১৯ আগস্ট ২০১৯  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

ডেঙ্গুতে আক্রান্তের সংখ্যা পাঁচ হাজার ছাড়িয়েছে

  • রাজধানীতে মৃত্যু বেড়ে ৩ থেকে ৫

স্টাফ রিপোর্টার ॥ আক্রান্তের সংখ্যার সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বেড়েছে ডেঙ্গু রোগীর মৃত্যুর সংখ্যাও। সরকারী হিসাবে রাজধানীতে ডেঙ্গুতে মৃত্যুর সংখ্যা তিন থেকে পাঁচে উঠেছে। চলতি বছরে রাজধানীতে মোট আক্রান্তের বৃহস্পতিবার সংখ্যা পাঁচ হাজার ছাড়িয়ে গেছে। বেসরকারী হিসাবে আক্রান্ত ও মৃত্যুর সংখ্যা কয়েকগুণ বেশি হবে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। তারা বলছেন, বৃহস্পতিবারও ২৪ ঘণ্টায় ২০১ জন নতুন ডেঙ্গু রোগী শনাক্ত হয়েছে। আর সরকারী হিসাবে ১-১৮ জুলাই পর্যন্ত রাজধানীতে ভর্তি হয়েছে মোট ৩১৮৫ ডেঙ্গু রোগী। চলতি বছরের পহেলা জানুয়ারি থেকে ১৮ জুলাই পর্যন্ত মোট আক্রান্ত হয়েছে ৫১৪৪ জন। জ্বর হলেই চিকিৎসকদের কাছে যাওয়ার জন্য পরামর্শ দিয়েছেন বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকরা।

ডেঙ্গু সম্পর্কে সচেতনতা বৃদ্ধির পরামর্শ দিয়ে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ের মেডিসিন অনুষদের সাবেক ডিন অধ্যাপক ডাঃ এবিএম আব্দুল্লাহ জনকণ্ঠকে বলেন, ডেঙ্গুর বিষয়টি মানুষ জানলেও এর যে গতি-প্রকৃতিতে পরিবর্তন হচ্ছে, সে সম্পর্কে সচেতনতা নেই অনেকের। অনেক চিকিৎসকেরও এ বিষয়ে ভাল ধারণা নেই। ফলে সবারই এ ব্যাপারে সচেতন ও সতর্ক থাকা উচিত। তিনি বলেন, ডেঙ্গু রোগের চারটি সেরোটাইপ রয়েছে (ডেন-১, ডেন-২, ডেন-৩ ও ডেন-৪)। সাধারণত একবার এক সেরোটাইপ দিয়ে আক্রান্ত হলে পরবর্তী সময় আরেকটি দিয়ে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি থাকে। কারো হয়ত ডেঙ্গু শনাক্ত হচ্ছে, কিন্তু ঠিক কোন্ টাইপের ডেঙ্গু তা শনাক্ত করা হচ্ছে না। ফলে ডেঙ্গু পরীক্ষার পাশাপাশি টাইপিং বের করাটাও জরুঈ। না হলে রোগীকে সঠিক চিকিৎসা দেয়া কঠিন হয়ে পড়ে।

বিভিন্ন ধরনের ডেঙ্গুর অবস্থা তুলে ধরে অধ্যাপক ডাঃ এবিএম আব্দুল্লাহ বলেন, ভাইরাসজনিত জ্বর ডেঙ্গু, যা এডিস মশার কামড়ের মাধ্যমে ছড়ায়। ডেঙ্গু ক্লাসিক্যাল, ডেঙ্গু হেমোরেজিক ও ডেঙ্গু শক সিনড্রোম -এই কয়েক ধরনের হয়। ক্লাসিক্যাল বা সাধারণ ডেঙ্গু জ্বর হয়, যা ১০৪ থেকে ১০৬ ডিগ্রী ফারেনহাইট পর্যন্ত হতে পারে। জ্বর দুই থেকে সাতদিন পর্যন্ত স্থায়ী হতে পারে। সঙ্গে মাথা ব্যথা, পেট ব্যথা, বমি বমি ভাব, চোখের পেছনে ব্যথা, মাংসপেশি বা গিঁটে ব্যথা, শরীরে র‌্যাশ থাকতে পারে। ক্লাসিক্যাল ডেঙ্গু হলে তেমন সমস্যা নেই, এতে মৃত্যুর মতো ঘটনা সাধারণত ঘটে না। আর ডেঙ্গু হেমোরেজিকে জ্বর কমে যাওয়ার দু-তিন দিনের মধ্যে শরীরের বিভিন্ন স্থানে লাল লাল র‌্যাশ বা রক্তবিন্দুর মতো দাগ দেখা যায়। অন্যান্য উপসর্গের মধ্যে রয়েছে মাড়ি বা নাক দিয়ে আপনা আপনি রক্তক্ষরণ, রক্তবমি, কালো রঙের পায়খানা, ফুসফুসে বা পেটে পানি জমা। রক্ত পরীক্ষা করালে দেখা যায়, রক্তের অণুচক্রিকা বা প্লাটিলেটের সংখ্যা অনেক কমে গেছে। হেমোরেজিক ডেঙ্গুতে মৃত্যুঝুঁকি বেশি, যাতে শরীর থেকে অস্বাভাবিক রক্তক্ষরণ হতে পারে। তিনি আরও বলেন, শক সিনড্রোমে ডেঙ্গু হেমোরেজিক ফিবারের উপসর্গগুলোর পাশাপাশি রোগীর রক্তচাপ হঠাৎ কমে যায়, নাড়ির গতি বৃদ্ধি পায়, হাত-পা শীতল হয়ে আসে, রোগী নিস্তেজ হয়ে পড়ে। এমনকি রোগী অজ্ঞানও হয়ে যেতে পারে। এ ধরনের জ্বর হলে দ্রুত হাসপাতালে চিকিৎসা নেয়া উচিত। অনেক সময় চিকিৎসকের পরামর্শে রক্ত বা অণুচক্রিকাও দিতে হতে পারে। তবে সবার যে এমন হবে, তা কিন্তু নয়।

সরকারের রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (আইইডিসিআর) সাবেক পরিচালক ও বর্তমানে আন্তর্জাতিক উদরাময় রোগ গবেষণা কেন্দ্র বাংলাদেশের (আইসিডিডিআরবি) পরামর্শক অধ্যাপক ডাঃ মাহামুদুর রহমান বলেন, ডেঙ্গুর কারণে মায়োকার্ডিটিসে আক্রান্ত হলে তা খুবই বিপজ্জনক। অনেক চিকিৎসকের পক্ষে তা দ্রুত বুঝে ওঠা কঠিন। তাই এ বিষয়ে চিকিৎসকদের প্রশিক্ষণ দেয়া দরকার। তিনি জানান, চীনে মায়োকার্ডিটিসে আক্রান্ত তিন হাজার মানুষের ওপর গবেষণার ফলে দেখা গেছে, তাদের মধ্যে ১১ শতাংশ ডেঙ্গু থেকে মায়োকার্ডিটিসে আক্রান্ত হয়েছে। এটি আক্রান্তদের মৃত্যু ঘটাতে সক্ষম।

স্বাস্থ্য অধিদফতরের মহাপরিচালক অধ্যাপক ডাঃ আবুল কালাম আজাদ বলেন, বিশ্বের অন্যান্য দেশের কারণে জয়বায়ু পরিবর্তন হচ্ছে। যার প্রভাবে বাংলাদেশের তাপমাত্রা বৃদ্ধি পেয়েছে। বাতাসে আর্দ্রতার পরিমাপও বেড়েছে। কখনও খরা, আবার কখনওবা অতিবৃষ্টির ফলে ডেঙ্গু মশার প্রকোপ বৃদ্ধি পাচ্ছে। তবে প্রকোপ বৃদ্ধি পেলেও বিশ্বের অন্যান্য দেশের তুলনায় এ বছর বাংলাদেশে ডেঙ্গু আক্রান্ত রোগী ও মৃতের সংখ্যা অনেক কম। আয়তনের তুলনায় জনসংখ্যার আধিক্য রাজধানীতে ডেঙ্গুর এ ধরনের প্রকোপ এক ধরনের বাস্তবতা। প্রত্যেক নগরবাসীকে সচেতন হতে হবে। জ¦র হলে সাধারণ জ¦র মনে না করে চিকিৎসকের শরণাপন্ন হয়ে ডেঙ্গুর পরীক্ষা করাতে হবে। সকল হাসপাতালকেই এ বিষয়ে নির্দেশনা দেয়া আছে। জ¦র নিয়ে সময়ক্ষেপণ করা যাবে না। সচেতন থাকলে আতঙ্কের কিছু নেই। আর ডেঙ্গু প্রতিরোধকল্পে সরকারীভাবে তৈরিকৃত জাতীয় গাইড মেনে ডেঙ্গু রোগীদের চিকিৎসাসেবা প্রদানের জন্য চিকিৎসকদের পরামর্শ দেন মহাপরিচালক।

রামেকে ভর্তি তিন, ঢাকায় দু’জন ॥ স্টাফ রিপোর্টার, রাজশাহী, রাজশাহী মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে এখন তিন ডেঙ্গু রোগী চিকিৎসা নিচ্ছেন। আগে থেকেই ডেঙ্গু মোকাবেলায় আলাদা ওয়ার্ডসহ সকল প্রস্তুতি সম্পন্ন করে রেখেছিল রাজশাহী মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের চিকিৎসকরা। রাজশাহীতে কোন রোগী শনাক্ত না হলেও ঢাকা থেকে রামেক হাসপাতালে রোগীদের ভর্তি করা হয়েছে।

গত গত দুই দিনে দুই জনকে রামেকে ভর্তি করা হয়েছে। তাদের বাড়ি রাজশাহী জেলায় হওয়ায় তাদের রামেক হাসপাতালে ঢাকা থেকে পাঠানো হয়েছে বলে জানান রোগীর স্বজনরা। এর মধ্যে রাজশাহীতেও একজন ডেঙ্গু রোগীকে শনাক্ত করা হয়েছে। তিনি রাজশাহী মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের ৪র্থ বর্ষের শিক্ষার্থী জানে আলম। তার বাড়ি দিনাজপুর জেলার কামালপুরে।

ঢাকা থেকে আসা অন্য দুইজন হলেন, নাটোর লালপুরের সালাউদ্দিন (২৮) ও মোহনপুরের শফিকুল ইসলাম (৩০)। এই দুইজন ঢাকায় বেসরকারী প্রতিষ্ঠানে চাকরি করতেন। সেখানেই ডেঙ্গু জ্বর হলে তাদের বাড়ি রাজশাহীতে হওয়ায় ঢাকার চাপ কমাতে তাদের রাজশাহী মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে রেফার করা হয়।

রাজশাহী মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের উপ-পরিচালক অধ্যাপক ডাঃ সাইফুল ইসলাম বলেন, ডেঙ্গু নানা ধরনের হয়। এদের বিভিন্ন ধরনের হয়েছে। তিনি বলেন, ডেঙ্গু রোগীদের জন্য আলাদা বোর্ড করা হয়েছে। চিকিৎসার জন্য সবসময় তৈরি এখানকার চিকিৎসরা। পাশাপাশি ব্লাড ব্যাংকেও পর্যাপ্ত রক্তের চাহিদা দেয়া আছে। এজন্য রক্তের চাহিদাও আমরা মেটাতে পারব। পাশাপাশি তাদের সকল খরচ সরকারীভাবে করা হচ্ছে। যে কোন পরিস্থিতি মোকাবেলায় আমরা প্রস্তুত রয়েছি।

এদিকে রামেকে ডেঙ্গু প্রতিরোধে আলাদা ওয়ার্ড তৈরি করা হয়েছে। বর্তমানের ১৭নং কেবিনকে আধুনিকায়ন করে ডেঙ্গু মোকাবেলায় আলাদা ওয়ার্ড হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে। এখানে চিকিৎসা নিতে আসা সকল রোগীকে সরকারী খরচের পাশাপাশি বিভিন্ন অনুদান দেয়ার কথা থাকলেও তাদেরকে নামমাত্র কিছু ওষুধ দেয়া হচ্ছে তবে কোন ধরনের অনুদান দেয়া হচ্ছে না।