২১ আগস্ট ২০১৯  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

সামাজিক সুরক্ষায় শুভ বুদ্ধির উদয় হোক

  • নাজনীন বেগম

সমাজবদ্ধ মানুষরা বিধি নিষেধের শৃঙ্খলিত জীবনে নিজেদের সংহত করে। যুগ যুগ ধরে গড়ে ওঠা সামাজিক সংস্কার, আইনী কার্যক্রম, ধর্মীয় বোধ, সুস্থ মানবিক চেতনা, মানুষের প্রতি দায়বদ্ধতায় এক সঙ্গে পারস্পরিক সম্পর্কের ভিত্তিতে সমাজ নামক বৃহৎ প্রতিষ্ঠানটির কর্মপ্রক্রিয়া এগিয়ে যায়। সবচেয়ে প্রয়োজনীয় বিষয়টি হলো মানুষের সঙ্গে মানুষের সম্পর্কের চৌহদ্দীতে সামাজিক মূল্যবোধের যে অনবদ্য বাধন তৈরি হয় তারও একটি সুস্থ, নিশ্চিত গতিধারা প্রতিষ্ঠানটিকে নিয়তই পরিশীলিত করে।

সমাজ তার ঐতিহ্যকে ধারণ করে, যথার্থ আন্দোলন, সংগ্রামের অনুবর্তী হয় তারচেয়েও বেশি নতুন সময়কে যুক্ত করার এক অভাবনীয় কর্মদ্যোতনায় নিবেদিত হয়। মানুষের সঙ্গে মানুষের মেলবন্ধনই যেখানে অবধারিত চেতনা সেখানে হানাহানি, স্বার্থপরতা, হীনম্মন্যতা এবং ভয়ঙ্কর বিপদ সঙ্কেত সুস্থ জীবনধারাকে দৃশ্যমান করে তোলে না। যেখানে মানুষের প্রতি মানুষের মমত্ববোধ ধুলায় লুণ্ঠিত হয়, মনুষ্যত্বের অপমান আর মানবতার অসম্মান তীক্ষè কাঁটার মতো ক্ষত বিক্ষত করে, সেই সমাজের নিরাপত্তা বলয় যদি প্রশ্নবিদ্ধ হয়, তাহলে সামাজিক বন্ধনের ভিত্তি দুর্বল হতেও সময় লাগে না। সমাজবদ্ধ মানুষকে যখন অস্থির সময়গুলোকে সামলাতে গিয়ে হরেক রকম সঙ্কটের আবর্তে পড়তে হয় সেটাও কোন সুষ্ঠু প্রবাহকে নির্দেশ করে না। বর্তমানে আমাদের বাংলাদেশ বিভিন্নভাবে অনেক অপ্রত্যাশিত দুর্ঘটনাকে মোকাবেলা করছে যা কোনভাবেই কাক্সিক্ষত নয়। মারামারি, হত্যা, ধর্ষণের মতো ঘটনাপ্রবাহ যে মাত্রায় সবাইকে শঙ্কিত করে তুলছে সেটাকে আমলে নিয়েও বলা যায়, এমন অঘটন খুব বেশি নয়। তবে ভয়ঙ্কর ও পৈশাচিক অপরাধ যতই কম হোক না কেন তার ভয়াবহতার মাত্রা অনেক বেশি। যার কারণে সামাজিক বলয়ে তার নেতিবাচক প্রতিক্রিয়ায় জনগোষ্ঠী অস্বস্তিবোধ করে, বিপন্ন পরিস্থিতিতে দিশেহারা হয়, উদ্বিগ্নতার সময় পার করা ছাড়া কোন পথও থাকে না।

অপরাধ একটি বহুল আলোচিত সামাজিক ব্যাধি। যা সমাজের স্বাভাবিক গতিধারায় বিচ্যুতি ডেকে আনে। অপরাধ বিজ্ঞানীরা বলেন, সামাজিক অন্যায়গুলো মূলত কোন মানুষের বংশগত কিংবা মজ্জাগত নয়। তাৎক্ষণিকভাবে মানসিক অসংহত মনোবৃত্তি যদি তার আয়ত্তের বাইরে চলে যায় সেখানে অপরাধের মতো মারাত্মক ব্যাপার ঘটতে সময় লাগে না। তবে স্থির পরিকল্পনায় ঠা-া মাথায় খুন করার নজিরও ক্রমে বেড়ে যাচ্ছে। রাজনৈতিক হানাহানি, ক্ষমতার দ্বন্দ্ব, আধিপত্যের লড়াই, ব্যক্তিত্বের সংঘাত কিংবা কর্তৃত্বের উন্মত্তায় বর্তমানে এমন সব খুনোখুনি, ধর্ষণ, নির্যাতন, কিংবা অপহরণের ঘটনা হরহামেশাই বিপর্যয়কে ডেকে আনছে। আধুনিকতার বিস্তৃত বলয় আজ সাধারণ মানুষের হাতের নাগালে। নতুন সময়ের আধুনিক প্রযুক্তি এভাবে জনগোষ্ঠীকে নব চেতনায় উদ্দীপ্ত করছে, পাশাপাশি এর বিপরীত অপপ্রয়োগও তাকে নৃশংসতার পর্যায়ে নিয়ে যাচ্ছে। বর্তমানে অপরাধীরা তাদের অমানবিক ঘটনাগুলো ভিডিও করে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়েও দিচ্ছে। এমন অমানবিক পাশবিকতা ভাবাই যায় না। পরিকল্পিত উপায়ে সতীর্থদের হাতে কেরোসিন ঢেলে পুড়িয়ে দেয়ার ঘটনাও সারাদেশকে হতভম্ব করে দেয়। এখনও সর্বস্তরে নারীদের মানুষ ভাবার মানবিক মূল্যবোধ তৈরি হয়নি। যার কারণে নুসরাত এবং সায়মার মতো মেয়েরা জঘন্য মনোবিকৃতির শিকার হয়। রিফাতের মতো ছেলেরা প্রকাশ্যে দিবালোকে নিকটজনের উপস্থিতিতে মৃত্যুকে বরণ করে নিতে বাধ্য হয়। দূরে দাঁড়িয়ে এর কোন প্রতিকার না করে কেউ কেউ আবার ভিডিওর মাধ্যমে তা ছাড়িয়েও দিচ্ছে। এমন সব দৃশ্য আজ সমাজ ব্যবস্থাকে নানা মাত্রিকে শঙ্কিত করে তুলছে। বিশিষ্ট জনেরা বলছেন, বিচারহীনতার অপসংস্কৃতি কিংবা দীর্ঘসূত্রতার অপকৌশল থেকে বেরুতে না পারলে এসব জঘন্য অন্যায় ক্রমান্বয়ে বেড়েই যাবে।

শুধু আইন দিয়ে মনোবিকার কিংবা জিঘাংসার কুপ্রবৃত্তিকে ঠেকানো আসলেই মুশকিল। যে পশুশক্তি মানুষকে নৃশংসতার সর্বশেষ পর্যায় নিয়ে যায় যেখানে শুভবোধের উদয় সব থেকে জরুরী। অন্যায় করে পার পাওয়ার চাইতেও বেশি দরকার অপরাধ না করার সুস্থ মানবিক বোধ। শ্রেষ্ঠত্ব কিংবা ব্যর্থতার লড়াই, নয়ত নিজের জিঘাংসা চরিতার্থই শুধু নয়, পাশবিক বিকৃত বাসনার উন্মত্ততায় মানুষের শুভবুদ্ধি যখন নৃশংসতার কবলে পড়ে সেখান থেকে সাবধান, সতর্ক এবং সচেতনতায় নিজেকে মুক্ত করে আনাটাই এই মুহূর্তে করণীয়। বিচারিক প্রক্রিয়া কিংবা আইনের ফাঁক ফোকর তো অপরাধ সংঘটনের পরবর্তী পর্যায়। কিন্তু অপরাধপ্রবণতাকেই যে সবার আগে নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। এর জন্য সামাজিক সুষ্ঠু পরিবেশ যেমন অপরিহার্য, একইভাবে পারিবারিক শৃঙ্খলা এবং দায়বদ্ধতাকেও কোনমতেই অস্বীকার করা যায় না। পরিবার সমাজের ক্ষুদ্রতম প্রতিষ্ঠান হলেও এর আদি অন্ত পুরো সমাজের ওপর ব্যাপক হারে প্রভাবিত করে। পরিবার সমাজের আদি এবং অকৃত্রিম প্রতিষ্ঠান। যার মাধ্যমে এগিয়ে চলে সমাজের অন্য আনুষঙ্গিক কার্যক্রম। পরিবারই কোন সচেতন নাগরিকের নিজেকে তৈরি করার প্রাথমিকই শুধু নয়, মূল সংগঠনও বটে। তথ্যপ্রযুক্তির ক্রমবিকাশমান আধুনিকতার বিস্তীর্ণ বলয়ে সময়ের প্রজন্ম নিবেদিত হচ্ছে নিজেকে তৈরি করার এক অদম্য স্পৃহায়। ভাল-মন্দ কিংবা ন্যায়-অন্যায়বোধ সব সময় তাদের তাড়িতও করে না। এখানেই সম্ভবত পারিবারিক দায়বদ্ধতার একটি বিরাট ভূমিকা থাকে। কারণ উদীয়মান বর্তমান প্রজন্ম এখনও পারিবারিক সুশৃঙ্খল আবহ এবং ছায়ায় নিজেদের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সময়কে পার, করে যা তার ভবিষ্যত তৈরি করার প্রয়োজনীয় মাধ্যম। আধুনিক বাবা-মাও এত ব্যস্ত থাকেন সন্তানকে প্রয়োজনীয় সঙ্গ দিতেও তাদের হিমশিম খেতে হয়। তার ওপর বর্তমান শিক্ষা কার্যক্রমে অতি বাল্যকাল থেকে দৌড়ঝাঁপের প্রতিযোগিতা শুরু হয়ে যায় সেখানে অভিভাবকরা নিজেই বিপন্ন অবস্থার শিকার হয়। যা কখনও তাদের নিজের জীবন গড়ার ক্ষেত্রে সামলাতে হয়নি। যুগের পরিবর্তন হচ্ছে, সময়ের মিছিল ও দ্রুততার সঙ্গে সামনে এগুচ্ছে, তার সঙ্গে সমান তাল মেলাতে এখন বাবা-মায়েরা সত্যিই অসহায়। যুগ আর সময়ের চাহিদায় আধুনিক প্রজন্ম যে গতিতে ছুটে বেড়াচ্ছে সেখানে পারিবারিক ভূমিকা আজ প্রশ্নবিদ্ধ। পারিবারিক ¯েœহ-মমতার যে শক্ত বাঁধন সেখানে কোন বিচ্যুতি না ঘটলেও ভবিষ্যত নাগরিক তৈরি হওয়ার ক্ষেত্রে প্রজন্মের ফারাক আজ দৃষ্টিকটুভাবে দৃশ্যমান। তবে সবার ক্ষেত্রে নয় এ কথা জোর দিয়েই বলা যায়। অঘটন ঘটে স্বল্প সংখ্যক। কিন্তু প্রভাব এত বেশি যার রেশ অনেকখানিই বিস্তৃত হয়।

সমাজের বিভিন্ন স্থানে ঘটে যাওয়া এমন নৃশংস পাশবিকতা সাময়িক প্রতিবন্ধকতা তৈরি করলেও এসব কেটে যেতেও বেশি সময় লাগবে না। তবে সব দায়িত্ব রাষ্ট্র কিংবা সরকার প্রধানের নয়। প্রত্যেক সচেতন নাগরিকের দায়বদ্ধতায় সমাজ সংহত হয়, সভ্যতা এগিয়ে যায়, নতুন সময়ও তার কর্তব্য পালন করে। বিত্ত, শ্রেণী, ধর্ম, বর্ণ, লিঙ্গ নির্বিশেষে সব মানুষের মিলিত কর্মযোগে সমাজের গতি ত্বরান্বিত হয় সুষ্ঠু এবং স্বাভাবিক পরিবেশ নির্বিঘœ হয়। মানুষের প্রতি মানুষের সম্মান বোধ, নারীকে মানুষ ভেবে তার কাক্সিক্ষত মর্যাদা রক্ষা করাই শুধু নয়, ন্যায়-অন্যায়বোধে নিজের ব্যক্তিসত্তাকে পরিশীলিত করাও সবার নৈতিক দায়িত্ব। নীতি নৈতিকতা, আদর্শ নিষ্ঠতা, দেশপ্রেম এবং মানবিক মূল্যবোধকে উজ্জীবিত করতে না পারলে সমূহ বিপদ সঙ্কেত থেকে পরিত্রাণ পাওয়া কঠিন।

লেখক : সাংবাদিক