১৯ আগস্ট ২০১৯  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

প্রতিরোধে পুরুষদেরই এগিয়ে আসতে হবে

  • কবীর চৌধুরী তন্ময়

বন্যতা থেকে বর্বরতা আর বর্বরতা থেকে মানুষ ধীরে ধীরে সুশৃঙ্খল জীবনযাপনে এগিয়ে আজকের এই সময়ে এসে সামাজিক, অর্থনৈতিক, সাংস্কৃতিক কর্মকা- দ্বারা তাদের জীবন প্রবাহের মান উন্নয়ন করেছে। আর এই বর্বরতা থেকে হোমো স্যাপিয়েন্স তথা জ্ঞানী মানুষের আবির্ভাব দুই লাখ বছর আগে হলেও মানব সভ্যতার গোড়াপত্তন হয়েছে আজ থেকে মাত্র পাঁচ হাজার বছর আগে। অভিধানের ভাষায়, সভ্য জাতির জীবনযাত্রা নির্বাহের পদ্ধতি, সাহিত্য, শিল্প, বিজ্ঞান, দর্শন, ধর্ম ও বিদ্যার অনুশীলনহেতু মন-মগজের উৎকর্ষ সাধন করাই হচ্ছে সভ্যতা। আর মানুষের মন মগজে কী হচ্ছে- এটি দৃশ্যমান নয়, গবেষণার বিষয়। এই মানুষ তার সকল কাজ সম্পাদন করে থাকে মন মগজের নির্দেশনা থেকে।

ধর্ষণ ও মন মগজের বহির্প্রকাশ। আর মানব সভ্যতার আদিকাল থেকেই এই ধর্ষণের ঘটনা ঘটে আসছে। তখনকার সময়ে ধর্ষণকেও ধর্ষণ বলে মনে করত না। অনেকের মতে, মানব সভ্যতার শুরুটা ছিল মাতৃতান্ত্রিক। সময়ের বিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে এটি পুরুষতান্ত্রিক হয়ে উঠে। আর তখন থেকেই একশ্রেণীর পুরুষ মনে করে, মেয়ে মানুষ হচ্ছে তাদের অন্য আর দশটা সম্পত্তির মতোই ভোগ্যপণ্য সম্পত্তির একটি। তাই নারীকে যেমন ইচ্ছে তেমনিভাবে ভোগ-বিলাস করার প্রবণতা সৃষ্টি হয় কতিপয় পুরুষের মন-মগজে। পুরুষতান্ত্রিক সমাজ-সভ্যতার দৃষ্টিকোণে ধীরে ধীরে এটি স্বাভাবিক হয়ে উঠে। তখন নারীকে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করতে শুরু করে। যেমন, শত্রুকে চূড়ান্তভাবে অপমান-অপদস্ত করার একটি অনুষঙ্গ হলো প্রতিপক্ষের মা-বোনদের ধর্ষণ করা। আর এই ধর্ষণ-হত্যার মধ্যেই শত্রুপক্ষের পরাজয় বিবেচনা করা হতো যা আমাদের মহান মুক্তিযুদ্ধে চার লাখেরও বেশি নারীর সম্ভ্রম বিনাশ করার মাধ্যমে পাকিস্তানী হানাদার ও রাজাকার বাহিনী- এই চেষ্টাই করেছিল।

মানুষের মন মগজে এই ধর্ষণের উপস্থিতি কেন বা কী কারণে হয়ে থাকে এটি খোঁজতে গিয়ে দেখি, ধর্ষণ করার প্রবণতায় ‘শিশু’ কিংবা ‘শত বছরের বৃদ্ধা নারী’কেও উপেক্ষা করছে না ধর্ষক। সাম্প্রতিক সময়ে টাঙ্গাইলের মধুপুর উপজেলার শত বর্ষের অন্ধ বৃদ্ধাকে ধর্ষণ করেছে ১৪ বছরের কিশোর। অন্যদিকে কয়েক মাসের কন্যাসন্তানও ধর্ষকের নোংরা থাবা থেকে রেহায় পায়নি, পাচ্ছে না। আবার এই ধর্ষণের শিকার হচ্ছে ছেলে শিশু পর্যন্ত। মূলত, মন মগজ দ্বারা পরিচালিত ধর্ষণ প্রবণতা ব্যক্তিবিশেষের ওপর নির্ভর করে ধর্ষণের প্রকারভেদ। কখনও কখনও প্রতিশোধ পরায়ণ, কখনও সুযোগ পেয়ে, কখনও নিজেই কৌশল নির্ণয় করে ধর্ষণের মত বর্বরতা করে থাকে।

বিখ্যাত নিউরোলোজিস্ট সাইকিয়াট্রিস্ট ফ্রয়েডের মতে, মানুষ মূলত তিনটি সত্তার সমন্বয়ে গঠিত। ইড, ইগো এবং সুপার ইগো। ‘ইড’ মানুষকে জৈবিক সত্তার দিকে নিয়ে যায়। মানব মনের স্বভাবজাত চাহিদা পূরণে ‘ইড’ বার বার উৎসাহিত করে তোলে। সহজ করে বললে, মানুষের মন যা চায় তাই পূরণে এই ‘ইড’ কাজ করে। আর ‘ইড’ মানুষ এবং পশুর মাঝে সমানভাবে বিরাজমান। ইড-এর কোন মানবিক দিক বা বিকাশ নেই। এর পুরোটায় মানুষ কিংবা পশুর লোভ-লালসা আর কাম চিন্তায় ভরপুর। ‘ইড’ মানুষের ভেতরের এক প্রকার সুপ্ত পশু যার প্ররোচনায় মানুষ যে কোন অসামাজিক, অনৈতিক, অপরাধ থেকে শুরু করে খুন-ধর্ষণের মতো বর্বর কর্মকা- করতেও দ্বিধাবোধ করে না।

‘ইড’ আর ‘সুপার ইগো’র মাঝখানে বসবাস ‘ইগো’। ‘ইগো’র কাজ হচ্ছে ‘ইড’ এর কাজগুলোকে ঘুরিয়ে পেঁচিয়ে বাস্তবায়ন করা, সেদিকে মানুষকে প্ররোচিত করা।

আর ‘সুপার ইগো’ হচ্ছে- মানুষের বিবেক। ‘ইড’ যখন জৈবিক কামনা বাসনা পূরণ করতে উদ্দীপ্ত করে তোলে, তখন ‘সুপার ইগো’ একে বাধা দেয়। ‘সুপার ইগো’ মানুষকে সব সময় মানবিক হতে সহায়তা করে, ভাল কাজ করতে উদ্দীপ্ত করে। যদিও সুপার ইগোর প্রতি অবিচল থাকা নির্ভর করে ব্যক্তির নৈতিক, পারিবারিক, প্রাতিষ্ঠানিক এবং সামাজিক শিক্ষা এবং মূল্যবোধের উপর।

এখন প্রশ্ন আসতে পারে, পরিবার থেকে আমরা কী শিখে এসেছি বা শিখছি! প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা কাঠামো আমাদের কী ধরনের মূল্যবোধ শিখিয়েছে বা শিখাচ্ছে?

আমাদের পুরুষতান্ত্রিক সমাজ-সংসারে সন্তানের সামনেই বাবা-মাকে প্রহার করছে। অশ্লীল ভাষায় গালাগালিসহ শারীরিক নির্যাতনও রুটিন কর্মকান্ড। পান থেকে চুন খসলেই নারীর ওপর পুরুষের নির্যাতন- এই শিক্ষাটা পরিবার থেকেই প্রথমে পেয়ে আসছে। অন্যদিকে নারীকে কন্ট্রোলে রাখতে হবে, তাদের বুদ্ধি-সুদ্ধি কম, নারী-পুরুষের সেবাদাসী, স্বামীর পায়ের নিচে স্ত্রীর বেহেস্ত, স্ত্রী থাকার পরেও অন্য নারীর সঙ্গে মেলামেশা, একটা নারী গেলে দশটা আসবে, পুরুষের জন্যই নারী, পুরুষ ইচ্ছে করলেই অনেকগুলো বিয়ে করতে পারে- এই ধরনের পারিবারিক কলহের মাঝেই ধীরে ধীরে যে ছেলেটি শিশু-কিশোরের বয়স পেরিয়ে যুবক হয়, তখন তার মাঝে নারীর প্রতি সম্মান-শ্রদ্ধাবোধ কাজ করে না।

ধর্ষণ নিয়ে বিস্তর গবেষণার প্রয়োজন আছে। এটি একক কোন ‘বিন্দু’র উপর নির্ভর নয়। আবার কোন একক ব্যক্তি, গোষ্ঠী বা শ্রেণীর মধ্যেই ধর্ষণ মনোভাব সীমাবদ্ধ নয়। স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয় থেকে মাদ্রাসার কতিপয় শিক্ষকও আজ ধর্ষণের অভিযোগে অভিযুক্ত। আবার মসজিদের ইমাম, মন্দিরের পুরোহিত বা ধর্মগুরুরাও এই ধর্ষণ কাজের অপরাধ থেকে নিজেদের আজও মুক্ত রাখতে পারেনি। কর্পোরেট হাউজ থেকে মিডিয়া হাউজগুলোও একই অভিযোগে অভিযুক্ত। সাম্প্রতিক মি’টুর আন্দোলন অনেক মিডিয়া ব্যক্তিত্বের মুখোশ খুলে দিয়েছে।

সাম্প্রতিক সময়ে বাংলাদেশে ধর্ষণের মাত্রা বেড়ে গেছে বলে অনেকে মিডিয়া ও সোশ্যাল মিডিয়ায় তার তীব্র প্রতিবাদসহ বিচারহীনতা, বিচারের দীর্ঘসূত্রতা, ধর্ষকের মৃত্যুদন্ড নিশ্চিত করতে না পারার ব্যর্থতাকে দায়ী করছেন। এটিকে উড়িয়ে দেয়ার যেমন সুযোগ নেই তেমনিভাবে (ভীত) তথ্য-উপাত্তকে উপেক্ষা করাও উচিত নয়। জাতিসংঘ কর্তৃক প্রকাশিত বিশ্ব ক্রাইম ট্রেন্ড রিপোর্টের ২০১৫ সালের ভার্সন থেকে জানা যায়, প্রতিবছর সবচেয়ে বেশি ধর্ষণের ঘটনা ঘটে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে। ১০টি দেশের তালিকায় এক নম্বর অবস্থানে আছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র। সাউথ আফ্রিকা, সুইডেন, ভারত, যুক্তরাজ্য, জার্মানি, ইউরোপের ফ্রান্স, উন্নত রাষ্ট্র কানাডা, শতভাগ শিক্ষার দেশ শ্রীলঙ্কা এবং দ’শে ইথিওপিয়া থাকলেও ধর্ষণ অপরাধে বিশ্বের অন্যতম বিপদজনক রাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশের নাম নেই।

অন্যদিকে, ধর্ষণের অপরাধে প্রকাশ্যে শিরচ্ছেদ, গুলি করে হত্যা, ঢিল মেরে মেরে হত্যা, ফাঁসি দিয়ে হত্যার দন্ড নিশ্চিত করা দেশগুলোতে আজও ধর্ষণ বন্ধ করা যায়নি বা কাক্সিক্ষত ফল অর্জন সম্ভব হয়নি। তাই বলে বিচারের নামে দীর্ঘ সময় পার করা, রাজনৈতিক নোংরা হস্তক্ষেপ, বিচারহীনতার অপসংস্কৃতি গ্রহণযোগ্য নয়। সময়ের প্রয়োজনে আইনের ধারাও পরিবর্তন, পরিবর্ধন করা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে পড়েছে। আর চলমান আইনের ১৮০ কার্যদিনের মধ্যে বিচারকাজ সম্পন্ন ও দৃষ্টান্ত শাস্তি নিশ্চিত করার বার্তা মিডিয়ার মাধ্যমে, আলোচনা-সমালোচনার মাধ্যমে সর্বস্তরে ছড়িয়ে দিতে হবে। ধর্ষণ, হত্যাসহ সামাজিক অবক্ষয় নিয়ন্ত্রণ-রোধ করতে রাষ্ট্র, রাষ্ট্রযন্ত্র ও মিডিয়ার সমন্বয়ে জনসচেতনামূলক কর্মকা-ের উদ্যোগ নিতে হবে। প্রয়োজনে স্থানীয় সরকারকে কাজে লাগিয়ে পাড়ায়, মহল্লায় যৌননিপীড়ন ‘সেল’ বা ‘কমিটি’ গঠন করা উচিত। মসজিদগুলোতে প্রতি শুক্রবার খুদবার আগে শিশু-নারী নির্যাতন, ধর্ষণ-হত্যা নিয়ে ইমাম কর্তৃক আলোচনা নিশ্চিত করতে হবে। স্থানীয় জনপ্রতিনিধি, শিক্ষক, ধর্মপ-িত দ্বারা উঠান বৈঠকের আয়োজনের মাধ্যমে স্থানীয়ভাবে ‘নারী ও শিশু নির্যাতন’ নিয়ে আলোচনা এবং তার বিপরীতে প্রচলিত আইনে কী শাস্তির বিধান আছে- এসব বিষয়ে স্থানীয়ভাবে সচেতন-সাবধান করতে হবে।

সরকারী-বেসরকারী সব প্রতিষ্ঠান, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে যৌন নিপীড়নবিরোধী সেল গঠন করতে দেশের সর্বোচ্চ আদালত নির্দেশ দিয়েছেন সেই ২০০৯ সালে। নতুন করে (১০ জুলাই, ২০১৯) শিশু নির্যাতন রোধে দেশের প্রতিটি স্কুলে অভিযোগ বক্স রাখার নির্দেশ দিয়েছেন হাইকোর্ট। আমি মনে করি, ধর্ষণ অপরাধে বিশ্বের অন্যতম বিপজ্জনক রাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশের নাম তালিকাভুক্ত হওয়ার আগেই আদালতের নির্দেশনা বাস্তবায়ন সময়ের গুরুত্বপূর্ণ মানবিক দায়িত্ব হয়ে পড়েছে।

ধর্ষণের মতো বর্বরতার হাত থেকে পুরুষতান্ত্রিক সমাজকে অপরাধমুক্ত করতে হলে সর্বপ্রথম আমাদের পুরুষদেরই এগিয়ে আসতে হবে। নারীদের আরও সচেতন, প্রতিবাদমুখর হওয়া উচিত। সেইসঙ্গে আমাদের ‘সুপার ইগো’ বা ‘মানুষের বিবেক’ জাগ্রত করার মাধ্যমে মানবিক মূল্যবোধ নিশ্চিত করতে পরিবার থেকে রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ ব্যক্তিকে গবেষণা করে সিন্ধান্ত নিতে হবে। শিশু-কিশোর থেকেই নৈতিকতা বা বিবেকবোধ সুস্থ করে গড়ে তুলতে হলে পারিবারিক, প্রাতিষ্ঠানিক এবং সামাজিক শিক্ষা এবং মূল্যবোধের উপর আমাদের জোর দিতে হবে।

লেখক : সভাপতি, বাংলাদেশ অনলাইন এ্যাক্টিভিস্ট ফোরাম (বোয়াফ)

kabir_tanmoy@yahoo.com