১৯ আগস্ট ২০১৯  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

আগামী সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে ছক কষছে বিএনপি

  • হাতে নিয়েছে বিভিন্ন কর্মসূচী

শরীফুল ইসলাম ॥ রাজনৈতিকভাবে ঘুরে দাঁড়ানোর কৌশল হিসেবে আগামী দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে ছক কষছে বিএনপি। এ নির্বাচনের আগেই কারাবন্দী দলের চেয়ারপার্সন খালেদা জিয়াকে মুক্ত করে এবং সর্বস্তরে দল গুছিয়ে মাঠের রাজনীতিতে সক্রিয় থাকার মধ্য দিয়ে আবার রাজনৈতিকভাবে সফল হতে চায়। এ জন্য ইতোমধ্যেই বিভিন্ন কর্মসূচী হাতে নিয়েছে বিএনপি।

সূত্র জানায়, অতীতের কিছু ভুল সিদ্ধান্তের কারণে বিএনপি আজ রাজনৈতিকভাবে চরম বেকায়দায় এ বিষয়টি দলের অধিকাংশ নেতাকর্মী উপলব্ধি করতে পেরেছেন। আর এ অবস্থা থেকে সহজে যে ঘুরে দাঁড়ানো সম্ভব নয় সে বিষয়টিও তারা বিবেচনায় নিয়েছে। এ কারণেই দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের ৪ বছর আগেই দলকে এগিয়ে নিতে বিভিন্ন কর্মপরিকল্পনা হাতে নেয়া হয়েছে। এরই অংশ হিসেবে বিএনপি চেয়ারপার্সন খালেদা জিয়ার মুক্তির দাবিতে সারাদেশের বিভাগীয় পর্যায়ে জনসভা কর্মসূচী শুরু করা হয়েছে। এসব কর্মসূচীর মাধ্যমে তৃণমূল পর্যায়ে স্থবির হয়ে থাকা দলকে চাঙ্গা করার কৌশল নেয়া হয়েছে। পাশাপাশি সারাদেশের সর্বস্তরে দলের কমিটি পুনর্গঠন এবং খালেদা জিয়া মুক্তি পেলে দলের জাতীয় কাউন্সিল করে নতুন নির্বাহী কমিটি গঠন করা হবে। এরপর একে একে রাজপথে বিভিন্ন কর্মসূচী পালনের মধ্য দিয়ে দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগেই সর্বস্তরে দলের রাজনৈতিক শক্তি বৃদ্ধি করে ওই নির্বাচনে ভাল ফলাফল অর্জনের চেষ্টা করা হচ্ছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে।

এ বিষয়ে বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেন, দলকে সর্বস্তরে ঢেলে সাজানোর কাজ চলছে। দলের সর্বস্তরের নেতাকর্মীরা ঐক্যবদ্ধ থেকে কাজ করে গেলে আশা করছি আবার বিএনপি ঘুরে দাঁড়াবে। বিএনপি চেয়ারপার্সন খালেদা জিয়াকে মুক্ত করে এবং জনগণের ভোটাধিকার নিশ্চিত করে আমরা আবার দেশে গণতন্ত্র ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করে যাচ্ছি।

বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য লে. জেনারেল (অব) মাহবুবুর রহমান বলেন, আমাদের দল একটি নির্বাচনমুখী দল। নির্বাচনের জন্য সবসময় প্রস্তুত থাকে বিএনপি। আমরা দলকে এগিয়ে নেয়ার জন্য কাজ করে যাচ্ছি। আশা করছি পরবর্তী নির্বাচনে জনগণের ভোটাধিকার নিশ্চিত করে আবারও বিএনপি ক্ষমতায় যাবে।

সরাদেশের সর্বস্তরে নেতাকর্মীদের মনোবল চাঙ্গা করে মাঠের রাজনীতিতে সক্রিয় করার জন্য ইস্যুভিত্তিক কর্মসূচী পালনের পাশাপাশি জেলায় জেলায় বিভিন্ন কর্মসূচী পালনের সিদ্ধান্ত নিয়েছে বিএনপি। ইতোমধ্যেই বরিশাল মহানগরে জনসভা করা হয়েছে। পরবর্তীতে চট্টগ্রাম ও খুলনাসহ সব মহানগরে জনসভা করবে। সবশেষে রাজধানীর সোহরাওয়ার্দী উদ্যোনে জনসভার মধ্য দিয়ে বড় ধরনের শোডাউন করতে চায় বিএনপি। এর মাধ্যমে একদিকে দলের সাংগঠনিক অবস্থা জোরদার করা এবং অন্যদিকে মাঠের রাজনীতি চাঙ্গা করার চেষ্টা করবে দলটি। এরপর বড় কোন ইস্যু পেলে আন্দোলন কর্মসূচী পালনের মাধ্যমে বর্তমান সরকারকে চাপে ফেলার কৌশল নিতে চায় তারা। আর এভাবেই দলটি সামনে এগিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করবে।

জানা যায়, দল পুনর্গঠনের অংশ হিসেবে প্রথমেই এক এক করে বিএনপির ১১টি অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনকেও পুনর্গঠন করা হচ্ছে। এরপর উপজেলা ও জেলা পর্যায়ে কমিটি পুনর্গঠন করে নতুন কেন্দ্রীয় কমিটি করার কাজে হাত দেয়া হবে। আর এ কাজ তদারকি করছেন বিএনপির ক’জন সিনিয়র নেতা। লন্ডন থেকে বিভিন্ন মাধ্যমে নিয়মিত যোগাযোগ রেখে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারপার্সন তারেক রহমানও এ কাজে সহযোগিতা করছেন বলে জানা গেছে।

সূত্র মতে, একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর এ সরকারের অধীনে আর কোন নির্বাচনে অংশ নেবে না বলে জানালেও সম্প্রতি দলীয় হাইকমান্ডের নির্দেশে এ কৌশল পরিবর্তন করেছে বিএনপি। তাই এখন থেকে সব নির্বাচনে অংশ নেবে দলটি। ইতোমধ্যেই দলের সর্বস্তরের নেতাকর্মীদের কাছে এ বার্তা পৌঁছানো হয়েছে বিএনপি কেন্দ্রীয় কার্যালয় থেকে। অবশ্য তার আগেই বিএনপি দলীয় এমপিরা সংসদে যোগ দিয়ে রাজনীতিতে নেতিবাচক অবস্থান ছেড়ে ইতিবাচক অবস্থানে এসেছে।

বিএনপি নেতাকর্মীদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ভরাডুবির পর কোন নির্বাচনে অংশ না নেয়ায় ইতোমধ্যেই দলটি রাজনৈতিকভাবে অনেক ক্ষতির সম্মুখীন হয়েছে। বিশেষ করে উপজেলা নির্বাচনে অংশ না নেয়ায় দলের শতাধিক নেতা উপজেলা চেয়ারম্যান হওয়ার নিশ্চিত সুযোগ হারিয়েছে। শুধু তাই নয়, সারাদেশের প্রতি উপজেলায় এ নির্বাচনের সময় দলের নেতাকর্মীদের নিষ্ক্রিয় অবস্থায় ঘরে বসে থাকতে হয়েছে। এর ফলে সরকারী দলের নেতাকর্মীরা উপজেলা পর্যায়ের রাজনীতিতে একচ্ছত্র আধিপত্য বিস্তার করলেও বিএনপি ছিল নীরব ভূমিকায়। এর ফলে তৃণমূল পর্যায়ের নেতাকর্মীদের মনোবল ভেঙ্গে যায়। তাই এখন থেকে পরবর্তী সব নির্বাচনে অংশ নেয়ার সিদ্ধান্ত নেয়ার পাশাপাশি কিভাবে নির্বাচনে দলের জন্য সুফল বয়ে আনা যায় সে কৌশলও নির্ধারণ করছে বিএনপি।

বিএনপির রাজনৈতিক খরা শুরু হয় ওয়ান-ইলেভেনের সময় থেকে। সদ্যক্ষমতা থেকে বিদায় নেয়া একটি রাজনৈতিক দল ওয়ান-ইলেভেনের পর চরম নাজুক পরিস্থিতিতে পড়ে। খোদ দলটির মহাসচিবসহ অধিকাংশ সিনিয়র নেতা বিএনপি চেয়ারপার্সন খালেদা জিয়ার নেতৃত্বকে চ্যালেঞ্জ করে পাল্টা বিএনপি গঠন করে সংস্কারপন্থী বিএনপি নামে। এক পর্যায়ে খালেদা জিয়া ও তারেক রহমান বন্দী হলে দলের নেতাকর্মীরা মূল দল থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়ে সংস্কারপন্থী বিএনপির দিকে ঝুঁকে।

নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে বিএনপি চেয়ারপার্সন খালেদা জিয়া কারাগার থেকে মুক্ত হওয়ার পর আবার ঘুরে দাঁড়ানোর চেষ্টা করে। এক পর্যায়ে সংস্কারপন্থী বিএনপির অনেক নেতা আবার খালেদা জিয়ার নেতৃত্ব মেনে রাজনীতি করতে থাকে। তবে নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশ নিয়ে শোচনীয়ভাবে পরাজয় বরণ করে বিএনপি। এর ফলে ক্ষমতা থেকে দূরে সরে যাওয়ায় সর্বস্তরের নেতাকর্মীদের মধ্যে হতাশা নেমে আসে। বিএনপি চেয়ারপার্সন খালেদা জিয়া জেলা সফর কর্মসূচীসহ বিভিন্নভাবে সর্বস্তরের নেতাকর্মীদের হতাশা কাটানোর নানামুখী চেষ্টা করেও সফল হতে পারেননি।

দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবিতে রাজপথের আন্দোলন চাঙ্গা করে বিএনপি। তবে জামায়াতকে সঙ্গে নিয়ে দেশব্যাপী হরতাল-অবরোধ কর্মসূচী দিয়ে বিভিন্ন নাশকতামূলক কর্মকান্ড এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সঙ্গে সংঘাতে জড়িয়ে ব্যাপক সমালোচনার মুখে পড়ে বিএনপি। একপর্যায়ে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কঠোর অবস্থানের কারণে বিএনপির আন্দোলন কর্মসূচী ব্যর্থ হয়। এ পরিস্থিতিতে ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারি দলীয় সরকারের অধীনেই দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচন করে ফেলে আওয়ামী লীগ।

এদিকে দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচন বর্জন করে রাজনৈতিকভাবে চরম বৈরী পরিস্থিতিতে পড়ে বিএনপি। সংসদে প্রতিনিধি না থাকায় বিরোধী দলের মর্যাদা হারিয়ে কোণঠাসা হয়ে পড়ে দলটি। তবে সেবার জাতীয় সংসদ নির্বাচন বর্জন করলেও ওই নির্বাচনের পর সব স্থানীয় সরকার নির্বাচনে অংশ নেয় বিএনপি। এর ফলে দেড় শতাধিক উপজেলা চেয়ারম্যানসহ স্থানীয় সরকারের বিভিন্ন স্তরে বিএনপির অনেক তৃণমূল নেতা নির্বাচিত হয়। আর তাদের কেন্দ্র করে তৃণমূল পর্যায়ের নেতাকর্মীরা নিজ নিজ এলাকায় সক্রিয় থাকে। বর্তমানে এ বিষয়টিও বিএনপি নেতাকর্মীদের মধ্যে আলোচনায় উঠে আসছে।