১৯ আগস্ট ২০১৯  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

দেশদ্রোহী তৎপরতা ॥ ট্রাম্পের কাছে প্রিয়া সাহার মিথ্যা তথ্য প্রদান

দেশদ্রোহী তৎপরতা ॥ ট্রাম্পের কাছে প্রিয়া সাহার মিথ্যা তথ্য প্রদান
  • সারাদেশে নিন্দা, প্রতিবাদের ঝড়;###; মামলার প্রস্তুতি

গাফফার খান চৌধুরী ॥ মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের কাছে ভয়াবহ মিথ্যাচার করে রীতিমতো আলোচনার ঝড় তুলেছেন প্রিয়া সাহা নামের এক বাংলাদেশী নারী নেত্রী। বাংলাদেশ হিন্দু-বৌদ্ধ-খ্রীস্টান ঐক্য পরিষদের সাংগঠনিক সম্পাদক হিসেবে তিনি মার্কিন প্রেসিডেন্টের সঙ্গে কথা বলার সুযোগ পেয়েছিলেন। ট্রাম্পের সঙ্গে সাক্ষাতে তিনি বাংলাদেশের সংখ্যালঘু প্রায় পৌনে চার কোটি মানুষ নিখোঁজ বলে দাবি করেন। যদিও বাংলাদেশে নিযুক্ত মার্কিন রাষ্ট্রদূত রবার্ট মিলার প্রিয়া সাহার এমন তথ্য ভিত্তিহীন বলে ইতোমধ্যেই মার্কিন প্রশাসনকে জানিয়ে দিয়েছেন। মার্কিন প্রেসিডেন্টের কাছে প্রিয়া সাহার এমন অভিযোগের বিষয় নিয়ে সারাদেশে রীতিমতো হৈ চৈ পড়ে গেছে। এ নিয়ে সারাদেশে নিন্দা আর প্রতিবাদের ঝড় বয়ে যাচ্ছে। বাংলাদেশে মার্কিন দূতাবাসের তরফ থেকে প্রিয়ার বক্তব্যের বিষয়ে দেয়া এক বিবৃতিতে বলা হয়েছে, মার্কিন কর্তৃপক্ষ কারও ব্যক্তিগত মতামত প্রকাশ করতে বাধা দেয় না। এমনকি ব্যক্তিগত মতামত প্রকাশের ক্ষেত্রে হস্তক্ষেপও করে না।

ইতোমধ্যেই বাংলাদেশ সম্পর্কে মার্কিন প্রেসিডেন্টের কাছে মারাত্মক মিথ্যাচার করার কারণ জানতে রীতিমতো তদন্ত শুরু হয়ে গেছে। বিশেষ কোন ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর প্ররোচনায় তিনি এমন মিথ্যাচার করেছেন কিনা তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে। তার বিরুদ্ধে রাষ্ট্রদ্রোহীতার অভিযোগ এনে মামলা দায়েরের প্রস্তুতি চলছে। সেই মামলায় প্রিয়া সাহাকে গ্রেফতার দেখিয়ে ঘটনার প্রকৃত রহস্য উদ্ঘাটন করতে যাবতীয় প্রক্রিয়া শেষ করা হয়েছে।

পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, বিশ্বের বিভিন্ন দেশে ধর্মীয় নিপীড়নের শিকার, এমন ২৭ ব্যক্তির সঙ্গে বৈঠক করেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। গত ১৬ জুলাই অনুষ্ঠিত ওই বৈঠকে ১৬ দেশের প্রতিনিধিরা অংশ নেন। বৈঠকে বাংলাদেশ হিন্দু-বৌদ্ধ-খ্রীস্টান ঐক্য পরিষদের সাংগঠনিক সম্পাদক প্রিয়া সাহাও অংশ নেন। বৈঠকের এক পর্যায়ে প্রিয়া সাহা মার্কিন প্রেসিডেন্টের সঙ্গে কথা বলার সুযোগ পান।

নিজের পরিচয় দিয়ে প্রিয়া সাহা মার্কিন প্রেসিডেন্টকে জানান, তিনি বাংলাদেশ থেকে এসেছেন। বাংলাদেশে ৩ কোটি ৭০ লাখ হিন্দু, বৌদ্ধ ও খ্রীস্টান ব্যক্তি নিখোঁজ রয়েছেন। এ বিষয়ে তিনি ট্রাম্পের কাছে সহায়তা চান। তাদের দেশে থাকাও অনিরাপদ। তারা দেশেই থাকতে চান। এজন্য যেন তাদের বিষয়ে পদক্ষেপ নেয়া হয়। সেখানে ১ কোটি ৮০ লাখ সংখ্যালঘু আছে। তারা বাড়িঘর হারিয়েছেন। তারা আমাদের বাড়িঘর পুড়িয়ে দিয়েছে। আমাদের ভূমি দখল করে নিয়েছে। কিন্তু এখন পর্যন্ত কোন বিচার পাইনি। প্রিয়া সাহার এমন বক্তব্য প্রকাশের পর বাংলাদেশসহ সারা দুনিয়ায় রীতিমতো তোলপাড় শুরু হয়ে যায়। এ নিয়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ফেসবুকে রীতিমতো ঝড় বয়ে যাচ্ছে। দেশজুড়ে এখন এটিই আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে। পাড়া-মহল্লা থেকে শুরু করে রাষ্ট্রের উচ্চপর্যায় পর্যন্ত একই আলোচনা।

প্রিয়া সাহার অভিযোগ সঠিক নয়, মার্কিন রাষ্ট্রদূত ॥ মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের কাছে প্রিয়া সাহা বাংলাদেশী সংখ্যালঘু নির্যাতন বিষয়ে যে তথ্য দিয়েছেন তা সঠিক নয় বলে দাবি করেছেন ঢাকায় নিযুক্ত মার্কিন রাষ্ট্রদূত রবার্ট মিলার। তিনি আরও বলেন, হোয়াইট হাউসের ওয়েবসাইটের বিবৃতিতে বাংলাদেশী ওই নারীকে মিসেস সাহা পরিচয় করিয়ে দেয়া হয়। যদিও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম থেকে জানা যায়, ওই নারীর নাম প্রিয়া সাহা। তিনি বাংলাদেশ হিন্দু-বৌদ্ধ-খ্রীস্টান ঐক্য পরিষদের সাংগঠনিক সম্পাদক ও মানবাধিকার কর্মী।

ওই নারীর এমন অভিযোগ সঠিক নয়। কারণ বাংলাদেশের বিভিন্ন ধর্মীয় সম্প্রদায় একে-অপরকে শ্রদ্ধা করে। আমার প্রথম আট মাসের দায়িত্ব পালনকালে আমি বাংলাদেশের আটটি বিভাগেই ঘুরেছি। মসজিদ, মন্দির ও চার্চে গিয়ে ইমাম-পুরোহিতদের সঙ্গে কথা বলেছি। এখন আমি এসেছি একটি বৌদ্ধ মন্দিরে, আমার কাছে যেমনটা মনে হয়েছে, এখানকার ভিন্ন ভিন্ন বিশ্বাসের লোকজন একে-অপরকে শ্রদ্ধা করে। তাই আমি মনে করি, তার অভিযোগ সঠিক নয়, বরং ধর্মীয় সম্প্রীতির ক্ষেত্রে বাংলাদেশ একটি উল্লেখযোগ্য নাম। তিনি আরও বলেন, এ অঞ্চলের প্রধান ইস্যুগুলো কী, তা যুক্তরাষ্ট্র ভালভাবেই জানে।

প্রিয়া সাহার বক্তব্য রাষ্ট্রদ্রোহীতার শামিল, আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের ॥ প্রিয়া সাহার বক্তব্য প্রসঙ্গে আওয়ামী লীগ সভাপতির ধানমন্ডির রাজনৈতিক কার্যালয়ে শনিবার দুপুরে আয়োজিত যৌথসভা শেষে আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক, সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের বলেছেন, প্রিয়া সাহার বক্তব্য সম্পূর্ণ অসত্য, মিথ্যা ও বানোয়াট। এই বক্তব্য কোনভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। এ ধরনের উস্কানিমূলক বক্তব্য উগ্রবাদীদের উৎসাহিত করে। এছাড়া তার এ বক্তব্য রাষ্ট্রদ্রোহীতার শামিল। দেশদ্রোহী হিসেবে তার বিরুদ্ধে অবশ্যই শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেয়া হবে। প্রিয়া সাহার এমন বক্তব্যের বিষয়ে হিন্দু, বৌদ্ধ ও খ্রীস্টান ঐক্য পরিষদের নেতাদের সঙ্গে কথা হয়েছে। প্রিয়া সাহার এমন বক্তব্যের সঙ্গে সংগঠনটির কেউ একমত নন। বাংলাদেশে সাম্প্রদায়িকতাকে উস্কে দিতেই পরিকল্পিতভাবে তিনি এমন বক্তব্য দিয়েছেন। তবে বাংলাদেশের মানুষ সাম্প্রদায়িকতাকে চরমভাবে ঘৃণা করে। প্রিয়া সাহার বক্তব্য মোতাবেক তিনি দেশদ্রোহী। তাই দেশদ্রোহী হিসেবে অবশ্যই প্রিয়া সাহার বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেয়া হবে। এ সংক্রান্ত কার্যক্রম শুরু হয়েছে।

প্রিয়া সাহা দেশে ফিরলে জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে- স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ॥ শনিবার রাজধানীর ধানমন্ডির নিজ বাসায় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল সাংবাদিকদের বলেন, সংখ্যালঘু নিয়ে আলোচনার ঝড় তোলা প্রিয়া সাহার বক্তব্যের সত্যতা প্রিয়া সাহাকেই প্রমাণ করতে হবে। মার্কিন প্রেসিডেন্টের কাছে প্রিয়া সাহার করা অভিযোগ অবশ্যই প্রিয়া সাহাকেই প্রমাণ করতে হবে। এর অন্যথা হওয়ার কোন সুযোগ নেই। এ সংক্রান্ত প্রয়োজনীয় নথিপত্র দিতে হবে। অভিযোগ প্রমাণ করতে না পারলে প্রিয়া সাহার বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেয়া হবে। প্রিয়া সাহার বক্তব্য বাংলাদেশ সম্পর্কে বিশ্বের কাছে নেতিবাচক বার্তা পৌঁছে দিয়েছে। পুরো দেশের মানুষ তার বক্তব্যে বিভ্রান্ত। দেশের কোন জায়গায় থেকে প্রায় পৌনে চার কোটি মানুষ নিখোঁজ হয়ে গেছে, তার প্রমাণ দিতে হবে প্রিয়া সাহাকে। কোন্ কোন্ জেলায় বা জায়গায় এমন ঘটনা ঘটেছে, তার লিখিত দলিল ও প্রমাণ দিতে হবে। নিখোঁজদের পরিবারের সন্ধান দিতে হবে। অন্যথায় তার বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেয়া হবে। তার বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করে তাকে গ্রেফতারের পর জিজ্ঞাসাবাদ করার প্রস্তুতিও আছে সরকারের।

প্রিয়া সাহা কেন এমন মিথ্যা তথ্য দিলেন, সেটি গভীরভাবে অনুসন্ধান করে দেখা হচ্ছে। এ ব্যাপারে বিভিন্ন সংস্থার তরফ থেকে তদন্ত শুরু হয়েছে। কোথায় বাড়িঘর পুড়িয়ে দেয়া হয়েছে, তারও খোঁজ-খবর নেয়া হচ্ছে। এমন মিথ্যা তথ্য দেয়ার পেছনে ষড়যন্ত্র আছে। সেই ষড়যন্ত্রের সঙ্গে কারা কি কারণে এবং কিভাবে জড়িত তা জানার চেষ্টা করা হচ্ছে।

মন্ত্রী আরও বলেন, বিগত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে দেশে হিন্দুদের হার ছিল ৮ শতাংশের বেশি। ২০১৭ সালের জরিপ অনুযায়ী ১০ ভাগের বেশি। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান অসাম্প্রদায়িক চেতনার সোনার বাংলা গড়ার যে স্বপ্ন দেখতেন, সেই স্বপ্ন বিনির্মাণে বর্তমান সরকার সফল।

যে আওয়ামী লীগ সরকার জামায়াত-শিবির কর্তৃক নির্বাচনের পর পর ২০১৫ সালে সংখ্যালঘুদের পুড়িয়ে দেয়া মন্দির, উপাসনালয় ও বাড়িঘর, দোকানপাট নতুন করে বিজিবি সদস্যদের দিয়ে গড়ে দিয়েছেন, সেই সরকারের আমলে সংখ্যালঘু নির্যাতনের তথ্য রীতিমতো হাস্যরসের সৃষ্টি করেছে। এটি নিছক প্রোপাগান্ডা। নিশ্চয়ই এমন মিথ্যাচারের পেছনে দেশীয় বা আন্তর্জাতিক কোন গভীর ষড়যন্ত্র আছে। সত্যিকার অর্থে এমন কোন নির্যাতনের ঘটনা ঘটেনি।

মন্ত্রী আরও বলেন, প্রধানমন্ত্রী দেশে ফেরার পর এ ব্যাপারে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেয়া হবে। তবে বিষয়টি নিয়ে প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে যোগাযোগ হচ্ছে। প্রিয়া সাহা দেশে ফিরলে তাকে এ ব্যাপারে জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে।

ষড়যন্ত্রের অংশ হিসেবে প্রিয়া সাহার এমন বক্তব্য পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ॥ মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের কাছে বাংলাদেশে ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের বিষয়ে প্রিয়া সাহার মিথ্যা অভিযোগের প্রতিবাদ ও তীব্র নিন্দা জানিয়েছে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। শনিবার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের তরফ থেকে দেয়া এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে প্রিয়া সাহার এমন বক্তব্যের আনুষ্ঠানিক প্রতিবাদ ও প্রতিক্রিয়া জানিয়েছে। এক প্রতিক্রিয়ায় বলা হয়েছে, এমন মিথ্যাচারের পেছনে অসৎ কোন উদ্দেশ্য আছে। এটি রাষ্ট্রবিরোধী ষড়যন্ত্রের অংশ। সেই ষড়যন্ত্রের অংশ হিসেবেই এমন মিথ্যাচার করা হয়েছে। বাংলাদেশের মারাত্মক ক্ষতি করার উদ্দেশ্য নিয়েই প্রিয়া সাহা ট্রাম্পের কাছে এমন অভিযোগ করেছেন বলে মনে করছে সরকার। বাংলাদেশ ধর্মীয় স্বাধীনতা ও সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির একটি বাতিঘর। যেখানে সকল ধর্ম ও সম্প্রদায়ের মানুষ যুগ যুগ ধরে শান্তিতে বসবাস করছেন। জোরপূর্বক বাস্তুচ্যুত ১১ লাখেরও বেশি মিয়ানমারের নাগরিকদের (রোহিঙ্গাদের) অস্থায়ীভাবে আশ্রয় দেয়া হয়েছে। এমন ঘটনার পর বাংলাদেশের মানুষের মানবিকতা ও উদারতা বিশ্বব্যাপী প্রশংসিত হয়েছে। আর সেই দেশ সম্পর্কে এমন মিথ্যাচারের ঘটনা সত্যিই বিরল ঘটনা। বাংলাদেশ সরকার আশা করে এ ধরনের বড় আন্তর্জাতিক অনুষ্ঠানের আয়োজকরা দায়িত্বশীল ব্যক্তিদের আমন্ত্রণ জানাবেন, যারা ধর্মীয় স্বাধীনতার মূল্য বৃদ্ধিতে সত্যিকারের অবদান রাখবেন।

এদিকে যুক্তরাষ্ট্রের ওয়াশিংটন ডিসিতে সে দেশটির পররাষ্ট্রমন্ত্রী মাইক পম্পেওর উদ্যোগে তিন দিনব্যাপী ‘ধর্মীয় স্বাধীনতায় অগ্রগতি’ শীর্ষক আন্তর্জাতিক সম্মেলনে অংশ নিয়ে পররাষ্ট্রমন্ত্রী এ কে আবদুল মোমেন বলেন, প্রিয়া সাহা ধর্মীয় সংখ্যালঘু নির্যাতনের যে অভিযোগ যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্টের কাছে করেছেন, তা নাকচের পাশাপাশি এর উদ্দেশ্য নিয়ে প্রশ্ন আছে। এমন অভিযোগ একেবারেই মিথ্যা। প্রিয়া সাহা বিশেষ মতলবে মার্কিন প্রেসিডেন্টের কাছে এমন উদ্ভট কথা বলেছেন। এ ধরনের অভিযোগ করে প্রিয়া সাহা শান্তিপূর্ণ সমাজে বিশৃঙ্খলা উস্কে দেয়ার চেষ্টা করেছেন। সরকার বিরোধী গোষ্ঠীর উদ্দেশ্য পূরণ করতেই প্রিয়া সাহা এমন বক্তব্য দিয়েছেন বলে মন্তব্য করেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী। এদিকে প্রিয়া সাহা বাংলাদেশের ভাবমূর্তি নষ্ট করতেই এমন বক্তব্য দিয়েছেন বলে দাবি করেছেন পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শাহরিয়ার আলম। মন্ত্রী বিষয়টি গভীরভাবে খতিয়ে দেখা হচ্ছে বলেও জানিয়েছেন।

প্রিয়ার বিষয়ে সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেয়ার প্রক্রিয়া চলছে- রানা দাশ গুপ্ত ॥ প্রিয়া সাহা যে সংগঠনের নেত্রী বাংলাদেশ হিন্দু-বৌদ্ধ-খ্রীস্টান ঐক্য পরিষদের সেই সংগঠনের সাধারণ সম্পাদক আন্তর্জাতিক যুদ্ধাপরাধ ট্রাইব্যুনালের সাবেক প্রসিকিউটর আইনজীবী রানা দাশ গুপ্ত বলেন, প্রিয়া সাহার বক্তব্য একান্তই তার নিজের। এমন বক্তব্য দেয়ার জন্য সংগঠনের তরফ থেকে বলে দেয়া হয়নি। প্রিয়া সাহার ঘরবাড়ি পুড়িয়ে দেয়ার ঘটনা সত্য। এমন ঘটনার সঙ্গে আরও অনেক সংখ্যালঘু পরিবারের ঘরবাড়ি পুড়িয়ে দেয়ার বক্তব্যের সঙ্গে তিনি একমত নন।

তিনি আরও বলেন, যুক্তরাষ্ট্রে ফ্রিডম অব রিলিজিয়ান নামে একটি সম্মেলন হয়। তাতে তাদের সংগঠনের তিন সদস্যের প্রতিনিধি দল অংশ নেয়। সেই প্রতিনিধি দলে প্রিয়া সাহা ছিলেন না। ঐক্য পরিষদের পক্ষ থেকে প্রিয়া সাহাকে পাঠানো হয়নি। তিনি কিভাবে গেলেন, এটা মার্কিন দূতাবাস বলতে পারবে। এমন মিথ্যা বক্তব্য দেয়ার বিষয়ে তার বিরুদ্ধে দলের তরফ থেকে নিয়ম মেনে সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেয়া হতে পারে। তবে সেটি সময়সাপেক্ষ বিষয়। তিনি দেশে ফিরলে তাকে শোকজ করার পর নিয়মানুযায়ী সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেয়া হবে।

প্রিয়া সাহার বক্তব্যের সঙ্গে একমত নয় হিন্দু সম্প্রদায় ॥ শনিবার শ্রীকৃষ্ণ সেবা সংঘের আহ্বায়ক নকুল চন্দ্র সাহা ও সদস্য সচিব সুজন দে স্বাক্ষরিত এক বিবৃতিতে বলা হয়েছে, প্রিয়ার বক্তব্যের সঙ্গে হিন্দু সম্প্রদায় একমত নয়। এমন বক্তব্যে বাংলাদেশের ভাবমূর্তি ক্ষুণœ হয়েছে। এ বক্তব্য রাষ্ট্রদ্রোহীতার শামিল। কোন একটি বিশেষ গোষ্ঠীকে সুবিধা দিতে বাংলাদেশের বিরুদ্ধে গভীর চক্রান্তের অংশ হিসেবে এমন বক্তব্য দিয়েছে প্রিয়া।

কে এই প্রিয়া সাহা ॥ প্রিয়া সাহার স্বামী মলয় সাহা। তিনি দুর্নীতি দমন কমিশনের কর্মকর্তা। তার দুই সন্তান মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে পড়াশোনা করেন। ওয়াশিংটন ডিসিভিত্তিক ‘হিন্দু আমেরিকান ফাউন্ডেশন’র কর্মকর্তা জয় ক্যানসারার উদ্যোগে তিনি যুক্তরাষ্ট্রের ওই সম্মেলনে যান। প্রিয়া সাহা মাসিক ‘দলিত কণ্ঠ’ নামের একটি পত্রিকার সম্পাদক ও প্রকাশকের দায়িত্ব পালন করছেন। ‘দলিত কণ্ঠ’ নামের ওই পত্রিকায় প্রিয়া সাহার নাম ‘প্রিয়া বালা’ বিশ্বাস বলে উল্লেখ করা হয়েছে। গত ১২ জুন ঢাকা জেলার অতিরিক্ত ম্যাজিস্ট্রেট কাজী নাহিদ রসুল পত্রিকাটি প্রকাশের ঘোষণাপত্র প্রদান করেন। মাসিক পত্রিকা হলেও এর অনলাইন ভার্সন আছে। তাতে সংখ্যালঘু এবং দলিত সম্প্রদায়ের খবর বিশেষ গুরুত্ব দেয়া হয়। পত্রিকার ঠিকানা দেয়া হয়েছে বাড়ি নম্বর-১১, সড়ক নম্বর- ৪, ধানমন্ডি, ঢাকা। উষা আর্ট প্রেস থেকে এটি প্রকাশিত হয়। ঘোষণাপত্রে শনাক্তকারী হিসেবে স্বাক্ষর করেছেন এ্যাডভোকেট আল আমিন রিজভী। পত্রিকার ঘোষণাপত্রে রাষ্ট্রবিরোধী সংবাদ না ছাপানোর অঙ্গীকার করলেও সম্পাদক প্রিয়া সাহা নিজেই রাষ্ট্রবিরোধী বক্তব্য ও মিথ্যা তথ্য দিয়ে রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্টের কাছে দেয়া বক্তব্যের মাধ্যমে অভিযোগ করেছেন।

নিজ এলাকার হিন্দু-মুসলমানদের হয়রানি করছেন প্রিয়া সাহা ॥ মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের কাছে সংখ্যালঘু নির্যাতনের অভিযোগ করে রীতিমতো আলোচনায় থাকা প্রিয়া নিজ এলাকার হিন্দু-মুসলমানদের নানাভাবে হয়রানি করছেন বলে অভিযোগ উঠেছে। ব্যক্তিগত ও পারিবারিক স্বার্থ হাসিলের চেষ্টার অংশ হিসেবে তিনি এমন হয়রানি করছেন বলেও অভিযোগ রয়েছে। এলাকাবাসী ছাড়াও প্রিয়ার গ্রামের বাড়ি পিরোজপুর জেলার নাজিরপুরের মাটিভাঙ্গা ইউনিয়নের চরবানিয়ারী গ্রামের স্থানীয় হিন্দু নেতারাও এমন অভিযোগ করেছেন।

শনিবারের এক প্রতিবেদনে এমনটাই দাবি করা হয়েছে। হিন্দু নেতাদের বরাত দিয়ে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এলাকার মুসলমান-হিন্দুদের শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান নষ্ট করতেই প্রিয়া ট্রাম্পের কাছে এমন অভিযোগ করেছেন। প্রিয়া বালা বিশ্বাস তার ভাইয়ের জমি নিয়ে বিরোধের জেরে স্থানীয় কয়েকজন হিন্দু ও মুসলমানকে হয়রানি করে আসছেন। চলতি বছরের প্রথম দিকে জমি নিয়ে বিরোধের জের ধরে তার ভাইয়ের পরিত্যক্ত একটি বাড়িতে যে আগুন দেয়ার ঘটনা ঘটেছিল, সেটি নিয়েও রহস্য আছে। এ ঘটনায় স্থানীয় কয়েকজন নিরীহ হিন্দু সম্প্রদায়ের লোককেও আসামি করে তিনি হয়রানি করছেন বলেও অভিযোগ আছে। প্রতিপক্ষকে ঘায়েল করতেই পরিকল্পিতভাবে রাতের বেলায় পরিত্যক্ত ঘরটিতে আগুন লাগিয়ে দেয়া হয়েছিল।

প্রিয়া সাহা চরম অন্যায় করেছেন- গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রী শ. ম. রেজাউল করিম ॥ এদিকে শনিবার দুপুরে পিরোজপুর-১ আসনের সংসদ সদস্য গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রী শ. ম. রেজাউল করিম নাজিরপুরের নিজ বাড়িতে বসে সাংবাদিকদের বলেন, প্রিয়া সাহা তার নির্বাচনী এলাকার মেয়ে। তিনি যুক্তরাষ্ট্রে গিয়ে মার্কিন প্রেসিডেন্টের কাছে নিজ দেশ, নিজের এলাকা সম্পর্কে চরম মিথ্যাচার করেছেন। এটা চরম অন্যায় ও রাষ্ট্রদ্রোহীতার শামিল। পিরোজপুরের নাজিরপুরসহ এ জেলার মুসলমান, হিন্দুসহ অন্য ধর্মাবলম্বীরা শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান করছেন। যা একটি অনন্য দৃষ্টান্ত। নাজিরপুর বা পিরোজপুর জেলার কোন হিন্দু বা অন্য কোন সম্প্রদায়ের লোক গুম বা নিখোঁজ হয়নি। প্রিয়া সাহা অসৎ উদ্দেশ্যে প্রণোদিত হয়ে এবং সাম্প্রদায়িক সম্পর্ক নষ্ট করতেই এমন উস্কানিমূলক বক্তব্য দিয়েছেন। নাজিরপুর উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান অমূল্য রঞ্জন হালদার বলেন, প্রিয়া বালা বিশ্বাস তার ভাইয়ের জমি নিয়ে বিরোধের জেরে স্থানীয় কয়েকজন হিন্দু ও মুসলমানকে হয়রানি করে আসছেন।

পিরোজপুর জেলা পূজা উদ্যাপন পরিষদের সভাপতি বিমল ম-ল বলেন, প্রিয়ার কাছ থেকে এ ধরনের একটি উদ্ভট মিথ্যাচার আশা করা যায় না। তিনি কেন এবং কি উদ্দেশ্যে এভাবে মিথ্যাচার করেছেন তাও আমাদের বোধগম্য হচ্ছে না। জেলা পূজা উদ্যাপন পরিষদের সহ-সভাপতি সুনীল চক্রবর্তী বলেন, প্রিয়া সাহা তার ব্যক্তিগত স্বার্থ হাসিলের জন্য এমন বক্তব্য দিয়েছেন। তিনি পিরোজপুরসহ দেশের সকল ধর্মের লোকজনকে অপমান করেছেন। সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি বিনষ্টের পাঁয়তারা চালাচ্ছেন তিনি।

প্রিয়া ‘শারি’ নামে একটি এনজিওর নির্বাহী পরিচালক। সংস্থাটি বাংলাদেশের দলিত সম্প্রদায় নিয়ে কাজ করে। প্রিয়া পিরোজপুরের নাজিরপুর উপজেলার মাটিভাঙ্গা ইউনিয়নের চরবানিয়ারী গ্রামের মৃত নগেন্দ্র নাথ বিশ্বাসের মেয়ে। তার শ্বশুরবাড়ি যশোর জেলায়। তার স্বামী মলয় কুমার সাহা দুর্নীতি দমন কমিশনের সদর দফতরে উপপরিচালক পদে কর্মরত। তাদের বাসা ঢাকার ধানমন্ডিতে। তাদের দুই মেয়ে প্রজ্ঞা পারমিতা সাহা ও ঐশ্বর্য লক্ষ্মী সাহা যুক্তরাষ্ট্রে পড়াশোনা করছে।

প্রিয়া সাহাকে আইনের আওতায় আনার দাবি ১৪ দলের ॥ আওয়ামী লীগ সভাপতিমন্ডলীর সদস্য ও কেন্দ্রীয় ১৪ দলের মুখপাত্র মোহাম্মদ নাসিম বলেছেন, প্রিয়া সাহার বিরুদ্ধে রাষ্ট্রদ্রোহীতার মামলা করার পাশাপাশি কার প্ররোচনায়, কোন মহলের মদদে এই নারী মিথ্যাচার করেছেন তা তদন্ত করে বের করা দরকার। এ প্রিয়া সাহার মিথ্যাচারের ঘটনার নিন্দা জানিয়ে দেয়া এক বিবৃতিতে মোহাম্মদ নাসিম আরও বলেন, আমি মনে করি বাংলাদেশ-যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে বিদ্যমান সুসম্পর্ক বিনষ্ট এবং নির্বাচিত সরকারের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ণ করতেই অশুভ মহল এই নারীকে দিয়ে এমন মিথ্যাচারের কাজটি করিয়েছে। তার বিরুদ্ধে দ্রুত রাষ্ট্রদ্রোহের মামলা করে আইনের আওতায় আনতে হবে। একই সঙ্গে ওই নারী কিভাবে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্টের কাছে গিয়ে মিথ্যাচারের সুযোগ পেল সেটি বের করতে হবে। প্রিয়া দাবিকে ভিত্তিহীন বলে অভিহিত করায় মার্কিন রাষ্ট্রদূত রবার্ট মিলারকে ধন্যবাদ জানান মোহাম্মদ নাসিম।

প্রিয়াকে আইনের আওতায় আনার প্রক্রিয়া চলছে- ডিএমপি কমিশনার ॥ ডিএমপি কমিশনার মোঃ আছাদুজ্জামান মিয়া বলেছেন, প্রিয়া সাহার সংখ্যালঘু নির্যাতন করার অভিযোগ সম্পূর্ণ বানোয়াট, ভিত্তিহীন এবং অমূলক। দেশের সংখ্যালঘুরা নিরাপদে আছেন। দেশের সার্বভৌমত্ব বিপন্ন করতেই উদ্দেশ্যমূলকভাবে তিনি এমন বক্তব্য দিয়েছেন। তাকে আইনী প্রক্রিয়ায় আনতে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় থেকে উদ্যোগ নেয়া হয়েছে।

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে থাকা বাংলাদেশীদের মধ্যেও প্রিয়া সাহার বক্তব্যে তোলপাড় ॥ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্ক মহানগর আওয়ামী লীগের ভারপ্রাপ্ত সভাপতি জাকারিয়া চৌধুরী সাংবাদিকদের জানান, প্রিয়া সাহার বক্তব্যে যুক্তরাষ্ট্রে থাকা বাংলাদেশীদের মধ্যেও রীতিমতো তোলপাড় ও সমালোচনার ঝড় বইছে। সেখানকার অধিকাংশ বাংলাদেশীদের বক্তব্য, ড. ইউনূস, বিচারপতি এস কে সিনহা , শিতাংশু গুহ ও প্রিয়া সাহা, এরা সবাই একই সূত্রে গাঁথা। এরা রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ সুবিধাভোগী এবং রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে সর্বোচ্চ ষড়যন্ত্রকারী। প্রবাসী বাংলাদেশীদের অনেকে প্রিয়া সাহার অভিযোগে ক্ষোভ প্রকাশ ও তীব্র নিন্দা প্রকাশ করেছেন। ডেমোক্র্যাটিক পার্টির সংগঠক খোরশেদ খন্দকার বলেন, প্রিয়া সাহা নিজের স্বার্থে বাংলাদেশকে কাঠগড়ায় দাঁড় করিয়েছেন। রাজনৈতিক আশ্রয় লাভের সহজ পথ হিসেবে এমন উদ্ভট-আজগুবি অভিযোগ করেছেন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের কাছে।

সম্প্রীতি বাংলাদেশের বিবৃতি ॥ প্রিয়ার বক্তব্যের ঘটনায় সংগঠনটির আহ্বায়ক পীযুষ বন্দোপাধ্যায় স্বাক্ষরিত এক বিবৃতিতে বলা হয়েছে, মার্কিন প্রেসিডেন্টের কাছে প্রিয়া সাহার দেয়া বক্তব্য বাংলাদেশের হাজার বছরের চেতনা বিরোধী। এমন বক্তব্যের মাধ্যমে মহান মুক্তিযুদ্ধের দর্শনকে অস্বীকার ও অবজ্ঞা করা হয়েছে। সম্প্রীতি বাংলাদেশ ও বাঙালী জাতি দীর্ঘকাল ধরে অসাম্প্রদায়িকতা এবং সব ধর্মের সুসর্ম্পকের ক্ষেত্রে দৃষ্টান্ত স্থাপন করে চলেছে। সব ধর্মের সম্প্রীতি ঐতিহাসিকভাবে অটুট বলেই জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে মহান মুক্তিযুদ্ধে আমরা বিজয়ী হয়েছি।