১৭ জুলাই ২০১৯  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

কোরবানির আগে কাঁচা চামড়ার সঠিক দাম নির্ধারণ করা হবে

  • কয়েক বছর ন্যায্যমূল্য মিলছে না

এম শাহজাহান ॥ কাঁচা চামড়া রক্ষায় কোরবানির আগে এবার ন্যায্যদাম নির্ধারণ করে দেয়া হবে। আন্তর্জাতিক বাজারের সঙ্গে সমন্বয় রেখে গরু, ছাগল, ভেড়া ও মহিষের চামড়ার পৃথক দাম নির্ধারণ করে দেয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। কয়েক বছর ধরে ট্যানারি মালিকদের কারসাজির কারণে সঠিক দাম নিশ্চিত হচ্ছে না। ফলে স্থানীয় ও মাঠ পর্যায়ে সংরক্ষণের অভাবে বিপুল পরিমাণ চামড়া নষ্ট হয়ে যাওয়ার অভিযোগ রয়েছে। এছাড়া রাজধানী ঢাকা ও বাণিজ্যিক শহর চট্টগ্রামেও গত বছর বহু চামড়া নষ্ট হয়ে গেছে লবণের অভাবে। এছাড়া ন্যায্যদাম পাওয়া যায় না বলে বেশির ভাগ চামড়া পশু থেকে খেয়ালখুশিমতো কেটে ছিঁড়ে বের করে আনা হয়। এতে করেও কয়েকশ’ কোটি টাকার কোরবানির চামড়া নষ্ট হয়ে যাওয়ার ঝুঁকি বাড়ছে। এসব কারণে চামড়ার সঠিক দাম নিশ্চিত করবে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়। সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে এ তথ্য।

এদিকে কাঁচা চামড়ার সঠিক দাম পাওয়া না গেলেও চামড়াজাত পণ্যের দাম দেশে প্রতিবছর বাড়ছে। হাজার টাকার নিচে একটি বেল্টও কেনা যায় না। সাধারণ মানের একজোড়া চামড়ার জুতা কিনতে ভোক্তাকে খরচ করতে হচ্ছে চার থেকে ৫ হাজার টাকা। আর কোরবানির হৃষ্টপুষ্ট লাখ টাকার গরুর কাঁচা চামড়া বিক্রি হয় মাত্র ৬০০-৮০০ টাকায়। ট্যানারি মালিক ও এ শিল্পের পাইকারি ব্যবসায়ীরা পানির দামে কিনে নেন কাঁচা চামড়া। কয়েক বছর ধরে ক্ষুদ্র ও মৌসুমি ব্যবসায়ীরা ধারাবাহিকভাবে লোকসান করায় স্থানীয় পর্যায়ে এখন আর কেউ কাঁচা চামড়া কিনে ঝুঁকির মুখে পড়তে চায় না। এছাড়া কোরবানির চামড়ার সবচেয়ে বড় সংগ্রাহক এতিম ছাত্রছাত্রী ও মসজিদ-মাদ্রাসার সংশ্লিষ্টরাও এখন চামড়া নিতে আগ্রহ হারিয়ে ফেলছেন। ফলে কোরবানির চামড়া সংগ্রহ নিয়ে বড় ঝুঁকি রয়েছে। কাঁচা চামড়ার সঠিক দাম নিশ্চিত না হওয়ার কারণে এ সঙ্কট তৈরি হয়েছে বলে মনে করছে সংশ্লিষ্টরা।

এ প্রসঙ্গে বাণিজ্য সচিব মোঃ মফিজুল ইসলাম জনকণ্ঠকে বলেন, কাঁচা চামড়ার সঠিক দাম নিশ্চিত করতে বেশকিছু পদক্ষেপ নেয়া হবে। বিশেষ করে আন্তর্জাতিক বাজারের সঙ্গে সমন্বয় করে দাম নির্ধারণ করে দেয়ার সিদ্ধান্ত নেয়া হচ্ছে।

তিনি বলেন, বহির্বিশ্বে কাঁচা ও ফিনিশড চামড়ার দাম কি অবস্থায় রয়েছে তা নিয়ে কাজ শুরু করেছে ট্যারিফ কমিশন। পুরো তথ্য পাওয়ার পর এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেয়া যাবে। এছাড়া খুব শীঘ্রই চামড়া শিল্পের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ী, ট্যানারি মালিক ও পাইকারি ব্যবসায়ীদের সঙ্গে বৈঠক করা হবে। বাণিজ্য সচিব বলেন, সঠিক দাম নিশ্চিত না হওয়ার কারণে কোরবানিদাতারা কাঁচা চামড়া নিয়ে তাদের আগ্রহ হারিয়ে ফেলছেন। যেনতেনভাবে কেটে ছিঁড়ে চামড়া পশু থেকে খুলে নেয়া হচ্ছে। এছাড়া পশু থেকে সংগ্রহের পরই তাতে লবণ মিশাতে হয়। কিন্তু ন্যায্যদাম না পাওয়ায় অনেকেই চামড়া নষ্ট করে ফেলছেন। অথচ চামড়া দেশের জাতীয় সম্পদ।

জানা গেছে, শুধু লবণের অভাবে গত বছর ৩৬০-৪০০ কোটি টাকার চামড়া নষ্ট হয়ে গেছে। এছাড়া কেটে ছিঁড়ে আরও কয়েকশ’ কোটি টাকার চামড়া নষ্ট করা হয়েছে বলে জানিয়েছে বাংলাদেশ ট্যানারি এ্যাসোসিয়েশন (বিটিএ)। প্রতিবছর নষ্ট হওয়া চামড়ার পরিমাণ বাড়ছে। সংশ্লিষ্টরা বলছে, কাঁচা চামড়ার দাম ঠিকমতো না পাওয়ার কারণে সব জায়গায় সঙ্কট তৈরি হচ্ছে। এ কারণে চামড়া শিল্প রক্ষায় আগে কাঁচা চামড়ার ন্যায্যদাম নিশ্চিত হওয়া প্রয়োজন।

সাভারের ট্যানারিতে যাবে সব চামড়া ॥ কোরবানির কাঁচা চামড়া সংগ্রহে এবার সাভারের ১৫৫টি ট্যানারি প্রস্তুতি নিতে শুরু করেছে। ট্যানারি অবকাঠামো নির্মাণের কাজ শেষ হলেও কেন্দ্রীয় বর্জ্য পরিশোধনাগার (সিইটিপি) নির্মাণের কাজ এবারও সম্পূর্ণ করতে পারেনি বিসিক। ফলে ট্যানারি বর্জ্যে দূষিত হচ্ছে ধলেশ্বরী নদী। স্থানীয় পরিবেশও বিপর্যয়ের মুখে। এই বাস্তবতায় ট্যানারির কমপ্লায়েন্স নিয়ে আপত্তি রয়েছে বিদেশী বিনিয়োগকারীদের। কিন্তু অবকাঠামোগত অন্যান্য সুযোগ-সুবিধা বিদ্যমান থাকায় কোরবানির চামড়া সাভারের ট্যানারিতেই যাবে।

বাংলাদেশে ট্যানার্স এ্যাসোসিয়েশনের তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশ থেকে বছরে ২২ কোটি বর্গফুট চামড়া পাওয়া যায়। এর মধ্যে ৬৪ দশমিক ৮৩ শতাংশ গরুর, ৩১ দশমিক ৮২ শতাংশ ছাগলের, ২ দশমিক ২৫ শতাংশ মহিষের এবং ১ দশমিক ২ শতাংশ ভেড়ার চামড়া। মোট চামড়ার অর্ধেকের বেশি সংগ্রহ ও মজুদ করা হয় কোরবানির ঈদের সময়। সরকারের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, দেশী গরু-ছাগলেই কোরবানির মৌসুমের চাহিদা মেটানোর সক্ষমতা বাংলাদেশ অর্জন করেছে। প্রাণিসম্পদ অধিদফতরের তথ্য অনুযায়ী, গত বছর ১ কোটি ৫ লাখ গবাদিপশু কোরবানি হয়েছে। এবার দেশের খামারগুলোতে কোরবানিযোগ্য পশু আছে প্রায় সোয়া কোটি। ওই হিসেবে চাহিদার তুলনায় বেশি কোরবানিযোগ্য পশু রয়েছে।

ন্যায্যদামে কাঁচা চামড়া কিনতে হবে ॥ গত কয়েক বছর ধরে ধারাবাহিকভাবে চামড়ার দাম কমানো হচ্ছে। তবে এবার ন্যায্যদামে চামড়া কিনতে হবে। বাণিজ্য মন্ত্রণালয় থেকে গত কোরবানি আগে কাঁচা চামড়ার দাম নির্ধারণ করে দেয়া হয়। ওই সময় ঢাকায় প্রতি বর্গফুট লবণযুক্ত গরুর চামড়ার দাম ৪৫ থেকে ৫০ টাকা এবং ঢাকার বাইরে ৩৫ থেকে ৪০ টাকা হবে। গত বছর প্রতি বর্গফুটের দাম ছিল ঢাকায় ৪৫ থেকে ৫৫ টাকা এবং ঢাকার বাইরে ৪০ থেকে ৪৫ টাকা। এ ছাড়া সারাদেশে খাসির চামড়া প্রতি বর্গফুট ১৮ থেকে ২০ টাকা এবং বকরির চামড়া ১৩ থেকে ১৫ টাকায় সংগ্রহ করতে বলা হয় ব্যবসায়ীদের। গতবার খাসির চামড়া প্রতি বর্গফুট ২০ থেকে ২২ টাকা এবং বকরির চামড়া ১৫ থেকে ১৭ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছিল। আন্তর্জাতিক বাজারের চেয়ে কম দাম নির্ধারণ করে দেয়ার পরও পানির দামে কেনা বেচা হয়েছে সারাদেশে। যদিও প্রতিবেশী রাষ্ট্র ভারতে কাঁচা চামড়ার দাম বাংলাদেশের তুলনায় আড়াই থেকে তিনগুণ বেশি। এছাড়া আন্তর্জাতিক বাজারে এই দাম ছয়গুণের ওপর। ভারতে কাঁচা চামড়ার মূল্য প্রতি বর্গফুট ১১০ থেকে ১২০ টাকা। আন্তর্জাতিক বাজারে তার দাম ন্যূনপক্ষে ২৪০-২৫০ টাকা। অথচ দেশে সেই চামড়া বিক্রি হচ্ছে মাত্র ৪০-৪৫ টাকায়।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, দেশে কাঁচা চামড়া রাখতে হলে অবশ্যই সঠিক দামে কাঁচা চামড়া বেচাকেনা হতে হবে। ট্যানারি মালিকদের মনমানুষিকতার পরিবর্তন করাতে হবে। এছাড়া এই শিল্পে নতুন উদ্যোক্তা তৈরি করা প্রয়োজন। দীর্ঘদিন ধরে চামড়া ব্যবসাটি একটি পারিবারিক ব্যবসায়ে রূপ নিয়েছে। পোশাকসহ অন্যান্য খাতে নতুন উদ্যোক্তা তৈরি হলেও এই শিল্প খাতে কেউ এগিয়ে আসছে না।