১৯ আগস্ট ২০১৯  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

৭১-এর এই দনিে ॥ বঙ্গবন্ধুকে হত্যার নীলনকশা!॥ ২৪ জুলাই, ১৯৭১

  • শাহাব উদ্দিন মাহমুদ

১৯৭১ সালের ২৪ জুলাই দিনটি ছিল শনিবার। এই দিন কুমিল্লায় পাকহানাদার বাহিনী এক কোম্পানির সৈন্য গোঙ্গজ পার হয়ে মুক্তিবাহিনীর কটেশ্বর ঘাঁটির দিকে অগ্রসর হলে মুক্তিবাহিনীর অগ্রবর্তী অবস্থানের যোদ্ধারা মর্টার ও হালকা মেশিন গানের সাহায্যে বাধা দেয়। দু‘ঘণ্টা যুদ্ধের পর পাকসেনারা মুক্তিযোদ্ধাদের প্রতিরোধের মুখে পিছু হটতে বাধ্য হয়। এ সংঘর্ষে পাকবাহিনীর ১৫জন সৈন্য হতাহত হয়। বিকেল পাঁচটায় ক্যাপ্টেন গাফফারের নেতৃত্বে এক প্লাটুন যোদ্ধা কুমিল্লায় ৫০-৬০জন পাকসেনা ও স্থানীয় দালালদের নওগাঁও স্কুল প্রাঙ্গণে অনুষ্ঠিতব্য সমাবেশের ওপর অতর্কিত আক্রমণ চালায়। এই আক্রমণে পাকসেনাদের ৩০জন সৈন্য ও ৭জন দালাল নিহত হয়। এতে সমাবেশ ভেঙ্গে যায় এবং পাকসেনারা ছত্রভঙ্গ হয়ে যায়। বরিশালে পাকহানাদার বাহিনী দুটি গানবোটের সাহায্যে মুক্তিবাহিনীর সাতলা বাগদার পেয়ারা বাগান ঘাঁটি আক্রমণ করে। মুক্তিযোদ্ধাদের ঘাঁটি এলাকা পাকসেনাদের কাছে চিহ্নিত হয়ে যাওয়ায় যোদ্ধারা ঘাঁটি ছেড়ে গৌরনদী থানার জমিদার বাড়িতে নতুন ঘাঁটি স্থাপন করে। সিলেটের তেলিয়াপাড়ায় শত্রুদের আখড়ায় অতর্কিত আক্রমণে ২৫ জন শত্রুসেনা নিহত হয়। মুক্তিফৌজ গেরিলা দল নরসিংদীর পশ্চিমে অহিনাশপুরের রেলপথে একটি এন্টি মাইন স্থাপন করে সেনাবাহী রেললাইন উড়িয়ে দেয়। সব ধরনের প্রস্তুতি থাকা সত্ত্বেও শত্রুরা এই ফাঁদে পা দেয় এবং তাদের ৪টি বগি উড়িয়ে দেয়া হয়। গেরিলা বাহিনীর একই দল রেলপথের স্টেশন সিগন্যাল বোর্ড এবং সরারচরের টেলিগ্রামের সরঞ্জাম ধ্বংস করে দেয়। পরবর্তী সময়ে পাকবাহিনী এ এলাকায় সন্ত্রাসী কাজকর্ম চালায়। রাত ৮ টা ৩০ মিনিটে হানাদার সৈন্যদের অধিকৃত টাঙ্গাইল শহরের একটি সিনেমা হলে মুক্তিফৌজের গেরিলারা হাতবোমা ফাটান। ফলে শত্রুদের ৫ জন নিহত এবং ২০ জন আহত হয়। ২০ জনকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। উল্লেখ্য, গত ১৭ জুলাই টাঙ্গাইল ওয়াপদা তাপ বিদ্যুত কেন্দ্রে গেরিলারা গ্রেনেড চার্জ করেন। ফলে টাঙ্গাইল শহরে বিদ্যুত সরবরাহ বন্ধ হয়ে যায়। মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে প্রচারণা ও অর্থ সংগ্রহের লক্ষ্যে ১৯৭১ সালের এই দিনে নদীয়া একাদশের মুখোমুখি হয়েছিল স্বাধীন বাংলা ফুটবল দল। সেদিন পশ্চিমবঙ্গের নদীয়া জেলার কৃষ্ণনগর স্টেডিয়ামে বাংলাদেশের পতাকা নিয়ে মাঠ প্রদক্ষিণ করেছিল ৩১ ফুটবলারকে নিয়ে গড়া দলটি, যে দলের অধিনায়ক ছিলেন জাকারিয়া পিন্টু আর সহ-অধিনায়ক প্রতাপ শংকর হাজরা। স্বাধীন বাংলা ফুটবল দলের কল্যাণে স্বাধীন হওয়ার আগেই বাংলাদেশের পতাকা উড়েছিল বিদেশের মাটিতে, তাও সেই ১৯৭১ সালের ২৪ জুলাই তারিখে। যুগান্তর পত্রিকার নিজস্ব প্রতিনিধি বাংলাদেশের কনিষ্ঠতম মুক্তিসেনা হোসেন জোয়ারদারের কথা লিখেন। তাঁর ভাষায়, ওর সঙ্গে আরও প্রায় ৫০০ তরুণ ট্রেনিং নিয়েছে। ওর চোখে ফ্রন্টের স্বপ্ন। গাছ ছাড়া অন্য কোন লক্ষ্যভেদ এখনও করেনি। এবার আসল লক্ষ্য শত্রুসেনা। হাতের টিপ ঠিক আছে-এবার ফ্রন্ট। ওর চোখে-মুখে উল্লাস। ও ফ্রন্টে যাবে। ঢাকার সামরিক কর্তৃপক্ষ ঘোষণা করেন, আগামীকাল (২৫ জুলাই) বে-আইনী ঘোষিত আওয়ামী লীগ নেতা তাজউদ্দীন আহমদ, আবদুল মান্নান ও দি পিপল পত্রিকার সম্পাদক আবিদুর রহমানের সম্পত্তি প্রকাশ্য নিলামে বিক্রি করা হবে। মার্কিন সহকারী পররাষ্ট্রমন্ত্রী জন আরউইন ভারতে বাংলাদেশের শরণার্থী প্রসঙ্গে সিনেটের বিচার বিভাগীয় সাব-কমিটিতে বলেন, শরণার্থীদের স্বদেশ প্রত্যাবর্তন কাজ ত্বরান্বিত করার জন্য পূর্ব-পাকিস্তান ভারত সীমান্তে জাতিসংঘের পর্যবেক্ষক দল মোতায়েনের প্রস্তাবকে পাকিস্তান স্বাগত জানিয়েছে কিন্তু ভারত তা গ্রহণ করেনি। ঈশ্বরদী থানা শান্তি কমিটির আহ্বায়ক আরিফুদ্দিনের সভাপতিত্বে স্বাধীনতা বিরোধীদের সভা অনুষ্ঠিত হয়। সভায় সাবেক মন্ত্রী ফকরুদ্দিন বলেন, ‘দুনিয়ায় এমন কোন শক্তি নেই যা পাকিস্তানকে ধ্বংস করতে পারে।’ তিনি সবাইকে গ্রাম রক্ষীবাহিনীতে যোগ দিতে আহ্বান জানান। সভায় কাউন্সিল মুসলিম লীগের পূর্ব পাকিস্তান শাখার প্রচার সম্পাদক বলেন, ‘পাকিস্তান বিভক্ত করার চক্রান্তে লিপ্ত দুষ্কৃতকারী দমনে আমরা দৃঢ়প্রতিজ্ঞ এবং তাদের চেষ্টা ব্যর্থ হয়েছে। বিবিসি বাংলার ডন নিউজ টকে পাকবাহিনী ও মুক্তি বাহিনী সম্পর্কে বিশদভাবে উঠে এসেছে পূর্ব পাকিস্তানে মুক্তি বাহিনীর নাশকতা চলছে। বিবিসির মার্ক টালি, পাকিস্তান সেনাবাহিনী যে পরিস্থিতির মুখোমুখি সে ব্যাপারে লিখেছেন। প্রথমে কেউ পূর্ব পাকিস্তানে আসলে মনে করবে এখানকার পরিস্থিতি স্বাভাবিক হচ্ছে। কিছু এলাকার জন্য কথা সত্যি। পরিস্থিতি যাই হোক মানুষকে খেতে হবে, আয় করতে হবে। তবে স্বাভাবিক হবার পরিবেশ গেরিলা এ্যাকশনে বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। মুক্তি বাহিনীর দুটি অস্ত্র, ভয় এবং অর্থনীতির ভাঙ্গন। স্বাধীন বাংলা বেতারে মুক্তিফৌজ ঘোষণা করেছে যে, যদি কেউ সেনাবাহিনীকে সাহায্য করে তবে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া হবে। তারা শান্তি কমিটি ও অন্যান্য বিশিষ্ট সহযোগী সদস্যদের হত্যা করছে এবং কারখানা শ্রমিক, চা বাগান শ্রমিক ও পাট চাষীদের শাসানি দিচ্ছে। অর্থনৈতিক ফ্রন্টে তারা অত্যাবশ্যক কিছু ইনস্টলেশন স্যাবোটাজ করছে এবং ধ্বংস করছে। তারা যোগাযোগ ব্যবস্থা যাতে পুনরায় ঠিক করা না যায় সেরকম ব্যবস্থা নিচ্ছে। পাকিস্তান সেনাবাহিনী এই হুমকি পূরণ করার চেষ্টা করছে কিন্তু তারা খুব কঠিন ঝামেলায় আছে। প্রথমত. তারা গুরুত্বপূর্ণ শহরগুলোতে অনেক সৈন্য রাখছে কারণ তারা মনে করছে বড় আক্রমণ হতে পারে। বাকিরা মূলত সীমান্তে আছে। পূর্ব পাকিস্তানের জনগণ মুক্তি ফৌজের প্রতিকূলে যাবে যদি তাদের দৈনন্দিন জীবন ব্যাহত হয়। কিন্তু যদি সেনাবাহিনী শান্তি ফিরিয়ে না আনতে পারে তাই সাধারণ জনগণ মুক্তিফৌজের কোন তথ্য সেনাবাহিনীকে দেবে না। আসল সোর্স হল গেরিলা বাহিনী যারা ভারতের বর্ডারে অবস্থিত ক্যাম্পে অবস্থান করে। মুক্তিফৌজ খুব সহজেই আর্মিদের পোস্টের কাছে ঘুমাতে পারে আর যার ফলে মাঝে মাঝেই তাদের সীমান্ত দিয়ে আক্রমণ করতেও সমস্যা হয় না। ভারত ও পাকিস্তান আর্মিদের মধ্যে ক্ষণে ক্ষণে শেলিং চলতে থাকে। এটা বলা সম্ভব নয় যে গেরিলাদের সংখ্যা কত? তবে সব সীমান্তজুড়েই তাদের অবস্থান। পাকিস্তান সেনাবাহিনী কার্যত একটি অসম্ভব কাজের সম্মুখীন হয়েছে। তারা এমন একটি এলাকায় অবস্থান করছে যেখানে যোগাযোগ ব্যবস্থা পুরোটাই গেরিলাদের নখদর্পণে। তবে তারা পাকিস্তানের দুটি প্রধান ক্ষেত্র চা আর পাট সেক্টরের নিরাপত্তা বিধান করতে পেরেছেন। আরও কিছু গেরিলাদের প্ল্যান ভেস্তে দেয়া হয়েছে। গেরিলাদের এখনও অনেক কিছু শেখা বাকি। সব কিছু নির্ভর করছে তারা কতদিন তাদের মনোবল ধরে রাখতে পারে এবং টিকে থাকতে পারে। দৈনিক যুগান্তর পত্রিকায় প্রকাশিত সম্পাদকীয় নিবন্ধে বলা হয়েছে, জেনারেল ইয়াহিয়া খানের হাতে বন্দী শেখ মুজিবুর রহমানের ভাগ্য সম্পর্কে অস্থায়ী বাংলাদেশ সরকারের পররাষ্ট্রমন্ত্রী খন্দকার মোশতাক আহমদ যে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে, সে উদ্বেগ তার একার নয়, পৃথিবীর সকল সভ্য মানুষেরই এই বিষয়ে উদ্বেগ থাকার কথা। শাসক হিসেবে যার বন্দুকের জোর ছাড়া আর কোন জোরই নেই সেই ইয়াহিয়া খান বিচারের নামে হত্যা করতে চাইছেন শেখ মুজিবুর রহমানকে যিনি বাংলাদেশের সাড়ে সাত কোটি মানুষের নির্বাচিত নেতা। ইয়াহিয়া খানকে এই জিঘাংসা থেকে নিবৃত্ত করার দায়িত্ব সারা পৃথিবীর, সমগ্র মনুষ্যজাতির। বিদেশী সাংবাদিকদের কাছে দম্ভভরে ইয়াহিয়া খান বলেছেন, শেখ মুজিবুর রহমানকে সামরিক আদালতে ‘বিচারের’ সম্মুখীন করা হবে এবং তার বিরুদ্ধে যে অভিযোগ আনা হবে তাতে তার মৃত্যুদ- হতে পারে। দশ লাখ মানুষের হত্যা, অসংখ্য নারী নির্যাতন, লুণ্ঠন ও ধ্বংসের জন্য যিনি দায়ী তিনি কি করে অন্যের বিচার করবেন? শেখ মুজিবুর রহমান এমন কি করেছেন, যার জন্য তাকে ইয়াহিয়ার কাছে প্রাণ বলি দিতে হবে? দেশদ্রোহী? মুজিব যদি দেশদ্রোহী হয় তাহলে ইয়াহিয়া ঢাকায় এসে তার সঙ্গে বৈঠক করছিলেন কেন? এই ‘বিচার’ গোপনেই বা অনুষ্ঠিত হবে কেন? যাকে ইয়াহিয়া খান নিজে ‘ভবিষ্যতের প্রধানমন্ত্রী’ বলে অখ্যায়িত করেছিলেন, তার বিরুদ্ধে আজ কি অভিযোগ, কি সাক্ষ্যপ্রমাণ, এসব কথা দেশের লোককে ও পৃথিবীর মানুষকে জানতে দেওয়া হবে না কেন? একজন নিরস্ত্র, নিঃসঙ্গ মানুষ তার হাতের মুঠোয়, আদালত তার নিজেরই তৈরি। তবু সেই মানুষকেই তার এত ভয় যে, সকলের চোখের সামনে সেই মানুষটিকে তিনি কাঠগড়ায় দাড় করাতে পারছেন না? এটা লক্ষ্য করার বিষয় যে, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবকে ফাঁসির কাষ্ঠে ঝোলাবার হুমকি দেওয়ার সঙ্গে সঙ্গে ইয়াহিয়া এ কথাও বলে রেখেছেন যে, মৃত্যুদ-ের আদেশ মওকুব করার ক্ষমতা তার রয়েছে। মুজিবের অনুগামীদের সম্ভবত প্রছন্নভাবে তিনি এটাই জানিয়ে দিতে চান যে, তারা যদি তাদের নেতাকে প্রাণে বাঁচাতে চান তাহলে তার সঙ্গে একটা আপোসে আসতে হবে। কিন্তু রক্তপিপাসু ইয়াহিয়া খানকে এই চরম নির্বুদ্ধিতার পথ থেকে নিবৃত্ত করবে কে? বাংলাদেশ সরকারের পররাষ্ট্রমন্ত্রী খন্দকার মোশতাক আহম্মদ এই বিচারের প্রহসন বন্ধ করে শেখের প্রাণ বাঁচাবার জন্য জাতিসংঘের সেক্রেটারি জেনারেল উথান্টের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন। সেক্রেটারি জেনারেলের নিশ্চয়ই এই বিষয়ে একটা কর্তব্য রয়েছে। মানবিকতার নামে, ন্যায্য বিচারের নামে তার নিশ্চয়ই এই ব্যাপারে হস্তক্ষেপ করা উচিত। মুজিবের প্রহসনের বিচার বন্ধ করার দাবিতে সারা পৃথিবীর জনমত সোচ্চার হয়ে ওঠা উচিত।

লেখক : শিক্ষাবিদ ও গবেষক

sumahmud78@gmail.com