যূনতম মুনাফা নিয়ে ব্যবসা করে থাকে। তবে তা মানুষের স্বার্থেই করে থাকেন। এক্ষণে কূটতর্কের জন্য এ ধরনের বক্তব্য বিএনপি-জামায়াত ও পাশাপাশি উপরে সরকার থেকে সুবিধা নেয়া কনসালটেন্সি নেয় আর পেছন থেকে ছুরি মারে- জুলিয়াস সিজারের মৃত্যুকালীন উক্তি ‘দি ব্রুটাস’ তাদের সম্পর্কে সতর্ক থাকা বাঞ্ছনীয়। গিরগিটির মতো যারা রং বদলায় তারা সব সময়েই ট্রেইটর হয়। আর বিএনপি-জামায়াতপন্থীরা তলে তলে বিভিন্ন সুবিধাবাদীর ঘাড়ে সওয়ার হয়। প্রধানমন্ত্রী যথার্থই বলেছেন চীনা টিভির সঙ্গে সাক্ষাতকারে- ‘বাংলাদেশের মানুষের ভাগ্য উন্নয়ন ছাড়া অন্য কিছু ভাবেন না।’ যার অন্তরে দেশের মানুষের কথা সর্বদা কল্যাণ আকাক্সক্ষা যাচিত হয়, সেখানে অর্থনৈতিক উন্নয়নের পথপরিক্রমার কাজ করতে হবে। এক্ষেত্রে টেকসই উন্নয়নের জন্য সরকার কাজ করে চলেছে। পিকেএসএফ বর্তমানে অপ্রাতিষ্ঠানিক কর্মকান্ড পরিচালনা করে চলেছে। বাংলাদেশ ব্যাংককে পেশাদারিত্বের সঙ্গে প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোকে দুর্নীতিমুক্তভাবে এবং আপীল বিভাগের নিয়ম মেনে উন্নত স্তরে পৌঁছাতে হবে।

লেখক : শিক্ষাবিদ ও অর্থনীতিবিদ

pipulbd@gmail.com