১৯ আগস্ট ২০১৯  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

বন্যা ॥ বর্ষার নিয়মিত চিত্র

  • মিলু শামস

সারাদেশে বন্যা পরিস্থিতি মোটামুটি স্থিতিশীল হয়ে এলেও তিস্তার ডালিয়া পয়েন্ট এবং ধরলার কুড়িগ্রাম পয়েন্টে বন্যার পানি বিপদসীমা অতিক্রম করার সম্ভাবনার কথা জানিয়েছে পানি উন্নয়ন বোর্ডের বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্র। গঙ্গা ও পদ্মার পানি বাড়ার আশঙ্কা নেই। তবে গতকাল পর্যন্ত দেশের প্রধান নদ-নদীর একুশটি পয়েন্টে পানি বিপদসীমার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হয়েছে। কিছু এলাকায় পরিস্থিতি অপরিবর্তিত থাকবে বলেও জানিয়েছে পূর্বাভাস কেন্দ্র।

বর্ষা মৌসুমে এ চিত্র বাংলাদেশে নিয়মিত, যার মূল কারণ ফারাক্কা বাঁধ। বর্ষা এলে ভারত ফারাক্কার গেটগুলো খুলে দেয়। এতে ওদেশেরও কিছু এলাকায় বন্যা ছড়িয়ে পড়ে। কয়েক বছর আগে বিহারের মুখ্যমন্ত্রী ফারাক্কা বাঁধ তুলে দেয়ার দাবি জানিয়েছিলেন। বাংলাদেশের মানুষের এ দাবি আরও পুরনো। বিহারে গত দশ বছর ধরে এ রকম বন্যা হওয়ায় তিনি বলেছিলেন, ‘ফারাক্কা বাঁধের কারণে গঙ্গায় বিপুল পরিমাণ পলি জমেছে। আর এ কারণে প্রতিবছর বিহারে বন্যা হচ্ছে। এর স্থায়ী সমাধান হলো ফারাক্কা বাঁধটাই তুলে দেয়া।’ পদ্মার তলদেশে পলি পড়ে আঠারো মিটারের বেশি ভরাট হয়েছে। এক সময়ে যে পদ্মার পঁচিশ লাখ কিউসেক পানি ধারণ করার ক্ষমতা ছিল এখন তা অর্ধেকে নেমে এসেছে। বর্ষায় ভারত থেকে ফারাক্কার গেট খুলে দিলে ধারণক্ষমতার বেশি পানি নিয়ে পদ্মা ভাসিয়ে দেয় আশপাশের এলাকা। বিপন্ন হয় জনজীবন।

বিহারের মুখ্যমন্ত্রী আরও বলেছিলেন, আগে যেসব পলি নদীর প্রবাহে ভেসে বঙ্গোপসাগরে গিয়ে পড়ত এখন ফারাক্কার কারণে সেই পলি নদীর বুকে জমা হয়ে বন্যা ডেকে আনছে। তাই আমি দশ বছর ধরে বলে আসছি, এই পলি ব্যবস্থাপনা না করলে বিহার কিছুতেই বন্যা থেকে পরিত্রাণ পাবে না। বাংলাদেশের নদী বিশেষজ্ঞরাও এ কথাই বলছেন। খোদ পশ্চিমবঙ্গ থেকেই হয়ত এক সময় এ দাবি উঠবে। কারণ ফারাক্কা বাঁধের মূল উদ্দেশ্য ছিল গঙ্গার নাব্য বজায় রেখে কলকাতা বন্দর চালু রাখা। তাতে বাংলাদেশের পদ্মা, ব্রহ্মপুত্র ও এদের শাখা নদীর ওপর বিরূপ প্রভাব পড়বে সে দিকটা তারা উপেক্ষা করে গেছে বরাবর। বাঁধের কারণে গঙ্গার ভাটি এলাকা বাংলাদেশ অংশে শুধু পানিই কমেনি বদলে গেছে পুরো জীববৈচিত্র্য। মরুময় হয়ে পড়েছে পুরো এলাকা। তবে দীর্ঘ মেয়াদে বাঁধের বিভিন্ন ফটকে পলি জমে এখন ভারতেও এর বিরূপ প্রতিক্রিয়া পড়তে শুরু করেছে। এখন বিহারে, ভবিষ্যতে পশ্চিমবঙ্গকেও হয়ত এ বৈরী প্রভাব মোকাবেলা করতে হবে।

উনিশ শ’ চুয়ান্ন সালের বন্যার পর ক্রুগ মিশন পূর্ব পাকিস্তান সফর করে পানি ও বিদ্যুত উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (ওয়াপদা) গঠনের সুপারিশ করে। উনিশ শ’ ঊনষাট সালে ওয়াপদা গঠিত হয়। একই সঙ্গে বন্যা নিয়ন্ত্রণ ও সেচ প্রকল্প নেয়া হয় অনেক। এর পাঁচ বছর পর পানি সম্পদ উন্নয়নে বিশ বছর মেয়াদী একটি মাস্টারপ্ল্যানের কাজ শুরু হয়। ওয়াপদাকে বন্যা, সেচ নিয়ন্ত্রণের দায়িত্ব দেয়ার সময় বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন কর্পোরেশন (বিএডিসি)কে উফশী ধানের বীজ, রাসায়নিক সার, কীটনাশক বিতরণ জনপ্রিয় ও বাজারজাতকরণের দায়িত্ব দেয়া হয়। কাজগুলো ষাট দশকে ঢাক-ঢোল পেটানো ‘সবুজ বিপ্লব’-এর আওতায়ভুক্ত ছিল। এসবই হচ্ছিল বিশ্বব্যাংকের পরামর্শ মতো। স্বাধীনতার পর এসব প্রকল্পের মূল্যায়নের তেমন কোন উদ্যোগ কোন সরকারই নেয়নি বরং একে সমর্থন দিয়ে এগিয়ে নিয়েছে। বন্যা নিয়ন্ত্রণ, পানি নিষ্কাশন এবং সেচ প্রকল্পের উদ্যোগ ও কার্যপ্রণালী বর্ণনার দলিলদস্তাবেজ রচিত হয়েছে প্রচুর। কিন্তু মেয়াদ শেষে এসব কি সুফল বয়ে এনেছে তা নিয়ে মূল্যায়ন হয়েছে খুব কম। বিশ্বব্যাংক এবং এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক এর পর পানি উন্নয়ন বোর্ডের আওতায় ভূমির উপরের পানি প্রকল্প এবং বিএডিসির আওতায় ভূ-গর্ভের পানি প্রকল্পের প্রতি মনোযোগী হয়। পানিসংক্রান্ত এসব প্রকল্পের শতকরা সত্তর ভাগ আশির দশকের প্রথমভাগ পর্যন্ত এ সংস্থা দুটোর অধীনে ছিল। পরে তা প্রায় আশি ভাগে উন্নীত হয়। কিন্তু এসব প্রকল্পের ‘প্রকল্প সমাপ্তি’ মূল্যায়ন হয়েছে একেবারে কম। অর্থাৎ প্রকল্পের পর প্রকল্প নেয়া হয়েছে-তার জন্য প্রচুর ফান্ড এসেছে কিন্তু কাজের কাজ তেমন কিছুই হয়নি। উনিশ শ’ আটাশি সালে এ্যালেন সি লিন্ডকুইস্ট কিছু বড় প্রকল্পের তিরিশ বছরের প্রকল্প সমীক্ষা করতে গিয়ে বড় বড় শুভঙ্করের ফাঁকি দেখতে পান। তার নিরীক্ষায় বেরিয়ে আসে- ঢাকার এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক অফিস পানি সম্পদ উন্নয়ন বিষয়ক একটি প্রকল্পেরও সমাপ্তি রিপোর্ট দেখাতে পারেনি। বেশিরভাগ ক্ষেত্রে প্রকল্পের অর্থনৈতিক লাভের ওপর নির্ভর করে প্রকল্পের বিন্যাস হয়েছে। মেঘনা-ধনাগোদা সেচ প্রকল্প এবং বরিশাল সেচ প্রকল্পের মতো বড় দুটো প্রকল্পে খরচের ব্যাপক তারতম্য দেখতে পান তিনি। এ দুটো প্রকল্পের খরচ হেক্টরপ্রতি যথাক্রমে চার হাজার মার্কিন ডলার এবং তিন শ’ ষাট মার্কিন ডলার। সাহায্যনির্ভর এসব প্রকল্পে দাতারা তাদের পছন্দমতো কনসালট্যান্ট নিয়োগ দেয়। যোগ্যতা মুখ্য নয়, দাতাদের পছন্দই এখানে শেষ কথা। প্রকল্প ব্যয়ের বড় একটি অংশ কনসালট্যান্টদের ফি হিসেবে দেয়া হতো। এ ক্ষেত্রে স্থানীয় কনসালট্যান্টদের তুলনায় বিদেশী কনসালট্যান্টদের ব্যয় পঁচিশ গুণ বেশি। পানি সম্পদ ব্যবস্থাপনার নামে এ ধরনের সাহায্যনির্ভর প্রকল্পের প্রতি কনসালট্যান্ট, আমলা, প্রকৌশলী সবার লোভনীয় দৃষ্টি থাকে। পানি ব্যবস্থাপনা ও বন্যা নিয়ন্ত্রণের নামে স্বাধীনতার আগে-পরের উদ্যোগ এ ধরনের ধারাবাহিকতাই চলছে। বিশ্বব্যাংক বন্যা সমস্যার দাওয়াই হিসেবে সব সময়ই খুব ব্যয়বহুল কাঠামোগত সমাধান সুপারিশ করে আসছে এবং বলতেই হয়- এ ধরনের সুপারিশের টোপ গেলার জন্য দেশী-বিদেশী সুযোগ সন্ধানীরা আগ্রহভরে অপেক্ষা করে থাকেন।

গত শতকের পঞ্চাশের দশক থেকে শুরু করা পানি সম্পদ রক্ষা ও বন্যা নিয়ন্ত্রণের প্রচারের ঢাক-ঢোল উনিশ শ’ সাতাশি ও আটাশি সালের ব্যাপক বন্যার হাত থেকে দেশকে রক্ষা করতে পারেনি। অথচ মিলিয়ন মিলিয়ন ডলার খরচ হয়েছে এ খাতে। আশির দশকের ওই বন্যার পর করিতকর্মা বিশ্বব্যাংক আবার নড়েচড়ে বসে। ‘বন্যা নিয়ন্ত্রণ’ এবং পানি ব্যবস্থাপনা নিয়ে ব্যাপক তোড়জোড় শুরু হয়। দেশী-বিদেশী বিশেষজ্ঞরা নিউইয়র্ক, ওয়াশিংটন, লন্ডনে একাধিক বৈঠকে মিলিত হন। গুরুত্বপূর্ণ নানা আলোচনা, গুরুগম্ভীর পর্যালোচনা শেষে বাংলাদেশের বন্যা নিয়ন্ত্রণের জন্য যুগান্তকারী দাওয়াই ফ্লাড এ্যাকশন প্ল্যান (ফ্যাপ) প্রণয়ন করেন এবং অল্প সময়ে প্রকৃতি ও পরিবেশের ক্ষতিকর প্রভাব বেরিয়ে পড়ায় দেশে-বিদেশে ব্যাপক সমালোচনার মুখে ফ্লাড এ্যাকশন প্ল্যান বাতিল করা হয়। অবশ্য এর বদলে যা গ্রহণ করা হয় তা নতুন আঙ্গিকে ওই ফ্যাপেরই ভিন্ন সংস্করণ। সুতরাং বন্যা নিয়ন্ত্রণে কাজ কি হচ্ছে তা সহজেই অনুমান করা যায়।

পদ্মার পানি হঠাৎ বেড়ে যাওয়ায় অনেক মানুষ পানিবন্দী হয়ে পড়েছে। সব হারিয়ে সর্বস্বান্ত হয়েছে অনেক পরিবার। এসব খবর প্রতিবছর নিয়মিত আমরা শুনব আর বিশেষজ্ঞরা পানি ব্যবস্থাপনা ও বন্যা নিয়ন্ত্রণে বছরের পর পর নিরলস কাজ করে যাবেন।

অথচ সময় মতো ফারাক্কা বাঁধ তুলে নিলে এসব সমস্যার কোনটাই হতো না। সমস্যা হতো একটাই- বাংলাদেশের বন্যা নিয়ন্ত্রণে বিশ্বব্যাংকের নিত্যনতুন ফরমূলা এ্যাপ্লাইয়ের সুযোগ সৃষ্টি হতো না। আর দেশী-বিদেশী কনসালট্যান্টরাও মোটা ফি থেকে বঞ্চিত হতেন। ফারাক্কা বাঁধ যে এখনও অটুট রয়েছে এটা হয়ত তার অন্যতম কারণ।