১৯ আগস্ট ২০১৯  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

লিভার দান করে ছেলেকে বাঁচাতে পেরে আনন্দে কাঁদলেন মা

  • বঙ্গবন্ধু মেডিক্যালে সফল প্রতিস্থাপনের পর দুজনই বাড়ি ফিরলেন

স্টাফ রিপোর্টার ॥ কৃতজ্ঞতা জানাতে গিয়ে কাঁদলেন মা ও ছেলে। লিভার দান করে ছেলেকে বাঁচাতে পেরে আনন্দে কাঁদলেন মা রোকসানা বেগম। আর যাদের ত্যাগ ও অবদানে জীবন ফিরে পেয়েছেন তাদেরকে ধন্যবাদ জানাতে গিয়ে আবেগে আপ্লুত হয়ে কান্না থামাতে পারেননি লিভারগ্রহীতা ২০ বছর বয়সী সিরাতুল ইসলাম শুভ। মা-ছেলে উভয়ই প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, স্বাস্থ্যমন্ত্রী জাহিদ মালেক, বিএসএমএমইউ’র উপাচার্য অধ্যাপক কনক কান্তি বড়ুয়াসহ লিভার প্রতিস্থাপন কার্যক্রমের চিকিৎসক টিমসহ সংশ্লিষ্ট সকলের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেছেন। এ সময় উপস্থিত সকলের মুখে ফুটে ওঠে জটিল কার্য সম্পাদনের সফলতার হাসি। আর লিভার প্রতিস্থাপন সফল করায় বিশ্ববিদ্যালয়ের চিকিৎসকদের অভিনন্দন জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। বুধবার রাতে বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য ডাঃ কনক কান্তি বড়ুয়াকে টেলিফোন করে অভিনন্দন জানান তিনি। এ সময় লিভার গ্রহীতা ছেলে সিরাতুল ও দাতা মা রোকসানা বেগমেরও খোঁজ নেন প্রধানমন্ত্রী।

লিভারদাতা ও লিভারগ্রহীতা উভয়ই বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ে (বিএসএমএমইউ) সফল প্রতিস্থাপন কার্যক্রমের মাধ্যমে সুস্থ হয়ে হাসপাতাল ছেড়েছেন। বৃহস্পতিবার এক অনুষ্ঠানের মাধ্যমে তাদেরকে হাসপাতাল থেকে ছাড়পত্র দেয়া হয়েছে। লিভার প্রতিস্থাপন সম্পন্ন হওয়ার পরও তারা এতদিন হাসপাতালে পর্যবেক্ষণাধীন ছিলেন। বিভিন্ন পরীক্ষা-নিরীক্ষা এবং চিকিৎসাসেবা প্রদানের পর তাদের ছাড়পত্র দেয়া যায় বলে মনে করছেন চিকিৎসকরা। মায়ের দান করা লিভারের একাংশ সফল অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে সুস্থ হয়ে উঠেছেন লিভার সিরোসিসে আক্রান্ত ২০ বছর বয়সী সিরাতুল ইসলাম শুভ। বৃহস্পতিবার সিরাতুলকে বিএসএমএমইউ থেকে ছাড়পত্র দেয়া উপলক্ষে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে প্রধান অতিথি স্বাস্থ্যমন্ত্রী জাহিদ মালেক অনুষ্ঠানের শেষাংশে মা-ছেলের হাতে লাল গোলাপ তুলে দেন। বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ডাঃ কনক কান্তি বড়ুয়ার সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন উপ-উপাচার্য (গবেষণা ও উন্নয়ন) অধ্যাপক ডাঃ মোঃ শহীদুল্লাহ সিকদার, উপ-উপাচার্য (শিক্ষা) অধ্যাপক ডাঃ সাহানা আখতার রহমান, উপ-উপাচার্য (প্রশাসন) অধ্যাপক ডাঃ মুহাম্মদ রফিকুল আলম, কোষাধ্যক্ষ অধ্যাপক ডাঃ মোহাম্মদ আতিকুর রহমান, রেজিস্ট্রার অধ্যাপক ডাঃ এ বি এম আব্দুল হান্নান, রোগীর মা রোকসানা বেগম ও রোগী সিরাতুল ইসলাম শুভ।

অনুভূতি প্রকাশ করার একপর্যায়ে কেঁদে ফেলেন সিরাতুল । তিনি বলেন, নতুন জীবন ফিরে পাওয়ার পেছনে অনেকের ভূমিকা রয়েছে। তবে মা আমাকে নতুন জীবন দান করেছেন। বাবা ও ভাইবোনদের ধন্যবাদ জানিয়ে সিরাতুল বলেন, মা আমাকে লিভার দান করবে এতে তারা কেউ বাধা দেননি বরং বিশ্ববিদ্যালয়পড়ুয়া এক বোন প্রয়োজনে তার লিভারের একাংশ দিতেও প্রস্তুত ছিলেন। সকলের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন সিরাতুল।

ছাড়পত্র প্রদান অনুষ্ঠানে উপাচার্য ডাঃ কনক কান্তি বড়ুয়া জানান, এ ধরনের লিভার প্রতিস্থাপন ৩০ লাখ টাকার মধ্যে হওয়া সম্ভব। তবে এ রোগীর ক্ষেত্রে তারা বিনামূল্যে সবকিছু করেছেন। এটি ছিল এই বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রথম লিভার প্রতিস্থাপন এবং দেশের মধ্যে পঞ্চম। আগামী আগস্টে আরও পাঁচটি লিভার প্রতিস্থাপনের কার্যক্রম তারা হাতে নেবেন বলেও জানান তিনি।

অনুষ্ঠানে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন বিশ্ববিদ্যালয়ের হেপাটোবিলিয়ারি, প্যানক্রিয়েটিক ও লিভার ট্রান্সপ্ল্যান্ট সার্জারি বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ডাঃ মোঃ জুলফিকার রহমান খান। তিনি সাংবাদিকদের বলেন, গত ২৪ জুন ২০ বছর বয়সী এক যুবক সিরাতুল ইসলাম শুভ’র লিভার ট্রান্সপ্ল্যান্ট অপারেশন করা হয়। সিরাতুল ইসলাম লিভার সিরোসিসে ভুগছিলেন। ২০১৭ সালে লিভার সিরোসিস ধরা পড়লে চিকিৎসার জন্য তিনি ভারতে যান। সেখানে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকগণ চিকিৎসার জন্য লিভার ট্রান্সপ্ল্যান্ট করার মতামত প্রদান করেন। ২০ বছরের এই যুবকের মায়ের বয়স ৪৯ বছর। তিনি তার ছেলেকে আংশিক লিভার দানে সম্মত হন। এরপর গত ১৫ জুন ওই যুবককে হেপাটোবিলিয়ারি, প্যানক্রিয়েটিক ও লিভার ট্রান্সপ্ল্যান্ট সার্জারি বিভগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ডাঃ মোঃ জুলফিকার রহমান খানের অধীনে ভর্তি করা হয়। ২৪ জুন মায়ের কাছ থেকে আংশিক লিভার সংগ্রহ করে তার ছেলের লিভার ট্রান্সপ্ল্যান্টের দিন ধার্য করা হয়। পরিকল্পনা অনুযায়ী, ২৪ জুন ভোর ৬টা থেকে কার্যক্রম শুরু হয়। লিভার গ্রহীতার লিভার সম্পূর্ণ ফেলে দিয়ে লিভারদাতার লিভারের ডান অংশ সফলভাবে প্রতিস্থাপিত করা হয়। এই অপারেশন সম্পন্ন করতে মোট ১৬ ঘণ্টা সময় লাগে।

অধ্যাপক ডাঃ মোঃ জুলফিকার রহমান খান আরও জানান, অপারেশনের ২৫তম দিন পরও লিভারদাতা সম্পূর্ণ সুস্থ আছেন। তাকে হাসপাতাল থেকে আগেই ছাড়পত্র দেয়া হয়েছে। লিভার গ্রহীতাও বর্তমানে সুস্থ আছেন এবং আজকে তাকে হাসপাতাল থেকে ছাড়পত্র দেয়া হচ্ছে। তার ব্ল্যাড প্রেসার এবং রেসপিরেশন নরমাল আছে। সে স্বাভাবিক মুখে আহার গ্রহণ করছে। সে হাই ডোজের ইমিউনো সাপ্রেশন মেডিসিন পাচ্ছে, সেহেতু তার রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা অনেক কম। এ ব্যাপারে যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হচ্ছে। তার প্রতিস্থাপিত লিভার কাজ শুরু করেছে।

সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয়, অধ্যাপক ডাঃ মোঃ জুলফিকার রহমান খান, চেয়ারম্যান, হেপাটোবিলিয়ারি, প্যানক্রিয়েটিক ও লিভার ট্রান্টপ্ল্যান্ট সার্জারি বিভাগের নেতৃত্বে শল্য চিকিৎসক টিমে ছিলেন অধ্যাপক ডাঃ মোহাম্মদ মোহছেন চৌধুরী, সহযোগী অধ্যাপক ডাঃ বিধান চন্দ্র দাস, সহকারী অধ্যাপক ডাঃ মোঃ সাইফ উদ্দিন এবং সহকারী অধ্যাপক ডাঃ মোঃ নূর-ই-এলাহী। রেসিডেন্ট চিকিৎসকদের মধ্যে ছিলেন- ডাঃ ওমর সিদ্দিকী, ডাঃ মোহাম্মদ ইমরুল হাসান খান, ডাঃ মোহাম্মদ মশিউর রহমান, ডাঃ রাসেল মাহমুদ, ডাঃ আব্দুল্লাহ মোঃ আবু আইউব আনসারি, ডাঃ সারওয়ার আহমেদ সোবহান, ডাঃ মোঃ নাজমুল হক, ডাঃ এস এম মোর্তজা আহসান, ডাঃ জাবিউল ইসলাম, ডাঃ মোঃ আবদুল কাইউম, ডাঃ মোঃ আরিফুজ্জামান, ডাঃ মোঃ আসাদুজ্জামান নূর, ডাঃ মোস্তফা মামুন ওয়ারিদ, ডাঃ একে আজাদ, ডাঃ সবিতা রানা, ডাঃ আজফার বিন আনিস এবং ডাঃ মোঃ ইমরান আলী।