২০ জুলাই ২০১৯  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

বিলীন হচ্ছে টেংরাগিরির সবুজ অরণ্য

বিলীন হচ্ছে টেংরাগিরির সবুজ অরণ্য

স্টাফ রিপোর্টার, বরিশাল ॥ জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে দিনদিন বেড়েই চলেছে বঙ্গোপসাগরে জোয়ারের উচ্চতা। ক্রমাগত সমুদ্র সৈকত ও তার আশেপাশের আবাদী জমিতে বৃদ্ধি পাচ্ছে লবনাক্ততা। ফলে গত কয়েক বছরে বিলীন হয়ে গেছে দক্ষিণাঞ্চলের অন্যতম পর্যটন কেন্দ্র কুয়াকাটা সমুদ্র সৈকতের নারিকেল বাগানের বড় একটা অংশ।

সাগরের পানিতে লবনাক্ততা বৃদ্ধির কারণে বালুর স্তর প্রতিদিনই নেমে যাওয়ায় এবং বর্ষা মৌসুমে পানির উচ্চতা বৃদ্ধি ও প্রবল ঢেউ লন্ডভন্ড করে দিচ্ছে কুয়াকাটা ও বঙ্গোপসাগরের কোলে গড়ে ওঠা ‘দ্বিতীয় সুন্দরবন’ হিসেবে পরিচিত সংরক্ষিত ম্যানগ্রোভ বন টেংরাগিরি বন্যপ্রাণী অভয়ারণ্যের মনোমুগ্ধকর পরিবেশ।

জলবায়ু পরিবর্তনের বিরুপ প্রভাবে গত কয়েক বছর ধরে বর্ষা মৌসুমে প্রবল ঢেউয়ে সৈকতের বালুর স্তর প্রতিদিনই নেমে যাওয়ায় গাছের কান্ড ভেঙ্গে পরছে। আবার কোনো কোনো গাছের শিকড় বের হয়ে খাদ্য সংগ্রহ করতে না পারায় মরে যাচ্ছে গেওয়া, কেওড়া, ছইলা, ঝাউবন, নারিকেলসহ নানা প্রজাতির গাছ। ফলে বিলীন হয়ে যাচ্ছে সবুজ অরণ্য। জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে বিলীন হওয়ার আশঙ্কায় রয়েছে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে থাকা সবুজ অরণ্য।

সরেজমিনে কুয়াকাটা সমুদ্র সৈকত ও সংরক্ষিত ম্যানগ্রোভ বন টেংরাগিরি বন্যপ্রাণী অভয়ারণ্য ঘুরে দেখা গেছে, সাগর তীরবর্তী বিস্তৃর্ন বনাঞ্চলের কিছু কিছু স্থানের গাছের গোড়ার মাটি সরে যাওয়ায় শিকর বেরিয়ে হেলে পরেছে। বালুতে শিকর ঢেকে থাকা গাছের পাতাও বিবর্ন হয়ে গেছে। স্থানীয়রা মনে করছেন, বিরূপ আবহাওয়ার কারনে কুয়াকাটাসহ আশেপাশের এলাকার গাছপালা ভীষন ক্ষতিগ্রস্থ হচ্ছে।

বৈশ্বিক উষ্ণায়নের প্রভাবে সমুদ্রের পানি বৃদ্ধি ও প্রচন্ড ঢেউয়ের ঝাপটায় সৈকতের বালুক্ষয় মারাত্মক আকার ধারণ করেছে। এর প্রথম শিকার হচ্ছে সৈকতে দাঁড়িয়ে থাকা দৃষ্টিনন্দন ঝাউবাগান, তালবাগান, নারিকেল কুঞ্জ, ইকোপার্কের একাংশ ও শুটকি পল্লী। একে একে হারিয়ে যাচ্ছে কড়ই গাছের বিশাল আয়তনের বাগানটি। ফলে আগামী দিনের ঝড় ও জল্লোচ্ছ্বাসের সময় প্রধান অবলম্বন হিসেবে দাঁড়িয়ে থাকা এসব গাছ খতম হয়ে যাওয়ার আশঙ্কায় এখানকার মানুষের মধ্যে চরম উদ্বেগ দেখা দিয়েছে।

স্থানীয় ভূমি অফিসের দেয়া তথ্যে জানা গেছে, গত অমাবস্যা ও পুর্ণিমার জো মিলিয়ে কুয়াকাটা সমুদ্র সৈকত কমপক্ষে ১২ মিটার ধুয়ে নিয়ে গেছে। প্রতিবছর বর্ষা মৌসুমে বালুক্ষয়ের প্রভাবে সৈকতের ব্যাপক ক্ষতি হচ্ছে। সমুদ্র সৈকত এবং এর আশপাশে ঘুরে দেখা গেছে, পর্যটকদের জন্য প্রাকৃতিক সৌন্দর্য সেজে থাকা সৈকতের কয়েকটি স্পট ইতোমধ্যে ঢেউয়ের ঝাপটায় লন্ডভন্ড হয়ে গেছে। সৈকতে দাঁড়িয়ে থাকা দৃষ্টিনন্দন প্রধান আকর্ষণ ঝাউ বাগান, তালবাগান, নারিকেল কুঞ্জ, ইকোপার্কের একাংশ ও শুটকিপল্লী তছনছ হয়ে গেছে। সৈকতে বনাঞ্চলের শত শত গাছ উপড়ে পরেছে। এভাবে বালুক্ষয় অব্যাহত থাকলে কুয়াকাটার বেড়িবাঁধ ভেঙে ভিতরে সমুদ্রের পানি প্রবেশ করে পর্যটন শিল্প বিলুপ্ত হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।

কুয়াকাটা ডেভেলপমেন্ট সোসাইটি’র কর্মকর্তারা বলেন, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে সাগরের পানিতে মাত্রাতিরিক্ত লবণাক্ততার পরিমাণ বৃদ্ধির ফলে সাগরের পার ঘেষা প্রাকৃতিকভাবে জম্মানো বনাঞ্চল ও বন বিভাগের বাগান হুমকির মুখে পরেছে। এছাড়া জ্বলোচ্ছাসের ঝাপটায় মাটির স্তর ধুইয়ে নেমে যাওয়ায় প্রতিদিনই ভেঙ্গে যাচ্ছে বনাঞ্চল। তারা আরও বলেন, বৈষ্ণিক উষ্ণতার কারণে তাপমাত্রা বৃদ্ধি পাওয়ায় বরফ গলে যাওয়ার কারণে সাগর নদীর পানির উচ্চতা বেড়ে গেছে। একই সাথে পানিতে লবণাক্ততার পরিমাণ বেড়ে যাওয়ায় ৫০/৬০ বছর পূর্বে সৃষ্ট প্রাকৃতিক বনাঞ্চল ও বন বিভাগের রোপিত বনাঞ্চল বিপরীত প্রতিকূলতায় এখন মরে যাচ্ছে। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে সাগরের পানির স্তর ক্রমশ বৃদ্ধি পাওয়ায় বেশি করে গাছ লাগানো হলে প্রাকৃতিক এ দুর্যোগ থেকে উপকূলের মানুষ কিছুটা রক্ষা পাবেন।