১৬ জুলাই ২০১৯  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণ

ক্রমবর্ধমান জনসংখ্যার উর্ধগতি দেশের জন্য এক মহাসঙ্কট। তাই রাষ্ট্রের পক্ষ থেকেই এমন সমস্যাকে মোকাবিলায় বিভিন্ন কর্মসূচী প্রয়োগ করা হয়। আজ বাংলাদেশ উন্নয়নের বিকশিত ধারায় অগ্রসরমান হলেও এক সময় তৃতীয় বিশ্বের অনুন্নত দেশের কাতারে ছিল। অশিক্ষা, গতানুগতিক রক্ষণশীলতা, ধর্মীয় গোঁড়ামিই শুধু নয় জনগোষ্ঠীর অসচেতনতাও পরিবার সীমিত রাখার ক্ষেত্রে অনেক বড় ধরনের প্রতিবন্ধকতা ছিল। ফলে সরকারকেই হতে হয়েছে নির্ণায়কের ভূমিকায়। প্রচার, প্রচারণা থেকে শুরু করে জন্মনিয়ন্ত্রণ পদ্ধতির সহজলভ্যতাকে জনগণের হাতের কাছে পৌঁছে দিতে পরিবার পরিকল্পনা ক্লিনিক প্রতিষ্ঠার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট অধিদফতরও প্রয়োজনীয় কার্যক্রম গ্রহণে সর্বাধিক পদক্ষেপ নিয়েছে। গ্রামেগঞ্জে, শহরে, নগরে ছোট পরিবারকে আদর্শ নমুনা ধরে মূল্যবান বার্তাও মানুষের কাছে পৌঁছে দিতে সরকারের হরেক রকম কর্মপ্রকল্প জনসাধারণের ভবিষ্যত লক্ষ্যকে নির্ধারণও করেছে। ‘দুটি সন্তানের বেশি নয়, একটি হলে ভাল হয়’ এমন স্লোগানকে জনগোষ্ঠীর নিকট জনপ্রিয় করতে সরকারের যে প্রয়োজনীয় ভূমিকা তাও সফলভাবে এগিয়ে গেছে। কিন্তু বর্তমানে এমন মূল্যবান বার্তাকে পাস কাটিয়ে গতানুগতিক ধারায় পেছনে তাকানো কোনভাবেই সময়ের যৌক্তিক চাহিদা নয়। কারণ এক দশকেরও আগে সেই পুরনো স্লোগানকে আবারও জাগিয়ে তোলা একেবারে কাম্য নয়। ‘দুটি সন্তানই যথেষ্ট’- এই বাণী পুনরুজ্জীবিত করে সেটাকেই জনগোষ্ঠীর সামনে নিয়ে আসা হচ্ছে যা জনসংখ্যা সমস্যাকে সঙ্কটাপন্ন করতে পারে বলে বিশিষ্টজনও বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন। সরকারের নতুন এমন কর্মযোগ জন্ম নিয়ন্ত্রণের মূল কাঠামোকেই প্রশ্নবিদ্ধ করছে। বাংলাদেশে জনসংখ্যার হার কমে এলেও বৃদ্ধির সাবলীল গতিধারাকেও উপেক্ষা করা যাবে না। ফলে সরকারের নতুন নীতি প্রবর্তনের এটা মোটে উপযুক্ত সময় নয়। আরও একটি আশঙ্কার বিষয় দেশে জনসংখ্যা বৃদ্ধির হার ২.৩ এ অনেক বছর ধরে আটকে আছে। যেখানে এই হার ২ এর নিচ হওয়া সঙ্গত। যা স্পষ্টভাবেই দৃশ্যমান করে তোলে জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণে প্রত্যাশিত জায়গায় এখনও দেশ পৌঁছাতে পারেনি। স্বাধীনতার পরবর্তী বাংলাদেশ আগের তুলনায় অনেকখানি সফল হলেও কাক্সিক্ষত লক্ষ্য ধরতে না পারার আশঙ্কা থেকেই যায়। স্বাধীনতার আগে যেখানে ১৫-৪৯ বয়সী নারীরা গড়ে ৬টার বেশি সন্তান জন্ম দিতেন যার প্রজনন হার ছিল ৬.৪। এখন তা কমে দাঁড়ায় ২.৫ মতানৈক্যে ২.৩। সে সময় মাত্র ৮% দম্পতি জন্মনিয়ন্ত্রণ পদ্ধতি নিতেন। এখন সেখানে এমন ব্যবস্থাপনা গ্রহণ করে তেমন দম্পতি ৬৪%। তথ্যগুলোই প্রমাণ করে ক্রমান্বয়ে বাংলাদেশের জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণ একটা মোটামুটি অবস্থানে চলে এসেছে। তবে বাল্য বিয়ের মতো সামাজিক অভিশাপকে ঠেকাতে না পারলে কাক্সিক্ষত গন্তব্যে পৌঁছা আসলেই কঠিন। বাল্য বিয়ে মানেই অকাল মাতৃত্বই শুধু বেশি সন্তান জন্ম দেয়ারও এক অপ্রত্যাশিত দায়ভাগ। নগর রাষ্ট্র ছাড়া বাংলাদেশ এখনও বিশ্বের সবচাইতে জনবহুল দেশ। অর্থাৎ ছোট্ট ভূখ-ের তুলনায় মাত্রাতিরিক্ত জনসংখ্যার ভার দেশটিকে বিপন্নতা থেকে সেভাবে মুক্তিও দিতে পারেনি। ফলে শুধু দুটি সন্তান যথেষ্ট বললে সরকার কোনভাবেই দায়মুক্ত হতে পারে না। বরং একটি হলে ভাল হয় তেমন বার্তা আগের মতই ছড়িয়ে দিতে হবে।

গত ১১ জুলাই পালিত হলো বিশ্ব জনসংখ্যা দিবস। এই দিবসের তাৎপর্যকে আমলে নিয়ে জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণে আরও সাবধান এবং সতর্ক হওয়া অত্যন্ত জরুরী। দক্ষ জনসম্পদ সমাজ বিনির্মাণের মূল কারিগর। আর সেই জনবল যদি প্রত্যাশিত জন্মহারে নিজেদের সংহত করতে না পারে তাহলে উন্নয়নের অগ্রযাত্রা সবার দ্বারে সেভাবে পৌঁছাবে না। গত বছর অক্টোবরে স্লোগান পরিবর্তনের পরিপত্র জারি করে পরিবার পরিকল্পনা অধিদফতর। আর এখানেই দুটি সন্তানকেই সমান গুরুত্ব দেয়া হয়েছে। শুধু ১টির বেলায় কোন বক্তব্যই আসেনি।

এসব নিয়ে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা চীনের দৃষ্টান্ত খাড়া করেন- যেখানে শুধু একটি সন্তানের কথা বলা হলেও সরকার বর্তমানে তা থেকে সরে আসে। চীনও জনবহুল দেশ। তবে বিশাল ভূখন্ডের জনসংখ্যার চাপ সেভাবে দৃশ্যমান নয়। যা বাংলাদেশের জন্য বেশি সমস্যা। কোন দেশের কাঠামোগত যে সুনির্দিষ্ট প্রতিবেশ তারই আলোকে তার উন্নয়ন প্রকল্পগুলো হাতে নেয়া হয়। বাংলাদেশের ক্ষেত্রেও সেটাই অবধারিত হওয়া সঙ্গত।