১৯ আগস্ট ২০১৯  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

বন্যার পানি নামতে শুরু করেছে

 বন্যার পানি নামতে শুরু করেছে
  • শঙ্কা কেটে গেছে

স্টাফ রিপোর্টার ॥ দেশের সব নদ নদীর পানি কমতে শুরু করেছে। পানি উন্নয়ন বোর্ড জানিয়েছে পানি হ্রাস অব্যাহত থাকলে আগামী ৭ দিনের মধ্যে উত্তর ও মধ্যাঞ্চল থেকে বন্যার পানি নেমে যাবে। তবে নিম্নাঞ্চলে বন্যা আরও কিছুদিন স্থায়ী হতে পারে। তারা জানান, এই মুহূর্তে বন্যা পরিস্থিতি নিয়ে আর কোন শঙ্কার কারণ নেই। তবে উত্তরের ভারি বৃষ্টিপাতের একটা পূর্বাভাস রয়েছে। এটা হলে হয়তো বন্যা কিছু সময়ের জন্য স্থিতিশীল হয়ে পড়তে পারে। এদিকে ঢাকার চারপাশ ঘিরে থাকা নদীগুলোর পানি এই মুহূর্তে স্থিতিশীল হয়ে পড়ছে। ফলে রাজধানী ঢাকা বন্যা কবলিত হওয়ার শঙ্কা নেই।

জনকণ্ঠের প্রতিনিধিরাও জানিয়েছেন উত্তরের বিভিন্ন নদ নদীর পানি দ্রুত কমতে শুরু করেছে। কিন্তু পানি কমলে মানুষের দুর্ভোগ এখনও কমেনি। আশ্রয় কেন্দ্রে এবং বাঁধে অবস্থান নেয়া লোকজনগুলো এখনও ঘরবাড়িতে ফিরতে পারেনি। পাশাপাশি পানিবন্দী মানুষের মধ্যে নানা ধরনের রোগব্যাধি ছড়িয়ে পড়েছে। জ্বালানি বিশুদ্ধ পানি ও খাদ্য সঙ্কট দেখা দিয়েছে। হাজার হেক্টর ফসলের ক্ষতির আশঙ্কা করা হচ্ছে। পাঠদান বন্ধ হয়ে যাওয়া শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে এখনও কার্যক্রম শুরু করা যায়নি।পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী আরিফুজ্জামান ভুইয়া বলেন, নতুন করে বন্যা পরিস্থিতির অবনতির আশঙ্কা এই মুহূর্তে নেই। যদিও দু’একদিনের মধ্যে ভারি বৃষ্টিপাতের আশঙ্কা রয়েছে। তিনি বলেন, এখন সব নদীর পানিই সমতলে কমতে শুরু করেছে। উত্তর এবং মধ্যাঞ্চল থেকে ৭ দিনের মধ্যে পানি নেমে যাবে। তবে নিম্নাঞ্চলে পানি নামতে একটু সময় নিতে পারে।

পানি উত্তর বোর্ড জানিয়েছে সুরমা কুশিয়ারা এবং ঢাকার চারদিকে ঘিরে থাকা নদ নদী ব্যতীত দেশের সব প্রধান নদীর পানির সমতলে কমতে শুরু করেছে। আগামী ২৪ ঘণ্টার মধ্যে প্রধান নদী যমুনা, পদ্মা গঙ্গার পানি আরও কমবে। তবে এ সময়ের মধ্যে সুরমা কুশিয়ারা নদীর পানি আরও বাড়তে পারে। ব্রহ্মপুত্র নদীর পানি সমতলে স্থিতিশীল থাকবে। তবে ২৪ ঘন্টায় তিস্তা নদী ডালিয়া পয়েন্টে এবং ধরলা নদী কুড়িগ্রাম পয়েন্টে দ্রুত বেড়ে বিপদসীমা অতিক্রম করতে পারে। এ সময়ের মধ্যে উত্তরাঞ্চল এবং দেশের মধ্যাঞ্চলে বন্যা পরিস্থিতির আরও উন্নতি হবে। তাদের হিসাব অনুযায়ী দেশের ১১টি নদীর পানি ২০টি পয়েন্টে এখনও বিপদসীমার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে।

মানিকগঞ্জ ॥ মানিকগঞ্জের আরিচা পয়েন্টে গত ২৪ ঘণ্টায় যমুনা নদীর পানি ২৫ সেন্টিমিটার কমে বিপদসীমার ১৭ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। যমুনা ও ভাঁটি এলাকার পদ্মা নদীর তীরবর্তী নতুন নতুন নিচু এলাকাগুলোতে পানি ঢুকছে। রবিবার সন্ধ্যার দিকে হরিরামপুর উপজেলা চত্বরে বন্যার পানি ঢুকেছে। নিচু এলাকার ৪৯ হেক্টর রোপা আমন, ৪১০ হেক্টর বোনা ও রোপা আউস, ভুট্টাসহ অন্যান্য ২০ হেক্টর ফসল পানিতে তলিয়ে গেছে। এছাড়াও শিবালয়, হরিরামপুর ও দৌলতপুর ও ঘিওর উপজেলার নিম্নাঞ্চলের নতুন নতুন এলাকায় পানি ঢুকে পড়েছে।

শরীয়তপুর ॥ পানি দ্রুত বৃদ্ধি পাওয়ায় নতুন করে বন্যার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে দেশের মধ্যাঞ্চলীয় জেলা শরীয়তপুরে। সোমবার সন্ধ্যা পর্যন্ত শরীয়তপুরের পদ্মা পাড়ে অবস্থিত নড়িয়া, জাজিরা ও ভেদরগঞ্জ উপজেলার প্রায় ২০টি গ্রামে পানি ঢুকেছে। জাজিরা উপজেলার বিলাশপুর, কাজিয়ার চর ও নড়িয়া উপজেলার মোক্তারের চর, কুলকাঠি, ঢালীকান্দি, নওপাড়া এবং ভেদরগঞ্জ উপজেলার দুলারচর, তারাবুনিয়া ও কাঁচিকাটায় নিচু এলাকা প্লাবিত হওয়ায় কয়েকটি সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়ে পাঠদান ব্যাহত হচ্ছে। রান্নাঘর ও টয়লেট পানিতে তলিয়ে যাওয়ায় নড়িয়া উপজেলার ঢালীকান্দি ও কুলকাঠি গ্রামের দুই শতাধিক পরিবার দুর্ভোগে পড়েছে। গবাদিপশুর খাদ্যেরও সঙ্কট দেখা দিয়েছে।

কুড়িগ্রাম ॥ ব্রহ্মপূত্র, ধরলার ও দুধকুমোরসহ ১৬টি নদ-নদীর পানি কমতে শুরু করেছে। পানি কমলেও মানুষের দুর্ভোগ কমেনি। মানুষজন এখনও তাদের ঘরবাড়িতে ফিরতে শুরু করেনি। প্রায় সাড় ৮ লাখ মানুষ চরম খাদ্য সঙ্কটে পড়েছে। খাদ্য ও বিশুদ্ধ পানির সঙ্কটের পাশাপাশি শৌচাগার না থাকায় কষ্টে আছেন বানভাসি মানুষ। দেখা দিচ্ছে পানিবাহিত রোগ-ব্যাধি। পানি কমার সঙ্গে সঙ্গে কোথাও কোথাও দেখা দিয়েছে নদীর ভাঙ্গন। রবিবারও পানিতে ডুবে দুজনের মৃত্যু হয়েছে। এ পর্যন্ত বন্যায় পানিতে ডুবে ১৫ জনের মৃত্যু হয়েছে।

কুড়িগ্রাম কৃষি সম্প্রসারণ বিভাগ জানায় এখন পর্যন্ত পাট, ভুট্টা, আউসধান ও বীজতলাসহ শাকসবজি জলমগ্ন হয়ে আছে। উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তা আসাদুজ্জামান সরকার জানান, শাকসবজির মধ্যে করলা, পটোল, বেগুন, ঝিঙ্গা, লালশাক, ডাটা, পাট, পুঁই, কলমিসহ ১ হাজার ৯৬২ হেক্টর সবজি ক্ষেত বিনষ্ট হওয়ার পথে।

গাইবান্ধা ॥ গাইবান্ধার ব্রহ্মপুত্র ও ঘাঘট নদীর পানি কিছুটা কমলেও এখনও বিপদসীমার অনেক ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। ফলে জেলার সার্বিক বন্যা পরিস্থিতি এখনও অপরিবর্তিত রয়েছে। বন্যাদুর্গত এলাকায় পানিবন্দী পরিবারগুলোর মধ্যে বিশুদ্ধ পানি, পয়ঃনিষ্কাশন এবং জ্বালানি সঙ্কট বিরাজ করছে। এদিকে পানিবন্দী মানুষদের বন্যার পানিতে দেখা দিয়েছে, নানাবিধ রোগজীবাণু। অনেকে আক্রান্ত হয়ে পড়ছে পানিবাহিত নানাবিধ রোগে। ঘরবাড়ি ছেড়ে যাওয়া পরিবারগুলো নৌ-ডাকাতির শঙ্কায় রয়েছে। অনেক চরবাসী রাত জেগে বাড়ি পাহারা দিচ্ছে। কৃষি বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, বন্যায় জেলার বিভিন্ন এলাকায় ১২ হাজার ৮০৩ হেক্টর জমির ফসল নিমজ্জিত রয়েছে। এসব ফসলের মধ্যে রয়েছে আউশ, আমন বীজতলা, রোপিত আমন, পাট ও শাকসবজি।

বগুড়া অফিস ॥ বগুড়ায় যমুনার পানি এখনও বিপদসীমার ৪৮ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে এবং বাঙালীর পানি বিপদসীমার ৯০ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। যমুনার পানি ধীরে ধীরে নিচে নামলেও বাঙালীর পানি প্রতিদিনই বাড়ছে। এই অবস্থায় বাঙালী ও করতোয়া নদীর পানি বেড়ে সোনাতলা ও গাবতলি উপজেলার নতুন এলাকায় বন্যার পানি ঢুকে পড়ছে। ওদিকে যমুনা ও বাঙালী তীরের সারিয়াকান্দি, ধুনট ও সোনাতলা উপজেলার ১৯টি ইউনিয়নের ১২৯টি গ্রামের প্রায় সোয়া লাখ মানুষ পানিবন্দী অবস্থায় রয়েছে। ১৪৫টি বসতভিটা নদীগর্ভে চলে গেছে। জলমগ্ন ৭৯টি সরকারী প্রাথমিক স্কুলের প্রায় ২৫ হাজার শিক্ষার্থী এখনও স্কুলে যেতে পারছে না। বাঙালীর পানি বেড়ে যাওয়ায় শেরপুর উপজেলার সাহেববাড়ি বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধে ফাটল ধরে একশ’ মিটার ভেঙ্গে গেছে। সোনাতলা উপজেলার দিগদাইর ইউনিয়নের মহিরচরণে বন্যার পানিতে বিদ্যুতস্পৃষ্টে এক ব্যক্তি মারা গেছে। তার নাম পরিতোষ (৩৫)। এদিকে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের উপপরিচালক নিখিল চন্দ্র জানিয়েছেন সোমবার পর্যন্ত ১২ হাজার ২শ’ ৩০ হেক্টর ফসলি জমিতে পানি ঢুকে পড়ায় অন্তত ৬২ হাজার কৃষকের ক্ষতি হয়েছে।

টাঙ্গাইল ॥ নাগরপুর উপজেলায় বন্যা কারণে এ পর্যন্ত ৯২টি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধ হয়ে গেছে। এর মধ্যে মাধ্যমিক বিদ্যালয় ১০টি, মাদ্রাসা ৪টি, কলেজ ২টি এবং সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয় ৭৬টি। এসব শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে অধ্যয়নরত প্রায় ৪৫ হাজার শিক্ষার্থীর শিক্ষা কার্যক্রম বন্ধ রয়েছে। পাইকশা পশ্চিম সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয় ইতোমধ্যে পানির তোড়ে ভেঙ্গে যমুনা নদীতে বিলীন হয়ে গেছে। আরও কয়েকটি প্রাথমিক বিদ্যালয় ভাঙ্গন হুমকিতে রয়েছে। এদিকে সরকারীভাবে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধের কোন নির্দেশনা না থাকায় অভিভাবকরা উভয় সঙ্কটে পড়েছেন। তারা তাদের কোমলমতি সন্তানদের দুশ্চিন্তা নিয়ে বিদ্যালয়ে পাঠাচ্ছেন। যে সকল বিদ্যালয়ে বন্যার পানি উঠেনি সেখানেও শিক্ষার্থীদের উপস্থিতি কমে গেছে। কারণ শিক্ষার্থীদের বিদ্যালয়ে আসতে বন্যার পানি অতিক্রম করে আসতে হয়।