১৯ আগস্ট ২০১৯  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

বায়ান্ন বাজার তিপ্পান্ন গলি

বায়ান্ন বাজার তিপ্পান্ন গলি
  • মোরসালিন মিজান

পুরান ঢাকার অলিগলি ঘুরে বেড়াতে বেশ লাগে। সুযোগ পেলেই এদিক-ওদিক যাওয়া হয়। একই নিয়মে দুদিন আগে ঢুঁ মারা হয়েছিল চকবাজারে। রমজানে সরু গলির যেখানে ইফতারসামগ্রীর পসরা সাজানো হয়, সেখানে এখন স্ট্রিটফুড। মৌসুমি যত ফল কেটে পিরিচে সাজিয়ে রাখা হয়েছে। আম জাম আনারস কলা পেঁপে থেকে শুরু করে আছে কাঁঠালও। মাত্র ২০ থেকে ২৫ টাকায় পিরিচ ভর্তি ফল। কাঁটা চামচে তুলে গল্প করতে করতে খাচ্ছিলেন অনেকে। ছিল কোয়েল পাখির ডিম। সেদ্ধ ডিমের ভাল চাহিদা। পাশাপাশি গরম তেলে এটা ওটা ভাজা হচ্ছিল। এর ঠিক উল্টো পাশে ‘নূরানী লাসসি।’ বহু বছরের পুরনো দোকান। খুবই বিখ্যাত। এই দোকানে লাসসি ছাড়াও চমৎকার লেবুর শরবত পাওয়া যায়। মুখে দিতেই কেমন চনমনে একটা ভাব হলো। স্বাদটাও মুখে লেগে ছিল অনেকক্ষণ।

কিন্তু এখান থেকে বের হয়ে চুড়িহাট্টার দিকে এগিয়ে যেতেই মন খারাপ হয়ে গেল। হঠাৎই চোখের সামনে সেই আগুনে পোড়া বাড়ি। ২১ ফেব্রুয়ারি রাতে বাড়িটি সম্পূর্ণরূপে ঝলসে গিয়েছিল। দাউ দাউ আগুন, মানুষের আর্ত চিৎকার, পুড়ে মরাÑ কী বীভৎস সেই ছবি! এখনও গায়ে কাটা দেয়। এক রাতে ৭১ জন মানুষের মৃত্যু হয়েছিল। ঘণ্টার পর ঘণ্টা ধরে চলা আগুনে ঝলসে গিয়েছিল ভবনের প্রতিটি ফ্লোর। ইট পলেস্তারা খসে পড়ছিল। যে কোন মুহূর্তে ভবনের মূল কাঠামো ভেঙ্গে পড়তে পারে- ছিল এমন আশঙ্কাও। ঘটনার অনেকদিন পর ভবনটির দিকে তাকিয়ে মনে হচ্ছিল, যে কোন সময় সত্য হতে পারে এই আশঙ্কা। অথচ ক্ষতিগ্রস্ত ভবনের ঠিক পাশের রাস্তা দিয়ে বহু মানুষ প্রতিদিন হেঁটে যাচ্ছেন। সতর্ক করে কোন নোটিস পর্যন্ত টানানো হয়নি। উল্টো দেখা গেল ভবনের নিচতলায় নতুন করে দোকান বসানোর প্রস্তুতি চলছে। পুড়ে কালো হয়ে যাওয়া ইটের সঙ্গে নতুন ইট জোড়া দিয়ে দেয়াল তোলা হয়েছে। সিমেন্টের প্রলেপ দিয়ে ভেতরের ক্ষত ঢাকার চেষ্টা হয়েছে। দ্বিতীয় তলায়ও দেয়াল তোলার কাজ হচ্ছে। প্রথমে দেখে বিশ্বাসই হচ্ছিল না। এও সম্ভব? এত বড় অগ্নিকা-ের পরও এমন ঝুঁকি কোন মানুষ নিতে পারে? বাড়ির মালিক বা ভাড়াটিয়াদের মধ্যে মানুষের কোন উপাদান কি আদৌ আছে? এত মানুষের মৃত্যু দেখেও কোন শিক্ষা ওদের হলো না। কী করে সম্ভব? অবশ্য বৃহস্পতিবার বায়ান্ন

বাজার তিপ্পান্ন গলির গল্প লিখতে লিখতেই জানা গেল, ম্যাজিস্ট্রেট জেসমিন আক্তারের নেতৃত্বে একটি টিম চুড়িহাট্টায় অভিযান চালাচ্ছে। ঝুঁকিপূর্ণ কাঠামোর নিচে রাতারাতি তোলা দেয়াল ভেঙ্গে দিয়েছে পুলিশ। পাশাপাশি মালিক ও ভাড়াটিয়ারে ভর্ৎসনাও করেছেন ম্যাজিস্ট্রেট। আবার এমন কিছু করা হলে কঠিন শাস্তি পেতে হবে বলেও হুঁশিয়ারি দিয়েছেন তিনি। এমন অভিযান অব্যাহত থাকুক সকলের তা-ই প্রত্যাশা।

এদিকে গত বুধবার পুরান ঢাকার পাটুয়াটুলীতে একটি পরিত্যক্ত দোতলা ভবনের আংশিক ধসে পড়েছে। মৃত্যু হয়েছে একজনের। সুমনা হাসপাতালের পাশে ছয় নম্বর লেনে শতবর্ষ পুরনো ভবন। ভবনের ছাদের কিছু অংশ ধসে পড়েছে বলে জানা যায়। কিন্তু ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ কম হওয়ায় খবরটি অত সামনে আসেনি। অথচ এই ভবনধস একটি বার্তা দিয়ে গেল। পুরান ঢাকার বহু বাড়িঘর, বলা চলে, হাওয়ায় দুলছে। যে কোন সময় ঘটতে পারে বড় দুর্ঘটনা। আমরা কি এ ব্যাপারে সচেতন আছি?

ডেঙ্গুর কথাও বলতে হবে। রাজধানীতে মারাত্মকভাবে ছড়িয়ে পড়েছে এই রোগ। ঘরে ঘরে রোগী। মানুষ কাতারাচ্ছে। অসহ্য যন্ত্রণায় ছটফট করছে। বিশেষ করে ছোট ছোট ছেলে-মেয়েদের মুখের দিকে তাকানো যায় না। গত রবিবার হলি ফ্যামিলি হাসপাতালে পরিচিত এক ডেঙ্গু রোগী দেখতে গিয়ে জানা গেল, তার মাও একই রোগে আক্রান্ত হয়েছেন। বর্তমানে পাশাপাশি বেডে মা-মেয়ের চিকিৎসা চলছে। এমন খবর আরও আসছে। কিন্তু সিটি কর্পোরেশনের কিছুই যেন করার নেই। কেন এই মশার সঙ্গে পারছেন না মেয়ররা? তাদের পূর্ব প্রস্তুতি কী ছিল? কেন এই আজকের অবস্থা হলো? প্রশ্ন তুলছেন ভুক্তভোগীরা। এমনকি এক নাগরিক তো মেয়র সাঈদ খোকনকে উকিল নোটিসও দিয়েছেন। কিন্তু কাজের কাজ কিছু হচ্ছে কি? কে দেবে উত্তর?