২৩ জুলাই ২০১৯  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

উঠে এসেছে জীবন

  • মুহাম্মদ ফরিদ হাসান

বাঙালী সংস্কৃতি লালন ও এর গৌরবময় বিকাশকে উৎকর্ষের সঙ্গে ছড়িয়ে দিতে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ১৯৭৪ সালের ১৯ ফেব্রুয়ারি বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমি গঠন করেন। এর এক বছর পর ১৯৭৫ সালে প্রথমবারের মতো জাতীয় চারুকলা প্রদর্শনীর আয়োজন করা হয়। সেই ধারাবাহিকতায় এ বছর ১ জুলাই থেকে ২৩তম জাতীয় চারুকলা প্রদর্শনী অনুষ্ঠিত হচ্ছে। শিল্পকলা একাডেমির জাতীয় চিত্রশালায় প্রদর্শনী চলবে ২১ জুলাই পর্যন্ত। এবার এ সুবৃহৎ আয়োজনে অংশ নিতে ৮৫০ জন শিল্পী আবেদন করেছিলেন। শিল্পকর্ম নির্বাচন কমিটি মান-উৎকর্ষের বিচারে ৩১০ জন শিল্পীর ৩২২টি শিল্পকর্ম প্রদর্শনীর জন্য নির্বাচিত করেন। শিল্পকর্মগুলোর মধ্যে চিত্রকলা ১৫৯টি, ছাপচিত্র ৫০টি, ভাস্কর্য ৪৫টি, কারুশিল্প ১৭টি, স্থাপনাশিল্প ৩৭টি, মৃৎশিল্প ৭টি ও কৃৎশিল্প ৭টি রয়েছে। নিঃসন্দেহে এ আয়োজনটি শিল্পরসিকদের জন্য আকর্ষণীয় ও আগ্রহের বিষয়। কেননা, বাংলাদেশে চারুকলার বিভিন্ন শাখার সমন্বিত সমকালীন উপস্থাপন একসঙ্গে দেখতে পাওয়া দুরূহ বিষয়।

নানা কারণে জাতীয় চারুকলা প্রদর্শনীর এমন আয়োজন অত্যন্ত গুরুত্ববহ। প্রদর্শিত শিল্পকর্মগুলো দেখলে বর্তমান সময়ের শিল্পীদের চিন্তা, চেতনা, মনোজগত, উপস্থাপন, উপকরণের বিষয়ে স্বচ্ছ ধারণা পাওয়া যাবে। পাশাপাশি বর্তমান শিল্পচর্চার গতিপথ সম্পর্কেও সচেতন দর্শক অবহিত হতে পারবেন। সমকালীন শিল্পীদের হাতে চারুকলা যে নতুন রূপ পাচ্ছে তা এখন অনেকটাই স্পষ্ট। আনন্দের বিষয় হলো দেশীয় উপকরণকে মাধ্যম হিসেবে ব্যবহার করে শিল্পীরা আন্তর্জাতিকতাকে ছুঁয়ে দিচ্ছেন। বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমির মহাপরিচালক লিয়াকত আলী লাকী প্রদর্শিত শিল্পকর্ম সম্পর্কে লিখেছেন, ‘প্রদর্শনীর জন্য নির্বাচিত শিল্পকর্ম দেখে মনে হয়েছে শিল্পীরা সমকালীন বাস্তবতা, সামাজিক জটিলতা ও অসঙ্গতি এবং এসবের মাঝে প্রকৃত সমাধান খুঁজে বের করার প্রয়াসকেই তাঁদের শিল্পচর্চায় প্রাধান্য দিয়েছেন। শিল্পকর্মের মাধ্যম এবং ব্যবহৃত উপাদানেও কৌশলগত নতুনত্বের ধারণা প্রকাশ পেয়েছে।’ প্রদর্শনীর প্রতিটি গ্যালারি ঘুরে তাঁর পর্যবেক্ষণ যথার্থ মনে হয়েছে।

প্রদর্শিত শিল্পকর্মে যে বিষয়টি বিশেষভাবে দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে তা হলো সমাজমনস্কতা। সমাজের বিভিন্ন ঘটনার অভিঘাতে কখনও কখনও শিল্পী ভীষণ বিক্ষত হন। এমন প্রতিফলনই পড়েছে শিল্পের পরতে পরতে। আবার এই পতিত অবস্থা থেকে উত্তোরণ ও প্রতিবাদের উপস্থাপনও জোরালোভাবে শিল্পকর্মগুলোতে রয়েছে। এ বিষয়ে জয়তু চাকমার দুটি ছবি বিশেষভাবে উল্লেখ করার মতো। রত্নেশ্বর সূত্রধরের আঁকা ‘দগ্ধ মুখ-১’ ও শায়লা আখতারের ‘অগ্নিদগ্ধ চকবাজার’, আমিরুল মোমেনীন চৌধুরীর ‘ঢাকা ট্র্যাজেডি-১’, আফরোজা জামিল কংকা-এর ‘চকবাজার ট্র্যাজেডি’ শিল্পকর্মগুলো নিকট অতীতের ভয়াবহতার কথা স্মরণ করিয়ে দেয়। এসব ছবি যেন যাপিত জীবনের দুঃসহ ঘটনার জ¦লজ¦ল ধারাভাষ্য। জান্নাতুল ফেরদৌসের ‘জুডিশিয়ারি ইমব্যালান্স’ শিল্পকর্মটি নিয়ে কিছু না বললেই নয়। শিল্পকর্মে দেখা যায়, চোখবাঁধা বিচারকের হাতের ন্যায়দন্ডের এক পাল্লায় তিনটি কাক ও অন্য পাল্লায় দুটি কবুতর রয়েছে এবং এখানে কাকের পাল্লা ভারি। অর্থাৎ বিচারে কাকের বা দুষ্টের জয় এবং কবুতর বা শান্তির পরাজয় দেখানো হয়েছে। এখানে শিল্পীর সত্য ও সমাজের সত্য একই। কেননা বর্তমানে সমাজে শুভ্রচেতনাধারী মানুষের চেয়ে অশুভ মানুষেরাই পাল্লায় ভারি। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম আমাদের প্রতিদিনের জীবনের সঙ্গে নিবিড়ভাবে সম্পৃক্ত রয়েছে। তবে যে জীবন আমরা যাপন করি, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে তা ‘বাড়িয়ে’ উপস্থাপন করা হয়। নিজের ছবি, ভ্রমণ, খাবার-দাবারসহ সবকিছুতেই চলে ঘষামাজা, পরিপাটি করার আয়োজন। কিন্তু বাস্তবজীবনে অতটা পরিপাটি নই আমরা। এমন চিন্তাকে ধারণ করে তৈরি করা হয়েছে ‘সোশ্যাল মিডিয়া শোঅফ’ শিল্পকর্মটি। শিল্পী শারমীন আলম। অতিপরিচিত অনুষঙ্গ হলেও কাজটি ভাললাগার মতো।

নারী শিল্পসাহিত্যের চিরায়ত অনুষঙ্গের একটি। এ প্রদর্শনীর বিভিন্ন শিল্পকর্মে নারীদের যাপন, বেদনা, প্রতিকূলতা, দহন উপস্থাপিত হয়েছে। কপিল চন্দ্র রায়ের আঁকা ‘ওমেন সারাউন্ডিং-২’ শিল্পকর্মে ক্ষতবিক্ষত নারীর মুখ তুলে ধরা হয়েছে। মুখের আশপাশে শিয়ালদের আনাগোনা। এই শিয়াল পুরুষ নামধারী পশুদের প্রতিচ্ছবি বহন করে। আজমীরা নাজনীনের শিল্পকর্ম ‘গোপন ব্যথা-৭’ ছবিতে সমাজের রক্তচুক্ষর সম্মুখে বেদনাহত বিষণ্ণ রক্তাক্ত নারীকে তুলে ধরা হয়েছে। হাবিবা আখতার পাপিয়ার ‘সীমাবদ্ধতার যন্ত্রণা’ শিল্পকর্মটিও বিশেষ তাৎপর্যবহ। নারীজীবন ও যন্ত্রণার অন্যান্য শিল্পকর্মের মধ্যে বিটপ শোভন বাছাড়-এর ‘উইমেন ইন সোসাইটি’, সুনন্দা রানী বর্মণের ‘মুখোশ’, অভিজিত ম-লের ‘শুরু! শেষ’, নারগিস পারভীনের ‘নারী জীবন-১৭’, নূর মুনজেরীন রিমঝিমর ‘নারী ও সমাজ’, অনন্যা দাসের ‘প্রকৃতি ও নারী’ ইত্যাদি উল্লেখযোগ্য। চারুকলার চলমান প্রদর্শনীর বেশকিছু ছবি প্রকৃতিকে ধারণ করে আছে। এদের মধ্যে অভি শংকর আইন-এর ‘অনুসৃতি নীরবতা’, সমীর কুমার মজুমদার-এর ‘সুন্দরবন-৫’, ‘সুন্দরবন-৭’, মনজুর রশীদের ‘সময়ের বর্ণনা-২’ উল্লেখযোগ্য।

শিল্পের অনুষঙ্গ কোনটি-এমন প্রশ্নের চেয়ে ‘কোনটি শিল্পের অনুষঙ্গ নয়’ এই প্রশ্নটিই তাৎপর্যবহ। আমাদের চারদিকে ছড়িয়ে ছিটিয়ে যা উপকরণ রয়েছে তার সবকিছুই শিল্পের অনুষঙ্গ হতে পারে। শিল্পীই ঠিক করে নেন তিনি কোন বিষয়কে অনুষঙ্গ হিসেবে বেছে নেবেন। আলোচ্য প্রদর্শনীর বিভিন্ন শিল্পকর্মে উঠে এসেছে একাত্তরের গণহত্যা, শরণার্থী, বৃদ্ধাশ্রমে থাকা মানুষদের করুণ মুখ, নাগরিক দৃশ্যমালা, বিগত শৈশব সময়, জলবায়ু পরিবর্তন, যাত্রা-গান, রাখাল, সাধক, আরব বসন্ত, প্রেয়সী, দেশীয় ঐতিহ্য, বিদ্রুপ, ইলিশ, রক্তমাখা জুতো, বিচিত্র মুখ, বৃক্ষনিধন ইত্যাদি। পাশাপাশি শিল্পীরা শিল্পমাধ্যমে নিজস্ব সত্তার ব্যবচ্ছেদ করেছেন নিপুণভাবে। গ্লানি, হতাশা, দুঃখবোধ, বিষণ্ণতা লেপ্টে আছে কিছু কিছু ক্যানভাসে। প্রদর্শনীতে উপস্থাপিত শিল্পকর্মের মধ্যে বিভিন্ন ক্যাটাগরিতে ৮টি শিল্পকর্মকে পুরস্কার প্রদান করা হয়েছে। পুরস্কারপ্রাপ্ত শিল্পকর্মগুলো হলো- কামরুজ্জামানের ‘গ্লোবাল ওয়ার্মিং-২’, তানভীর মাহমুদের প্রণিধান-২, রুহুল করিম রুমীর ‘সন্দেহজনক প্রতিকৃতি’, রাফাত আহমেদ বাঁধনের ‘সম্পর্ক-৪’, সহিদ কাজীর ‘সোনালি আঁশ’, উত্তম কুমার তালুকদারের ‘জীবনের গল্প-১, ফারিয়া খানম তুলির ‘প্রীতিবিম্ব-৪’ এবং সুমন ওয়াহিদের ‘ম্যাপ’।

আশা জাগানিয়া বিষয় হচ্ছে, চারুকলা প্রদর্শনীর অধিকাংশ ছবিই ‘শিল্পের জন্য শিল্প’ না হয়ে ‘মানুষের জন্য শিল্প’ হয়েছে। ফলে এসব শিল্পকর্মে জীবন, সমাজ ও রাষ্ট্রের একটি বিশেষ রূপই কেবল প্রতিফলিত হয়নি, এর গন্তব্যও নির্দেশিত হয়েছে। আর বেদনাদায়ক বিষয় হচ্ছে, জীবন ও সমাজে এমন বিরূপ ও বেদনাদায়ক সময় আমরা অতিক্রম করছি। তবে আমরা আলোর যাত্রী, স্বর্ণময় ভোরের স্বপ্ন দেখি এবং বিশ্বাস করি, অখন্ড শুভ্রতার মধ্যে যেটুকু কালিমা রয়েছে তা অচিরেই মুছে যাবে। শিল্প ও শিল্পী-উভয়েই এমন দাবি রাখে।

নির্বাচিত সংবাদ