১৬ জুলাই ২০১৯  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

পাঁচ পাতাল রেল ॥ রাজধানীর যানজট নিরসনে নতুন উদ্যোগ

পাঁচ পাতাল রেল ॥ রাজধানীর যানজট নিরসনে নতুন উদ্যোগ
  • মাটির ৫০ ফুট নিচে হবে লাইন ;###; ২০২৬ সালের ডিসেম্বরের মধ্যে যাত্রা শুরুর আশাবাদ

রাজন ভট্টাচার্য ॥ যানজট কাটিয়ে নগরীর এক প্রান্ত থেকে অপর প্রান্তে পৌঁছানোর সবচেয়ে আধুনিক বাহন হলো পাতাল রেল। ঢাকায় জনসংখ্যা ও যানবাহনের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে যানজটের ভোগান্তি। তাই যোগাযোগ বিশেষজ্ঞরা বলছেন, চলমান এই ধারা অব্যাহত থাকলে প্রায় দুই কোটি মানুষের নগরী দিন দিন আরও অচলের ধারায় যাবে। বাড়বে যানজটের মাত্রা। আগামী পাঁচ বছরের মধ্যে হাঁটার গতি আর গণপরিবহনের গতি সমান হবে। পরিস্থিতি বিবেচনায় নগরীর যানজট সমস্যা নিরসনে ম্যাস র‌্যাপিড ট্রানজিট লাইনের আওতায় রাজধানীতে পাঁচটি পাতাল-এলিভেটেড মেট্রোরেল নির্মাণের উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। ইতোমধ্যে সবকটি মেট্রোরেলের রুট ঠিক করা হয়েছে। আগামী ২০৩০ সালের মধ্যে সব লাইন চালুর কথা জানিয়েছে সড়ক পরিবহন মন্ত্রণালয়। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ২০২৬ সালের ডিসেম্বরের মধ্যে নগরীতে পাতাল রেলে যাতায়াত শুরু হবে। মাটির ৫০ ফুট নিচে নির্মাণ হবে লাইন। ঢাকা শহরে মাটির নিচে বিভিন্ন সেবা সংস্থার লাইন থাকায় নির্মাণ ব্যয় বিশ্বের অন্যান্য শহরের তুলনায় কিছুটা বেশি পড়বে। নির্মাণ কাজ সম্পন্ন হলে, নগরী হবে যানজটমুক্ত। যানজট নিরসনে একের পর প্রকল্প নির্মাণের পাশাপাশি রাজধানীর জনসংখ্যা কমানোর পরামর্শ দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা। তারা বলছেন, প্রাতিষ্ঠানিক বিকেন্দ্রীকরণ, ঢাকার বাইরে কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করা না গেলে শহরমুখী মানুষের স্রোত বন্ধ করা সম্ভব হবে না। মানুষ আসতে থাকলে বারবার প্রকল্প নির্মাণের প্রয়োজনীয়তা দেখা দেবে।

মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, পাঁচটি লাইনের মধ্যে ৩১ কিলোমিটারের বেশি এমআরটি-১ দুই ভাগে বিভক্ত। এর মধ্যে বিমানবন্দর থেকে কমলাপুর রেলস্টেশন পর্যন্ত একটি, অপরটি নতুনবাজার থেকে পূর্বাচল ডিপো পর্যন্ত। গাবতলী থেকে চট্টগ্রাম রোড পর্যন্ত ২৪ কিলোমিটার হবে এমআরটি-দুই। হেমায়েতপুর থেকে ভাটারা পর্যন্ত ২০ কিলোমিটার এমআরটি-পাঁচ (উত্তর), গাবতলী থেকে দাশেরকান্দি পর্যন্ত ১৭ কিলোমিটারের বেশি এমআরটি-পাঁচ (দক্ষিণ), কমলাপুর থেকে নারায়নগঞ্জ পর্যন্ত ১৬ কিলোমিটার এমআরটি-৪ লাইন চূড়ান্ত হয়েছে।

লাইন ১, ২, ৪ ও ৫-এর আওতায় উড়াল ট্রেনের পাশাপাশি পাঁচটি পাতাল মেট্রোরেল রুট নির্মাণ করা হবে। সব মিলিয়ে ১০৯ কিলোমিটার পথ চূড়ান্ত হয়েছে। ঢাকা ম্যাস ট্রানজিট কোম্পানি লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক এম এ সিদ্দিক জানান, ২০২৬ সালের ডিসেম্বরের মধ্যে নগরবাসী পাতাল রেলে চড়তে পারবেন। আমরা আশাবাদী ২০৩০ সালের মধ্যে সবকটি প্রকল্পের কাজ শেষ হবে। তিনি বলেন, নগরীর সব ভবনের ডিজাইন এক রকম নয়। তাই লাইন নির্মাণের ক্ষেত্রে খুব সাবধানতা অবলম্বন করতে হবে। ঝুঁকি এড়াতে যেসব পয়েন্টে পাতাল লাইন হবে সেখানে ৫০ ফুট মাটির নিচে হবে নির্মাণ কাজ।

তিনি বলেন, মহানগরীর পূর্ব থেকে পশ্চিমে সংযোগ বাড়াতে মেট্রোরেল লাইন-৫ নির্মাণের উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। এ লাইনের মাধ্যমে দুটি রুট নির্ধারণ করা হয়েছে। একটি সাউথ (দক্ষিণ) রুট ও অন্যটি নর্থ (উত্তর) রুট। নর্থ রুটের আওতায় ২০২৮ সালের মধ্যে উড়াল ও পাতাল রেলের সমন্বয়ে প্রায় ২০ কিলোমিটার লাইনের নির্মাণ কাজ শেষ হবে। সাভারের হেমায়েতপুর থেকে পূর্বে ভাটারা থানা পর্যন্ত এই রুটটি নির্ধারণ করা হয়েছে। সবকটি প্রকল্পের কাজ শেষ হলে নগরীর যানজট সমস্যা কমে আসবে বলে মনে করে সাবেক এই সড়ক সচিব।

এমআরটি লাইন-এক ॥ দেশের প্রথম আন্ডারগ্রাউন্ড বা পাতাল মেট্রোরেল হবে এটি। ৩১ দশমিক ২৪১ কিলোমিটার দীর্ঘ এই লাইনের দুটি অংশ রয়েছে। এর একটি বিমানবন্দর থেকে কমলাপুর পর্যন্ত ১৯ দশমিক ৮৭২ কিলোমিটার। এই লাইনে স্টেশন সংখ্যা হবে ১২টি। এগুলোর মধ্যে রয়েছে বিমানবন্দর, বিমানবন্দর টার্মিনাল-৩, খিলক্ষেত, যমুনা ফিউচারপার্ক, নতুন বাজার, উত্তর বাড্ডা, বাড্ডা, হাতিরঝিল, রামপুরা, মালিবাগ, রাজারবাগ ও কমলাপুর। নতুন বাজার থেকে পূর্বাচল ডিপো পর্যন্ত অপর লাইনের দৈর্ঘ্য ১১ দশমিক ৩৬৯ কিলোমিটার। এই লাইনে নয়টি স্টেশনের মধ্যে রয়েছে নতুন বাজার, যমুনা ফিউচার পার্ক, বসুন্ধরা, পুলিশ অফিসার্স হাউজিং সোসাইটি, মাস্তুল, পূর্বাচল সেন্টার, পূর্বাচল সেক্টর-৭ ও পূর্বাচল ডিপো।

এরই মধ্যে এই রুটের সম্ভাব্যতা যাচাইসহ বিভিন্ন সার্ভে শেষ হয়েছে। মূল নক্সা প্রণয়নের ৭০ ভাগ কাজও সম্পন্ন হয়েছে। এ রুটের নির্মাণ কাজ শেষ হবে ২০২৬ সালের মধ্যে। এর ব্যয় ধরা হয়েছে ৫১ হাজার ৯০০ কোটি টাকা। রুটের একটি অংশের ৩ হাজার ৮৯৫ কোটি টাকার ঋণ চুক্তি ২৯ মে জাপান সফরকালে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার উপস্থিতিতে স্বাক্ষরিত হয়েছে।

এমআরটি লাইন-২ ॥ ২০৩০ সালের মধ্যে গাবতলী থেকে চট্টগ্রাম রোড পর্যন্ত আন্ডারগ্রাউন্ড ও এলিভেটেড সমন্বয়ে প্রায় ২৪ কিলোমিটার দীর্ঘ মেট্রোরেল নির্মিত হবে। এ লক্ষ্যে ২০১৭ সালের ১৫ জুন জাপান ও বাংলাদেশ সরকারের মধ্যে সহযোগিতা স্মারক সই হয়। এরই ধারাবাহিকতায় ২০১৭ সালের ৬ ডিসেম্বর জাপান-বাংলাদেশের অংশগ্রহণে ইতোমধ্যে অন্তত তিনটি প্ল্যাটফরম সভা অনুষ্ঠিত হয়েছে। প্রকল্প বাস্তবায়নে অর্থনৈতিক বিষয় সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটি ২০১৮ সালের আট নবেম্বর নীতিগত অনুমোদন দিয়েছে। এর সম্ভাব্য রুট হলো গাবতলী-বসিলা-মোহাম্মদপুর বিআরটিসি বাস স্ট্যান্ড-সাত মসজিদ রোড-ঝিগাতলা-ধানমন্ডি-২ নম্বর রোড- সায়েন্সল্যাব-নিউমার্কেট-নীলক্ষেত-আজিমপুর-পলাশী-শহীদ মিনার-ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ-পুলিশ হেড কোয়াটার্স-গোলাপশাহ মাজার- বঙ্গ ভবনের উত্তর পাশের সড়ক-মতিঝিল-আরামবাগ-কমলাপুর-মুগদা-মান্ডা-ডেমরা হয়ে চট্টগ্রাম রোড।

এমআরটি লাইন-৪ ॥ ২০৩০ সালের মধ্যে কমলাপুর-নারায়ণগঞ্জ রেলওয়ে ট্রাকের নিচ দিয়ে প্রায় ১৬ কিলোমিটার দীর্ঘ পাতাল মেট্রোরেল নির্মাণের পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়েছে। চলতি বছরের ১৯ মার্চ জাপান ও বাংলাদেশ সরকার এবং জাপানের বেসরকারী বিণিয়োগকারীদের অংশগ্রহণে বাংলাদেশে অনুষ্ঠিত তৃতীয় প্ল্যাটফরম সভায় ও ১৫ জুন ২০১৭ জাপান-বাংলাদেশ সরকারের মধ্যে স্বাক্ষরিত সমঝোতা স্মারকের আওতায় পিপিপি পদ্ধতিতে এই লাইন নির্মাণের প্রস্তাব করা হয়েছে।

এমআরটি লাইন-৫ নর্থ ॥ ২০২৮ সালের মধ্যে হেমায়েতপুর থেকে ভাটারা পর্যন্ত আন্ডারগ্রাউন্ড ও এলিভেটেড সমন্বয়ে ২০ কিলোমিটার দীর্ঘ (আন্ডারগ্রাউন্ড ১৩ দশকি ৫০ কিলোমিটার এবং এলিভেটেড ছয় দশমিক ৫০ কিলেমিটার) ও ১৪ স্টেশন (নয়টি আন্ডারগ্রাউন্ড এবং পাঁচটি এলিভেটেড) বিশিষ্ট মেট্রোরেল নির্মাণে ইতোমধ্যে সম্ভাব্যতা সমীক্ষা শেষ হয়েছে। প্রকল্পের ইঞ্জিনিয়ারিং সার্ভিসের জন্য জাইকার সঙ্গে সাত হাজার ৩৫৮ মিলিয়ন ইয়েন চুক্তি সম্পন্ন হয়েছে। এ রুট নির্মাণে ব্যয় হবে ৪১ হাজার ২৬১ কোটি টাকা। এই প্রকল্পের রুট হলো হেমায়েতপুর-বালিয়ারপুর-মধুমতি-আমিনবাজার-গাবতলী-দারুস সালাম-মিরপুর-১, মিরপুর-১০, মিরপুর-১৪, কচুক্ষেত-বনানী-গুলশান-২-নতুন বাজার ও ভাটারা।

এমআরটি লাইন-৫ সাউথ ॥ ২০৩০ সালের মধ্যে গাবতলী থেকে দাশেরকান্দি পর্যন্ত পাতাল রেল ও উড়াল রেলের সমন্বয়ে ১৭ দশমিক ৪০ কিলোমিটার পথ ও ১৬ স্টেশন বিশিষ্ট মেট্রোরেল নির্মাণের প্রাথমিক সম্ভাব্যতা যাচাই করা হয়েছে। এর মধ্যে ১২ দশমিক ৮০ কিলোমিটার আন্ডারগ্রাউন্ড ও চার দশমিক ৬০ কিলোমিটার এলিভেটেড নির্মাণ হবে। মোট স্টেশনের মধ্যে ১২টি আন্ডারগ্রাউন্ড ও চারটি এলিভেটেড নির্মাণ করা হবে।

গত মার্চ মাসে এর সমীক্ষা শেষ হয়েছে। এ রুটের শ্রেণীবিন্যাস হচ্ছে, গাবতলী-টেকনিক্যাল-কল্যাণপুর-শ্যামলী-কলেজগেট-আসাদগেট-রাসেল স্কয়ার-পান্থপথ-সোনারগাঁও মোড়-হাতিরঝিল-নিকেতন-রামপুরা-আফতাব নগর-পশ্চিম আফতাবনগর সেন্টার-আফতাব নগর পূর্ব ও দাশেরকান্দি। প্রকল্প নির্মাণের মোট ব্যয় ধরা হয়েছে তিনশত ২৩ কোটি টাকা।

জানতে চাইলে সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের বলেন, ‘শুধু এমআরটি লাইন-৬ বা উড়াল মেট্রোরেল প্রকল্প বাস্তবায়ন করলেই যানজট শেষ হবে না। এর ছয়টি লাইনের পুরোপুরি কাজ শেষ করতে হবে। এজন্য আমরা কাজ চালিয়ে যাচ্ছি। এরই মধ্যে উড়াল পথের পাশাপাশি পাতাল পথও থাকছে। ২০৩০ সালের মধ্যে এর পুরো কাজ শেষ করার সিদ্ধান্ত হয়েছে। আশাকরি সবকটি লাইনের কাজ শেষ হলে নগরীর যানজট সমস্যা অনেকটাই সমাধান হবে।

জানতে চাইলে ঢাকা ম্যাস ট্রানজিট কোম্পানি লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক এম এ সিদ্দিক বলেন, ঢাকা মহানগরীর যানজট নিরসন এবং সক্ষমতা বাড়াতে ২০৩০ সালের মধ্যে ছয়টি মেট্রোরুট সমন্বয়ে একটি শক্তিশালী মেট্রোরেল ব্যবস্থাপনা গড়ে তোলার পরিকল্পনা নিয়েছে সরকার। এসব মেট্রোরেলের রুটের কাজ দ্রুত গতিতে এগিয়ে চলছে। উড়াল মেট্রোরেল নির্মাণের পাশাপাশি পাতাল মেট্রোরেলও নির্মাণ করা হবে। এমআরটি লাইন ১, ২, ৪ ও ৫-এ উড়াল পথের পাশাপাশি পাতাল পথও থাকছে।

যোগাযোগ বিশেষজ্ঞ আশীষ কুমার দে সরকারের যানজট নিরসনে পাঁচটি উড়াল ও পাতাল সড়ক নির্মাণের উদ্যোগকে স্বাগত জানিয়ে বলেন, আধুনিক এই সেবা দেয়া ছাড়া নগরীর যানজট সমস্যা সমাধান সম্ভব নয়। বিশ্বের বিভিন্ন দেশের জনবহুল সিটিগুলোতে মেট্রো ও পাতাল রেল নির্মাণের মধ্য দিয়ে যানজট থেকে মুক্তি মিলেছে। আমরাও আশাবাদী ২০৩০ সালের মধ্যে যদি সব প্রকল্পের কাজ শেষ হয় তাহলে যানজট হ্রাস পাবে। তবে ঢাকামুখী মানুষের স্রোত কমাতে সরকারের পক্ষ থেকে জরুরী পদক্ষেপ নেয়ার দাবি জানান তিনি।

এই মাত্রা পাওয়া