১৯ আগস্ট ২০১৯  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

রিজার্ভ থেকে ২৩৪ কোটি ডলার বিক্রি

  • গত অর্থবছরে মুদ্রা বাজার স্থিতিশীলতায় বহুমুখী উদ্যোগ নেয় বাংলাদেশ ব্যাংক

অর্থনৈতিক রিপোর্টার ॥ আমদানি ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় ডলারের ক্রমাগত চাহিদা পূরণের মাধ্যমে বিদেশী মুদ্রার বাজার স্থিতিশীল রাখতে গত অর্থবছরে (২০১৮-১৯) ২৩৩ কোটি ৯০ লাখ ডলার আন্তঃব্যাংক বাজারে বিক্রি করেছে বাংলাদেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংক, আগের অর্থবছরের চেয়ে যা এক দশমিক ২১ শতাংশ বেশি। এর আগের অর্থবছরে (২০১৭-১৮) আন্তঃব্যাংক বাজারে ২৩১ কোটি ১০ লাখ ডলার বিক্রি করেছিল সংস্থাটি। এই দুই অর্থবছরে বাংলাদেশ ব্যাংক বাজার থেকে কোন ডলার কেনেনি। বাংলাদেশ ব্যাংক সূত্রে এসব তথ্য জানা গেছে। সংস্থাটির কর্মকর্তারা বলছেন, গত দুই-আড়াই বছর ধরে ডলারের দর উর্ধমুখী ধারায় রয়েছে। এই সময়ে বাজার স্থিতিশীল রাখতে রিজার্ভ থেকে ব্যাংকগুলোর কাছে ডলার বিক্রি করা হয়।

জানা গেছে, গত এক বছরে ডলারের বিপরীতে টাকার অবচিতি ঘটেছে এক দশমিক ৫৩ শতাংশ। প্রাপ্ত তথ্যে দেখা যায়, চলতি বছরের মার্চ শেষে ডলারের মূল্যমান ছিল বাংলাদেশী মুদ্রায় ৮৪ দশমিক ২৫ টাকা। ২০১৮ সালের মার্চে এই দর ছিল ৮২ দশমিক ৯৬ টাকা। সে হিসেবে এক বছরে টাকার অবচিতি হয়েছে এক দশমিক ৫৩ শতাংশ। এদিকে ডলারের দর উর্ধমুখী থাকায় অন্য যে কোন অর্থবছরের তুলনায় গত অর্থবছরে রেমিটেন্স বেশি এসেছে। গত অর্থবছরে বৈধপথে এক হাজার ৬৪০ কোটি ডলার রেমিটেন্স এসেছে, যা দেশের ইতিহাসে এক অর্থবছরে সর্বোচ্চ।

জানা যায়, ডলারের ব্যাপক চাহিদার মধ্যে মুদ্রাবাজারের অস্থিরতা কমিয়ে আনার চেষ্টায় ডলার ছেড়েই চলেছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক।

গত অর্থবছরে এ পর্যন্ত কেন্দ্রীয় ব্যাংক ২৩৩ কোটি ডলার বিভিন্ন ব্যাংকের কাছে বিক্রি করেছে। বৃহস্পতিবার বাংলাদেশ ব্যাংক ডলার বিক্রি করেছে ৮২ টাকা ৯০ পয়সা দরে। অর্থাৎ ব্যাংকগুলো ওই দরে কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে ডলার কিনেছে। আর তারা গ্রাহকের কাছে বিক্রি করার সময় নিয়েছে আরও বেশি। কোন কোন ব্যাংক ৮৪ টাকার বেশি দামেও ডলার বিক্রি করেছে। এই পরিস্থিতিতে যুক্তরাষ্ট্রের মুদ্রা ডলারের বিপরীতে টাকার মান গত এক বছরে ক্রমাগত কমছে। তাতে প্রবাসীদের পাঠানো রেমিটেন্স এবং রফতানি আয়ে ‘ইতিবাচক’ প্রভাব পড়লেও আমদানিতে খরচ বেড়েছে। অর্থনীতির বিশ্লেষকরা বলছেন, আমদানি বাড়ার কারণে ডলারের চাহিদা বেড়েছে। কিন্তু আমদানির তথ্যের আড়ালে বিদেশে অর্থ পাচারকেও এর একটি কারণ বলে মনে করছেন কেউ কেউ। ডলার সংকট বিষয়ে সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) সম্মানিত ফেলো মুস্তাফিজুর রহমান জনকণ্ঠকে বলেন, আগের বছরে ব্যাপকহারে আমদানি হওয়ায় এখন ডলার সঙ্কট হচ্ছে। ওই সময়ে রফতানির চেয়ে আমদানি অনেক বেশি ছিল। তবে বর্তমানে রফতানির প্রবৃদ্ধি ভাল হচ্ছে। আমদানিও কমতে শুরু করেছে। শীঘ্রই অবস্থার উন্নতি হবে বলে তিনি মনে করছেন। তবে বৈদেশিক মুদ্রার বাজার নিয়ন্ত্রণে বাংলাদেশ ব্যাংকের ভূমিকা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বলে তিনি মনে করেন। এক্ষেত্রে বাংলাদেশ ব্যাংকের সক্রিয় থাকার কোন বিকল্প নেই। এ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকার্স বাংলাদেশের (এবিবি) চেয়ারম্যান ও ঢাকা ব্যাংকের এমডি সৈয়দ মাহবুবুর রহমান জনকণ্ঠকে বলেন, রফতানি, রেমিটেন্স আয়ের সঙ্গে আমদানি ব্যয়ের একটা অসামঞ্জস্য হয়ে গেছে। প্রতিনিয়ত বাণিজ্য ঘাটতি বাড়ছে। এর ফলে দাম বেড়ে যাচ্ছে। আর চাহিদা অনুযায়ী ডলারও দিতে পারছে না বাংলাদেশ ব্যাংক।

এদিকে রফতানি ও রেমিটেন্সে ভাল প্রবৃদ্ধি থাকায় বিদেশী মুদ্রার রিজার্ভ দাঁড়িয়েছে তিন হাজার ২৫২ কোটি ডলারে। রফতানি উন্নয়ন ব্যুরোর (ইপিবি) তথ্যে দেখা যায়, গত অর্থবছরে (জুলাই-জুন) ৪ হাজার ৫৩ কোটি ৫০ লাখ ডলারের পণ্য রফতানি করেছে বাংলাদেশ। এ সময়ে শীর্ষ রফতানি পণ্য তৈরি পোশাকের রফতানি বেড়েছে। বিপরীতে কমেছে দ্বিতীয় ও তৃতীয় শীর্ষ আয়কারী পণ্য চামড়া ও পাটের রফতানি। সব মিলিয়ে গত অর্থবছরে রফতানিতে প্রবৃদ্ধি ছিল ১০ দশমিক ৫৫ শতাংশ। জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) থেকে নেয়া তথ্যের ভিত্তিতে এ পরিসংখ্যান প্রকাশ করে ইপিবি।

অন্যদিকে গত জুলাই-এপ্রিল সময়ে পণ্য আমদানির পেছনে দেশের ব্যয় হয়েছে চার হাজার ৭১০ কোটি ডলার, যা এর আগের অর্থবছরের একই সময়ের তুলনায় চার শতাংশ বেশি। তবে আমদানি ব্যয়ের তুলনায় রফতানি আয়ে প্রবৃদ্ধি বেশি থাকলেও এখন পর্যন্ত দেশের চলতি হিসাবের ভারসাম্যে ঘাটতি থাকায় ডলারের ওপর চাপ রয়েছে। বৈদেশিক লেনদেনের ভারসাম্য সারণির তথ্য অনুযায়ী, গত জুলাই-এপ্রিল সময়ে দেশের চলতি হিসাবে ৫০৬ কোটি ডলারের বড় ঘাটতি ছিল। সার্বিক হিসাবে ঘাটতি ছিল ৫৯ কোটি ডলার।

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কর্মকর্তারা জানান, সার্বিক হিসাবে ঘাটতি থাকলে বিদেশী মুদ্রার রিজার্ভ থেকে কর্তন করে তা পূরণ করতে হয়। বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক কাজী ছাইদুর রহমান বলেন, রফতানি ও রেমিটেন্স প্রবাহ ভাল থাকায় বর্তমানে রিজার্ভও ভাল অবস্থানে রয়েছে। তাছাড়া বাজার চাহিদা পূরণে পর্যাপ্ত ডলারও বাজারে ছাড়া হয়েছে। আগের অর্থবছরের তুলনায় সদ্যবিদায়ী অর্থবছরে ডলার বেশিই ছাড়া হয়েছে।