২১ আগস্ট ২০১৯  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

চন্দ্রজয়ের ৫০ বছর

মানুষের আশৈশব লালিত স্বপ্ন চাঁদের বুকে প্রথম পদচিহ্ন পড়ে ১৯৬৯ সালের ২০ জুলাই। তবে ১৯৫৯ সালে ১৩ সেপ্টেম্বর তৎকালীন সোভিয়েত ইউনিয়নের লুনা-২-এর মাধ্যমে শুরু হয় চন্দ্রাভিযান। আর মার্কিন মহাকাশ সংস্থা নাসার এ্যাপোলো-১১ চন্দ্রযানে করে চাঁদের বুকে প্রথম মানুষ হিসেবে পা রাখেন নীল আর্মস্ট্রং, অনতিপরে এডুইন অলড্রিন ও মাইকেল কলিন্স। দিনটিকে যদি চাঁদে মানুষের পদার্পণের পূর্ণতা প্রাপ্তি হিসেবে ধরা হয়, তাহলে চন্দ্রজয়ের ৫০ বছর পূর্তি হচ্ছে শনিবার। ‘একজন মানুষের জন্য একটি ছোট পদক্ষেপ কিন্তু মানবতার জন্য এক বিশাল পদক্ষেপ’- চাঁদে অবতরণের পর অতি বিখ্যাত ও বহুল উদ্ধৃত এই উক্তির মাধ্যমে নীল আর্মস্ট্রং প্রকৃতপক্ষে বোঝাতে চেয়েছিলেন যে, ৫০ বছর আগে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির যে অসামান্য অগ্রগতি সাধিত হয়েছে, তা বর্তমানে আমাদের দৈনন্দিন জীবনকে বদলে দিয়েছে এবং প্রভাবিত করছে। চন্দ্রাভিযান সফল করার জন্য সে সময়ে যে বিপুল অঙ্কের অর্থের প্রয়োজন হয়েছিল তা অনুমোদন করেছিলেন তৎকালীন জনপ্রিয় মার্কিন প্রেসিডেন্ট জন এফ কেনেডি। তখন তার সমালোচকরা বলেছিলেন, এটি অসম্ভব। প্রত্যুত্তরে প্রেসিডেন্ট কেনেডি বলেছিলেন, অসম্ভব বলেই আমরা তা সম্ভব করব। সফল চন্দ্র জয়ের সুবর্ণজয়ন্তী উপলক্ষে ইতোমধ্যেই নানা-উৎসব-অনুষ্ঠান শুরু হয়ে গেছে যুক্তরাষ্ট্রের কেনেডি স্পেস সেন্টারসহ অন্যত্র। ইউনেস্কোর বিশ্ব ঐতিহ্য ও স্থান সংরক্ষণের মতো চাঁদের বুকেও অন্তত ১০০টি স্থান সংরক্ষণের প্রস্তাব করা হয়েছে ‘ফর অল মুনকাইন্ড’ সংগঠনের পক্ষ থেকে। আর বিভিন্ন সময়ে চাঁদের বুকে ফেলে আসা মানুষের স্মৃতি সংবলিত প্রায় ১৬৭ টন সামগ্রীকেও ‘ঐতিহ্য’ হিসেবে ঘোষণার প্রস্তাব করা হয়েছে। ইতোমধ্যে চীন এবং ভারতও সফলভাবে সমাপ্ত করেছে চন্দ্রাভিযান। জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে পৃথিবী ক্রমশ বসবাসের অনুপযোগী হয়ে পড়ায় মানুষ এখন জোরেশোরে অগ্রসর হচ্ছে মঙ্গলাভিযানে। সেদিন খুব দূরে নয়, যেদিন মঙ্গলের বুকেও পড়বে মানুষের পা।

ইতোমধ্যে রক্তিম রঙের গ্রহ মঙ্গলের বুকে পা রাখতে সমর্থ হয়েছে মনুষ্যনির্মিত রোবটযান ইনসাইট। পৃথিবী যে ক্রমশ উত্তপ্ত ও বসবাসের অনুপোযোগী হয়ে উঠবে তা সুস্থ মন ও মস্তিষ্কে কে ভাবতে চায়? তবে বাস্তবে সেটাই ঘটতে চলেছে যেন। উত্তর মেরু, দক্ষিণ মেরুতে ওজোন স্তরের ক্রমাগত ক্ষয়ের কারণে ভূম-ল ইতোমধ্যেই উত্তপ্ত ও মরুভূমি সদৃশ হয়ে উঠেছে। যার অনিবার্য পরিণতি আবহাওয়া ও জলবায়ুর পরিবর্তন, সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি, খরা ও মরুপ্রবণতা, তীব্র তুষারপাত, ঝড়-ঝঞ্ঝা-শিলাবৃষ্টি, অতিবৃষ্টি, বন্যা সর্বোপরি হিমবাহের গলন। এর পাশাপাশি প্রায় নিয়মিত যুদ্ধবিগ্রহ, ক্ষুধা ও দারিদ্র্য, অশান্তি-বিরোধ, হানাহানি ইত্যাদি তো আছেই। তদুপরি তীব্র সমস্যা হয়ে দেখা দিয়েছে জনসংখ্যার বিস্ফোরণ। যে কারণে বিজ্ঞানীদের ভাবনা, অদূর ভবিষ্যতে মানুষকে নিজের সমাজসভ্যতা ও কৃষ্টিকে নিরাপদ এবং বসবাসের উপযোগী রাখার জন্য ভিন্ন কোন গ্রহে উপনিবেশ স্থাপন করতে হবে। আর বর্তমান পৃথিবীর উপযোগী আবহাওয়া ও ভূ-আনুকূল্য বিবেচনায় সৌরজগতের সবচেয়ে কাক্সিক্ষত গ্রহটি হলো লাল সদৃশ মঙ্গল। আর সে কারণেই বহু বাছবিচার, বহু গবেষণা ও অনুসন্ধিৎসা শেষে মানুষের মঙ্গল অভিযান। অবশ্য কাজটি মোটেও সুগম ও সহজসাধ্য ছিল না। প্রথমত মঙ্গলের দূরত্ব পৃথিবী থেকে ৪৮ দশমিক ৬ কোটি কিলোমিটার পথ পাড়ি দিয়ে মঙ্গলের বুকে পা রাখা মোটেও চাট্টিখানি কথা নয়। ২০১৮ সালের ৫ মে যুক্তরাষ্ট্রের ক্যালিফোর্নিয়ার ভ্যানডেনবার্গ বিমান ঘাঁটি থেকে যাত্রা শুরু করে রোবট ইনসাইট। দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়ে ২৬ নবেম্বর মঙ্গলের মাটিতে অবতরণে সক্ষম হয় রোবটযানটি। ইনসাইট যেসব কাজ করবে তা হলো, মঙ্গলপৃষ্ঠের তাপমাত্রা, অনুরণন, কম্পনের মতো অত্যাবশ্যক লক্ষণসমূহের পরিমাপ সম্পর্কে তথ্যাদি সংগ্রহ এবং সেসব পৃথিবীর নিয়ন্ত্রণ কক্ষে প্রেরণ। ছবি ও তথ্য পাঠানোর পাশাপাশি ইনসাইটের দ্বিতীয় মুখ্য কাজ হবে নিজের সোলার প্যানেলটিকে সক্রিয় করে তোলা। তাহলে রোবটিক দীর্ঘদিন সক্রিয় ও কর্মক্ষম থাকতে সক্ষম হবে। মানবসভ্যতার অগ্রগতিতে এটি একটি মাইলফলকও বটে। বিজ্ঞান ও মানুষের সম্ভাবনা অসীম ও অন্তহীন। তাকে কোন পরিসীমায় বেঁধে ফেলা যায় না। পৃথিবী লয়প্রাপ্ত হলে মানুষ সভ্যতা স্থানান্তরে উদগ্রীব হবে, সেটাই স্বাভাবিক ও সঙ্গত। সে ক্ষেত্রে মঙ্গল হতে পারে মানুষের প্রথম পছন্দ।