২৪ আগস্ট ২০১৯  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

‘কান নিয়েছে চিলে’

  • দেশব্যাপী বিভ্রান্তি ॥ প্রতিটি গুজবই মিথ্যা প্রমাণিত

খোকন আহম্মেদ হীরা, বরিশাল ॥ বহুকাল থেকে গ্রামে একটি প্রবাদ রয়েছে ‘কান নিয়েছে চিলে’। অথচ কানে হাত না দিয়েই চিলের পিছনে ছুটে চলছে অতিউৎসাহী কিছু মানুষ। সেই প্রবাদ বাক্যের মতোই কল্লাকাটা গুজবে দেশব্যাপী কান নিয়েছে চিলের মতো অবস্থায় ছুটে চলছে কতিপয় অতিউৎসাহীরা। আর এতে চরম বেকায়দায় পড়েছেন ভবঘুরে মানসিক ভারসাম্যহীন ও অপরিচিত ব্যক্তিরা। প্রতিদিনই দেশের বিভিন্ন স্থানে ছেলেধরা কিংবা কল্লাকাটার সন্দেহে গণপিটুনি কিংবা হত্যার মতো ঘটনা ঘটাচ্ছে ওইসব গুজব রটনাকারী অতিউৎসাহীরা।

গুজব ছড়ানোর ইতিহাস বাংলাদেশে নতুন নয়। অতীতে দেশবিরোধী ষড়যন্ত্রকারীরা নির্বাচনের আগ মুহূর্তে গুজব ছড়িয়ে উস্কানি দিয়ে সাধারণ জনগণকে ক্ষিপ্ত করা কিংবা ছাত্র আন্দোলন চলাকালীন সময় বিষয়টি ভিন্নখাতে প্রবাহিত করে নিজেদের রাজনৈতিক ফায়দা হাসিলের জন্য দেশব্যাপী নানা গুজব ছড়িয়ে আসছে। পরবর্তীতে ষড়যন্ত্রকারীদের প্রতিটি গুজবই মিথ্যে হিসেবে প্রমাণিত হয়েছে। তেমনি কল্লাকাটা কিংবা ছেলে ধরার গুজবেরও কোন অস্তিত্ব এখনও খুঁজে পায়নি আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, বর্তমানে দেশের চলমান উন্নয়নকে বাধাগ্রস্ত করতে অতীতের দেশ বিরোধী ষড়যন্ত্রকারীরা তাদের লক্ষ্য ও উদ্দেশে ব্যর্থ হয়ে বিভিন্ন মাধ্যমে নানা গুজব ছড়িয়ে আসছে। আমেরিকার প্রেসিডেন্টের কাছে প্রিয়া সাহার মিথ্যাচারের ন্যায় পদ্মা সেতু নিয়ে পূর্ব ষড়যন্ত্রের অংশ হিসেবে সেইসব ষড়যন্ত্রকারীরা সেতু নির্মাণে মানুষের মাথা ব্যবহারের গুজব রটিয়ে আসছে। সামজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে অপপ্রচারের (গুজব) ছড়ানোর কারণেই একশ্রেণীর সুবিধাবাদী লোকদের রোষানলে বরিশালে গলাকাটা আতঙ্কে নির্মমতার শিকার হচ্ছেন এলাকায় নতুন আসা অপরিচিত ব্যক্তি, পথের মানসিক ভারসম্যহীন (পাগল) মানুষগুলো। গলাকাটা সন্দেহে গণধোলাইয়ের শিকার হচ্ছে তারা। এমনকি নিস্তার পায়নি শ্বশুর বাড়িতে বেড়াতে আসা নতুন জামাই, বিভিন্ন মাদ্রাসার উন্নয়নের জন্য সাহায্য নিতে আসা হাফেজ ও মাওলানারাও। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে নানা ভুয়া তথ্য প্রচারকে (গুজব) কেন্দ্র করে নানাসময় দেশব্যাপী বিভ্রান্তির সৃষ্টি হয়। এসব গুজব যেকোন মুহূর্তে সমাজের পরিস্থিতি আরও সঙ্কটের দিকে টেনে নিয়ে যেতে পারে। এর থেকে প্রতিকার পেতে তথ্য প্রকাশ বা ঘটনার ছবি ও ভিডিও শেয়ারে সবার সতর্ক থাকাকেই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় বলে মনে করছেন সচেতন মহল। তাদের মতে, যেকোন তথ্য ফেসবুকে শেয়ার করা বা প্রকাশ করার সময় খুবই সতর্ক থাকা উচিত। তথ্য প্রকাশ করার আগে একাধিকবার বিভিন্নদিক থেকে সেটা ক্রসচেক করে নেয়া উচিত।

গুজব হলো জনসাধারণের সম্পর্কিত যেকোন বিষয়, ঘটনা বা ব্যক্তি নিয়ে মুখে মুখে প্রচারিত কোন বর্ণনা বা গল্প। সামাজিক বিজ্ঞানের ভাষায়, গুজব হলো এমন কোন বিবৃতি যার সত্যতা কখনই নিশ্চিত করা সম্ভব হয় না। গুজব হচ্ছে-ভুল কিংবা অসঙ্গত তথ্য। ভুল তথ্য বলতে মিথ্যা ও বানোয়াট তথ্যকে বোঝায় এবং অসঙ্গতি তথ্য বলতে বোঝায় ইচ্ছাকৃতভাবে ভ্রান্ত তথ্য উপস্থাপন করা। এছাড়া রাজনীতিতে গুজব বরাবর একটি গুরুত্বপূর্ণ কৌশল হিসাবে ব্যবহৃত হয়ে আসছে। এ ক্ষেত্রে প্রতিপক্ষ সম্পর্কে ইতিবাজক গুজবের পরিবর্তে নেতিবাচক গুজব সর্বদা অধিক কার্যকর হতে দেখা গেছে। গুজব সাম্প্রতিককালে সর্বাধিক অলোচ্য বিষয়ে পরিণত হয়েছে দেশে। অবশ্য গুজবের উৎপত্তি আদিকালে। এর ব্যবহার মাঝে-মধ্যে মাত্রাতিরিক্ত হয়েছে। তবে এর আগে গুজবের ব্যবহার বর্তমানের মতো এতো ব্যাপক হয়নি। আর এর দুর্বার বিস্তৃৃতি ঘটেছে ক্ষুদে শিক্ষার্থীদের ‘নিরাপদ সড়ক চাই’ আন্দোলনকে কেন্দ্র করে। মানুষ যখন অবাস্তব অলৌকিক গল্পগুলো বলে তখন সবক্ষেত্রেই দেখা যায় ঘটনাটি তারা নিজের চোখে দেখেননি। তবে এমন বিশ্বস্ত একজনের কাছ থেকে শুনেছে যিনি কখনো মিথ্যা বলেন না। যিনি মিথ্যা বলেন না তিনিও আবার শুনেছেন অন্য আরেকজনের কাছ থেকে। আরেকজন আবার শুনেছে আরেকজনের কাছ থেকে। তিনি আবার শুনেছেন তার ভাসুরের ভাইয়ের সম্মন্ধীর খালাত ভাইয়ের কাছ থেকে! এসব গুজবের ঘটনার উৎস সন্ধান করতে গেলে এর চেইন এরকম লম্বা হতেই থাকবে। কিছুকিছু ঘটনার উৎপত্তি কোথায় তা জনার জন্য এগিয়ে গেলেও তার কোন তলা পাওয়া যায় না।

এর আগে ২০১৩ সালের ৩ মার্চ যুদ্ধাপরাধীদের বিচার ইস্যু থামাতে ‘সাঈদীকে চাঁদে দেখা গেছে’ এমন গুজব ছড়িয়ে বলা হয় ‘যারা এ কথা বিশ্বাস করবে না তাদের ইমান নষ্ট হয়ে যাবে।’ ওই বছরের ৫ মে ধর্মীয় বিভিন্ন ইস্যুতে ঢাকার মতিঝিল শাপলা চত্বরে অরাজনৈতিক সংগঠন হেফাজতে ইসলাম সমাবেশ ও অবস্থান কর্মসূচী শুরু করলে রাতে তাদের হটিয়ে দেয় আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। সেই রাতে হেফাজতের হাজারখানেক নেতাকর্মী নিহত হওয়ার গুজব রটানো হলেও একজন ব্যক্তি নিখোঁজ রয়েছেন এমন কোন তথ্য অদ্যাবধি দিতে পারেনি সংগঠনটি।

এ ব্যাপারে বরিশাল আইনজীবী সমিতির সাবেক সভাপতি ও জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক সাবেক সাংসদ মুক্তিযোদ্ধা এ্যাডভোকেট তালুকদার মোঃ ইউনুস জনকণ্ঠকে বলেন, বিএনপি ও জামায়াতের সাম্প্রদায়িক চক্র গুজব রটনা ও মিথ্যাচারের প্রধান কারখানা। মুক্তিযুদ্ধ, ধর্ম নিরপেক্ষতা এবং কোরানের বাণী নিয়ে ক্রমাগত মিথ্যাচার করে যাওয়া এই সাম্প্রদায়িক চক্রের কালো থাবা থেকে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমকে রক্ষা করতে হবে। তিনি আরও বলেন, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম আসার আগেও গুজব রটনার অপসংস্কৃতি ছিল। সাম্প্রতিককালে ইন্টারনেটে সামাজিক গণমাধ্যম আসার পরে বিষয়টি ব্যাপক আলোচনায় আসে। আমাদের দেশের একটি রাজনৈতিক মহল রাজনৈতিক উদ্দেশে গুজব রটিয়ে একের পর এক মিথ্যাচার করে যাচ্ছে।

নির্বাচিত সংবাদ
এই মাত্রা পাওয়া