২২ আগস্ট ২০১৯  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

নাম বিড়ম্বনায় খেলতে না পারা সালমার হৃদয়ে রক্তক্ষরণ

নাম বিড়ম্বনায় খেলতে না পারা সালমার হৃদয়ে রক্তক্ষরণ

স্পোর্টস রিপোর্টার ॥ খেলায় অংশ নিয়ে ব্যর্থ হলে যতটা না কষ্ট, তার চেয়েও কয়েকগুণ বেশি কষ্ট হচ্ছে যথাযথ প্রস্তুতি নিয়েও যদি সেই খেলাতেই অংশ না নেয়া যায়। চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলা দলের ১৪ বছর বয়সী সুদর্শনা কুস্তিগীর উম্মে সালমা এখন ভুগছে সেই অসহ্য মর্মযাতনায়। হৃদয়ে অহর্নিশ হচ্ছে রক্তক্ষরণ। কিছুতেই ভুলতে পারছে না খেলায় নাম দেবার পরও খেলতে না পারার দুঃসহ স্মৃতি।

ঢাকার পল্টনের শহীদ (ক্যাপ্টেন) এম মনসুর আলী জাতীয় হ্যান্ডবল স্টেডিয়ামে মঙ্গলবার থেকে শুরু হয়েছে জাতীয় জুনিয়র কুস্তি প্রতিযোগিতার আসর। আগেরদিন বালক ও বালিকা বিভাগের সব কুস্তিগীরদের ওজন গ্রহণ করে তাদের নাম নিবন্ধন করা হয় এবং ওজন অনুযায়ী তাদের বিভিন্ন শ্রেণীতে ফেলা হয়।

উম্মে সালমাও অন্যদের মতো নিজের ওজন টুর্নামেন্ট কমিটির মাধ্যমে নিরূপণ করে এবং ৫৩ কেজি ওজন শ্রেণীতে তার নাম লিপিবদ্ধ করা হয়। কিন্তু পরদিন খেলা শুরুর ঠিক আগে সে জানতে পারে তার খেলা হবে না। কারণ? এ প্রসঙ্গে সালমার কোচ মোহাম্মদ বাবলু জামান (২০১০ এসএ গেমসে কারাতেতে স্বর্ণজয়ী মরিয়ম খাতুন এবং বিপাশার বাবা) জনকণ্ঠকে বলেন, ‘আগেরদিন যখন সালমা কমিটির সামনে নিজের ওজন মেপে নাম লেখায় তখনও আমি ঢাকা পৌঁছুতে পারিনি। সালমার সঙ্গে আমার স্ত্রী ছিল। যাহোক, মঙ্গলবার ঢাকা পৌঁছে আমি খেলা শুরুর আগে একটি ফিকশ্চার হাতে নিয়ে অবাক হয়ে আবিস্কার করি, সেখানে সালমার নামই নেই! আমি টুর্নামেন্ট কমিটির কাছে গিয়ে ব্যাপারটা জানতে চাইলে তারা এন্ট্রি বুক বের করে চেক করে দেখে সেখানে সালমার নাম ঠিকই লেখা ছিল, কিন্তু পরে আবার সেই নামটি কেটে দেয়া হয়েছে!’

এক্ষেত্রে টুর্নামেন্ট কমিটির ভাষ্য-উম্মে সালমার নামটি দু’বার লেখা হয়েছিল এবং দু’বারই তার দলের নাম রাজশাহী জেলা ক্রীড়া সংস্থার নামে লেখা হয়। অথচ সালমার দল তো চাঁপাইনবাবগঞ্জ! ঘটনার এখানেই শেষ নয়। কাকতালীয়ভাবেই ঠিক এই নামেই রাজশাহীর এক খেলোয়াড় ছিল, উম্মে সালমা রিংকী! টুর্নামেন্ট কমিটি তখন বিষয়টি আবিস্কার করে জানায় একই ওজন শ্রেণীতে এক খেলোয়াড় দু’বার নাম দিতে পারবে না। তখন সেখানে উপস্থিত রাজশাহীর কোচ আহসান কবির বাবু (জানা গেছে ৫৩ কেজি ওজন শ্রেণীতে স্বর্ণজয়ী খেলোয়াড় উম্মে সালমা রিংকী হচ্ছে তার মেয়ে। পরে রিংকীই সেই ইভেন্টে স্বর্ণজয় করে) নাকি তখন কমিটিকে বলেন, উম্মে সালমা রিংকীর নামটি রেখে উম্মে সালমার নামটি কেটে দেয়া হোক, কারণ হয়তো একই নাম ভুলে দু’বার লিখে ফেলেছে কমিটি। কমিটি বাবুর কথা মেনে তাই করে এবং ওই ওজন শ্রেণীর খেলা শুরু করে দেয় (ওই ওজন শ্রেণীতে মোট চার খেলোয়াড় ছিল)। কয়েকটি খেলা হয়ে যাওয়ার পর চাঁপাইয়ের উম্মে সালমার কোচ বাবুলের টনক নড়ে। তিনি টুর্নামেন্ট কমিটির দৃষ্টি আকর্ষণ করেন এবং আগের সব খেলা বাতিল করে সালমাকে খেলানোর অনুরোধ করেন। কিন্তু কমিটি ততক্ষণে অনেক দেরি হয়ে গেছে জানিয়ে দেয় বাবুলকে। ফলে মন ভেঙ্গে যায় সালমা ও তার কোচের। বাবলু বলেন, ‘ও যদি খেলে হারতো তাহলে কোন কষ্ট ছিল না। কিন্তু ও তো খেলতেই পারলো না! এত পরিশ্রম, অনুশীলন, পড়াশোনা বন্ধ করে ঢাকায় আসা-সবই তো বৃথা গেল। ওর পরিবারকে এখন কি জবাব দেব? আমি আশা করেছিলাম এই ইভেন্টে সালমা একটি পদক জিতবে।’

২০১৭ সালে চাঁপাইনবাবগঞ্জে অনুষ্ঠিত একটি কুস্তি টুর্নামেন্টে ৫০ কেজি ওজন শ্রেণীতে রৌপ্যপদক জিতেছিল উম্মে সালমা। ওটাই ছিল ক্যারিয়ারের প্রথম সাফল্য। ঢাকায় এসে দ্বিতীয় সাফল্য কুড়িয়ে নেয়ার

স্বপ্নসাধ ধূলিসাৎ হয়ে গেল তার। এলাকার অন্যান্য মেয়েদের কুস্তি খেলতে দেখেই এই খেলার প্রেমে পড়ে যায় সালমা। পরিবার থেকেও মেলে সম্মতি। কুস্তি খেলে ভবিষ্যতে একটি ভাল চাকরি পাবার পাশাপাশি দেশের হয়ে আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় স্বর্ণ জেতার স্বপ্ন দেখে অষ্টম শ্রেণীর শিক্ষার্থী সালমা।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক টুর্নামেন্ট কমিটির এক কর্মকর্তা জানান, ‘আসলে রাজশাহীর কোচ বাবু চালাকি কৌশলের কারণেই খেলতে পারেনি চাঁপাইয়ের মেয়েটা। আর আমরাও তো সব খেলোয়াড়কে চিনি না। যদি চিনতাম, তাহলে তো ঠিকই ভুল শুধরে মেয়েটিকে খেলাতে পারতাম।

অবশ্য এক্ষেত্রে রাজশাহীর কোচ বাবুর যুক্তি ছিল ভিন্ন, ‘চাঁপাইয়ের সালমার আগেই আমার রাজশাহী দলের সালমা তার ওজন পরিমাপ করে ও নাম এন্ট্রি করে। পরে চাঁপাইয়ের মেয়েটা নাম নাম লেখাতে গিয়ে ভুলে রাজশাহীর দলের নাম লিখে ফেলে। পরে টুর্নামেন্ট কমিটির তা নজরে এলে আমাকে ডেকে বলে একই নাম (দলের নামও দু’বার) দু’বার এসেছে কেন? এটা যেন ঠিক করে দিই। পরে চেক করে উম্মে সালমা রিংকীর নামটি রেখে অন্য নামটি (উম্মে সালমা) কেটে দিতে বলি। এতে আমার দোষটা কোথায়? খেলা শুরুর আগে চাঁপাইয়ের ওই খেলোয়াড়ের কোচ কেন সেখানে থেকে বিষয়টি প্রোটেস্ট করলো না?’