২১ আগস্ট ২০১৯  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

মার্কিন সরকারের ক্ষমাহীন অপরাধ ॥ ১৮ জুলাই, ১৯৭১

  • শাহাব উদ্দিন মাহমুদ

১৯৭১ সালের ১৮ জুলাই দিনটি ছিল রবিবার। বাংলাদেশের সাড়ে সাত কোটি মানুষের বিরুদ্ধে বর্বর সেনাবাহিনীকে লেলিয়ে দিয়ে ব্যাপক হত্যা, লুণ্ঠন ও পৈশাচিক নির্যাতন চালিয়ে পশ্চিম পাকিস্তানী স্বার্থান্বেষী মহল ও ইয়াহিয়া সর্বাত্মক মিথ্যা ও অপপ্রচার ছড়িয়ে যে- বিভ্রান্তি ছড়িয়ে ছিল তা দ্রুতই কেটে যাচ্ছে। বাংলাদেশে পাক বাহিনীর গণহত্যা ও বর্বরতার পেছনে যে দূরভিসন্ধি ও রাজনৈতিক উদ্দেশ্য কাজ করেছে বিশ্বের মানুষের কাছে তা আজ অনেকখানি স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। বাংলাদেশ সম্পর্কে বিশ্বজনমত নতুন ধারায় প্রবাহিত হতে শুরু করেছে। বিশ্বের বহু দেশ বাঙালীর মুক্তি সংগ্রামকে প্রকাশ্যে সমর্থন জানাচ্ছে। কানাডা, পশ্চিম জার্মানি, সুইডেন, স্ক্যান্ডিনেভীয় দেশসমূহ এবং আরও কয়েকটি দেশ বাংলাদেশ সংক্রান্ত প্রশ্নটি জাতিসংঘে তোলার জন্য উদ্যোগী হয়েছে। এই দিন পাকসেনাদের একটি দল শালদা নদী ঘাঁটি থেকে দক্ষিণ দিকে মনোরা ব্রিজের দিকে অগ্রসর হলে ৪র্থ বেঙ্গলের ‘এ’ কোম্পানির যোদ্ধারা মর্টার ও কামানের সাহায্যে আক্রমণ করে। ফলে পাকসেনাদের ৪জন সৈন্য নিহত ও ১০জন আহত হয়। পরে পাকসেনারা সামনে অগ্রসর না হয়ে পিছু হটে মনোরা ব্রিজের উত্তরে অবস্থান নেয়। ক্যাপ্টেন আইনউদ্দিনের নেতৃত্বে একটি রেইডিংপার্টি কসবার উত্তরে কাসিমপুর সেতুর কাছে অবস্থানরত পাকসেনাদের ওপর আক্রমণ চালায়। এ আক্রমণে ১৭জন পাকসেনা নিহত হয় এবং যারা বেঁচে ছিল তারা অবস্থান ত্যাগ করে খাইরাতুল্লায় পালিয়ে যায়। মুক্তিবাহিনীর একটি গেরিলা দল গোসাইরহাট থানার দামুদিয়া পুলিশ ফাঁড়ির ওপর আক্রমণ চালায়। এই আক্রমণে পুলিশ ফাঁড়িটি সম্পূর্ণ ধ্বংস হয় এবং গেরিলা দল ৫টি রাইফেল, একটি ওয়্যারলেস সেট ও প্রচুর গোলাবারুদ দখল করে। কুমিল্লায় সুবেদার আবদুল ওহাবের নেতৃত্বে মুক্তিযোদ্ধা দল নওগাঁ নামক জায়গায় পাক ডিফেন্সের ও-পি পোস্ট আক্রমণ করে। রংপুরের বরখাতা ও চৌইলাদি এলাকায় মুক্তিযোদ্ধাদের সঙ্গে পাক সৈন্যদের দুই দুইবার ভয়াবহ সংঘর্ষ হয়। ময়মনসিংহে মুক্তিযোদ্ধারা রাতে সৈন্য বাহিনীর টেলিফোন লাইন কেটে দেয়। করিমগঞ্জের নিকটে এক সংঘর্ষে ১২ জন পাকসেনাকে হত্যা করে। মুক্তিযোদ্ধাদের তীব্র আক্রমণে পাকবাহিনীর ২জন অফিসার, ১জন জেসিও ও ২ জন সিপাই নিহত হয় এবং ১জন সিপাই আহত অবস্থায় ও-পি পোস্টের ওপর হতে নিচে পড়ে যায়। পাকবাহিনীর এক ব্রিগেড সৈন্য লেঃ কর্নেল হেলাল মুর্শেদের কোম্পানি ও ক্যাপ্টেন নাসিমের কোম্পানির ওপর আক্রমণ চালায়। জাতিসংঘ উদ্বাস্তু সংক্রান্ত হাই কমিশনার প্রিন্স সদরুদ্দিন আগা খান জেনেভায় বলেন, ভারতে পূর্ব পাকিস্তানের শরণার্থীদের জন্য আরও বিপুল পরিমাণ সাহায্য প্রয়োজন। কিন্তু তাদের স্বেচ্ছায় স্বদেশ প্রত্যাবর্তন হবে এ সমস্যার সর্বোৎকৃষ্ট সমাধান। নরওয়ের পররাষ্ট্রমন্ত্রী কেপলেন অসলোতে বলেন, নরওয়ে পূর্ব পাকিস্তানের ব্যাপারে কোন প্রকার হস্তক্ষেপ করবে না এবং বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দেবে না কারণ এতে ত্রাণ কাজে জটিলতার সৃষ্টি হবে। মানিকগঞ্জের ঘিওর থানার পাকহানাদাররা ব্যাপক হত্যাযজ্ঞ চালায়। তেরশ্রীর জমিদার সিদ্ধেশ্বর রায়প্রসাদ চৌধুরীকে হানাদাররা জীবন্ত পুড়িয়ে হত্যা করে। হামিদুল হক চৌধুরী ও মাহমুদ আলী নিউইয়র্কে এক সাংবাদিক সম্মেলনে পূর্ব পাকিস্তানের পরিস্থিতি সম্পর্কে বিশ্বব্যাংকের রিপোর্টকে ‘ভয়ঙ্কর অতিরঞ্জিত’ বলে অভিহিত করে বলেন, এ রিপোর্ট লোকমুখে শোনা কাহিনীর ওপর ভিত্তি করে রচিত। তারা আরও বলেন, পূর্ব পাকিস্তানী বিচ্ছিন্নতাবাদীদের আশ্রয় দেয়ার ভারতীয় নীতি পাকিস্তান ও ভারতের মধ্যে সংঘর্ষ সৃষ্টির ইন্ধন হিসেবে কাজ করবে। সোভিয়েত ইউনিয়ন ও ফ্রান্স এ কথা দ্ব্যর্থহীনভাবে ঘোষণা করেছে যে, সামরিক ও অর্থনৈতিক সাহায্য দিয়ে কোন অবস্থাতেই তারা পাকিস্তানকে সহযোগিতা করবে না। তারা বলেছেন পরিস্থিতি আদৌ স্বাভাবিক নয়। সেখানে সর্বত্রই ধ্বংসের চিহ্ন ছড়িয়ে আছে, পাক হানাদার সৈন্যরা এখনও বাংলাদেশের ওপর হত্যা, ধ্বংস ও নির্যাতন চালিয়ে যাচ্ছে। একমাত্র মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র সরকার ছাড়া এইড কনসোর্টিয়ামভুক্ত সব দেশই পাকিস্তানকে সাহায্য বন্ধের পক্ষে মত প্রকাশ করেছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র সরকার বিশ্বজনমত উপেক্ষা করে, পাকিস্তানকে সমর সম্ভার ও অর্থ সাহায্য দিয়ে বাংলাদেশে গণহত্যার প্রত্যক্ষভাবে সহযোগিতা করলেও আমেরিকান জনগণ, সংবাদপত্র, বেতার- টেলিভিশন ও সিনেটররা বাংলাদেশের প্রকৃত ঘটনাবলী প্রকাশ করে বাংলার জনগণের সঙ্গে একাত্মতা ঘোষণা করেছে। মার্কিন সংবাদপত্রসমূহ খোলাখুলিভাবেই বাংলাদেশ প্রশ্নে মার্কিন সরকারী নীতির কঠোর সমালোচনা করেছে। নিউইয়র্ক টাইমস’, ‘ওয়াশিংটন পোস্ট’, ‘ইভিনিং স্টার প্রভৃতি প্রভাবশালী দৈনিক পত্রিকাগুলোতে মার্কিন সরকারী নীতির কঠোর সমালোচনা করে বলা হয়েছে যে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও অন্যান্য ঋণদানকারী রাষ্ট্রগুলোর উচিত পাকিস্তানকে সর্বপ্রকার সাহায্য বন্ধ করে দেয়া। ভারতে নিযুক্ত প্রাক্তন মার্কিন রাষ্ট্রদূত পাকিস্তানে মার্কিন সাহায্য প্রেরণের কঠোর সমালোচনা করে বলেছেন, মার্কিন সরকারের এ ভুলের কোন তুলনা হয় না। মার্কিন সরকারের এটা শুধু ভুল নয়, এটা একটি ক্ষমাহীন অপরাধ- ইতিহাস এ অপরাধ কোন দিনই ক্ষমা করবে না। শিলিগুড়ি থেকে আনন্দবাজার পত্রিকার রিপোর্টারের প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, গত কয়েকদিন ধরে প্রচ- লড়াইয়ের পর মুক্তিফৌজ বৃহস্পতিবার পাক দখলদার বাহিনীর কবল থেকে ঠাকুরগাঁর জগদলপুর থানা ছিনিয়ে নিয়েছে। জগদলপুর, ইসলামপুর সীমান্তের উল্টো দিকে। গত কয়েকদিনের মুক্তিফৌজ ২৩ জন পাকসেনাকে হত্যা করে। মাদারই পাড়া সীমান্ত ঘাঁটির ওপর আক্রমণ চালিয়ে মুক্তিফৌজ বেশ কিছু পাক সেনাকে হত্যা করে। বাকি সেনারা পালিয়ে জীবন রক্ষা করে। সীমান্ত চৌকি দখল নেয়ার পর মুক্তিফৌজ সেখানে প্রচুর রসদ বিশেষ করে ৫০০ মণ চাল পায়। উত্তর রণাঙ্গন থেকে যেসব খবর আসছে তাতে পাক দখলদার বাহিনীর মনোবল ক্রমশই ভেঙ্গে পড়ছে এবং ঘাঁটি ছেড়ে ৫ থেকে ৭ মাইল ভেতরে দৌড়াচ্ছে। দিনহাতার উল্টোদিকে ভুরুঙ্গামারী এখন মুক্তিফৌজের দখলে। এছাড়া গত কয়েক সপ্তাহে মুক্তিফৌজের কমান্ডোরা যুগপৎ আক্রমণ চালিয়ে দিনাজপুর ও রংপুর জেলার অন্তত ৪২টি সীমান্ত চৌকি পুড়িয়ে দিয়েছে। উদ্দেশ্য হলো, পাক দখলদার রা কোন ক্রমেই ওইসব সীমান্ত চৌকি যাতে ঘাঁটি হিসেবে ব্যবহার করতে না পারে। রংপুর সেক্টরে মগলহাট, হাতিবান্ধা, বড় খাতা, অন্যদিকে দিনাজপুর সেক্টরে পাঁচ বাড়ি, পাঁচ বিবি, আতোয়ার, পাক হিলি ও গৌরীপুর এলাকায় মুক্তিফৌজ ও কমান্ডোদের আক্রমণে দখলদাররা বিপর্যস্ত। স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র থেকে প্রচারিত ইংরেজী অনুষ্ঠান ওয়ার্ল্ড প্রেস রিভিউ অন বাংলাদেশে বলা হয়, বাংলাদেশের নিরীহ জনগণের ওপর হত্যাযজ্ঞে ব্যবহার হবে জেনেও চীন হাল্কা ও মাঝারি ধরনের অস্ত্রশস্ত্র এবং গোলাবারুদ সরবরাহ করেছিল। এমনকি বাংলাদেশের গ্রীষ্মপ্রধান ছোট শহরগুলোর উপযুক্ত করে ৩জনের ছোট ট্যাঙ্কও বানিয়েছিল। ঢাকা নারায়ণগঞ্জ, চট্টগ্রাম, খুলনা যশোর আর কুমিল্লাতে গণহত্যা আর ধ্বংসযজ্ঞ চালাতে এই ট্যাঙ্কগুলোই ব্যবহার করা হয়েছিল। অন্যদিকে নিক্সন প্রশাসন বিশেষত সিআইএ পাকিস্তানের গণহত্যার পরিকল্পনা আগে থেকেই জানত। স্টেট ডিপার্টমেন্টের বিপরীত সুপারিশ সত্ত্বেও গণহত্যার বিরুদ্ধে প্রবল জনমতের জন্যই হোয়াইট হাউস স্বীকার করতে দেরি করছিল যে তারা পাকিস্তানকে অস্ত্র সাহায্য করে যাচ্ছে। পাকিস্তান, যুক্তরাষ্ট্রে একটা সংবাদপত্র, টিভি চ্যানেল বা রেডিও নেটওয়ার্ক খুঁজে পায়নি যেখানে সে বাংলাদেশের সঙ্গে করা তার ঘৃণ্য অপরাধের সাফাই গাইবে। এটা লক্ষণীয় যে নিক্সন প্রশাসন পাকিস্তানে অর্থ ও অস্ত্র সাহায্য অব্যাহত রাখার ঘোষণার পরেই শুধু নিক্সনের উপদেষ্টা কিসিঞ্জারকে পাকিস্তানে চীনা নেতাদের সঙ্গে সাক্ষাতের গোপন সফরে আসতে দেয়া হয়েছিল। নিক্সন আশা করছিলেন চীনের সঙ্গে স্থায়ী বন্ধুত্ব করা গেলে কোনরকম রাজনৈতিক নিয়ন্ত্রণ না হারিয়েই ইন্দোচীন থেকে সৈন্য সরিয়ে নেয়া যাবে এবং তাতে ডেমোক্রেটদের ব্যর্থ করে দেয়ার ভাল সুযোগ থাকবে। নিপীড়িত জনতার অধিকারের স্বঘোষিত রক্ষক চীন বৈশ্বিক রাজনীতিতে সোভিয়েত ইউনিয়নের বিপক্ষে সুবিধা আদায়ের জন্য এই অপরাধগুলো মেনে নিয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র, ইতিহাসের সবচেয়ে ভয়ংকর সাম্রাজ্যবাদের প্রতিনিধি সোভিয়েত ইউনিয়নকে আটকানোর এই যৌথ প্রচেষ্টার মাধ্যমে আরও বড় রাজনৈতিক আধিপত্য কায়েম করতে চায়। চীন এখনও পরাশক্তি হয়ে উঠতে পারেনি কিন্তু সোভিয়েত ইউনিয়ন এখনই পরাশক্তি। বাংলাদেশের জনগণ কি এই চীন-মার্কিন বন্ধুত্বে বলি হয়ে যাবে? রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকরা ধারণা করছেন চীন-মার্কিন বন্ধুত্ব দিনশেষে বাংলাদেশের জন্য ভালই হবে। নতুন এই বোঝাপড়া ভারত সম্পর্কে চীনকে নমনীয় করে তুলবে। বাংলাদেশের সমস্যার সমাধান অর্থাৎ সম্পূর্ণ স্বাধীনতা ত্বরান্বিত হতে পারে শুধু যদি সোভিয়েত ইউনিয়ন আরও সক্রিয়ভাবে আগ্রহী হয়ে ওঠে।

লেখক : শিক্ষাবিদ ও গবেষক

sumahmud78@gmail.com