২৩ জুলাই ২০১৯  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

জলবায়ু অভিযোজনে বৈশ্বিক নেতৃত্বের স্বীকৃতি

  • বাংলাদেশের অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে কর্মমুখী প্রতিবেদন তৈরি করবে জাতিসংঘ

কাওসার রহমান ॥ জলবায়ু অভিযোজনে বৈশ্বিক নেতৃত্বের স্বীকৃতি পেল বাংলাদেশ। ঢাকায় দুদিনের গ্লোবাল কমিশন অন এ্যাডাপটেশনের বৈঠক করে সেই স্বীকৃতিই দিয়ে গেলেন বিশ্ব নেতারা। স্বাধীনতার পর থেকেই বাংলাদেশ বৈশ্বিক জলবায়ু পরিবর্তনের সঙ্গে খাপ খাইয়ে নেয়ার জন্য অভিযোজনের কাজ করে আসছে। আর এই অভিযোজন কার্যক্রমে গত ১১ বছর ধরে সামনে থেকেই নেতৃত্ব দিচ্ছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। যে কারণে ১৯৭০ সালের ঘূর্ণিঝড়ে ৫ লাখ মানুষ মারা গেলেও, সাম্প্রতিক ঘূর্ণিঝড় ফণীতে মারা যায় মাত্র ১২ জন। বরং ঘূর্ণিঝড় আঘাত হানার আগেই ১৬ লাখ মানুষকে নিরাপদে সরিয়ে নিতে সক্ষম হয় বাংলাদেশ। নানা উদ্ভাবনীমূলক কার্যক্রম গ্রহণের মাধ্যমে বাংলাদেশ জালবায়ু অভিযোজন কার্যক্রমে বেশ দক্ষতা ও অভিজ্ঞতা অর্জন করেছে। বাংলাদেশের এই মডেলটিকেই বৈশ্বিক জলবায়ু অভিযোজনের সেরা মডেল হিসেবে গ্রহণ করতে চাইছে গ্লোবাল কমিশন অন এ্যাডাপ্টেশন। এজন্যই কমিশনের প্রথম বৈঠক বাংলাদেশে আয়োজন করা হয়।

জলবায়ু অভিযোজনে এই কার্যকর সক্ষমতা অর্জনের জন্য কমিশনের প্রধান বান কি মুন বাংলাদেশকে সেরা শিক্ষক হিসেবে অভিহিত করেছেন। আর এই অভিযোজনে সামনে থেকে নেতৃত্ব দেয়ার জন্য তিনি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বেরও প্রশংসা করেছেন। শুধু তাই নয়, শেখ হাসিনাকে জলবায়ু পরিবর্তনের সমস্যাটি নিয়ে সামনে থেকেই নেতৃত্ব প্রদানকারী বিশ্বনেতাদের মধ্যে অন্যতম বলে উল্লেখ করেছেন।

উল্লেখ্য, ২০০৯ সালে জাতীয় অভিযোজনের কর্মপরিকল্পনা সৃষ্টি করে এক্ষেত্রে বাংলাদেশ বিশ্বের প্রথম দেশ হয়েছিল। কোপেনহেগেন জলবায়ু সম্মেলনে এই অভিযোজন কর্মপরিকল্পনা তুলে ধরেছিল বাংলাদেশ। সেই সম্মেলন থেকে দেশে ফিরে শেখ হাসিনা উন্নত দেশের দিকে তাকিয়ে না থেকে নিজেদের অর্থে জলবায়ু অভিযোজন কার্যক্রম গ্রহণ করেন। ২০০৯-১০ অর্থবছরের বাজেটে জলবায়ু অভিযোজনে প্রথম বাজেট বরাদ্দ দেয়া হয়। এজন্য গঠন করা হয় বাংলাদেশ ক্লাইমেট চেঞ্জ ট্রাস্ট ফান্ড। গত ১১ বছর ধরে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এই ট্রাস্ট ফান্ডে বরাদ্দ দিয়ে আসছেন এবং এই ফান্ডের মাধ্যমে দেশে জলবায়ু অভিযোজন কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে।

বায়ু দূষণের জন্য দায়ী ‘কার্বন’। বিগত দেড় শ’ বছর ধরে উন্নত দেশগুলোর কার্বন নির্গমনের কারণে বৈশ্বিক উষ্ণায়ন অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে গেছে। ফলে বিশ্বজুড়েই জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে আবহাওয়ার অস্বাভাবিক আচরণ দেখা যাচ্ছে। এবার ২০১৯ সালে কুয়েতে সর্বোচ্চ ৬৩ ডিগ্রী সেলসিয়াস তাপমাত্রা ও ফ্রান্সে সর্বোচ্চ ৪৫.৯ ডিগ্রী সেলসিয়াস তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয়েছে। চলতি বছরের জুন মাসব্যাপী ইউরোপজুড়ে প্রচন্ড তাপপ্রদাহে স্বাভাবিক জীবনযাত্রা থমকে যায়।

বাংলাদেশ খুব সামান্যই কার্বন নিঃসরণ করে থাকে অথচ তার দায়ভার বহন করে চলেছে বাংলাদেশের মতো দুর্যোগপ্রবণ দেশগুলো। দুই দিনের এই বৈঠকে জলবায়ু প্রশমন অর্থাৎ কার্বন নির্গমন হ্রাস করার বিষয়টিও সামনে চলে আসে। কার্বন নির্গমনের কারণে গত প্রায় দেড় শ বছরে বৈশ্বিক উষ্ণায়ন প্রাক-শিল্প যুগের চেয়ে এক ডিগ্রী সেলসিয়াস বেড়ে গেছে। এভাবে বৈশ্বিক উষ্ণতা বাড়তে থাকলে বাংলাদেশ এভাবে কতদিন অভিযোজন করে যাবে। সভায় বলা হয়, ভূমিকা না থাকলে অভিযোজনের পাশাপাশি বাংলাদেশ কার্বন নির্গমনকে গুরুত্ব দিচ্ছে। সভায় কার্বন নির্গমন হ্রাসে জোরালো ভূমিকা রাখার জন্য উন্নত দেশগুলোর ওপর চাপ সৃষ্টির জন্য কমিশনের প্রতি আহ্বান জানান হয়।

জলবায়ু পরিবর্তনের সঙ্গে খাপ খাইয়ে নিতে বাংলাদেশের বিভিন্ন সংস্থা কিভাবে কাজ করছে তা তুলে ধরা হয়। এ সময় বলা হয়, জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ১৯৭০ সালে ভয়াবহ ঘূর্ণিঝড় ও জলোচ্ছ্বাসের অভিজ্ঞতা নিয়ে স্বাধীনতার পর বহুমুখী সাইক্লোন শেল্টার নির্মাণ করে জলবায়ু পরিবর্তনের সঙ্গে খাপ খাওয়ানোর পথ দেখান। প্রাকৃতিক দুর্যোগের ক্ষয়ক্ষতি হ্রাসে বঙ্গবন্ধু কক্সবাজারে সবুজবেষ্টনী গড়ে তুলেছিলেন এবং যে কোন প্রাকৃতিক দুর্যোগ মোকাবেলায় তখন ৪৫ হাজার স্বেচ্ছাসেবী প্রস্তুত করেছিলেন। এছাড়া জনগণের পাশাপাশি গৃহপালিত পশুদের জীবন রক্ষায় গঠন করা হয়েছিল ‘মুজিব কিল্লা’। বঙ্গবন্ধুর সেই উদ্যোগ মাথায় রেখে আরও উদ্ভাবনীর মাধ্যমে বাংলাদেশ জলবায়ু অভিযোজনের কাজ করে আসছে।

সভায় অভিযোজনের অভিজ্ঞা তুলে ধরেন পল্লী কর্মসহায়ক ফাউন্ডেশনের (পিকেএসএফ) চেয়ারম্যান ড. কাজী খলীকুজ্জমান আহমদ। তিনি বলেন, ‘উপকূলীয় অঞ্চলের মানুষের চাহিদা নিরূপণের মাধ্যমে অভিযোজন কার্যক্রম পরিচালনা করছে পিকেএসএফ। এটা বেশ কার্যকরী হচ্ছে।’ তিনি বলেন, অভিযোজনের ভাল ফল পেতে হলে সামাজিক অগ্রগতি ও পরিবেশ সংরক্ষণ এই দুটির মধ্যে সমন্বয়ের মাধ্যমে অভিযোজন করতে হবে।

জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবেলায় অভিযোজনের ধারণা উন্নয়নে সম্প্রতি জাতিসংঘের পক্ষ থেকে গঠন করা হয়েছে ‘গ্লোবাল কমিশন অন এ্যাডাপটেশন’। প্যারিস জলবায়ু চুক্তি স্বাক্ষরে অগ্রণী ভূমিকা পালন করায় এই কমিশনের প্রধান করা হয়েছে জাতিসংঘের সাবেক মহাসচিক বান কি মুনকে। আর কমিশনের কো-চেয়ার করা হয়েছে বিশ্বব্যাংকের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) ক্রিস্টালিনা জর্জিওভাকে। কমিশনের ঢাকা বৈঠকে দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার জন্য বাংলাদেশে জলবায়ু পরিবর্তনবিষয়ক একটি বৈশ্বিক অভিযোজন কেন্দ্র নির্মাণের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয়। কমিশনের প্রধান বান কি মুন এই অভিযোজন কেন্দ্র স্থাপনের জন্য প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনকে প্রস্তাব দিয়েছেন। প্রধানমন্ত্রী ওই প্রস্তাব গ্রহণও করেছেন। উল্লেখ্য, জাতিসংঘের একটি বৈশ্বিক জলবায়ু সম্মেলনেও বাংলাদেশে এ্যাডাপটেশন সেন্টার স্থাপনের সিদ্ধান্ত হয়। কিন্তু সেই সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের আর কোন অগ্রগতি হয়নি।

জলবায়ু বিশ্লেষকরা বলছেন, বাংলাদেশ জলবায়ু অভিযোজনে অনেক সাফল্য দেখিয়েছে। এ কারণে বিশ্বব্যাপী জলবায়ু অভিযোজনের একটি কৌশল প্রণয়নের জন্য গ্লোবাল কমিশন অন এ্যাডাপটেশন বাংলাদেশ থেকে শিক্ষা গ্রহণ করতে এসেছে। জলবায়ু পরিবর্তনে ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলোর অন্যতম বাংলাদেশ। কিন্তু বিশ্বে অনেক দেশ আছে যেগুলো বাংলাদেশের চেয়েও নাজুক। কিন্তু তাদের নিজেদের ঘুরে দাঁড়ানোর সক্ষমতা নেই। বাংলাদেশ জলবায়ুর ঝুঁকিপূর্ণ দেশ হয়েও পরিবর্তনের সঙ্গে খাপখাইয়ে ঘুরে দাঁড়িয়েছে। এ কারণেই এই সম্মেলনের জন্য ঢাকাকে বেছে নেয়া হয়েছে। এই সম্মেলন থেকে জাতিসংঘের জন্য জলবায়ু পরিবর্তন অভিযোজনের বিষয়ে সুপারিশমালা তৈরি করা হবে।

এ প্রসঙ্গে কমিশন প্রধান বান কি মুন নিজেও বলেছেন, ‘অভিযোজন অনুশীলনে বাংলাদেশের জনগণ ও সরকার যে নেতৃত্ব অর্জন করেছে তা অলৌকিকের চেয়েও কোন অংশে কম নয়। তাই আমরা ঢাকায় এসেছি, বাংলাদেশের অভিজ্ঞতা ও দূরদর্শিতা থেকে শিখতে।’

জাতিসংঘের সাবেক মহাসচিব বলেনছেন, জলবায়ু পরিবর্তনের সঙ্গে অভিযোজন করে বাংলাদেশ সরকার ও জনগণ জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবেলায় যে প্রজ্ঞা ও কার্যকারিতার উদারহরণ দেখিয়েছে, তা আমাদের সবাইকে অনুপ্রেরণা জোগায়। বাংলাদেশের কাছে বিশ্বের বাকি দেশের অনেক কিছু শেখার আছে।

তিনি বলেন, ভাবনার চেয়ে অনেক অনেক দ্রুতগতিতে জলবায়ু পরিবর্তন হচ্ছে। এক্ষেত্রে আমাদের নষ্ট করার মতো সময় নাই। এসব অভিযোজন অনুশীলন বিনিময় করতে হবে। যাতে জলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাতে ক্ষতিগ্রস্ত জনগোষ্ঠীর সহায়তায় আমরা জরুরী ভিত্তিতে ব্যয়সাশ্রয়ী উপায়ে পদক্ষেপ নিতে পারি।

এ বিষয়ে তার কমিশন শীঘ্রই প্রতিবেদন প্রকাশ করবে বলে জানিয়েছেন বান কি মুন। ওই প্রতিবেদন হবে কর্মমুখী। কিভাবে ক্ষতিগ্রস্ত দেশগুলো ব্যয় সাশ্রীয় পদ্ধতিতে আসন্ন জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবেলা করবে তার দিকনির্দেশনা থাকবে এই প্রতিবেদনে। কমিশনের কো-চেয়ার এবং বিশ্বব্যাংকের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) ড. ক্রিস্টালিনা জর্জিভা ঢাকায় সম্মেলন করার যুক্তি হিসেবে বলেন, জলবায়ুর ঝুঁকি কী এবং এ ঝুঁকি থেকে বিভিন্ন কার্যক্রম কিভাবে মানুষকে রক্ষা করতে পারে তার কেন্দ্র বাংলাদেশ।

এ প্রসঙ্গে জলবায়ু বিশেষজ্ঞ ড. আতিক রহমান বলেন, বাংলাদেশ এখন জলবায়ু অভিযোজনের ‘রাজধানী’। এই রাজধানী থেকে ‘গ্লোবাল কমিশন অন এ্যাডাপটেশন’ কাজ শুরু করতে চাইছে। তিনি আরও বলেন, ‘বাংলাদেশ এখন আর শুধু জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকিপূর্ণ দেশ নয়। বাংলাদেশ এখন জলবায়ু পরিবর্তনের ক্ষতি মোকাবেলায় ‘রেজিলিয়েন্ট’ (সক্ষম) একটি দেশ। এটি অভিযোজনের একটি আদর্শ পরীক্ষাগার। এখানেই জলবায়ু পরিবর্তনের সঙ্গে খাপ খাইয়ে নেয়ার সফল সব পরীক্ষা হচ্ছে। তাই কমিশন তার জন্য একটি আদর্শ সুপারিশ তৈরির জন্য এই পরীক্ষাগারের সাফল্যগুলো গ্রহণ করতে এসেছে।

ড. আতিক রহমান বলেন, বাংলাদেশ নিজেদের অর্থে জলবায়ু অভিযোজন করে চলেছে অথচ উন্নত দেশ এ অভিযোজনে অর্থায়ন করতে দায়বদ্ধ। বাংলাদেশের জলবায়ু অভিযোজনে দক্ষতা উন্নয়নের জন্য আরও অর্থায়ন করতে হবে। উন্নত দেশগুলোকে সেই অর্থ প্রদানে এগিয়ে আসতে হবে। বর্তমানে তারা যে অর্থ দিচ্ছে তা প্রয়োজনের তুলনায় খুবই অপ্রতুল।

নির্বাচিত সংবাদ