২২ আগস্ট ২০১৯  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

হঠাৎ করেই শিশুদের গলাকাটা আতঙ্ক-তদন্তে নেমেছে পুলিশ

আজাদ সুলায়মান ॥ হঠাৎ করেই শিশুদের গলাকাটা আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে। পদ্মাসেতুর জন্য মাথা প্রয়োজন- বলে গুজব ছড়ানোর পর গত দু’দিনে নেত্রকোনা ও রাজশাহীতে দু’শিশুর মাথা কাটার ঘটনা ঘটে। এই ঘটনায় গুজব যেন বিশ্বাসযোগ্য হয়ে ওঠছে। এতে অভিভাবকরাও আতঙ্কিত হয়ে পড়েছেন। এ দুটো ঘটনার সূত্র একই নাকি ভিন্ন- সেটার তদন্তে নেমেছে পুলিশ প্রশাসন। বৃহস্পতিবার ও শুক্রবার মাত্র ২৪ ঘণ্টার ব্যবধানে এ দুটো শিশুর গলা কাটার ঘটনা ঘটে। নেত্রকোনায় শিশুটির মস্তক বিচ্ছিন্ন উদ্ধার করা হলেও রাজশাহীর শিশুটি এখন হাসপাতালে চিকিৎসাধীন। দুটো শিশুর ওপর এ ধরনের নৃশংস আঘাতের পর অভিভাবকরা চরম উদ্বিগ্ন। নেত্রকোনার স্কুলগুলোতে শিশু শিক্ষার্থীদের উপস্থিতির হার হ্রাস পেয়েছে আশঙ্কাজনক হারে। এমনকি রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে শিশুদের মাথা কাটার আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে। পরিস্থিতি সামাল দিতে শুক্রবার দুপুরে জরুরী সংবাদ সম্মেলন ডেকে এ ধরনের গুজবে কান না দিয়ে গণপিটুনির নামে আইন নিজের হাতে তুলে না নেয়ার আহ্বান জানিয়েছেন। এ ধরনের গুজব মোকাবেলায় নেত্রকোনা ও রাজশাহীর পুলিশ প্রশাসন বেশ গুরুত্বের সঙ্গে মাঠে নেমেছে।

উল্লেখ্য বৃহস্পতিবার নেত্রকোনার পূর্ব কাটলি এলাকার রঈছ উদ্দিনের শিশু সজিবের (৭) বিচ্ছিন্ন মস্তক প্রতিবেশী মাদকাসক্ত যুবক রবিনের (২৮) কাছ থেকে উদ্ধার হয়। পরে এ ঘটনায় একই এলাকার বাসিন্দা এখলাছের ছেলে রবিনকে গণপিটুনি দিয়ে মেরে ফেলা হয়। এর কিছুক্ষণ পর পূর্ব কাটলি এলাকার কায়কোবাদ নামে এক ব্যক্তির নির্মাণাধীন ভবনের তৃতীয় তলা থেকে শিশু সজীবের মস্তক বিচ্ছিন্ন দেহটি উদ্ধার করে পুলিশ। পরে শিশু ও যুবকের মরদেহগুলো নেত্রকোনা আধুনিক সদর হাসপাতাল মর্গে পাঠানো হয়।

এদিকে বৃহস্পতিবার রাতেই রাজশাহীর বাগমারায় মিজানুর রহমান মিজান নামে ছয় বছরের এক শিশুকে গলা কেটে হত্যার চেষ্টা চালিয়েছে দুর্বৃত্তরা। গভীর রাতে উপজেলার ভবানীগঞ্জ পৌর এলাকার সূর্যপাড়ায় এই ঘটনা ঘটে। ওই সময় একই ঘরে শিশুটির মা-বাবাও ঘুমিয়েছিলেন। আহত মিজান ওই এলাকার আতিকুর রহমানের ছেলে। রাতেই মুমূর্ষু অবস্থায় তাকে রাজশাহী মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে নেয়া হয়। বর্তমানে হাসপাতালের ৩৩ নম্বর ওয়ার্ডে চিকিৎসাধীন ওই শিশু।

শুক্রবার এ বিষয়ে খোঁজ নিয়ে জানা যায়-এ দুটো ঘটনা জনমনে ব্যাপক আতঙ্ক ও উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে। এরই মধ্যে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছেলে ধরা নিয়ে ভীতি নেত্রকোনা ও রাজশাহী জেলাবাসীর মনে সৃষ্টি হয়েছে। বিষয়টি ফেসবুকসহ অন্যান্য সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়ে। এ নিয়ে নানা ধরনের গুজবও ছড়ানো হয়। বিশেষ করে মাত্র তিনদিন আগে পদ্মাসেতুর জন্য মস্তক প্রয়োজন বলে গুজব ছড়ানোর অভিযোগে চার যুবককে গ্রেফতারেরর পর নেত্রকোনা ও রাজশাহীর অভিভাবকদের কাছে তা বিশ্বাসযোগ্য হয়ে ওঠছে। নেত্রকোনার গৃহবধূ মারিয়া বলেছেন, পদ্মাসেতুর জন্যই কি শিশু সজিবের মস্তক কাটা হয়েছে। তিনি তার শিশুকে স্কুলে দিতে সাহস পাচ্ছেন না বলে জানিয়েছেন। অপর নারী জানিয়েছেন, শিশুদের গলা কেটে শরীরে নাকি খুনীরা সিল মেরে দেয়। যদিও সজিবের শরীরে এ ধরনের কোন সিল মারা দেখা যায়নি।

নেত্রকোনা ও রাজশাহী পুলিশের সঙ্গে আলোচনা করে জানা যায়-এ দুটো ঘটনা সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন। একটার সঙ্গে আরেকটার কোন যোগসূত্র বা সম্পৃকক্ততা নেই। নেত্রকোনার পুলিশ জানিয়েছে- সজিবের ঘটনায় শহরে নানা ধরনের গুজবের ডালপালা ছড়ানো হচ্ছে। কেউ পরিকল্পিতভাবে এ ধরনের গুজব ছড়াচ্ছে- নাকি এমনিতেই মানুষের মাঝে আতঙ্ক নেমে আসছে তা খতিয়ে দেখছে পুলিশ। জেলা পুলিশ সুপার জয়দেবদ চৌধুরী জরুরী এক সংবাদ সম্মেলনে এ ধরনের গুজব মোকাবেলা সতর্ক ও সচেতন হওয়ার জন্য জেলাবাসীর প্রতি অনুরোধ জানিয়েছেন। তিনি বলেন, অপরিচিত হলেও সন্দেহ করে কাউকে মারা যাবে না। এ ধরনের ভুল কাজে নিজেও অপরাধী হয়ে যেতে পারেন। এতে যে কাউকে দাঁড়াতে হতে পারে আইনের কাঠগড়ায়। এলাকা, পাড়া বা মহলায় অপরিচিত ব্যক্তিকে নিয়ে সন্দেহের সৃষ্টি হলে আগে তার সঙ্গে কথা বলুন। নয়ত শুধু সন্দেহের জেরেই চলে যেতে পারে সেই ব্যক্তির জীবন। আগে পরিচয় সম্পর্কে শতভাগ নিশ্চিত হন। তারপর কোথাও সমস্যা মনে হলে পুলিশে দিন। তা মন থেকে ঝেরে ফেলার পরামর্শ দিয়ে জয়দেব বলেন, নেত্রকোনা শহরের শিশু সজীবের দেহ বিচ্ছিন্ন মাথা কোন অপরিচিত ব্যক্তির হাতে ছিল না। রবিন ছিল ওই শিশুরই প্রতিবেশী এবং এলাকার চিহ্নিত মাদকাসক্ত যুবক। যদি গণপিটুনি দিয়ে রবিনকে মেরে ফেলা না হত তবে প্রকৃত ঘটনা পুলিশের মাধ্যমে অথবা সরাসরি তার মুখ থেকে দেশবাসী দ্রুত সময়ে শুনতে পারত। কিন্তু আইন হাতে তুলে নেয়ায় পুলিশ সেই সুযোগ পায়নি। অপরাধ যে কেউ করতে পারে আর তার জন্য আইন-আদালত রয়েছে। প্রচলিত আইন অনুযায়ী অপরাধীর বিচার হবে আদালতে। কিন্তু আইন কারও নিজের হাতে তুলে নেয়ার সুযোগ নেই। ধারণা করা হচ্ছে মনের পুরনো কোন জেদ বা বিকৃত মানসিকতা থেকেই সজীবের সঙ্গে এমন নির্মম ও বর্বরোচিত ঘটনা ঘটেছে। পুলিশ মাঠে আছে, দ্রুত সময়ের মধ্যেই মূল রহস্য উদঘাটন হবে। এরই মধ্যে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছেলে ধরা নিয়ে যে ভীতি জেলাবাসীর মনে সৃষ্টি হয়েছে ছেলেধরা বা পদ্মাসেতু ‘গুজবের’ কোন সম্পর্ক নেই।

ঠিক কি কারণে এ সজিবের গলা কাটা হয়েছে জানতে চাইলে জয়দেব চৌধুরী জানান- পদ্মা সেতুতে মস্তক প্রয়োজনের গুজবের সঙ্গে এটার সম্পর্ক একেবারেই নেই। কেননা এখন পর্যন্ত প্রাথমিক তদন্ত ও মরদেহের আলামত দেখে ধারণা করা হচ্ছে- একটি পরিত্যক্ত বাড়িতে সজিবকে হত্যার আগে বলাৎকার করা হয়। তারপর ঘাতক রবীন তার মস্তক কেটে ব্যাগে ভরে মদ কিনতে গিয়ে ধরা খেয়ে গণপিটুনিতে প্রাণ হারিয়েছে। এখন দেখতে হবে সে কেন সজিবের মস্তক কেটে নিয়ে ব্যাগে ভরে রাস্তায় নেমেছিল। সে যদি জীবিত থাকত তাহলে গ্রেফতারের পর পরই এ বিষয়টা নিশ্চিত হওয়া যেত।

তিনি আরও বলেন, রবিন ও শিশুটির বাবা একই এলাকার বাসিন্দা এবং পরস্পরের পূর্বপরিচিত। কাটলি এলাকার একটি নির্মাণাধীন বাড়ির টয়লেটে সজিবকে গলাকেটে হত্যা করে রবিন। সজিবকে নির্যাতনের পর রবিন হত্যা করেছে বলে প্রাথমিক তদন্ত করে জানা গেছে। রবিনকে চিহ্নিত মাদক বিক্রেতা’ দাবি করে এ পুলিশ কর্মকর্তা বলেন-এ হত্যাকা-ের সঙ্গে পদ্মাসেতুতে মাথা লাগবে এমন গুজবের কোন সম্পর্ক নেই। এটি একটি বিচ্ছিন্ন ঘটনা। রবিনের জব্দকৃত মোবাইল ফোনটি প্রযুক্তি ব্যবহার করে তদন্ত করা হচ্ছে।

এদিকে বৃহস্পতিবার রাতে ঘটনাস্থল পরিদর্শন শেষে ময়মনসিংহ রেঞ্জের অতিরিক্ত ডিআইজি আক্কাস উদ্দিন ভুইয়া সাংবাদিকদের বলেন, মাথা ছিন্ন করে হত্যার ঘটনায় চাঞ্চল্যে তৈরি হয়েছে। তবে আতঙ্কিত হওয়ার কিছু নেই। এর সঙ্গে পদ্মাসেতুতে মাথা দরকার এমন গুজবের কোন সম্পর্ক নেই।

এদিকে রাজশাহীর ঘটনাও ভিন্ন কারণে ঘটেছে বলে জানিয়েছে পুলিশ। প্রাথমিক তদন্তে পুলিশ নিশ্চিত হয়েছে এটাও ছেলে ধরা বা পদ্মা সেতুর প্রয়োজনে গলা কাটার ঘটনা নয়। পুলিশকে ইতোমধ্যেই আহত শিশুটির মা ফিরোজা বেগম জানান, প্রচ- গরমের কারণে তারা ঘরের মেঝেতে শুয়েছিলেন। শিশু মিজান শুয়েছিল খাটের ওপরে। গভীর রাতে ছেলের চিৎকারে তাদের ঘুম ভেঙ্গে যায়। রক্তাক্ত শিশুকে রাতেই নেয়া হয় উপজেলা স্বাস্থ্যকেন্দ্রে। পরে তাকে রামেক হাসপাতালে নেয়া হয়। অস্ত্রপচার শেষে মিজান শঙ্কামুক্ত বলে জানিয়েছেন চিকিৎসক। রাতে শোয়ার ঘরের দরজা খোলা ছিল। শিশু মিজান শুয়েছিল জানালার পাশেই। ঘরে প্রবেশ করে অথবা জানালা দিয়ে কেউ তার গলাকাটার চেষ্টা চালায়। তবে কাউকে ঘরের ভেতর থেকে পালাতে দেখেননি। এই ঘটনার কারণ এবং কারা এই কান্ড ঘটিয়েছেন তাও নিশ্চিত নন তারা।

এ বিষয়ে বাগমারা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আতাউর রহমান জানান, খবর পেয়ে ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছে পুলিশ। শোয়ার ঘরে ড্রেসিং টেবিলের ওপর ভাঙ্গা কাঁচ পাওয়া গেছে। প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে এই কাঁচ ভেঙ্গে শিশুটির গলায় পড়েছিল। অন্য কারণও খতিয়ে দেখছে পুলিশ। তবে ছেলের গলা থেকে রক্তক্ষরণ দেখে আতঙ্কিত হয়ে তাড়াহুড়ো করতে গিয়ে ড্রেসিং টেবিলের কাঁচ ভেঙ্গে গেছে বলে দাবি করেছেন শিশুটির মা ফিরোজা বেগম।

এ দুটো ঘটনাকে কেন ছেলে ধরা বা পদ্মা সেতুর প্রয়োজনে মস্তক কাটার গুজব হিসেবে রটানো হচ্ছে জানতে চাইলে সাবেক পুলিশ মহাপরিদর্শক নুুরুল আনোয়ার দৈনিক জনকণ্ঠকে বলেন, এটা আমাদের দেশের একটা কমন থিং হয়ে গেছে। কোন একটা ঘটনা বা একটা অপরাধ একটা প্যাটার্নে হতে থাকলে ঠিক সেভাবেই পুনরাবৃত্তি ঘটতে থাকে। তখনই সমাজে বা দেশে এক ধরনের আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। নইলে পদ্মাসেতুতে কেন মানুষের মস্তক লাগবে। দুনিয়াব্যাপী এত বড় বড় ব্রিজ নির্মাণ হয়েছে কোথাও কি কোন মস্তক লেগেছে। এর আগে আমাদের দেশেই তো যমুনা সেতু নির্মিত হয়েছে সেখানে কি মস্তক লেগেছিল। এখন পদ্মাসেতু যখন নির্মাণ কাজ শেষ হতে যাচ্ছে তখন একটা বিশেষ মহল অত্যন্ত সুকৌশলে এগুলো রটাচ্ছে। সরকারকে বেকায়দায় ফেলানো বা ভাবমূর্তিতে আঘাত হানতে এটা করা হচ্ছে। নেত্রকোনা ও রাজশাহীর দুটো ঘটনা তদন্তের আগে কিছুই মন্তব্য করা যাবে না। পুলিশ তদন্ত করছে। তবে আমার মনে হচ্ছে- দুটো দু’কারণে ঘটেছে। এখন গুজবকারীরা এটাকে মোক্ষম হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করছে। তদন্তে সবই বেরিয়ে আসবে। এজন্য কিছুটা সময় অপেক্ষা করতে হবে।

একই দিন রাজশাহী ও নেত্রকোনায় দুটো শিশুর গলা কাটার কোন যোগসূত্র থাকতে পারে কি জানতে চাইলে নুরুল আনোয়ার বলেন, যতটুকু জেনেছি দুটো দু’কারণে ঘটেছে।

দেশব্যাপী এ আতঙ্কে ভীত সন্ত্রস্ত না হবার কৌশল সম্পর্কে জানতে চাইলে তিনি বলেন, অভিভাবকদেরকেই সচেতন হতে হবে- তাদের সচেতন করতে হবে। গুজবকে গুজব হিসেবেই দেখতে হবে। কোন মহল যদি পরিকল্পিতভাবে এটা রটিয়ে থাকে তাহলে সেটা খুঁজে বের করে কঠোর ব্যবস্থা নিতে হবে।