২১ আগস্ট ২০১৯  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

এই দেশ আমার নয়, কেন...?

  • কবীর চৌধুরী তন্ময়

সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমগুলো বাংলাদেশে যেভাবে ব্যবহার হয়ে আসছে, অন্য দেশে কীভাবে ব্যবহার হয়- এটি গবেষণার বিষয়। তবে একটি বিষয় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, নেতিবাচক সবকিছুর বিরুদ্ধে সবাই সোচ্চার এবং প্রতিবাদমুখর। ছোট ছোট স্ট্যাটাস, ছবি, ভিডিও, একান্ত মতামতগুলো পর্যবেক্ষণ করলে দেখা যায়, সবাই সুন্দর এবং জনকল্যাণকর বাংলাদেশ দেখতে চায়, মানুষের দেশ হিসেবে পেতে চায়।

কিন্তু কতিপয় মানুষ আছে, কোথাও কিছু একটা হলেই যাচাই-বাছাই বা বিচার-বিশ্লেষণ ছাড়া হতাশাযুক্ত মতামত দিয়ে থাকে। অনেকে আবার কলাম পর্যন্ত লিখে ফেলে, এই দেশ আমার নয়। নষ্টদের দখলে আজ সব!

এই ধরনের মতামত অন্যদের মাঝে কী ধরনের প্রতিক্রিয়া জন্ম দেবে, অন্যরা কীভাবে এই মতামত গ্রহণ করবে- এটি হয়ত তারা ভাবেন না। আর সবকিছু সরকারের ওপর চাপিয়ে নিজে রাজা, মহারাজা-রানীর স্বপ্নে বিভোর। তারা ভাবে না, তাদেরও দায়িত্ব আছে, পথভ্রষ্টদের হাত থেকে এদেশ, এদেশের জনগণকে রক্ষা করা তাদেরও এগিয়ে আসতে হয়। যেভাবে বঙ্গবন্ধুর ডাকে আমাদের পূর্বপুরুষ তাদের জীবনের কথা, ধন-সম্পদের কথা চিন্তা না করে এদেশকে শত্রুমুক্ত করতে মহান মুক্তিযুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়েছিল।

আমরা জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের কাছ থেকে দীক্ষা অর্জন না করে বরং হতাশায় নিমজ্জিত হয়ে পড়ি। তাঁর সংগ্রামী জীবনের দিকে না তাকিয়ে বিচ্ছিন্ন ঘটনাকে কেন্দ্র করে নিজেরা ভেঙ্গে চুরমার হয়ে পড়ি। সামনে এগিয়ে যাওয়ার চেয়ে বরং অপরের ঘাড়ে দোষ দিয়ে নিজে বাঁচার চেষ্টা করি। আমার কর্তব্যগুলো এড়িয়ে বরাবরই বলি, পরিবার আমার এই করতে পারেনি, সরকার দেশে এটা করে দেয়নি, তিনি আমার জীবন ধ্বংস করেছে ইত্যাদি ইত্যাদি।

বঙ্গবন্ধু ২৩ বছর কারাভোগ, ভাষা আন্দোলন থেকে স্বাধীনতার জন্য যুদ্ধ কার জন্য করেছে? তিনিও আমাদের মতো অপরের ওপর দোষ চাপিয়ে আরামে-আয়েশি জীবনযাপন করতে পারতেন। তিনিও চাইলে পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী হতে পারতেন। বঙ্গবন্ধু চাইলে ধন-সম্পদের পাহাড় গড়ে পায়ের ওপর পা দিয়ে স্ত্রী-সন্তান আর পরিবার নিয়ে আমাদের অনেকের মতো জীবন পার করতে পারতেন।

কিন্তু তিনি বাঙালী জাতিকে একটি নিজস্ব সত্তা দিতে চেয়েছেন। শোষণ আর নির্যাতনের শাসনের হাত থেকে আমাদের মুক্ত করতে গিয়ে বার বার জেল-জুলুম আর অত্যাচার-নির্যাতন সহ্য করেছেন। বঙ্গবন্ধু আমাদের অনেকের মতো বলেননি, এই দেশ আমার নয়। বরং আমার বাঙালী, আমাদের দেশ বলেই বিশ্ববাসীর কাছে বার্তা দিয়েছেন। অন্যদের মাঝেও এই ধরনের আমার দেশ, দেশপ্রেম চেতনাবোধ সৃষ্টি করতে কাজ করেছেন, বাঙালী জাতিকে উদ্বুদ্ধ করে মুক্তিযুদ্ধের চূড়ান্ত প্রস্তুতি নিয়েছেন। আর আমাদের পূর্বপুরুষ-নারী বঙ্গবন্ধুর দেশপ্রেমে উদ্বুদ্ধ হয়ে নিজের সর্বস্ব ত্যাগ করে রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের মাধ্যমে স্বাধীন বাংলাদেশ উপহার দিয়েছেন। ৩০ লাখ শহীদ আর চার লাখেরও বেশি নারী তার সম্ভ্রম বিনাশ করেছে আমাদের সুন্দর সোনালি বাংলাদেশের স্থায়ী ঠিকানা নিশ্চিত করার জন্য।

ফেনীর সোনাগাজী থেকে বরগুনার ব্যক্তিগত দ্বন্দ্ব, ধর্ষণ থেকে হত্যার ঘটনাগুলো নিয়ে সমাজ-রাষ্ট্রের চারপাশে আলোচনা-সমালোচনা আজ বিদ্যমান। অনেকে শেখ হাসিনার চৌদ্দগোষ্ঠী উদ্ধারে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে নিজেদের প্রকৃত সত্তার পরিচয়ের বিকাশ ঘটিয়ে থাকে। কিন্তু একবারও ভাবে না, বঙ্গবন্ধুর মতোই তার কন্যা শেখ হাসিনাও নিজের সুখ-বিলাস ছেড়ে আমাদের ভাগ্য পরিবর্তন ঘটাতে, বাংলাদেশকে একটি উন্নত রাষ্ট্র হিসাবে বিশ্বের দরবারে তুলে ধরতে মাটিকে আঁকড়ে ধরে দিন-রাত পরিশ্রম করে যাচ্ছেন। শত্রুর নির্মম মৃত্যুর ষড়যন্ত্রের জাল ২৩ বার ভেদ করে এই বাংলাদেশকে পাকিস্তানী ভাব ধারা থেকে, পাকিস্তানী ছায়া রাষ্ট্র থেকে আন্দোলন-সংগ্রাম করে মুক্তিযুদ্ধের মূল চেতনায় পরিচালিত করতে অঙ্গীকারবদ্ধভাবে কাজ করে যাচ্ছেন। পৃথিবীর একমাত্র মানুষ হয়ত, যাকে শুধু ব্যক্তিগতভাবে আক্রমণ নয় অথবা সহজ ভাষায় বললে, অশ্লীল গালাগালি থেকে শুরু করে ভিন্ন ধর্মীয় সম্প্রদায়ের ঘরে জন্ম বলেও গুজব ছড়িয়ে সমালোচনা করেছে। বিদেশের মাটিতে অপমান, অপদস্ত করতে এমন কোন কর্মসূচী ছিল না যে শত্রুপক্ষ গ্রহণ করেনি।

আর সবচেয়ে পরিকল্পিত হত্যার মিশন ২১ আগস্টে গ্রেনেড হামলার কথা হয়ত এ জাতি কখনও ভুলতে পারবে না। আবার সেই হত্যার ঘটনা জজ মিয়ার নাটকের নতুন চরিত্র প্রতিটি সচেতন মানুষ ঘৃণাভরে স্মরণ করে। এই দেশে আমার জন্ম। এই দেশের জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের পবিত্র রক্তে আমার জন্ম। আমি আমার দেশে যাবই। যতই ষড়যন্ত্র হোক আর যতই বাধা আসুক, আমি আমার দেশে যাবই যাব।

এখানেও শুধু নয়, ’৭৫-এর পরবর্তী সময়ে শেখ হাসিনা আর ছোট বোন শেখ রেহানা নিজের নাম-পরিচয় লুকিয়ে জীবনযাপন করলেও নিজের দেশ বাংলাদেশের সঙ্গে তার সার্বক্ষণিক যোগাযোগ ছিল। এত বৈরি পরিবেশ, মৃত্যুর বুলেট কপাল বরাবর দেখার পরেও শেখ হাসিনা বলেননি, এই দেশ আমার নয়। এই বাংলাদেশ আমাদের নয়। নষ্টদের দখলে আজ গোটা দেশ না বলে বরং নষ্টদের হাত থেকে বাঙালী, বাঙালীর ভবিষ্যত প্রজন্ম এবং বাংলাদেশকে রক্ষার জন্য অজানা যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়ে একান্ত আত্মবিশ্বাস আর বঙ্গবন্ধুর আদর্শ, শিক্ষা-দীক্ষা নিয়ে।

পার করে আসা সেই কঠিন সময় নিয়ে আমি, আপনি, আমরা কী একবারের জন্যও ভেবেছি যে, সামাজিক, অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক ও আন্তর্জাতিকভাবে শিকড় গড়া স্বাধীনতাবিরোধী অপশক্তির হাত থেকে কীভাবে বাঙালী ও বাংলাদেশকে আবারও মুক্ত করতে পারবে! বঙ্গবন্ধু ও ত্রিশ লাখ শহীদের আদর্শের বাংলাদেশ, চার লাখেরও বেশি যে নারীরা তাদের সম্ভ্রম বিনাশ করেছে, তাদের লাল-সবুজের বাংলাদেশ আবারও কীভাবে ’৭২-এর সংবিধানে ফিরিয়ে নিয়ে আমার বাংলাদেশকে বিশ্ববাসীর মাঝে উন্নয়নের রোল মডেল হিসেবে উপস্থান করবে- এটি আমাদের কার মাঝে কখন উদয় হয়েছে!

শেখ হাসিনা দায়িত্ব নিয়েছেন। বিচারহীনতার অপসংস্কৃতি থেকে বাঙালী ও বাংলাদেশকে মুক্ত করেছেন। জাতির পিতার বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে যারা নির্মমভাবে সপরিবারে হত্যা করেছে ওইসব খুনীদের আইনের আওতায় এনে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করেছে। বাংলাদেশের অশুভ ছায়া, অভিশাপ স্বাধীনতাবিরোধী, যুদ্ধাপরাধী, মানবতাবিরোধী অপরাধীদেরও আইনের আওতায় এনে পুরো জাতিকে ঐক্যবদ্ধ করে বিচারের রায় কার্যকর করেছে। রাষ্ট্রের রন্ধ্রে রন্ধ্রে লুকিয়ে থাকা রাজাকারদের আজ চিহ্নিত করতে সক্ষম হয়েছে। এই দেশে যুদ্ধাপরাধ হয়নি, এই দেশে মানবতাবিরোধী অপরাধ সংগঠিত হয়নি, মুক্তিযুদ্ধে কোন বর্বরতা ঘটেনি- এই ধরনের মিথ্যাচার থেকে সবাইকে বের করে সত্যের আলো সমাজ-রাষ্ট্রে ছড়িয়ে দিয়ে একটি সঠিক ও তথ্যনির্ভর জাতি গঠনে এগিয়ে চলেছে।

দেশ আমার, বাংলাদেশ আমাদের সকলের বলেই বলা যায় শেখ হাসিনা একাই সকল দায়িত্ব কাঁধে তুলে নিয়ে নষ্টদের দখল থেকে আমাদের ও আমাদের পরবর্তী প্রজন্মকে নিরাপদ, সুখী-সুন্দর বাংলাদেশ উপহার দিতে নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছেন। সকল ভাল তোমার আর সকল মন্দ কাজটাই আমার বলে মনে করে শেখ হাসিনা আমাদের বাংলাদেশ আমাদের মন মতো করে গড়ে তুলতে সহ্য করছে সকল সমালোচনা, কটূক্তি! তাই এই আমিকেই প্রশ্ন করুন, বঙ্গবন্ধুর মতো বিশাল ব্যক্তিত্বের সংগ্রামী দীক্ষা, শেখ হাসিনার মতো ধৈর্যশীল ও দায়িত্ববান উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত থাকার পরেও আমি কেন বলি, এই দেশ আমার নয়, কেন...?

লেখক : সভাপতি, বাংলাদেশ অনলাইন এ্যাক্টিভিস্ট ফোরাম (বোয়াফ)