২৩ জুলাই ২০১৯  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

‘কতদূর এগোলো মানুষ’ যাত্রার আসরে নাগরিক প্রেমের নির্যাস!

  • অংশুমান ভৌমিক

১০ আষাঢ় বা ২৪ জুন সন্ধের কথা। বাংলাদেশ আন্তর্জাতিক নাট্যোৎসবের রোশনাইতে যখন বাংলাদেশ শিল্পকলা এ্যাকাডেমির উঠোনে নতুন জেল্লা এসেছে আর নেপাল থেকে আসা নাটুয়ার দলের কেরামতি দেখতে পাঁচমশালি ভিড় উঠছে জাতীয় নাট্যশালার সিঁড়ি বেয়ে তখন এক্সপেরিমেন্টাল থিয়েটার হলে একটা অবাক করা নাটক হলো। নাটক না বলে যাত্রা বলাই বুঝি শ্রেয়। অপেরা স্বরূপকথা নামের যে দল এই আসর বসিয়েছিলেন তারাও এই ব্যাপারটাকে ‘নিরীক্ষণ যাত্রাপালা’ নামে চালাতে তৎপর ছিলেন। এক্সপেরিমেন্টাল থিয়েটারের নমনীয় পরিকাঠামোকে ভেঙ্গে চুরে হামেশাই যাত্রা হয়। যাত্রার ঢঙে মঞ্চনাটক হয়। কিন্তু ‘নিরীক্ষণ যাত্রাপালা’ কী করতে চায়? তার ওপর তাদের আমন্ত্রণপত্র থেকে জানা যাচ্ছে যে আল মাহমুদের সোনালি কাবিনের অনুসরণে ‘কতদূর এগোলো মানুষ’ নামের এই পালার বিকাশ। তাই তো! পালার নামেই তো আল মাহমুদের প্রবাদপ্রতিম কবিতার প্রথম পঙক্তির সূত্র। তার ওপর দেখা গেল ঢাকার মঞ্চনাটকের কুশীলবরাই এর পেছনে আছেন, সামনে আছেন। কৌতূহল হয়েছিল। ভাগ্যিস হয়েছিল।

কতক প্রসেনিয়ামের গতে সাজানো রঙ্গমঞ্চ। চাইলে দু’পাশের গ্যালারি থেকেও দেখা যায়। যাত্রার রেওয়াজ মাফিক মঞ্চের ওপর একটা চৌকো মতন পাটাতন। সাইক্লোরামার আড়াল ঘুচে যাওয়ায় দেখছি মঞ্চে ওঠা আর নামার জন্য পেছনদিকে দু’পাশ দিয়ে দুটো সিঁড়ি নেমে গেছে সাজঘরের দিকে। কনসার্ট বাজিয়ে পালা শুরু। বাজছে কর্নেট ক্ল্যারিওনেট হারমোনিয়াম কিবোর্ডের পাশাপাশি তবলা মন্দিরা। উদ্দীপক মেজাজে। আর তারপর বাংলাদেশের নিশানরঙা শাড়ি-জামায় মঞ্চে এলেন সুরভি রায়। তার গলায় আব্দুল লতিফের সেই বিষাদসিন্ধু, ‘আমি দাম দিয়ে কিনেছি বাংলা’। মর্মভেদী তার আকুতি। দেশের গানের খেই ধরে এসে পড়লেন বিবেক (শংকর সরকার)। তার গানের ধুয়ো হয়ে এলেন আল মাহমুদ। প্রচলিত ঘরানার গানের মাঝে সাঝে ‘প্রকৃতি’র পংক্তি গুঁজে দেয়ায় চমৎকার এক আবেশ তৈরি হলো মিথোস্ক্রিয়ার। এরপর কথা নেই বার্তা নেই তিড়িং বিড়িং করে ‘আমি যে জলসাঘরে বেলোয়ারি ঝাড়’ নেচে গেয়ে গেল দুই কিশোর।

ততক্ষণে ২০ মিনিট পেরিয়েছে। মনে মনে প্রমাদ গুনছি এমন সময় একে একে মঞ্চে এলেন জয়িতা মহলানবীশ ও জাফরুল স্বপন। তারাই মূল পালার যুগল কুশীলব। আল মাহমুদের কবিতার নারী ও পুরুষ। প্রথমজনের ভিত পাকা হয়েছে নগরনাট্যের শীলিত শিক্ষায়। দ্বিতীয়জনের সিদ্ধি হয়েছে যাত্রার জমাট আসরে। প্রথমার জিহ্বাগ্রে প্রমিত বাংলার কাব্যিক মূর্ছনা। দ্বিতীয়ের জবানে সুরেলা প্রক্ষেপণের মেঠো তাঁত। এ যেন বাংলাদেশের বুকের ভেতর অন্তঃসলিলা গ্রাম-নগরের আঁতের কথার বিনিময়। সোনালি কাবিনের রন্ধ্রে রন্ধ্রে যে চারু সংলাপের বীজ আছে, যে নাটকীয় টানাপোড়েন আছে বা আছে যে ইন্দ্রিয়ঘন ইশারার লেনদেন। তাকে যাত্রার আদলে গড়ে নিয়েছিলেন এ পালার মুখ্য কারিগর জাফরুল। মঞ্চের পাশেই রেখেছিলেন এক প্রম্পটার-কাম-স্টেজ ম্যানেজারকে। তার যোগানো কথা কি বড় যান্ত্রিকভাবে বলে যাওয়া হলো? অহেতুক বদলাতে থাকল কুশীলবদের অবস্থান? ‘এ-তীর্থে আসবে যদি ধীরে অতি পা ফেলো সুন্দরী/ মুকুন্দরামের রক্ত মিশে আছে এ-মাটির গায়/ছিন্ন তালপত্র ধরে এসো সেই গ্রন্থ পাঠ করি/কতো অশ্রু লেগে আছে এই জীর্ণ তালের পাতায়’। এই উচ্চারণের আড়ালে যে আলকুশি আদর আছে তা কি অধরা রইলো জাফরুলের উচ্চারণে? বুদ্ধদেব বসুর কাব্যনাট্যে দীক্ষা থাকায় যে সুবিধে পাচ্ছিলেন জয়িতা, তাকে কি ছাপিয়ে গেল অযথা শ্বাসাঘাত? ‘আমিই মৃত্তিকা আমিই প্রকৃতি’ এই উচ্চারণের মধ্যে কি ঢুকে পড়ল অনুভবের অনুপস্থিতি? মঞ্চের ওপর জয়িতা-জাফরুলের প্রেম কি আঙ্গিকের তেলে-জলে মিশ খেল না? এ প্রশ্ন বুঝি সঙ্গত নয়। যেমন অসঙ্গত যাত্রার চড়া আন্দাজে বেজে চলা চিরচেনা কনসার্টের মধ্যে ফাঁকফোকর খোঁজা। মহড়ায় ঘাটতি ছিল বিলক্ষণ। তাতে কিঞ্চিৎ রসভঙ্গ হলো। ঐ এ্যান্টনি ফিরিঙ্গীর গান কি খামোখা এলো? হয়তো যাত্রার রসনিষ্পত্তির নতুন সূত্র মেনেই সে সব হলো। কারওর মনে ধরল, কারওর ধরল না। তাই বলে ১৯৭৩ খ্রিষ্টাব্দের বাংলাদেশের খোয়াবনামা বৃথা গেল না। প্রায় অর্ধশতক পরের বাংলাদেশ তাকে নতুন করে চিনল। চিনল আল মাহমুদকে। এই চেনাজানা হলো প্রসেনিয়াম থিয়েটারের আড়াল সরিয়ে। যাত্রাপালার শর্ত মেনে। মনসামঙ্গলের কৌম চিহ্ন বুকে এঁকে। একঘণ্টার পরিসরে যেটুকু সম্ভব। আগামীতে আরও ফলপ্রসূ উদ্ভাবনের সুতো ছেড়ে গেল ‘কতদূর এগোলো মানুষ’। ‘আমাদের ধর্ম হোক ফসলের সুষম বণ্টন’। এমন সমাজতান্ত্রিক স্বপ্নজারিত স্বর জয়িতার গলা দিয়ে ভেসে এসে আজকের বাংলাদেশের ভেতরকার যে লুপ্ত মহাদেশের হদিস দিল তাও ভাবাল বৈকি!

এ পালা আমাদের মনে করিয়ে দিল যে বাংলাদেশের মঞ্চনাটক মাঝে মাঝেই যাত্রাপথে হেঁটেছে। এই সুবাদে সেলিম আল দীনের ‘গ্রন্থিকগণ কহে’ অনেকের মনে পড়বে। মনে পড়তে পারে কিছুদিন আগেই মঞ্চস্থ হওয়া আগন্তুক রেপার্টরির নাটক ‘ধলেশ্বরী অপেরা’। এ সবের মধ্যে নগরনাট্যের আয়নাতে গ্রামীণ নাট্য পরম্পরাকে চিনে নেবার আকাক্সক্ষা ছিল। ‘কতদূর এগোলো মানুষ’ আগাগোড়া এর উল্টোপথে চলল। যাত্রার আসরে এনে ফেলল নাগরিক প্রেমের আধুনিক নির্যাসকে। কোন শহুরে কথার হাত না ধরে মাধ্যম করল আল মাহমুদের কবিতার অস্তিবাদী স্বরকে। প্রথম অভিনয়ের পর দেখলাম ঘোর লাগা চোখে এক্সপেরিমেন্টাল থিয়েটারের গ্যালারি থেকে নেমে আসছেন মিলনকান্তি দে।

শুধোলাম, ‘কী, কেমন লাগল কিংবদন্তির?’ মুগ্ধতা মাখা গলায় উত্তর এলো, ‘এই প্রথম, এই প্রথম আধুনিক কবিতা থেকে যাত্রা হলো!’ সত্যিই তো! মৈমনসিংহ গীতিকা থেকে যাত্রা হয়েছে অনেক, হয়েছে রবীন্দ্রকবিতা থেকেও। হাজারো সঙ্কটে হাবুডুবুু খাওয়া যাত্রা এবারে নাগরিক নিঃসঙ্গতার আল ধরল। আল মাহমুদ আর ক’মাস বেঁচে থাকলে খুশি হতেন। তার পঙক্তি দিয়েই তো এই ভাঙ্গা সেতু বাঁধা হলো! এই আলোচনার একটি উপসংহার আছে। ‘কতদূর এগোলো মানুষ’-এর প্রযোজনাপত্রে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক আবুল হাসান চৌধুরীর একটি ‘শুভেচ্ছা বাণী’ ছাপা হয়েছে। তাতে জানা যাচ্ছে স্বরূপকথা বা অপেরা স্বরূপকথা নামের এই দলটির ঠিকানা পাবনা জেলার কাজিরহাট এলাকায়। গঙ্গা আর যমুনা মিলেমিশে গেছে যেখানে, সেই মহল্লায়। সেখানকার অনেকদিনের ‘সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের’ উত্তরাধিকার বইছে স্বরূপকথা। ‘গণনাগরিক যাত্রাপালার প্রত্যয়ে’ বুক বেঁধে ‘বিষধর মৌলবাদের দংশন থেকে বাঁচাতে চায় অসাম্প্রদায়িক ও ধর্মসমন্বয়ের মহিমায় সমুজ্জ্বল বাংলাদেশকে’। তাদের খোয়াইশ পূর্ণতা পাক।

নির্বাচিত সংবাদ
এই মাত্রা পাওয়া