২৪ জুলাই ২০১৯

নেতানিয়াহুর যুগ শেষ হতে চলেছে!

ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহু আজ ১৩ বছর শাসনক্ষমতায়। চলতি মাসের মাঝামাঝি তিনি ইসরাইল রাষ্ট্রের জনক ডেভিড বেনগুরিয়ানের কার্যকালকে ছাড়িয়ে গিয়ে দেশের ইতিহাসে সবচেয়ে দীর্ঘদিন ধরে ক্ষমতাসীন প্রধানমন্ত্রী হিসেবে রেকর্ড গড়েছেন। পাঁচবার নির্বাচনে বিজয়ী নেতানিয়াহু ‘বিবি’ নামে দেশবাসীর কাছে সর্বাধিক পরিচিত। এমনি মনে হতে পারে যে এত দীর্ঘদিন ক্ষমতায় থাকা নেতানিয়াহু যথেষ্ট শক্তিধর। হওয়ারই কথা। কিন্তু এবারের নির্বাচন পরবর্তী পরিস্থিতি দৃষ্টে বোঝা যায় তিনি দুর্বল হয়ে পড়েছেন।

কারণ নির্বাচনের প্রায় ২ মাস অতিক্রান্ত হওয়ার পরও এখন পর্যন্ত কোন কার্যকর কোয়ালিশন তিনি গড়ে তুলতে পারেননি। এ অবস্থায় নেসেট বা পার্লামেন্টকে ভেঙ্গে দেয়া হয়েছে এবং ১৭ সেপ্টেম্বর আরেক দফা ভোট অনুষ্ঠিত হবে। তার মানে তিন মাস ধরে নির্বাচনী প্রচার চালানোর পরও রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা রয়ে গেছে এবং আগামী নির্বাচনের ফল যে সেই অনিশ্চয়তা দূর করতে পারবে তার কোন গ্যারান্টি নেই। তাই প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছেÑ এই পরিস্থিতির কি কোন পরিবর্তন হবে? নতুন ভোটাভুটি কি ক্ষমতার ভারসাম্যের পরিবর্তন আনবে?

গত এপ্রিলে শাসক দল লিকুদ পার্টি পার্লামেন্টের ১২০টি আসনের মধ্যে ৩৫টি আসনে বিজয়ী হওয়ার পর প্রধানমন্ত্রী হিসেবে নেতানিয়াহুর পঞ্চম মেয়াদ মোটামুটি নিশ্চিত হয়ে যায়। কারণ ধরেই নেয়া হয় যে কোয়ালিশন করার মতো সদস্য তিনি বাগিয়ে নিতে পারবেন। কিন্তু বাস্তবে তা হয়নি। ওদিকে তিনটি দুর্নীতির মামলায় তার অভিযুক্ত হওয়ার সম্ভাবনা আছে। নেতানিয়াহু অবশ্য অভিযোগ অস্বীকার করে পাল্টা অভিযোগ করেছেন যে বিরোধী দলগুলোই কোন কিছু করতে না পেরে উদোর পিন্ডি বুধোর ঘারে চাপিয়ে দেয়ার চেষ্টা করছে। তবে নেতানিয়াহুর পতœী সরকারী তহবিল অপব্যবহারের কথা স্বীকার করেছেন। তাকে কাঠগড়ায় দাঁড়ও হতে হয়েছে।

তবে দীর্ঘ ১৩ বছর ক্ষমতায় থেকে যাওয়ার ফলে রাষ্ট্রক্ষমতার ওপর তার কব্জা অসাধারণ রূপ ধারণ করেছে। সমর্থক ও বিরোধী নির্বিশেষে সবাই ব্যবসায়, নিরাপত্তা, পররাষ্ট্র, মিডিয়ার কিয়দাংশসহ ইসরাইলের জীবনের বিশাল এলাকার ওপর তার নিয়ন্ত্রণের কথা উল্লেখ করে থাকেন। আমেরিকায় শিক্ষিত এবং ইংরেজী ভাষার ওপর অসাধরণ দখলের অধিকারী নেতানিয়াহু ইসরাইলের আন্তর্জাতিক পতাকাবাহী হয়ে দাঁড়ান।

কিন্তু এবারের নির্বাচনের পর থেকে নেতানিয়াহু বুঝতে পেরেছেন যে ক্ষমতার ওপর তার আগের সেই বজ্র নিয়ন্ত্রণ আর নেই। সেটা ক্রমশ শিথিল হয়ে আসছে। দেড় মাস আগে তিনি নির্বাচনী বিজয়ে উৎসব করেছিলেন। তার লিকুদ পার্টি এবং বরাবরের কোয়ালিশন দক্ষিণপন্থী ও ধর্মীয় দলগুলো সব মিলিয়ে ৬৫টি আসনে বিজয়ী হয়েছিল। সংখ্যাগরিষ্ঠতার জন্য প্রয়োজনীয় আসন সংখ্যার চেয়েও তা বেশি ছিল। কিন্তু কোয়ালিশন সরকার গঠনে শরিক দলগুলোকে তিনি চুক্তিপত্রে সই করাতে পারেননি। এ ব্যাপারে কোন ঐকমত্য না হওয়ায় তার নতুন সরকারের যাত্রা শুরু হতে না হতেই বিপর্যয়ে পড়ে।

সমস্যাটা আসলে কোথায়? সেটা হচ্ছে ইসরাইলী সমাজে একটা ফাটল ধরেছে এবং সেই ফাটলটা অতি গভীর। সেই ফাটলের একাদিকে রয়েছে ধর্মীয় দিক দিয়ে রক্ষণশীল অতিমাত্রায় গোড়া ইহুদী সম্প্রদায় যা সংখ্যার দিক দিয়ে ক্রমশ স্ফীত হচ্ছে এবং অন্যদিকে রয়েছে সেক্যুলারপন্থী ইহুদী যাদের জীবনযাত্রা বহুলাংশে পাশ্চাত্য দেশগুলোর মতো। উভয়ের মধ্যে দ্বন্দ্ব রয়েছে এবং তা সম্প্রতি তীব্র আকার ধারণ করেছে। সেক্যুলার উদারপন্থীরা সেনাবাহিনীতে যোগদানে গোড়া ধর্মীয় রক্ষণশীল তরুণদের ওপর বাধ্যতামূলক কোটা আরোপের বিলের সমর্থক। আর রক্ষণশীলরা ধর্মীয় কারণে এই কোঠার বিরোধী। নেতানিয়াহুর কোয়ালিশন গঠনের জন্য এই উভয় গ্রুপের সমর্থন দরকার। কিন্তু তিনি কোনভাবেই এই দুই গ্রুপের দ্বন্দ্বের অবসান ঘটাতে এবং অচলাবস্থা ভাঙতে পারেননি।

এর পরিণতিতে তিনি রাজনৈতিকভাবে দুর্বল হয়ে পড়েছেন। কোয়ালিশন গঠনে তার সামনে অপশনগুলোর পরিধি সঙ্কুচিত হয়ে আসছে। সম্ভাব্য শরিকদের দাবি দাওয়া ক্রমশ বৃদ্ধি পাচ্ছে। প্রতিদ্বন্দ্বীরা টের পাচ্ছে যে নেতানিয়াহুর রাজনৈতিক বিপন্নতা বাড়ছে। তারা হিসাব করে দেখছে যে নেতানিয়াহুর যুগ সম্ভবত শীঘ্রই শেষ হতে চলেছে। তাই তারা ক্ষমতায় যাওয়ার জন্য কোমর বাঁধতে লেগে গেছেন। তথাপি সেপ্টেম্বরে যে নির্বাচন হতে যাচ্ছে তাতে ভালভাবে জয়লাভের জন্য নেতানিয়াহু যে মরণপণ চেষ্টা করবেন তাতে কোন সন্দেহ নেই।

সূত্র : টাইম ও অন্যান্য