২৩ জুলাই ২০১৯  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

প্রশ্নের মুখে এ্যাপভিত্তিক যাত্রী সেবার বৈধতা, শর্তপূরণ নিয়ে জটিলতা

  • ১৬ কোম্পানির মাত্র একটি নিবন্ধনের আবেদন করেছে

রাজন ভট্টাচার্য ॥ রাজধানীতে এ্যাপভিত্তিক পরিবহন সেবায় যুক্ত অন্তত ষোলোটি প্রতিষ্ঠান। প্রাথমিক হিসেবে এসব প্রতিষ্ঠানের আওতায় প্রায় দেড় লাখ যানবাহন চলছে মহানগরীতে। আশ্চর্যের বিষয় হলো ’১৫ সালের মাঝামাঝি নগরীতে এ্যাপভিত্তিক যাত্রীসেবার হাওয়া লাগে। প্রায় চার বছরেও এসব পরিবহন সেবা প্রতিষ্ঠানগুলো বৈধতা নেয়নি। বিআরটিএ সংশ্লিষ্টরা বলছেন, অবৈধ যাত্রীসেবা দিচ্ছে এ্যাপভিত্তিক এসব প্রতিষ্ঠান। নানা সীমাবদ্ধতা কাটিয়ে এ মাসের এক তারিখ থেকে বাংলাদেশ রোড ট্রান্সপোর্ট অথরিটি (বিআরটিএ) এ্যাপভিত্তিক যাত্রীসেবার সঙ্গে যুক্ত প্রতিষ্ঠানগুলোকে লাইসেন্স দেয়া শুরু করলেও বেশিরভাগ প্রতিষ্ঠান এখনও আবেদন করেনি। এমনকি নামী-দামী কোম্পানি উবার, পাঠাওয়ের পক্ষ থেকেও রেজিস্ট্রেশনের আনুষ্ঠানিক আবেদন জমা পড়েনি বিআরটিএর কাছে। ইচ্ছেমতো যাত্রীসেবায় নিয়োজিত সব প্রতিষ্ঠান।

ফলে রাইড শেয়ারিং নিয়ে যাত্রীদের নানা অভিযোগ থাকলেও চালক ও কোম্পানির বিরুদ্ধে কোন ব্যবস্থা নিতে পারছে না বিআরটিএ। তাই চালক, যাত্রী ও প্রতিষ্ঠানের স্বার্থে সবাইকে লাইসেন্সের আওতায় আসার পরামর্শ দিয়েছেন বিআরটিএ কর্মকর্তারা। অন্যথায় এসব প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেয়ার কথাও বলছেন তারা। এদিকে নিবন্ধন নিতে পাঁচ শর্তকে সঙ্কট হিসেবে দেখছে কোম্পানিগুলো। সরকারের সঙ্গে দেন-দরবারের মাধ্যমে এসব সমস্যা কাটিয়ে উঠতে পারলেই আনুষ্ঠানিক আবেদন করতে পারে এ্যাপভিত্তিক এসব প্রতিষ্ঠান।

ঢাকায় ’১৫ সালের মাঝামাঝি সময়ে রাইড শেয়ারিং সেবা শুরু হয়। ওই বছরের মে মাসে দেশী প্রতিষ্ঠান ‘চলো’র যাত্রা শুরু। এক বছর পর ’১৬ সালের মে মাসে ‘স্যাম’ নামে আরেকটি প্রতিষ্ঠান যাত্রা শুরু করে। একই বছরের নবেম্বরে ঢাকায় যাত্রা শুরু করে বিশ^ব্যাপী জনপ্রিয় এ্যাপভিত্তিক যাত্রীসেবা প্রতিষ্ঠান ‘উবার’। ডিসেম্বরে আসে ‘পাঠাও’।

যাত্রা শুরুর পর পরই এ নিয়ে তুমুল হইচই শুরু হয়। বিআরটিএ শুরুতে এটিকে অবৈধ বলে ঘোষণা করে। পরে সড়ক পরিবহন মন্ত্রণালয়ের আশ্বাসে প্রাথমিক যাত্রীসেবার অনুমতি দেয়া হয়। জনচাহিদার চাপে ’১৮ সালের ফেব্রুয়ারিতে সংস্থাটি রাইড শেয়ারিং সার্ভিস নীতিমালা প্রণয়ন করে। মার্চে কাগজে-কলমে এই নীতিমালা কার্যকর হয়। নীতিমালা অনুসারে, রাইড শেয়ারিং কোম্পানি এবং তাদের চালানো যানবাহন আলাদাভাবে বিআরটিএর অনুমোদন প্রয়োজন। এটাকে বলা হচ্ছে ‘এনলিস্টমেন্ট সার্টিফিকেট’। নীতিমালা প্রণয়নের পরই ষোলোটি কোম্পানি নিবন্ধনের জন্য আবেদন করে। পরে আবেদনে ত্রুটি থাকায় সব শর্ত পূরণ করে জমা দিতে কোম্পানিগুলোর আবেদন ফেরত পাঠানো হয়, যা এখনও নিবন্ধন হয়নি।

সরকার ও রাইড শেয়ারিং কোম্পানিগুলোর বিভিন্ন সূত্র বলছে, কোম্পানিগুলো তাদের সুবিধামতো বিআরটিএর নিবন্ধন চায়। বিআরটিএও চাইছে এই খাতের ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করতে কিন্তু রাইড শেয়ারিং সার্ভিস নীতিমালা, ’১৭-এর তিনটি ধারা এবং পুলিশের দুটি আপত্তিতেই সব আটকে আছে। এখন সুরাহার জন্য তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের দ্বারস্থ হয়েছে রাইড শেয়ারিং কোম্পানিগুলো।

নিবন্ধন না থাকায় রাইড শেয়ারিং সেবায় পুলিশের ৯৯৯ কল করে যে সেবা পাওয়ার কথা, তাও পুরোপুরি পাচ্ছেন না যাত্রীরা। যাত্রীরা নিরাপত্তাহীনতায় পড়লে চালকের সব তথ্য এবং যাত্রীর অবস্থান সরাসরি পুলিশের কাছে চলে যাওয়ার কথা। এর জন্য জাতীয় পরিচয়পত্রের তথ্যভা-ারে সঙ্গে চালকের তথ্য যুক্ত থাকা দরকার। কিন্তু কোম্পানিগুলোর নিবন্ধন না থাকায় এর কোনটাই হচ্ছে না।

পাঁচ বাধা দূর চায় কোম্পানিগুলো॥ এই অবস্থায় রাইড শেয়ারিং কোম্পানি পাঠাও লিমিটেড, সহজ লিমিটেড ও উবার বাংলাদেশ লিমিটেড গত ১৪ ফেব্রুয়ারি তথ্য ও যোগাযোগপ্রযুক্তি প্রতিমন্ত্রী জুনাইদ আহমদকে চিঠি দিয়েছে। তারা এই খাতের বিকাশে বাধা হিসেবে পাঁচটি বিষয় চিহ্নিত করে তা দূর করার জন্য প্রতিমন্ত্রীর সহায়তা চেয়েছে। পাঁচটি বিষয়ের তিনটি নীতিমালায় আছে, দুটিই এসেছে পুলিশের আপত্তি থেকে। এগুলো হলো- একজন মালিকের একটি গাড়ি একটিমাত্র কোম্পানিতে চালাতে পারবে, নিবন্ধন নেয়ার এক বছরের মধ্যে রাইড শেয়ারিংয়ে দেয়া যাবে না, রাইড শেয়ারিংয়ের ভাড়া ট্যাক্সিক্যাবের চেয়ে বেশি হতে পারবে না, প্রতিটি কোম্পানি কত যান নামাতে পারবে (সিলিং), তা ঠিক করে দিতে হবে, ঢাকার বাইরে নিবন্ধন নেয়া যানবাহন রাইড শেয়ারিংয়ে যুক্ত হতে পারবে না।

কোম্পানিগুলোর আবেদনের প্রেক্ষিতে তথ্য ও যোগাযোগপ্রযুক্তি প্রতিমন্ত্রী গত ২৪ এপ্রিল বিআরটিএ চেয়ারম্যানকে চিঠি দেন। এর প্রেক্ষিতে সম্প্রতি তথ্য ও যোগাযোগপ্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ে বিআরটিএ কর্মকর্তা এবং রাইড শেয়ারিং কোম্পানি প্রতিনিধিদের নিয়ে প্রতিমন্ত্রী বৈঠক করেন।

সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, সিলিং ঠিক করে দেয়া, ভাড়ার হার, নিবন্ধনের এক বছরের মধ্যে মোটরযান রাইড শেয়ারিংয়ে যুক্ত না করার বিষয়টি সুরাহা হয়নি। একজন মালিক তার যানবাহন একাধিক কোম্পানিতে চালাতে পারবেন, এই বিষয়ে বিআরটিএ নমনীয়। আর ঢাকার বাইরের গাড়ি রাইড শেয়ারিংয়ে যুক্ত হবে না এটা মেনে নিতে চায় সব কোম্পানিই। বাকি সমস্যা সমাধানে পুলিশকে নিয়ে পুনরায় বৈঠক করার সিদ্ধান্ত নেন তথ্য ও যোগাযোগ প্রতিমন্ত্রী। সহজ লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মালিহা কাদির এ বিষয়ে সম্প্রতি গণমাধ্যমকে বলেন, তাদের পাঁচটি আপত্তির সুরাহা এবং দ্রুত নিবন্ধন দেয়ার বিষয়টি নিয়ে কাজ চলছে। সবাই এই খাতের ভাল চাইছে। কিন্তু নীতিমালা প্রণয়নের এক বছর পরও জটিলতা রয়েই গেছে।

রাইড শেয়ারিং সেবা নিয়ে গত ১৮ ফেব্রুয়ারি ডিএমপির ট্রাফিক বিভাগ চিঠি দিয়ে বিআরটিএকে তিনটি সুপারিশ করে। এগুলো হচ্ছে ১০ বছরের পুরান যানবাহন রাইড শেয়ারিং সেবায় নিয়োজিত না করার বিধান, রাইড শেয়ারিং কোম্পানিগুলোকে সর্বোচ্চ কত যানবাহন নিবন্ধন করতে পারবে, তা ঠিক করে দেয়া এবং শুধু ঢাকা মহানগর থেকে নিবন্ধন নেয়া যানবাহনই কেবল এ সেবায় যুক্ত হতে পারবে, তা নিশ্চিত করা। পুলিশ বলেছে, দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে জরাজীর্ণ ও পুরান কার-মোটরসাইকেল মেরামত করে ঢাকায় রাইড শেয়ারিংয়ে যুক্ত করা হচ্ছে। ঢাকায় ইতোমধ্যে মেট্রোরেলের কাজের জন্য মূল সড়কের প্রশস্ততা কমেছে। রাইড শেয়ারিং চালু হওয়ার পর ছোট যান বেড়ে গেছে, যা যানজট সৃষ্টি করছে। এ ছাড়া অদক্ষ চালকের কারণে সড়ক দুর্ঘটনা বেড়ে যেতে পারে। তাই কোম্পানিগুলো সর্বোচ্চ কত যানবাহন চালাতে পারবে- এর একটা সিলিং থাকা উচিত।

তবে বিআরটিএ কর্মকর্তারা বলছেন, সিএনজিচালিত অটোরিক্সার সিলিং ঠিক করে দেয়ায় যাত্রীদের চাহিদা মেটাতে পারছে না। চাহিদার তুলনায় জোগান কম থাকায় এই খাতে নৈরাজ্য চলছে। নীতিমালার গলদে সরকার কয়েকবার চেষ্টা করেও ট্যাক্সিক্যাব সেবা চালু রাখতে পারেনি। এ ছাড়া মোটরসাইকেল ও কার নিবন্ধনের ক্ষেত্রে কোন বাধা নেই। তাই রাইড শেয়ারিংয়ে কৃত্রিম বাধা তৈরি করে রাখার কোন অর্থ হয় না। বিআরটিএ চেয়ারম্যান মশিয়ার রহমান বলেন, রাইড শেয়ারিংয়ে জনগণ সেবা পাচ্ছে কিন্তু কোম্পানিগুলো এখনও আইনী কাঠামোয় আসেনি। পুলিশের পক্ষ থেকে কিছু সমস্যা চিহ্নিত করা হয়েছে, সেগুলো সমাধানের চেষ্টা চলছে।

রাইড শেয়ারিং কোম্পানি ও গণপরিবহন ॥ এ্যাপের মাধ্যমে রাইড শেয়ারিং সেবা দিচ্ছে বা দিতে চায় এমন ১৬ প্রতিষ্ঠান নিবন্ধনের জন্য বিআরটিএতে প্রথমে আবেদন করে। এর মধ্যে কম্পিউটার নেটওয়ার্ক সিস্টেম, রাইডার রাইডশেয়ার এন্টারপ্রাইজ ইনক ও গোল্ডেন রেন লিমিটেড যানবাহনের সংখ্যা জানায়নি। সবচেয়ে বেশি যানবাহন আছে পাঠাও, সহজ, ওভাই সলিউশন, উবার, পিকমি ও হোস্ট ইন্টারন্যাশনালের। মোটরবাইক আছে ১ লাখ ৪ হাজার ৩৮৯, কার ১৮ হাজার ২৫৩। সব মিলিয়ে প্রায় দেড় লাখ যানবাহন এ্যাপভিত্তিক পরিবহন সেবার সঙ্গে যুক্ত।

ঢাকায় সাড়ে ১৪ লাখ রেজিস্ট্রেশনপ্রাপ্ত যানবাহনের মধ্যে প্রায় সাত লাখ মোটরবাইক চলছে। এর একটা বড় অংশ এখন এ্যাপভিত্তিক যাত্রীসেবায় নিয়োজিত। সব মিলিয়ে কত পরিবহন এ সেবায় যুক্ত তা কোম্পানির রেজিস্ট্রেশন ছাড়া নিশ্চিত হওয়া সম্ভব নয়। বিআরটিএর তথ্যানুযায়ী রাজধানীতে প্রায় ১৪ হাজার বাস ও মিনিবাস আছে। কাগজপত্রে সিএনজিচালিত অটোরিক্সার সংখ্যা ২০ হাজারের বেশি। সাড়ে তিন হাজারের বেশি ট্যাক্সিক্যাব যে আছে বিআরটিএর কাগজপত্রে তা উল্লেখ থাকলেও খুব একটা চলতে দেখা যায় না। এসব যানবাহনের জন্য আইন, নীতিমালা আছে।

বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতির মহাসচিব মোজাম্মেল হক চৌধুরী বলেন, রাইড শেয়ারিং সেবায় মানুষ উপকার পাচ্ছে। তবে কিছু কিছু অভিযোগও আসছে। এগুলোর সমাধান দেয়ার মতো আইনী ও সাংগঠনিক কাঠামো নেই সরকারের। সরকারের ভুল নীতির কারণে বাস-মিনিবাস, ট্যাক্সিক্যাব ও সিএনজিচালিত অটোরিক্সা খাতে নৈরাজ্য চলছে।

বিআরটিএ বলছে, ১ জুলাই থেকে রাইড শেয়ারিং প্রতিষ্ঠানের লাইসেন্স দেয়া শুরু হলেও শুধু ‘পিকমি’ লিমিটেড ছাড়া কেউ লাইসেন্সের আবেদন করেনি। প্রতিষ্ঠান কর্মকর্তারা বলছেন, মূলত পরিষেবা প্রতিষ্ঠানগুলোকে সরকারী নজরদারিতে আনার পাশাপাশি বৈধতা দিতে এই লাইসেন্স দেবে বিআরটিএ। এ বিষয়ে প্রতিষ্ঠানের সড়ক নিরাপত্তাবিষয়ক পরিচালক মাহবুব-ই রব্বানি বলেছেন, রাইড শেয়ারিং সেবাদাতা কোম্পানিগুলোর বিরুদ্ধে এতদিন নানা অভিযোগ থাকলেও বিআরটিএ কোন ব্যবস্থা নিতে পারছিল না। এখন নীতিমালার অধীনে সব প্রতিষ্ঠানকে জবাবদিহিতার আওতায় আনা যাবে।

পাশাপাশি পুরো প্রক্রিয়াকে শৃঙ্খলার মধ্যে আনার মাধ্যমে সরকারও রাজস্ব আদায় করতে পারবে। নিবন্ধনের পর রাইড শেয়ারিং এ্যাপগুলো আগের নিয়মেই পরিচালিত হবে। রাইড ডাকা বা রাইডে চলাচলের পদ্ধতিতে কোন পরিবর্তন হবে না। তবে নীতিমালার আওতায় গ্রাহক সেবার মান উন্নত হওয়ার পাশাপাশি নিরাপত্তা অনেকাংশে নিশ্চিত করা যাবে বলে আশা করেছে বিআরটিএ।

যদি কোন রাইড শেয়ারিং প্রতিষ্ঠান একবার নিবন্ধন পায় তাহলে তাদের প্রতিটি নীতিমালা মেনে চলতে হবে বলে জানিয়েছেন রব্বানি। তিনি বলেন, যদি কোন প্রতিষ্ঠান নীতিমালার শর্ত ভাঙ্গে প্রাথমিক ওই প্রতিষ্ঠানের নিবন্ধন বাতিল করে দেয়া হবে। পাশাপাশি তাদের কার্যক্রম বন্ধ করাসহ প্রচলিত আইনানুযায়ী প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।

নির্বাচিত সংবাদ
এই মাত্রা পাওয়া