২১ আগস্ট ২০১৯  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

পরীক্ষার হল থেকে মুক্তিযুদ্ধে

  • ডাঃ কামরুল হাসান খান

১৫ জুলাই, ১৯৭১। এসএসসি পরীক্ষা শুরু আজ। সকালে উঠে কিছু লেখাপড়া করে তৈরি হয়ে নিলাম। আব্বা সঙ্গে নিয়ে গেলেন বিশ্বাস বেতকা পোস্টালকালীন থেকে। আমরা যারা টাঙ্গাইল বিন্দুবাসিনী বয়েজ স্কুলের ছাত্র তাদের সিট পড়েছিল বিন্দুবাসিনী গার্লস স্কুলে। স্কুলের সামনে গিয়ে মনে হলো স্কুল তো নয় যেন ক্যান্টনমেন্ট। চারদিকে পাকসেনা আর মিলিশিয়া ঘিরে রেখেছে- নিচ্ছিদ্র নিরাপত্তা। এর মধ্যে আব্বা আমাকে হলে ঢুকিয়ে দিয়ে গেলেন। পূর্ব পরিকল্পনা অনুযায়ী মেজবা, বাছেত, অমল, মাসুম, রতীশ, শফী, শরীফ আসার পর সবাইকে নিয়ে ঠিক প্রশ্ন দেয়ার কিছু আগ মুহূর্তে আমরা একে একে বেরিয়ে পড়লাম পরীক্ষার হল থেকে পাকসেনাদের কড়া পাহারার ফাঁক গলিয়ে। এসে আমরা দাঁড়ালাম সবাই গতনদার ফার্মেসির সামনে। আমরা তখন অন্যান্য পরীক্ষার্থীদের বাধাদানে ব্যস্ত। কিছুক্ষণ পর মাসুমের লেবু চাচা এসে খবর দিলেন- পুলিশ আর গোয়েন্দা বাহিনীর লোক আমাদের খুঁজছে- সরে যাও এখান থেকে। আমরা সবাই তখন রতীশের বাসায় উঠলাম। রতীশের মা আমাদের তরমুজ খাওয়ালেন। কিছুক্ষণ ওখানে কথাবার্তা বলে যার যার বাসায় চলে এলাম। বাসায় এসে দেখি আব্বা তো রেগে আগুন- টিফিন নিয়ে পরীক্ষার মাঝখানে অপেক্ষা করে না পেয়ে বাসায় চলে এসেছেন। আমি তখন বাসার পেছনের দেয়াল টপকে তারটিয়া খালার বাড়িতে চলে গেলাম মুক্তিযুদ্ধে যোগদানের লক্ষ্যে।

১৯৭০-এর ডিসেম্বর মাসে টেস্ট পরীক্ষার ফল প্রকাশের পর এসএসসি পরীক্ষার ফরম পূরণ করা হয়ে গেছে। ১৯৭০-এর ২২ এপ্রিল পরীক্ষা। আমি টাঙ্গাইল বিন্দুবাসিনী সরকারী বিদ্যালয় থেকে প্রার্থী। পরীক্ষার জন্য জোর প্রস্তুতি চলছে। অন্যদিকে সংসদ নির্বাচনের পর তৎকালীন সমগ্র পূর্ব পাকিস্তানে চলছে বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে স্বাধিকার আদায়ের আন্দোলন। ইয়াহিয়া সরকার সংসদ অধিবেশন বসা নিয়ে টালবাহনা করছে। প্রতিদিন মিছিল মিটিং চলছে সারা বাংলায়। মন কিছুতেই বসে থাকতে চায় না পড়ালেখায়- কিন্তু জীবনের বড় পরীক্ষা আমাকে যে কাক্সিক্ষতভাবে অতিক্রম করতে হবে যাতে ঢাকার সেরা কলেজে ভর্তি হতে পারি- আমার আত্মীয়-স্বজন, স্কুলের শিক্ষক ছাত্র সবাই আশা করছে আমরা কয়েকজন এবার স্কুলের জন্য গৌরব বয়ে নিয়ে আসব।

আগাগোড়াই টাঙ্গাইল রাজনৈতিকভাবে অগ্রসর। তখন সকল দলের জাতীয় এবং স্থানীয় নেতৃবৃন্দ প্রায় প্রতিদিনই বিন্দুবাসিনী স্কুল মাঠে সভার আয়োজন করতেন। প্রতি সভারই নিয়মিত শ্রোতা ছিলাম। বিভিন্ন স্কুল থেকে আমরা দলে দলে সভায় যোগদান করতাম। টাঙ্গাইল বিন্দুবাসিনী মাঠ তখন যুদ্ধের প্রস্তুতি ক্ষেত্র। ষাট দশকের রাজনীতিতে স্কুলছাত্রদের বিশাল ভূমিকা ছিল। তখন দেশে কলেজের সংখ্যা ছিল খুবই কম। ’৬৯ এ- পাকিস্তান সরকার স্কুলে ‘দেশ ও কৃষ্টি’ নামে একটি বই পাঠ্য করেছিল যাতে বাঙালীর সংস্কৃতি ছিল না ছিল ভিন্ন সংস্কৃতি ও কৃষ্টি। সমগ্র পূর্ব পাকিস্তানের স্কুলছাত্ররা এ বই বাতিল করার জন্য ব্যাপক আন্দোলন গড়ে তোলে। অবশেষে পাকিস্তান সরকার বাধ্য হয় এ বইটি বাতিল করতে। আজও কানে বাজে ‘দেশ ও কৃষ্টি, দেশ ও কৃষ্টি বাতিল কর বাতিল কর’। সিক্স-সেভেন থেকেই ছাত্রদের রাজনৈতিকভাবে উদ্বুদ্ধ করার কর্মসূচী ছিল সকল প্রগতিশীল ছাত্র সংগঠনের। ’৬৯-এর গণঅভ্যুথানে শহীদ মতিউর নবম শ্রেণীর ছাত্র ছিল।

১৯৭১-এর ১ মার্চ হঠাৎ করেই জেনারেল ইয়াহিয়া ৩ মার্চের সংসদ অধিবেশন স্থগিত ঘোষণা করল। এই ঘোষণায় গর্জে উঠল বাংলাদেশ। সত্যিকার অর্থে মুক্তির আন্দোলন তখন থেকেই রণযুদ্ধে পরিণত হয়। দেশের বিভিন্ন স্থানে শুরু হয়ে যায় নিরস্ত্র মানুষের ওপর পুলিশ, আধা সামরিক আর সামরিক বাহিনীর আক্রমণ।

৭ মার্চ ঢাকার রেসকোর্স ময়দানে বঙ্গবন্ধুর ভাষণ। সমগ্র বাঙালী জাতি এই ভাষণ শোনার জন্য অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছে দিক নির্দেশনা পাওয়ার আশা নিয়ে। কথা ছিল, এই ভাষণ সরাসরি রেডিওতে প্রচার করা হবে। আমরা রেডিওর পাশে বসে থাকলাম উৎকণ্ঠা নিয়ে কিন্তু সরকার প্রচার করতে দেয়নি। যদিও পরেরদিন সকালে প্রচারিত হয়েছিল। একদিকে সামনের মাসে পরীক্ষা অন্যদিকে দেশব্যাপী তুমুল আন্দোলন। কিছুতেই ঘরে বসে থাকতে চায় না মন।

২৫ মার্চের ভয়াল কালরাতে ঢাকায় পাকহানাদার বাহিনীর আকস্মিক পৈশাচিক আক্রমণে স্তম্ভিত হয়ে পড়ল সমগ্র বাঙালী জাতি। হাজার হাজার মানুষ যে যেভাবে সম্ভব ঢাকা ছেড়ে চলে আসছে গ্রামের দিক। আমরাও টাঙ্গাইল ছেড়ে মামার বাড়ি পাইকড়া চলে গেলাম। ৩ এপ্রিল পাকবাহিনী সাটিয়াচর মুক্তিযোদ্ধাদের প্রতিরোধের মুখে টাঙ্গাইল দখল করে নেয়।

মাসখানেক পরে পরিস্থিতি কিছুটা সহনীয় হলে আমরা আবার টাঙ্গাইল শহরে চলে আসি। ইতোমধ্যে আমাদের এসএসসি পরীক্ষা পিছিয়ে ১৫ জুলাই চলে গেছে।

টাঙ্গাইল এসে আবার পড়ালেখায় মনোযোগী হওয়ার চেষ্টা করলাম। কিছুতেই মন বসে না। তখন মুক্তিযুদ্ধ কতদিন চলবে তার কোন ধারণা করা যাচ্ছে না- সবাই ভিয়েতনামের দীর্ঘযুদ্ধের কথা ভাবছি- এছাড়া বিশ্বের সকল মুক্তিযুদ্ধই দীর্ঘস্থায়ী হয়েছে। পড়তে বসে শুধু আঁকিঝুঁকি করি, টেস্ট পেপার বইয়ের প্রতি পাতায় পাতায় লিখি বঙ্গবন্ধু, বাংলাদেশ আর জয় বাংলা। মে মাসের দিকে কাদেরিয়া বাহিনী সংগঠিত হওয়ায় খবর পেলাম। কোথাও কোথাও ছোটখাটো যুদ্ধের খবরও শোনা যাচ্ছে। যুদ্ধে যাবার জন্য মন তখন প্রস্তুত- কিন্তু এই বয়সে বাবা-মা কোনভাবেই যেতে দেবেন না, অন্যদিকে সামনে গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা। ইতোমধ্যে বড় দুই ভাই, বড় ভগ্নিপতি যুদ্ধে চলে গেছেন। এমন একটি মহান যুদ্ধে আমি কোন ভূমিকা রাখব না?

একদিন বন্ধু শফির বাসায় শফি (প্রয়াত টাঙ্গাইলের ব্যবসায়ী), শরীফ (ডেন্টাল সার্জন) আর আমি বসলাম। ভেবেচিন্তে আমরা সিদ্ধান্ত নিলাম টাঙ্গাইলে এসএসসি পরীক্ষা বানচাল করব। পরিকল্পনা করলাম- প্রথমে বিন্দুবাসিনী স্কুলের যারা ভাল ছাত্র তাদের পরীক্ষায় অংশগ্রহণ থেকে বিরত রাখতে হবে। এদের বিরত রাখতে পারলে ওই স্কুলের অন্য ছাত্ররা পরীক্ষা দেবে না। বিন্দুবাসিনীর ছাত্ররা পরীক্ষা না দিলে টাঙ্গাইলের অন্যান্য স্কুলের ছাত্ররাও অংশগ্রহণ করবে না বলে আমাদের বিশ্বাস। প্রথমে ভাল ছাত্রদের মুক্তিযোদ্ধাদের বরাত দিয়ে ডাকযোগে মৃত্যুর হুমকি দিয়ে চিঠি ছাড়লাম। যেহেতু ওরা আমাদের ঘনিষ্ঠজন তাই হাতের লেখা চিনে ফেলতে পারে বিধায় কার্বন পেপার রেখে মাত্রাবিহীন অক্ষর দিয়ে চিঠি লিখলাম। চিঠি ছাড়ার কয়েকদিন পর ওদের বাড়ি বাড়ি গিয়ে খোঁজ নিলাম চিঠি পেয়েছে কি-না। দেখলাম চিঠিতো পেয়েছেই উপর্যুপরি আতঙ্কিত হয়ে পড়েছে- ভাবছে পরীক্ষা দেবে কি দেবে না। আমরা আরও ইন্ধন জোগালাম পরীক্ষা না দেয়ার পক্ষে। ওরা বলল কিন্তু যুদ্ধ কতদিন চলবে তার কোন নির্দিষ্ট সময় নেই আর আমাদের জীবন তো নির্ভর করছে এই পরীক্ষার উপরই। অবশেষে পরীক্ষায় অংশগ্রহণ না করার পক্ষে মোটামুটি একটা সিদ্ধান্ত হলো কিন্তু চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হবে পরীক্ষার আগের দিন। অন্যদিকে পাকবাহিনী এবং তাদের গোয়েন্দা বাহিনী পরীক্ষা সফলভাবে অনুষ্ঠিত করার জন্য সকল ধরনের প্রস্তুতি নিচ্ছে। ১৫ জুলাই পরীক্ষা শুরু হবে। পরীক্ষা শুরুর আগের দিন আমরা স্কুলে গিয়ে প্রবেশপত্র গ্রহণ করলাম। প্রবেশপত্র নিয়ে আমরা স্কুলের পেছনে গেলাম যেখানে তখন সুন্দর ছোট একটা বাগান ছিল। যে প্রবেশপত্র আমাদের সুন্দর জীবনের দুয়ার খুলে দেয়ার কথা সেই প্রবেশপত্র প্রতিবাদ হিসেবে কেউ ছুড়ে ফেলে দিচ্ছে, কেউ একটু -আধটু ছিঁড়ে ফেলছে। আমরা বিন্দুবাসিনী স্কুলের মেজবা, বাছেত, অমল, রতীশ, তোতা, শফী, শরীফসহ সেদিন ওই বাগানে সবাই হাতে হাত রেখে প্রতিজ্ঞা করলাম যে, আগামীকাল থেকে অনুষ্ঠিতব্য পরীক্ষায় আমরা কেউ অংশগ্রহণ করব না। তবে আমরা সবাই হলে যাব তারপর একসঙ্গে বেরিয়ে আসব।

পরিকল্পনা অনুযায়ী আমরা সেদিন তাই করেছিলাম। ওই পরীক্ষাটা বাস্তবায়ন করার জন্য পাক সরকার এতটাই তৎপর ছিল যেÑ যখন যেখানে পরীক্ষার্থীকে পেয়েছে পরীক্ষা দিতে তাদের বাধ্য করেছে। এমনও হয়েছে বাড়ি বাড়ি গিয়ে ধরেছে এবং ২/৩টা পরীক্ষা চলে গেলেও তাদের পরীক্ষা দিতে অভিভাবকদের ভয়ভীতি প্রদর্শন করে চাপ দিয়েছে। স্বাভাবিকভাবে দেশ চলেছে এটা প্রমাণ করার জন্য এটা ছিল তাদের বড় কর্মকান্ড। আমার জানামতে, অসংখ্য ছেলে মেয়ে পাক সরকারকে প্রত্যাখ্যান করে পরীক্ষাদানে বিরত ছিল।

আমরা হয়ত সম্পূর্ণ পরীক্ষা বানচাল করতে পারিনি কিন্তু আংশিক যতটুকু করতে পেরেছিলাম তাতে সুসংগঠিত মুক্তিবাহিনীর কোন যোগাযোগ ছিল না। আমাদের কয়েকজনেরই ক্ষুদ্র প্রয়াস তৎকালীন পাক সরকারের বিরুদ্ধে অনাস্থা প্রকাশ এবং অচলাবস্থা সৃষ্টির নিমিত্তে। তারটিয়া খালার বাড়িতে একদিন থেকে পরেরদিন চলে গেলাম মামার বাড়ি পাইকড়া। মন তখন আমার যুদ্ধে যাবার জন্য প্রস্তুত। কিন্তু কোথায় পাব তাদের আমার জানা নেই।

কয়েকদিন পর ফুপুর বাড়ি ঝনঝনিয়া গেলাম। কিন্তু মুক্তিযোদ্ধাদের সাক্ষাত মিলছে না। কোন পথও খুঁজে পাচ্ছি না জীবনের একটি মহান যুদ্ধে অংশগ্রহণ করার। ঝনঝনিয়াতেই দেখা পেলাম কাদেরিয়া বাহিনীর তখন সেকেন্ড ইন কমান্ড খন্দকার মুসা চৌধুরী। তখন ভরা বর্ষাকাল। ফুপুর বাধা উপেক্ষা করে মুসা ভাইয়ের নৌবহরে রওনা হলাম সখীপুর পাহাড়ের বহেরাতৈল ক্যাম্পের উদ্দেশে রাতভর দীর্ঘপথ ধরে। আমাদের মতো অনেক কিশোর তখন গোটা দেশে মুক্তিযুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়েছিল।

লেখক : সাবেক উপাচার্য, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়